Naya Diganta

জাওয়াদের প্রভাবে ভোগান্তি দেশজুড়ে

ঘূর্ণিঝড় জাওয়াদ শেষ পর্যন্ত লঘুচাপে পরিণত হয়ে গেছে। এর প্রভাবে গতকাল সারা দিনই মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি হয় দেশে। লঘুচাপটি অবশ্য সময়ের ব্যবধানে গুরুত্বহীন হয়ে পড়বে। তবে এর রেশ রয়েই গেছে। গত রাতেও উপকূলীয় এলাকায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার বেগে ঝড়োহাওয়া বয়ে গেছে। ফলে দেশের চার সমুদ্রবন্দরেই আবহাওয়া অফিস ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসঙ্কেত জারি রেখেছে। উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌযানকে পরবতী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে।
এ দিকে জাওয়াদের কারণে সমুদ্র উত্তাল থাকার পাশাপাশি দেশের বেশির ভাগ স্থানেই টানা বৃষ্টি হয়েছে গতকাল। অনেক জেলায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা। সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে অনেক ট্রলার নিরাপদ আশ্রয়ে না ফেরায় জেলেদের পরিবারে উদ্বেগ বিরাজ করছে। এর মধ্যে ভোলার চরফ্যাসনের একটি ট্রলার সাগরে মালবাহী জাহাজের ধাক্কায় ডুবে গেলে ১২ জেলে নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়া বৃষ্টির পানিতে রাজধানী ঢাকাসহ অনেক জেলা শহরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। গত দুই দিন বৃষ্টির কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন শ্রমজীবী মানুষ। শীতের মধ্যে বৃষ্টিতে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার লোকজনও সমস্যায় পড়েন।
এবারের ঘূর্ণিঝড় জাওয়াদ ছিল নজিরবিহীন একটি ঝড়। নি¤œচাপ সমুদ্রে ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়ে আবার সমুদ্রেই তা দুর্বল হয়ে পড়ার নজির রয়েছে। কিন্তু একটি ঘূর্ণিঝড় দুই অংশে বিভক্ত হয়ে দুই দিকে যাওয়ার নজির নেই। এবারই এমন ঘটনা ঘটেছে। ভারতের উড়িষ্যা উপক‚লের কাছাকাছি এসে দু’ভাগে তা বিভক্ত হয়ে গেছে। এর একটি ভাগ বাংলাদেশের দিকে আসতে আসতে শেষ পর্যন্ত গত রাতে লঘুচাপে পরিণত হয়েছে। লঘুচাপের কারণেই সারা দেশে থেমে থেমে বৃষ্টি হয়।
গতকাল মোটামুটি সারা দেশে হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি হয়েছে। তবে বাদ গেছে রংপুর বিভাগের জেলাগুলো। আকাশে মেঘ থাকলেও বৃষ্টিমাপক যন্ত্রে মাপার মতো বৃষ্টি রংপুর বিভাগের জেলাগুলোতে হয়নি। এই বিভাগ ছাড়া অবশিষ্ট সাত বিভাগেই বৃষ্টি হয়েছে। গতকাল সোমবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ বৃষ্টি হয়েছে যশোরে ১৬৩ মিলিমিটার। এরপরই ঢাকায় ১৩২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে ২৪ ঘণ্টায়। এই দুই জায়গায় মাঝারি মানের বৃষ্টি সারা দিনই হয়েছে। এতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা দারুণভাবে ব্যাহত হয়। খেটে খাওয়া যেসব মানুষ রাস্তায় অথবা খোলা আকাশের নিচে পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন তাদের কষ্টের কোনো শেষ ছিল না। শীতের মধ্যে টানা বৃষ্টি হওয়ায় অনেক রিকশাচালকও তাদের রিকশা চালানো বন্ধ রেখেছেন। লোকজনের চলাচল কম থাকায় ফুটপাথের দোকান যেমন কম ছিল তেমনি ক্রেতাও তেমন ছিল না। যানবাহনের সঙ্কটে চলাচলে বেশ সমস্যা হয়েছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের, যারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া-আসা করে। এইচএসসি পরীক্ষা থাকায় পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বৃষ্টির মধ্যেই চলাফেরা করতে হয়েছে।
গতকাল সন্ধ্যায় আবহাওয়া অধিদফতরের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন পশ্চিমবঙ্গ-বাংলাদেশ উপক‚লীয় এলাকায় অবস্থানরত সুস্পষ্ট লঘুচাপটি আরো দুর্বল হয়ে লঘুচাপ আকারে উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন বাংলাদেশ উপকূলীয় এলাকায় অবস্থান করছে। এটি আরও দুর্বল ও গুরুত্বহীন হয়ে পড়বে। এতে বলা হয়, লঘুচাপটির প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর ও বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় গভীর সঞ্চারণশীল মেঘমালা সৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে এবং বায়ুচাপের তারতম্যের আধিক্য বিরাজ করছে। অন্য দিকে সোমবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে আগামী ২৪ ঘণ্টার আবহাওয়ার পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায়; খুলনা ও বরিশাল বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় এবং ময়মনসিংহ ও রাজশাহী বিভাগের দু-এক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী বর্ষণ হতে পারে। এ সময় সারা দেশে রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে এবং দিনের তাপমাত্রা এক থেকে দুই ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়তে পারে বলেও পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে।
রাজধানীতে জলাবদ্ধতা-যানজটে চরম ভোগান্তি
নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, ঘূর্ণিঝড় ‘জাওয়াদ’-এর প্রভাবে দিনভর একটানা বৃষ্টিতে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে নয়াপল্টন, ফকিরাপুল, আরামবাগ, মিরপুর, কাজিপাড়াসহ বিভিন্ন স্থানে হাঁটু সমান পানি জমে যায়। এ ছাড়া কোথাও কোথাও গাড়ি সঙ্কট, আবার অনেক স্থানে দীর্ঘ যানজটের কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয় নগরবাসীকে।
গত রোববার থেকে রাজধানীতে থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। গতকাল সকাল থেকে টানা বৃষ্টি হওয়ায় কাজে বের হওয়া এবং অফিসগামী মানুষ ভোগান্তিতে পড়েন। গণপরিবহন সঙ্কট ও কিছু সড়কে যানজট ভোগান্তির মাত্রা আরো বাড়িয়েছে। অসময়ের বৃষ্টিতে ছাতা নিয়ে বের না হওয়ায় অনেকে কাকভেজা হয়ে গণপরিবহনের জন্য সড়কে অপেক্ষা করতে বাধ্য হন।
সরেজমিন দেখা যায়, সকাল ৮টার দিকে বৃষ্টিতে মিরপুরের সড়কে গণপরিবহনের তীব্র সঙ্কট দেখা দেয়। মিরপুর ও পল্লবী এলাকার রাস্তার মোড়ে মোড়ে অফিসগামী ও সাধারণ মানুষদের যানবাহনের জন্য অপেক্ষা করতে দেখা যায়।
পল্লবী এলাকার বাসিন্দা ইয়াসিন মুন্সী। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা। প্রতিদিনের মতো গতকাল সকালে অফিস করতে মালিবাগ যাওয়ার জন্য বাসা থেকে বের হয়ে পড়েন বিপাকে। ভিজেছেন বৃষ্টিতে। ইয়াসিন বলেন, বৃষ্টির কারণে বাস পাচ্ছি না। যে দু-একটা বাস আসছে সেগুলোতে ওঠা যাচ্ছে না। পুরান ঢাকার সূত্রাপুর থানাসহ আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখা যায়, টানা বৃষ্টির কারণে বেশ কয়েকটি এলাকার অলিগলিতে জলাবদ্ধতাসহ কাদার সৃষ্টি হয়েছে। পথচারীদের বৃষ্টিতে ও পানিতে ভিজে গন্তব্যে যেতে দেখা গেছে।
মিরপুর ১০ নম্বরে দুপুরের দিকে ছাতা মাথায় গণপরিবহনের জন্য অপেক্ষা করছিলেন আরিফুল ইসলাম। তিনি বলেন, কাওরান বাজারে অফিসে যাবো কিন্তু বৃষ্টির কারণে বাস পাচ্ছি না। যে দু-একটা বাস আসছে সেগুলো অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই হয়ে আসায় ওঠা যাচ্ছে না। উত্তর বাড্ডা থেকে মিরপুর-১ নম্বরে আসা আরেক বেসরকারি চাকরিজীবী শুকুর আহমেদ বলেন, উত্তর বাড্ডায় দীর্ঘসময় অপেক্ষা করে বাসে উঠেছি। কুড়িল, এয়ারপোর্ট রোড, কালশী সব জায়গাতেই অতিরিক্ত যানজট সৃষ্টি হয়েছে বৃষ্টির কারণে। যানজট হলেও গণপরিবহনের সংখ্যা অনেক কম। কালশী, মিরপুরসহ বিভিন্ন সড়কে জলাবদ্ধতা দেখেছি।
সময় যত বাড়তে থাকে বৃষ্টির পরিমাণও তত বাড়তে থাকে। দুপুরের দিকে রাজধানীতে বৃষ্টিপাতের মাত্রা ছিল সর্বাধিক। কিছুটা অন্ধকার নেমে আসায় বৃষ্টিতে দুর্ঘটনা এড়াতে প্রাইভেট কার, বাস, মোটরসাইকেল ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা হেডলাইট জ্বালিয়ে চলতে দেখা যায়। সড়কবাতিগুলোও জ্বালিয়ে দেয়া হয়। বিপণিবিতানও বাতি জ্বেলে রাখে।
জলাবদ্ধতার কারণে অনেক সিএনজিচালিত অটো রিকশা রাস্তায় অকেজো হয়ে পড়ে। সন্ধ্যায় বিজয়নগর মোড়ে এক সিএনজি চালককে যাত্রীসহ গাড়ি ঠেলে নিয়ে যেতে দেখা যায়। ওই চালক জানান, নয়াপল্টনে প্রায় হাঁটু সমান পানি জমে যাওয়ায় ওই পানির মধ্যে দিয়ে আসতে গিয়ে তার অটোরিকশার ইঞ্জিনে পানি ঢুকে গেছে। এতে তিনি বেশ ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
বিভিন্ন সড়কে ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হয়। আইয়ুব হোসেন নামে এক বাসযাত্রী বলেন, খিলক্ষেত ও বিশ্ব রোডের মাঝামাঝি এলাকায় গতকাল অতিরিক্ত যানজটের সৃষ্টি হয়। অর্ণব জামান নামের একজন পথচারী বলেন, সকালে আমার মতো যারা কাজে বের হয়েছেন তারা খুব ভোগান্তিতে পড়েছেন। এ দিন বৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতাকে পুঁজি করে রিকশা ভাড়া দ্বিগুণ হয়েছে। ৩০ টাকার ভাড়া ৬০ টাকা নিতে দেখা গেছে। অনেক রিকশাচালক রাস্তায় জমে থাকা পানি পাড় করছেন। ১০ হাত জায়গা পানি পারের জন্য ১০ টাকা করে নিচ্ছেন। তবে জলাবদ্ধতা নিরসনে মাঠে নেমেছে সিটি করপোরেশনের লোকজন। তাদের বিভিন্ন ড্রেনের ময়লা পরিষ্কার ও ম্যানহোল খুলে দিয়ে দ্রæত পানি সরানোর ব্যবস্থা করতে দেখা গেছে।
বরগুনায় কৃষক ও জেলে পরিবারে দুশ্চিন্তা
বরগুনা সংবাদদাতা জানান, ঘূর্ণিঝড় জাওয়াদের প্রভাবে গত রোববার রাতভর বৃষ্টি ও গতকাল সারাদিন ভারী বর্ষণে বরগুনায় ফসলের ক্ষেতে জলাবদ্ধতা হওয়ায় কৃষকরা চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। এ ছাড়া গভীর সমুদ্রে থাকা শত শত মাছ ধরার ট্রলার নিরাপদে আসতে না পারায় দুশ্চিন্তায় রয়েছে জেলে পরিবারগুলো। সমুদ্র উপক‚লীয় বরগুনা জেলার পাথরঘাটা, আমতলী, তালতলী, বামনা ও বেতাগীতে গতকাল ভারী বর্ষণের পাশাপাশি দিনব্যাপী আকাশ মেঘাচ্ছন্ন ছিল। কৃষকরা জানান, মাঠে এখন রোপণকৃত পাকা আমন ধান। এ অবস্থায় ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে বৃষ্টি হওয়ায় ধান গাছগুলো হেলে পড়ে অর্ধেকই নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জানা গেছে, গতকাল সাগরে প্রচণ্ড ঢেউ ও ঝড়ো হাওয়া বিরাজ করে। শত শত মাছ ধরার ট্রলার সমুদ্র থেকে নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে আসতে পারেনি। এ বিষয়ে জেলা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী নয়া দিগন্তকে বলেন, বহু ট্রলার এখনো গভীর সমুদ্রে অবস্থান করছে। আবহাওয়া খারাপ হওয়ায় আমরা যাদেরকে মুঠোফোনে পেয়েছি, তাদেরকে নিরাপদ স্থানে আসতে বলেছি। এখন পর্যন্ত কোনো ট্রলার ঘাটে আসেনি। এতে জেলে পরিবারের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
চরফ্যাসনে ট্রলার ডুবে নিখোঁজ ১২
ভোলা ও চরফ্যাসন সংবাদদাতা জানান, চরফ্যাসনের ঢালচরের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর মোহনায় রবিবার রাত সাড়ে ১০টায় একটি মাছ ধরার ট্রলার ডুবে ১২ মাঝি-মাল্লা নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে ১০ জনের নাম জানা গেছে। তারা হলেনÑ বাচ্ছু মাঝি, আলামিন মাঝি, ফারুক হাওলাদার, জাবেদ, খালেক, হাফেজ, ইউছুফ মৌলভী, জসিম জমাদার, রফিক, মাসুদ।
আবদুল্লাহপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ইলিয়াছ মাস্টার জানান, ৫ দিন আগে কামাল খন্দকারের একটি ট্রলার সাগরে মাছ ধরতে যায়। রবিবার রাতে ফেরার পথে ঢালচরের দক্ষিণ পাশে একটি জাহাজ ধাক্কা দেয়। এতে কামাল খন্দকারের ২১জন মাঝি মাল্লাসহ ট্রলারটি ডুবে যায়। গতকাল সোমবার দুপুরে হাফেজ নামের এক জেলে ফোন করে জানান তারা ৯জন পাথরঘাটা এলাকায় উদ্ধার হয়েছেন। এ দিকে পাশের আরেক ট্রলারের স্টাফ মো: হোসেন জানান, আবহাওয়া খারাপ হয়ে যাওয়ায় আমরা জাল দ্রæত টেনে উঠিয়ে ফেলি। কামাল খন্দকারের ট্রলারটি আমাদের পিছনে ছিলো। ওই ট্রলারটিকে চট্টগ্রামের একটি টলিং জাহাজ মাঝামাঝি এসে ধাক্কা দেয়। চরফ্যাসন থানার ওসি মনির হোসেন মিয়া এর সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ঘটনাটি দক্ষিণ আইচা থানার আওতাধীন। তবে দক্ষিণ আইচা থানার ওসি মো: সাখাওয়াত হোসেন এ প্রসংগে কিছু জানেন না বলে দাবি করেন।
এ দিকে চরফ্যাসনে টানা বৃষ্টিতে বেশি ক্ষতি হয়েছে কৃষক ও ইটভাটা মালিকদের। উপজেলা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতি জানিয়েছে, ইতোমধ্যে কয়েক শ’ মাছ ধরার ট্রলার নিরাপদে ফিরলেও কিছু ট্রলার সাগরে থাকায় দুশ্চিন্তায় রয়েছে জেলেদের পরিবার। কিছু ট্রলারের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। এ দিকে নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বসতবাড়ি তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। জাওয়াদের প্রভাবে নদ-নদীতে পানির উচ্চতা বেড়েছে। বেড়িবাঁধের বাইরে অবস্থানরত পরিবারগুলো আতঙ্কে আছেন।
হাতিয়ার সাথে নৌ যোগাযোগ বন্ধ
নোয়াখালী অফিস জানায়, সমুদ্র উত্তাল থাকায় নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার সাথে সারা দেশের নৌ যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। গতকাল সকাল ৬টা থেকে হাতিয়া-ঢাকা লঞ্চ চলাচল, হাতিয়া-চট্টগ্রাম স্টিমার চলাচল ও হাতিয়া-বয়ারচর চেয়ারম্যানঘাট সি-ট্রাক চলাচল বন্ধ রয়েছে। নৌ পথে দেশের অন্য কোথাও থেকে লোকজন হাতিয়ায় আসতে পারছেন না এবং কেউ দ্বীপের বাইরেও যেতে পারছেন না। ফলে দুর্ভোগে পড়েছেন অপেক্ষমাণ হাজার হাজার যাত্রী। সে সাথে জেলার সর্বত্রই হালকা ও মাঝারি ধরনের বৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে।
নোয়াখালী জেলা আবহাওয়া অধিদফতরের ভারপ্রাপ্ত সহকারী কর্মকর্তা মো: রফিকুল ইসলাম জানান, গত রোববার সন্ধ্যা ৬টা থেকে গতকাল দুপুর ১২টা পর্যন্ত নোয়াখালী জেলায় ৩৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ খোরশেদ আলম খান বলেন, উপক‚লীয় এলাকায় ৩ নম্বর সতর্ক সঙ্কেত চলছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে সাগর ও নদী উত্তাল থাকায় সোমবার সকাল ৬টা থেকে হাতিয়ার সাথে সব ধরনের নৌ যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।
চট্টগ্রামে ভোগান্তি নগরবাসীর
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, ‘জাওয়াদের’ প্রভাবে শীত মৌসুমে চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টি হচ্ছে। গত রোববার গুঁড়ি গুঁড়ি হলেও গতকাল সকাল থেকে শুরু হয় অঝোর ধারায় বৃষ্টি। এতে নগরের বিভিন্ন রাস্তায় পানি জমে যায়। রাস্তায় গাড়ি চলাচলও কম। ফলে সাধারণ মানুষকে কর্মস্থলে যেতে ভোগান্তি পোহাতে হয়। আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা যায়, পশ্চিম-মধ্য বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত গভীর নিম্নচাপের কারণে গভীর সঞ্চালন মেঘমালা সৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে এবং বায়ুর তারতম্যের আধিক্য বিরাজ করছে। এই গভীর নিম্নচাপের কারণে বৈরী আবহাওয়ায় হালকা হতে মাঝারি বা ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। নগরজুড়ে নিম্নচাপের প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। নগরীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অফিস-আদালত যেতে কর্মজীবী মানুষদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে যায়নি মানুষ। সকাল থেকে বৃষ্টির কারণে নগরীর সড়কগুলোতে যান চলাচল ছিল সীমিত। রাস্তায় যাত্রীও ছিল কম। এ ছাড়া নিম্নচাপের প্রভাবে সাগর উত্তাল রয়েছে।
দশমিনায় দুর্ভোগে শ্রমজীবীরা
দশমিনা (পটুয়াখালী) সংবাদদাতা জানান, দশমিনায় তিন দিনেও দেখা মেলেনি সূর্যের আলোর। গত রোববার গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হলেও গতকাল সকাল থেকে শুরু হয় অঝোর ধারায় বৃষ্টি। এতে উপজেলার বিভিন্ন রাস্তায় পানি জমে গেছে। সকাল থেকে খেটে খাওয়া মানুষকে বেকায়দায় পড়তে হয়েছে। রিকশাচালক কাওসার বলেন, ‘আমাগো তো সম্পদ নাই। গরিব মানুষ। কাম না করলে ঘরে ভাত জুটবে না। তাই কষ্ট হলেও বের হইছি। হাত-পা বরফ হয়ে গেছে।’ এ ছাড়া বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অফিসে যেতে কর্মজীবী মানুষদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে যাচ্ছে না মানুষ। সকাল থেকে বৃষ্টির কারণে গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যান চলাচল ছিল সীমিত। রাস্তায় যাত্রীও ছিল কম। তবে রিকশার আনাগোনা রয়েছে। এমন বৈরী আবহাওয়ার সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে নিম্ন আয়ের মানুষের। এক দিকে বৃষ্টি, আবার ঠাণ্ডার প্রকোপে তাদের কাজ থেমে নেই। গছানী বাজারের সবজি বিক্রেতা জালাল মিয়া বলেন, বৃষ্টির কারণে দোকান করতে পারি না। মাছ বিক্রেতা লাল মিয়া জানান, তেমন কোনো কাস্টমার নেই। টুকটাক কেনাবেচা হয়েছে। দোকান তো খুলতে হবে তাই চলে এসেছি।
যশোর শহরে হাঁটু পানি
যশোর অফিস জানায়, নিম্নচাপের কারণে ভারী বৃষ্টিতে যশোরের অধিকাংশ রাস্তাঘাট ডুবে গেছে। গতকাল দিনভর মুষলধারে বৃষ্টিতে বিভিন্ন এলাকা তলিয়ে যায়। শহরের বিভিন্ন রাস্তাঘাট বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। বাইরে বের হয়ে ব্যাপক ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে লোকজনকে। শহরের শংকরপুর, খড়কি, বেজপাড়া, বারান্দিপাড়া, পিটিআই রোড, স্টেশন রোড, ষষ্টিতলা এলাকা পানিতে থইথই করছে। শংকরপুর গোলপাতা মসজিদের সামনের সড়কে দেখা যায়, জমে থাকা পানির কারণে মানুষজন চলাচল করতে পারছে না। ইসহাক সড়কের সামনের অবস্থা আরো বেহাল। এই সড়ক দিয়ে হেঁটে চলাচলেরও উপায় নেই। যশোর সরকারি এমএম কলেজ এলাকার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। কবরস্থানপাড়ার একটি অংশ পানিতে তলিয়ে গেছে। এ ছাড়া খড়কি ধোপাপাড়ার নিচু এলাকায় হাঁটু পানি জমেছে।