Naya Diganta

বন্ধুগণ...

দরজা দিয়ে ঢুকতেই রুমভরা মানুষ, বেশির ভাগই তরুণ। সবাই ব্যস্ত আলাপচারিতায়। আমার চোখ খুঁজে বেড়াচ্ছে যাকে, তাকে দেখতে পাচ্ছি না কোথাও । না তিনি নেই । এগিয়ে এলো আবিদ আজম। ভাইয়া আসুন। আমাকে প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়েই বলল, মাহমুদ ভাইকে রেডি করা হচ্ছে। রেডি হলেই নিয়ে আসব। দেখি অনেকেই এসে গেছে। জাহাঙ্গীর ফিরোজ, জাকির আবু জাফর, ফজলুল হক তুহিন। কথা হচ্ছে আধুনিক বাংলা কবিতার গতিপ্রকৃতি নিয়ে। কে আধুনিক, মাইকেল, রবীন্দ্রনাথ না জীবনানন্দ। জীবনানন্দের পাল্লা ভারী হলেও আমি সবাইকে চমকে দিয়ে বলে উঠলাম, বাংলা কবিতা প্রকৃত আধুনিক হয়ে ওঠে মাইকেলের স্পর্শে। আমার কথায় যেন বাজ পড়ে। আলোচনা থেমে যায় মুহূর্তে। আমি কথা ঘুরিয়ে নেই। বলি, এ মুহূর্তে আধুনিক বাংলা কবিতার জীবিত বিস্ময় হচ্ছেন আল মাহমুদ। আড্ডা আবার নড়েচড়ে ওঠে। পাশের কয়েকজন তরুণও এসে যুক্ত হয়। আল মাহমুদের কবিতা নিয়ে যে যার মতো করে বলতে থাকে। এক তরুণের দাবি, মাহমুদ ভাই কিশোর কবিতায় বাংলা সেরা। আরেকজন বলে ওঠে, শুধু কিশোর কবিতা কেন, ছড়ার কথা বলো। ট্রাকের মতো ছড়া মাহমুদ ভাই ছাড়া আর কে লিখেছে? আগের তরুণটিও কম যায় না। সে বলে ওঠে, ফেরেশতারা চাঁদের বাটি উল্টায়Ñ এর মতো উপমা কিশোর কবিতায় আর কে দিতে পেরেছে। আমরা অবাক হই। সত্যিই তো কী নির্ভেজাল বিশ্লেষণ। একজন কবি তার হাঁটুর বয়সী তরুণদের কাছে কত সহজে ব্যবচ্ছেদ হচ্ছেন। জাহাঙ্গীর ভাই আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। জাকির আবু জাফর বলে উঠল, এটাই অর্জন মাহমুদ ভাইয়ের। ওরা আলাপ চালিয়ে যাচ্ছে, আমরা চুপচাপ। শুনছি আর ভাবছি। একজন কবি যখন সব শ্রেণী ও বয়সের কাছে সমানভাবে গ্রাহ্য হন, তখন তাঁর কবিত্ব নিয়ে আলাদা করে বলার কিছু থাকে না।
আল মাহমুদ সময়ের কবি। তিনি সময়কে ধারণ করেছেন তাঁর কবিতায়। যৌবনের আল মাহমুদ আর পরিণত বয়সের আল মাহমুদে তাই যোজন যোজন পার্থক্য। সোনালী কাবিনের আল মাহমুদ আমাদের কাব্যসাহিত্যে অনুকরণীয় কবি। প্রতিবার তাঁর নিজস্ব গোর্কি এসে লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে তাঁকে আর তিনি সেই রেখে যাওয়া পলিতে আবার নতুন করে সৃজন করেছেন তাঁর অপার বৃক্ষগুলো।
মাহমুদ ভাইকে নিয়ে আসতে দেরী হচ্ছে। এরই মধ্যে পুরো ড্রইং ও ডাইনিং রুম ভরে উঠেছে কানায় কানায়। সবার চোখে প্রতিক্ষা সেই মানুষটির জন্য যার কবিতায় জাদু আর ব্যক্তিগত স্নেহের পরশ তাদের টেনে এনেছে এখানে। পেছনের ভিড়টা নড়ে উঠল হঠাৎ। পথ করে দিচ্ছে কেউ। হ্যাঁ তিনি আসছেন, কবি আসছেন। ডোরাকাটা পাঞ্জাবি পরা কবি, আবিদ আজম আর অন্য একজনের কাঁধে চড়ে আসছেন আমাদের মাঝে। বেলুন আর ফুল দিয়ে সাজানো জলসায় কবি এসে বসলেন তার জন্য নির্ধারিত স্থানে। কবির বামপাশে আমি আর আমার ডানপাশে কবি জাহাঙ্গীর ফিরোজ এবং জাকির আবু জাফর। কবির অন্যপাশে কবি আল মাহমুদ ফাউন্ডেশনের সভাপতি।
শুরু হলো নিবেদনের পালা। কবিকে ফুলের বন্যায় ভাসিয়ে দিচ্ছে ভক্ত অনুরাগীরা। কবি নিশ্চুপ। শূন্য চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছেন। ফুলের ডালি স্পর্শ করার শক্তিটুকুও যেন নেই শরীরে। মনে পড়ছে ঢাকায় নজরুলের সেই শেষ দিনগুলোর কথা। তিনি দেখছেন, সব উপলব্ধি করছেন, কিন্তু কিছু বলতে পারছেন না। ফুল দেখে তাঁর চোখ ঝিলিক দিয়ে উঠছে, নিজের গান অন্যের কণ্ঠে শুনে ঠোঁটের নিচে জেগেছে এক চিলতে হাসি। এ যেন আল মাহমুদ নন, এ যেন সেই আপনার মনে পুড়িব একাকী গন্ধবিধূর ধূপের নজরুল। আমার চোখ ভিজে উঠল। শরীরটা কেঁপে উঠল অকস্মাৎ। নজরুলের পর কেউ আমাকে এভাবে নাঁড়াতে পারেনি, কাঁপাতে পারেনি।
আল মাহমুদ বসে আছেন। কিছুটা অস্থিরতা। তবু বসে আছেন। আমি একটু এগিয়ে তার ক্ষীণ দেহটাকে আমার হাতের নাগালে টেনে নিলাম। তিনি শরীর এলিয়ে দিলেন আমার বাহুতে। শুরু হলো শুভেচ্ছা পর্ব। মাহমুদ ভাইকে নিয়ে কথা বলা। কবি এমনিতেই সুস্থ নন। চোখের দৃষ্টি ক্ষীণ। কানেও কম শোনেন। তবুও তিনি যে উপভোগ করছেন তা বুঝতে কোনো কষ্ট হচ্ছিল না। সব চুপচাপ। মাথার উপর ফ্যানের একটানা ঝিরিঝিরি শব্দ। একেকজন বলছে, আমরা শুনছি। আল মাহমুদ উঠে আসছেন প্রার্থনার মতো। ভালোবাসার ভঙ্গিতে, রূপে-রসে-জৌলুশে। আমরা তাকিয়ে আছি বক্তাদের দিকে। তাদের বলার ভঙ্গিতে উচ্ছ্ব¦াস ঠিকরে বেরুচ্ছে, আবেগ ঘন হয়ে আসছে। আমরা যেন এক কল্পলোকের অচিন জলাশয়ে ডুবে যাচ্ছি ক্রমেই। কেউ একজন কবির সোনালী কাবিনের একটি কবিতাকে সুর করে গাইল, একটি মেয়ে উঠে গিয়ে তাঁর কানের পাশে আবৃত্তি করল তাঁরই লেখা একটি কবিতা। কী সুললিত কণ্ঠ, ভরাট উচ্চারণ। কবি বোধ হয় শুনলেন। হঠাৎ হাসির একটি কণা ঝিলিক দিয়ে উঠল তাঁর ঠোঁটের কোণে। সবার বলা শেষ, এবার কবির পালা। বাংলা কবিতার রাজপুত্রের মুখের সামনে মাইক্রোফোন। পায়ের কাছে এসে বসে তাঁকে সাহায্য করল জাকির আবু জাফর। কবির ঠোঁট কাঁপছে। বোঝা যাচ্ছে, কিছু একটা বলার জন্য তিনি প্রচণ্ড শক্তি নিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এরপর দু’বার, তিনবার। আবিদ বলছে, বলুন মাহমুদ ভাই। জাকির কানের কাছে মুখ নিয়ে তাগাদা দিচ্ছে, বলুন বলুন। আমরা তাকিয়ে আছি। কবির কী নিরন্তর চেষ্টা। কেটে যাচ্ছে মুহূর্তগুলো। কবি হঠাৎ বলে উঠলেন, বন্ধুগণ...। সবাই শিহরিত, উত্তেজিত এই তো-এই তো। বলুন, বলুন কলরোল চারদিকে। না কবি আর কিছুই বলতে পারলেন না। একটা মাত্র শব্দ বন্ধুগণের মধ্য দিয়ে হারিয়ে গেল কবির কণ্ঠস্বর। ‘বন্ধুগণ’ কবির শেষ উচ্চারণ, শেষ ভাষণ। কবি নেই। আমরা সেদিন যারা জন্মদিনের সেই আয়োজনে উপস্থিত ছিলাম, তাদের কানে আজো বাজছে সেই ধ্বনি, অনুরণিত হচ্ছে, কেঁপে কেঁপে ছড়িয়ে পড়ছে আত্মা থেকে আত্মায়। আমাদের কবিতার অভিভাবক, কবিতার বন্ধু, তার শেষ উচ্চারণ ‘বন্ধুগণ’ দিয়েই বেঁধে গেলেন আমাদের। আমরা সত্যিকার অর্থেই বাঁধা পড়ে গেলাম এক অচিন্ত্যনীয় অভাবনীয় বন্ধনে। আজ আল মাহমুদ নেই, কিন্তু তার সেই ‘বন্ধুগণ’ আজো বাজছে আমাদের কানে এবং বাজতেই থাকবে।