Naya Diganta

মুনীর ভাই হঠাৎ চলে গেলেন

গোলাপ মুনীর

গোলাপ মুনীর ভাই নেই- এটি বিশ্বাসই করা যায় না। জানা ছিল না যে, অসুস্থ ছিলেন করোনায় আক্রান্ত হয়ে। পরে জানতে পারলাম তিনি ১৩ সেপ্টেম্বর এ মহামারীতে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ছিলেন এবং মাত্র ৫ দিন পরই ইন্তেকাল করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

মুনীর ভাইকে প্রথমে দেখি ২০০৪ সালের শেষ দিকে নয়া দিগন্তের অস্থায়ী অফিসে- নটর ডেম কলেজের বিপরীতে। উনি কথা বলছিলেন নিম্ন কণ্ঠে। আলাপ করছিলেন পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগের তদানীন্তন ইনচার্জ এবং সাবেক সহকারী সম্পাদক (পরে নির্বাহী সম্পাদক) মাসুদ মজুমদার ভাইয়ের সাথে। কয়েক দিন পর মুনীর ভাই নয়া দিগন্তে যোগ দেন ১ অক্টোবর ২০০৪ সালে। অফিসে যেমন ছিল তার নিয়মিত হাজিরা, তেমনি কাজও করেছেন নিয়মিত। একেবারে ৩১ ডিসেম্বর ২০১৯ সাল পর্যন্ত। এরপর নিয়মিত সাপ্তাহিক কলাম লিখতেন একই পত্রিকায়। মুনীর ভাইয়ের কলাম প্রথমে দীর্ঘ দিন সোমবার এবং কয়েক মাস ধরে শনিবার ছাপা হতো। ১৩ সেপ্টেম্বর শেষ অসুস্থতায় মাত্র দুই দিন আগেও তিনি কলাম লিখেছেন। বিভিন্ন বিষয়ে লিখতেন এবং প্রধানত ইন্টারনেটের ওপর নির্ভর করে। তার বিষয়বৈচিত্র্য, সমকালীন বিষয় সম্পৃক্ততা, লেখার পরিসর ইত্যাদি অবাক করার মতো।

এ বয়সেও লেখালেখিতে তার ছিল বিপুল আগ্রহ। ইন্টারনেট ব্রাউজ করায় তিনি ছিলেন অক্লান্ত। বরাবর দেখেছি কম্পিউটারসহ তথ্যপ্রযুক্তি ও গাণিতিক বিষয়ে তার বিপুল উৎসাহ। নিজে বিগত সত্তরের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিষয়ে পড়েছেন। এরপর আইনে ডিগ্রি নিয়ে পেশাগত চর্চাও করেছিলেন কিছু দিন। শেষ পর্যন্ত বেছে নেন সাংবাদিকতাকে। আগ্রহ ছিল অর্থনীতি ও দর্শনের দিকেও। ‘অর্থনীতিকোষ’ নামে তার বই বেরিয়েছে অনেক আগে। দর্শনের বিভিন্ন মতবাদের ওপর তার লেখা সঙ্কলন গ্রন্থও রয়েছে।

মুনীর ভাই। বলা যায়, হাওর অঞ্চলের মানুষ। সে অনুন্নত এলাকার জনজীবনের সমস্যাগুলো তিনি অনুভব করতেন। বলতেন, ‘সে এলাকায় শীতকালে হাঁটা যায়; বর্ষায় নৌকাই ভরসা আর বছরের বাকি সময়ে কাদাপানি ভেঙে কষ্ট করে চলতে হয়।’ হাওরের অদূরে শ্যামারচর নামক গাঁয়ে তার বাড়ি, যা সুনামগঞ্জ জেলার শাল্লা উপজেলায় অবস্থিত। বলতেন, বাড়ি থেকে এক গ্রাম পাড়ি দিলেই বিস্তীর্ণ হাওর। ঢাকা থেকে তাদের বাড়ি যাওয়ার একাধিক রুটের কথাও জানিয়েছেন। কেউ যেতেন কিশোরগঞ্জ জেলার করিমগঞ্জ উপজেলার চামড়া ঘাট হয়ে নৌপথে; কেউবা ঘুরে সিলেট হয়ে অনেক দূর দিয়ে। বলতেন, তাদের বাড়ি থেকে নেত্রকোনার হাওর অঞ্চলের খালিয়াজুড়ির মতো স্থানগুলো খুব বেশি দূরে নয়। খালিয়াজুড়ির সন্তান ও বর্তমানে অন্যতম মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারে পরিবার এলাকায় শিক্ষা বিস্তারে অবদান রাখার কথাও বলতেন। আরো বলেছেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা জগৎ জ্যোতিদাসের (বীর বিক্রম) জীবন উৎসর্গ করার ঘটনা। এক দিন বললেন বৃহত্তর সিলেট জেলার খ্যাতিমান সাবেক জেলা প্রশাসক ফয়েজ উল্লাহর একটি লেখার বিষয়ে। এই সিএসপি ডিসি পত্রিকায় লিখেছেন শাল্লার ইংরেজি বানান ও উচ্চারণ নিয়ে। উল্লেখ্য, শাল্লাকে এ ভাষায় লেখা হয় ঝঁষষধ, যার উচ্চারণ ‘সুল্লা’ও হতে পারে।

মুনীর ভাই বোধহয় প্রথম দিনেই জানিয়েছিলেন তার মা-বাবা মারা যাওয়ার কথা। এক দিন বললেন, ‘যাচ্ছিলাম নিউ বেইলি রোড এলাকায়। সেখানে নামার পর হঠাৎ দিকভ্রান্তির কবলে পড়ে যাই।’ এটি তার মতে, একটা অদ্ভুত ঘটনা। মুনীর ভাই কলেজ জীবন কাটিয়েছেন কুমিল্লার বিখ্যাত ভিক্টোরিয়া কলেজে। সেখানকার স্মৃতিচারণ ছিল তার অন্যতম প্রিয় বিষয়। এক দিন কথা প্রসঙ্গে জানান, কুমিল্লার দক্ষিণে শহরের অদূরবর্তী এলাকার কথ্য ভাষার সাথে নোয়াখালীর ভাষাগত মিল রয়েছে, যা তাকে বিস্মিত করেছে। মুনীর ভাইয়ের এক ভাই এক দিন নয়া দিগন্ত অফিসে আসেন, যিনি দেখতে বেশ কিছুটা মুনীর ভাইয়েরই মতো। এক ভাই ছিলেন সরকারি কলেজ অধ্যক্ষ। মরহুমের বড় ভাই থাকতেন সপরিবারে কানাডায়। এই অগ্রজ ছিলেন একজন চিকিৎসক। ছোট ভাই করতেন ব্যবসায়। যিনি পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে কয়েক বছর ধরে শয্যাশায়ী। তার পরিবারকে মুনীর ভাই আর্থিক সাহায্য করতেন। তিনি স্বজনের জন্য ছিলেন কল্যাণ প্রয়াসী। তাদের বিভিন্ন ধরনের কষ্ট ও সমস্যার কথা বলতেন সহৃদয়তার সাথে। তিনি বলেছেন, তার মায়ের কথা ও নিজ বংশের ব্যাপারেও। মা তার নাম রেখেছিলেন ‘তৌসিফ মুনীর’। আবার অনেকের প্রিয় ছিল ‘গোলাপ মুনীর’। তার সুকর্ম ও সদাচরণ সত্যিই গোলাপের মতো সুবাস ছড়িয়েছে। একবার একজন তার নাম ভুল করে লিখেছিলেন ‘গোলাম মুনীর’। তার ঘনিষ্ঠ স্বজনদের অনেকের নামে ‘মুনীর’ কথাটা আছে। এটিও তার থেকে শোনা। তিনি বেশির ভাগ লোকের মতো ‘মনির’ না লিখে শুদ্ধভাবে ‘মুনীর’ লিখতেন। এক দিন তার এক নিকটাত্মীয় গাজীপুরে হঠাৎ মারা যান। এতে তিনি খুব মর্মাহত হন। তিনি জানিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধ, নিজের গ্রাম ও বাড়ি এবং বংশের ইতিহাস প্রসঙ্গে। গ্রামের বাড়িঘর ও অনেক আত্মীয়স্বজনের ছবিও আমাদের দেখাতে ভোলেননি।

মরহুম গোলাপ মুনীর জানান, ১৯৭১ সালের একটি মর্মান্তিক ঘটনা। নরসিংদীর একজন ব্যবসায়ী নৌকায় হাওর এলাকায় মালসামান নিয়ে যাওয়ার সময়ে কিছু দুর্বৃত্ত তাকে হত্যা করে। এই ব্যবসায়ীর ছেলে ছিলেন একজন প্রথিতযশা সাংবাদিক ও অনুবাদক। যিনি অনেক দিন প্রবাসে কাটিয়েছেন। তাদের পরিবারের কেউ কেউ বিখ্যাত ব্যক্তি।

মুনীর ভাই জানিয়েছিলেন তার পূর্বপুরুষদের কথা। তাদের আদি বসতি ছিল বর্তমান নরসিংদী জেলার বেলাবো অঞ্চলে। এ উপজেলায়ই প্রাচীন বাংলার রাজধানী উয়ারি বটেশ্বর আবিষ্কৃত হয়েছে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের দ্বারা। এখনো কাজ চলছে। মুনীর ভাইয়ের পূর্বপুরুষরা ছিলেন তৎকালীন ব্রিটিশ উপনিবেশবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলনে সম্পৃক্ত। তাই তাদেরকে ‘শাস্তি’ হিসেবে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল। তখন কেউ সুনামগঞ্জের শাল্লায়; কেউ বা গাজীপুর-কাপাসিয়ায়; কেউ কেউ সাভারে বসতি স্থাপন করেন। এমনকি কয়েকজন বর্তমান আসামে চলে যান। এই বীর মুসলিম বাঙালিদের একজন অধস্তন পুরুষ হলেন ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি মরহুম ফখরুদ্দীন আলী আহমদ। তিনি কংগ্রেস দলের রাজনীতি করতেন। যা হোক, সংগ্রামী ঐতিহ্যের জন্য মুনীর ভাই ছিলেন গর্বিত। অবাক হয়ে সেসব কথা শুনতাম।

মুনীর ভাইয়ের একমাত্র সন্তান মেয়ে। তার মেয়ের বিয়ে হয়েছিল ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে। এ জন্য বিপুল আয়োজন ছিল আজিমপুরে একটি কমিউনিটি সেন্টারে। সে দিন দেখা হয়েছিল ভাবীর সাথেও। যিনি ২০১৫ থেকে গুরুতর অসুস্থ। তারা পুরান ঢাকার বনেদি পরিবার। মুনীর ভাইয়ের একমাত্র মেয়ের বিয়েতে খাওয়ানো হলো লম্বা বাসমতি চালের পোলাও, যা ভুলবার নয়।

সে বিরাট অনুষ্ঠানে বিশেষত নয়া দিগন্ত পরিবার অনেক সিনিয়র সাংবাদিক ও দায়িত্বশীল ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। তাদের একজন হলেন সম্প্রতি পরলোকগত চেয়ারম্যান, সাবেক সচিব মরহুম শাহ আব্দুল হান্নান। তিনি আমাকে সেখানে দেখেই স্নেহভরে জড়িয়ে ধরেছিলেন, যা দেখে আমার স্ত্রী পর্যন্ত বিস্মিত হয়ে যায়। সে দিনের আনন্দঘন স্মৃতি আমার জীবনের উল্লেখযোগ্য এক সম্পদ।

মুনীর ভাই এ দেশে কম্পিউটার আন্দোলনের অন্যতম অগ্রপথিক মরহুম অধ্যাপক আবদুল কাদেরের কথা বলতেন শ্রদ্ধার সাথে। তার মৃত্যুর পর তারই প্রতিষ্ঠিত কম্পিউটার-বিষয়ক মাসিক পত্রিকাটি দেখাশোনা করতেন। এ জন্য অনেক খেটেছেন। মুনীর ভাই এত বয়সেও নিজের উৎসাহে গণিতের অনেক ধাঁধার সমাধান করেছেন। কিন্তু জীবনরহস্যের বিশাল ধাঁধার সমাধান কোনো মানুষের পক্ষেই সম্ভব নয়। তার আকস্মিক চিরবিদায় এর একটি প্রমাণ।

পরম করুণাময় মহান রাব্বুল আলামিন মুনীর ভাইকে বেহেশত নসিব করুন।