Naya Diganta

ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ সতর্কতায় চট্টগ্রাম বন্দরে অপারেশনাল কর্মকাণ্ড বন্ধ

ঘূর্ণিঝড় বুলবুল ধেয়ে আসার খবরে শুক্রবার সকাল থেকেই নড়ে চড়ে বসেছিল চট্টগ্রামের বন্দর, বিমান বন্দর, সিটি কর্পোরেশন ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা। ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে সকাল থেকেই চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরের বর্হিনোঙ্গরে পন্য লাইটারিং বন্ধ হয়ে যায়। বিকেলে জারি করা হয় এলার্ট-২ এবং সন্ধ্যায় এলার্ট-থ্রি। এর পর থেকে বন্ধ করা হয় বন্দরের সব ধরনের অপারেশনাল কর্মকান্ড। নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যায় কয়েকশ’ লাইটার জাহাজসহ ফিশিং ট্রলার ও মাছ ধরার নৌকাগুলো।

ঘূর্ণিঝড় বুলবুল’র প্রভাবে বঙ্গোপসাগর ছিল উত্তাল। বড় বড় ঢেউ আছড়ে পড়ছিল নগরীর বিস্তীর্ণ উপকুল জুড়ে। কিন্তু বাতাসের তীব্রতা ছিলনা বললেই চলে। বাতাসে আদ্রতার প্রভাব ছিল তীব্র। থেমে থেকে গুড়ি বৃষ্টি হয়েছে। এভাবেই ছিল শুক্রবার দিনভর চট্টগ্রামের আবহওয়ার চিত্র। 

ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, বিমান বন্দর কর্তৃপক্ষ, সিটি কর্পোরেশন ও জেলা প্রশাসনের প্রস্তুতি:

চট্টগ্রাম বন্দর সুত্র জানিয়েছে, ঘূর্ণীঝড়ের কারনে চট্টগ্রাম বন্দরে এলার্ট-থ্রি তথা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সতর্কতা ধাপ জারি করা হয়েছে। বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরের সব অপারেশনাল কর্মকান্ড। বন্দর কর্তৃপক্ষ মূল জেটিতে নোঙ্গররত সব জাহাজ বহির্নোঙ্গরে পাঠিয়ে দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। শনিবার সকালের জোয়ারেই বন্দরের জেটি জাহাজশূন্য করার প্রক্রিয়া শুরু করার কথা জানিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব মো: ওমর ফারুক।

এলার্ট-থ্রি জারির প্রেক্ষিতে বন্দরের বিভিন্ন জেটি ও ইয়ার্ডের মূল্যবান অপারেশনাল ইকুইপমেন্ট লক করে রাখা হচ্ছিল বলে সুত্র জানায়। জলোচ্ছাসের কবল থেকে রক্ষায় ইয়ার্ডে রক্ষিত পন্যভর্তি কন্টেইনার নীচে খালি কন্টেইনারের উপর লিফট করে এবং বিভিন্ন সিএফএস শেডে রক্ষিত মালামাল যতদুর সম্ভব সরিয়ে নেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়। ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ মোকাবেলায় বন্দর কর্তৃপক্ষের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কয়েক দফা বৈঠকে বসেন। বৈঠকে জাহাজ থেকে পণ্য উঠা-নামা বন্ধ, মেডিক্যাল টিম গঠন, নদীতে থাকা জাহাজগুলো নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব মো. ওমর ফারুক নয়াদিগন্তকে জানান, আবহাওয়া অধিদপ্তর ৬ নম্বর বিপদ সংকেত দেখাতে বলার পর চট্টগ্রাম বন্দরের নিজস্ব সতর্কতামূলক ব্যবস্থা ‘অ্যালার্ট-৩’ জারি করা হয়েছে। বর্হি:নোঙ্গরে আগে থেকে অবস্থান করা জাহাজগুলোকে নিরাপদে থাকতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সব জাহাজের ইঞ্জিন চালু রাখার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

বন্দর সচিব জানিয়েছেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ‘সাইক্লোন ডিজেস্টার প্রিপেয়ারনেস অ্যান্ড পোর্ট সাইক্লোন রিহ্যাবিলেটেশন প্ল্যান ১৯৯২ অনুযায়ী বন্দর চেয়ারম্যান নিজস্ব অ্যালার্ট-৩ জারি করেছেন। ঘুর্নীঝড়ের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে বন্দরের ৩টি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলার জানিয়েছেন তিনি। তিনি জানান, নৌ বিভাগের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের নম্বর ০৩১-৭২৬৯১৬ এবং পরিবহন বিভাগের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের নম্বর ০৩১-২৫১০৮৭৮, সচিব বিভাগের নিয়ন্ত্রন কক্ষের নম্বর - ২৫১০৮৬৯।

সতর্ক চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমান বন্দর কর্তৃপক্ষ

চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিান বন্দরের ব্যবস্থাপক উইং কমান্ডার সারোয়ার-ই-জামান নয়াদিগন্তকে জানিয়েছেন, দুর্যোগ মোকাবেলা প্লান অনুযায়ী আমরা সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছি। তবে চট্টগ্রামে ঘূর্নীঝড়ের প্রান্তিক (পেরিফেরিয়াল) আঘাতের সম্ভাবনা রয়েছে শনিবার দুপুরের পরে। শনিবার সকালে ঘুর্নীঝড়ের গতিবিধি দেখে পদক্ষেপ নেয়া হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় সব ধরনের সর্তকতামূলক প্রস্তুতি রয়েছে।

চসিকের কন্ট্রোলরুম চালু

ঘূর্ণিঝড় বুলবুল চট্টগ্রাম উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হানার আশঙ্কায় নগরবাসীর যে কোনো সেবা দানের জন্য সার্বÿণিক কন্ট্রোল রুম খুলেছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন । শুক্রবার সকালে চীনে অবস্থানকারী সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের নির্দেশে কন্ট্রোল রুম চালু করে চসিক। সিটি মেয়র প্রতিষ্ঠানিক কাজে চীন দেশে অবস্থান করছেন বলে কর্পোরেশন সুত্র জানিয়েছে। ঘূর্ণিঝড় সম্পর্কিত যে কোন তথ্য ও সহযোগিতার প্রয়োজনে কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য চসিকের পক্ষ থেকে নগরবাসীকে অনুরোধ করা হয়েছে। চসিক’র কন্ট্রোল রুমের ফোন নম্বরগুলো হলো- ০৩১-৬৩০৭৩৯, ০৩১-৬৩৩৬৪৯। দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তে উপকূলবাসীকে নিরাপদে সরিয়ে আনতে সকল প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন।

উপকুলীয় জনসাধারনকে সরিয়ে আনা এবং দুর্যোগকালীন ও দুর্যোগ পরবর্তী রাস্তাঘাট পরিস্কার রাখার কাজে রেড ক্রিসেন্টের স্বেচ্ছাসেবীরা, চসিক এর শ্রমিক ও পর্যাপ্ত গাড়ী প্রস্তুত রয়েছে। চসিকের পক্ষ থেকে উপকূলীয় এবং পাহাড়ের তলদেশে অবস্থানরত জনসাধারনের মাঝে সচেতনতার জন্য মাইকিং কার্যক্রম সহ দূর্যোগপরবর্তী সময়ের জন্য শুকনো খাবার,পর্যাপ্ত সুপেয় পানির ব্যবস্থা এবং চিকিৎসা সেবাদানের জন্য মেডিকেল টিম ও পর্যাপ্ত ওষুধপত্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এছাড়াও দূর্যোগ পূর্ববর্তী, দুর্যোগকালিন ও দূর্যোগ পরবর্তী সময়ে অবস্থানের জন্য উপকূলীয় এলাকায় চসিক পরিচালিত সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সর্বদা খোলা রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের সার্বিক পরিস্থিতি ও কন্ট্রোলরুমে তদারকি করছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ভারপ্রাপ্ত মেয়র চৌধুরী হাসান মাহমুদ হাসনী। ভারপ্রাপ্ত মেয়র ঘুর্ণিঝড় মোকাবেলায় জনগণকে আতঙ্কিত না হয়ে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করার আহ্বান জানিয়েছেন।
জেলা প্রশাসনের প্রস্তুতি

এদিকে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল’র সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরী সভা করেছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। শুক্রবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে অনুষ্ঠিত ও্ই সভায় আশ্রয়কেন্দ্র গুলো প্রস্তুত রাখা এবং মেডিকেল টিম গঠনকরার কথা জানানো হয়েছে। প্রস্তুত রাখা হয়েছে বিপুল সংখ্যক স্বেচ্ছাসেবক। মজুদ রাখা হয়েছে ত্রাণসামগ্রী ও নগদ টাকা এবং শুকনো খাবার। জেলা প্রশাসনের পক্ষ হতে উপকুলীয় এলাকায় মাইকিং করা হচ্ছে। কুমিরা গুপ্তছড়া ঘাট হতে স্বন্দ্বীপ ও হাতিয়া রুটে নৌ-চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে।
শত শত লাইটার জাহাজসহ ফিশিং ট্রলারগুলো নিরাপদ আশ্রয়ে

ঘূর্ণিঝড় সতর্কতার কারনে চট্টগ্রাম বন্দর বর্হিনোঙ্গরে পন্য খালাস বন্ধ থাকায় কর্নফুলি নদীতে অলস বসে থাকা বিপুল সংখ্যক লাইটার জাহাজসহ কয়েকশ’ মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলার কর্নফুলি নদীর শাহ আমানত সেতুর উজান ও ভাটির দিকে নিরাপদে আশ্রয় নিয়েছে। ফলে শনিবার কর্নফুলী নদীতে ছিল সারি সারি জাহাজ ও ফিশিং ট্রলার।