Naya Diganta

ফটোকপির দোকানে বিক্রি হয় থিসিস পেপার !

এসব ফটোকপির দোকানে পুরাতন থিথিস পেপার পাওয়া যায়।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) ফটোকপির দোকানগুলোতে প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে পুরাতন থিসিস পেপার। তবে প্রকাশ্যে থিসিস পেপার বিক্রিকারীদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না।

ফটোকপির দোকানে সহজলভ্য হওয়ায় মাস্টার্স পর্যায়ে গবেষণা জালিয়াতির আশ্রয় নিচ্ছে শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ। ফলে শিক্ষা ব্যবস্থার উপর এর বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বলেও দাবি করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ গবেষক ও শিক্ষকগণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থানে পূর্বের গবেষণা পেপারের সহজলভ্যতাকেও দায়ী করেন অনেকে।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের এমন জালিয়াতি সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) সদস্য অধ্যাপক ড. দিল আফরোজ বেগম বলেন, ‘উচ্চতর শিক্ষা প্রতিষ্টানের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এটা কাম্য নয়। জাতির জন্য এটা খুবই হতাশাজনক। তবে আমাদের দেশের টপ টু বটম যদি দুর্নীতিগ্রস্থ হয় তাহলে কি বিশ্ববিদ্যালয় আলাদা জায়গা? সেই প্রভাব তো আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও একটু পড়বে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, থিসিসের পুরাতন কপি বিশ্ববিদ্যালয় স্টেডিয়াম মার্কেট ও পরিবহন মার্কেটের দোকানগুলো পাওয়া যায়। এরকম প্রায় ১৪-১৫ টি দোকানে এই পুরাতন পেপার পাওয়া যায়।

গবেষণার পুরাতন পেপার গুলো শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটোকপির দোকানগুলো থেকে জোগাড় করছেন। সর্বনিম্ন তিনশত টাকাতে বিক্রি হয় সফট কপি। চাহিদার সাথে গবেষণা পেপার মিলে গেলে টাকা বাড়তে থাকে। সেক্ষেত্রে পাঁচশত টাকা বা আরও উচ্চ মূল্যে বিক্রি হয় এসব গবেষণাপত্র।

বিশ্ববিদ্যালয় আইন বিভাগের ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষের স্মাতকোত্তর পর্যায়ে প্রায় ১০ জন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে থিসিস জালিয়াতির অভিযোগ উঠে। বিষয়টি দায়িত্বপ্রাপ্ত সুপারভাইজারের দৃষ্টিগোচর হলে একই বর্ষের সকলের ফলাফল দিতে আপত্তি জানায় বিভাগের শিক্ষকগণ।

 

আরো পড়ুন: পরীক্ষায় ডিজিটাল জালিয়াতি করে কোটিপতি তারা

নিজস্ব প্রতিবেদক, ১০ আগস্ট ২০১৮

বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইসের মাধ্যমে এসএসসি, এইচএসসি, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল, ব্যাংকসহ সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস করে আসছে একটি চক্র। কয়েক বছর ধরেই ডিভাইস জালিয়াতি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এই অসাধু চক্রের সদস্যরা। এতে সরকারি কর্মকর্তা, বিসিএসে উত্তীর্ণরাসহ বিভিন্ন পেশার লোকজন জড়িত বলে প্রমাণ পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের অক্টোবর থেকে প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের সদস্যদের
ধরতে মাঠে নামে সিআইডি। অভিযানের অল্প কিছু দিনের মধ্যেই নাটোরের ক্রীড়া কর্মকর্তা রাকিবুল হাসানসহ প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের ২৮ জনকে গ্রেফতার করে তারা। তারই ধারাবাহিকতায় সরকারি ও বেসরকারি চাকরিতে নিয়োগ ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিতে ডিজিটাল জালিয়াতির সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে বিকেএসপির সহকারী পরিচালক, বিএডিসির সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তাসহ রাজধানীর অগ্রণী স্কুল ও ধানমন্ডি গভর্নমেন্ট বয়েজ স্কুলের দুই শিকসহ ৯ জনকে গ্রেফতার করে সিআইডি। এ ছাড়া এতে বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্তরাও রয়েছেন।

ঢাকা ও সিরাজগঞ্জ থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়। প্রতারক চক্রটি নিয়োগ ও ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ও আলিয়া মাদরাসায় বসে প্রশ্নের উত্তর সমাধান করে বিভিন্ন ডিভাইসের মাধ্যমে তা পরীক্ষার্থীদের কাছে সরবরাহ করত। তারা নিয়োগ ও ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন পিয়নের মাধ্যমে ফাঁস করত স্বীকার দাবি করেছে বলে গতকাল দুপুরে সিআইডি কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।

সিআইডি জানায়, চক্রটি জালিয়াতির মাধ্যমে বিভিন্ন জনের কাছে প্রশ্ন সরবরাহ করে ১০ থেকে ১২ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইমের বিশেষ পুলিশ সুপার (এসএসপি) মোল্যা নজরুল ইসলাম বলেন, গত পাঁচ দিনের সাঁড়াশি অভিযানে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে নয়জনকে আটক করা হয়। তারা হলেন জালিয়াতি চক্রের মাস্টারমাইন্ড বিকেএসপির সহকারী পরিচালক অলিপ কুমার বিশ্বাস, বিএডিসির সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোস্তফা কামাল, ৩৬তম বিসিএসে নন ক্যাডার পদে সরকারি মাধ্যমিক স্কুলের শিক হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত ইব্রাহিম ও ৩৮তম বিসিএসের প্রিলিতে উত্তীর্ণ আইয়ুব আলী বাঁধন, রাজধানীর অগ্রণী স্কুলের ইংরেজি শিক গোলাম মোহাম্মদ বাবুল, পিওন আনোয়ার হোসেন মজুমদার, নুরুল ইসলাম, ধানমন্ডি গভ. বয়েজ স্কুলের সমাজবিজ্ঞানের শিক হোসনে আরা বেগম ও পিওন হাসমত আলী শিকদার।

তিনি জানান, অলিপ কুমার বিশ্বাস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যায়ে ভর্তি পরীক্ষায় ডিজিটাল জালিয়াতির মূল হোতা। কয়েক বছরে সে জালিয়াতির মাধ্যমে তিন কোটি টাকার বেশি আয় করেছে। আর ইব্রাহিম, মোস্তফা ও বাঁধন বিসিএসসহ সব নিয়োগ পরীক্ষায় জালিয়াতির মূল হোতা। এরা শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষাতেই নয়; মেডিক্যাল, ব্যাংকসহ সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস করত। এ ছাড়া বিভিন্ন বোর্ড পরীক্ষাতেও প্রশ্নপত্র ফাঁস করে আসছিল তারা। এই চারজনের প্রায় ১০ কোটি টাকার নগদ অর্থ ও সম্পদের সন্ধান পেয়েছে সিআইডি।

ভর্তি কিংবা নিয়োগ পরীক্ষায় মূলত দুইভাবে জালিয়াতি হয়। একটি চক্র আগের রাতে প্রেস থেকে প্রশ্নপত্র ফাঁস করত। আরেকটি চক্র পরীক্ষা শুরুর কয়েক মিনিট আগে বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে প্রশ্নপত্র নিতে। জিজ্ঞাসাবাদে অলিপ, ইব্রাহিম, বাঁধন ও মোস্তফা জানায়, কেন্দ্র থেকে প্রশ্ন ফাঁসের পর আলিয়া মাদরাসা ও ঢাবির এফ রহমান হলের দু’টি কে বসে অভিজ্ঞদের দিয়ে সমাধান করে ডিজিটাল ডিভাইসের মাধ্যমে তারা পরীক্ষার্থীদের সরবরাহ করত।

এই চারজন মূলত ডিজিটাল ডিভাইস চক্রে জড়িত। আর বাকি পাঁচজন (শিক্ষক ও পিয়ন) পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে পরীক্ষা শুরুর কয়েক মিনিট আগে প্রশ্নপত্র সরবরাহ করত। গত বুধবার গ্রেফতারের সময় পিয়ন হাসমতের কাছে ৩৯তম বিসিএস লিখিত পরীার কয়েক কপি প্রশ্নপত্র এবং ৬০ হাজার টাকা পাওয়া গেছে। মোল্যা নজরুল ইসলাম বলেন, গত কয়েক বছরে জালিয়াতির মাধ্যমে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও সরকারি চাকরিতে শতাধিক ব্যক্তিকে নিয়োগ দিয়েছে চক্রটি। জালিয়াতির মাধ্যমে যারা নিয়োগ পেয়েছে, তাদের বেশ কয়েকজনের তথ্যও আমরা পেয়েছি। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করছি। যাচাই-বাছাই শেষে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সিআইডি জানায়, আটকদের মধ্যে ইব্রাহিমের ছিল বিলাসী জীবন। দরিদ্র পরিবারের সন্তান হলেও খুলনার মুজগুন্নী এলাকায় সাড়ে ছয় শতাংশ জমির ওপর চারতলা ভবন নির্মাণ করেছে। নড়াইলে রয়েছে ডুপ্লেক্স বাড়ি। চলাচল করত ৩৬ লাখ টাকায় দামের গাড়িতে। রাজধানীতে রূপালী মানি এক্সচেঞ্জ নামে তার একটি অবৈধ মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। সে মাদরাসা ব্যাকগ্রাউন্ডের ছিল। তবে তার যোগ্যতা না থাকলেও জালিয়াতির মাধ্যমে ৩৬তম বিসিএসে নিয়োগের জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত হয় সে।

মোল্যা নজরুল ইসলাম বলেন, আমাদের ল্য ছিল চক্রটির মূল উৎপাটন করা। সর্বশেষ অভিযানে ৯ জনকে আটকের মধ্য দিয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের মূলোৎপাটন করা হয়েছে। এ মামলায় (প্রশ্ন জালিয়াতি চক্রের) গ্রেফতারের সংখ্যা দাঁড়াল ৩৭। এই সুবিশাল চক্রকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার ফলে আগামীতে ভর্তি ও নিয়োগ পরীক্ষায় জালিয়াতির ঘটনা হ্রাস পাবে বলে মনে করছেন সিআইডির এই কর্মকর্তা।