Naya Diganta

আশুরার তাৎপর্য

আশুরার অর্থ চন্দ্র বছরের প্রথম মাস মহররমের দশম তারিখ। আশুরার ফজিলত বর্ণনা করতে গিয়ে রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা হচ্ছে আল্লাহর মাস মহররমের রোজা রাখা’ (মুসলিম ও তিরমিজি)। অন্যত্র বলা হয়েছে, ‘আশুরার রোজার ব্যাপারে আমি আল্লাহর কাছে আশা করছি যে, তিনি বিগত এক বছরের পাপ ক্ষমা করে দেবেন’ (মুসলিম)। উল্লেখ্য, শুধু দশম তারিখের রোজা রাখা বৈধ হলেও নবম ও দশম তারিখের রোজা রাখা সুন্নত। আশুরা ও মহররমকে কেন্দ্র করে একমাত্র রোজা ছাড়া আর অন্য কোনো ইবাদত কুরআন ও সহিহ হাদিস দ¡ারা প্রমাণিত নয়।
আশুরার দিনের উল্লেখযোগ্য ঘটনা
আশুরার দিন মানব জাতির ইতিহাসে বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। যেমনÑ এ দিনেই পৃথিবীর সূচনা হয়েছিল এবং এ দিনেই পৃথিবী ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। লাওহে মাহফুজ ও কলম সৃষ্টি হয়েছিল এ দিনে। হজরত জিবরাইল আ:সহ অন্য ফেরেস্তারা সৃষ্টি হয়েছিলেন এ দিনে। এ দিনে বহু নবী-রাসূল জন্মগ্রহণ করেছেন এবং বহু নবী-রাসূলের ফরিয়াদ মহান আল্লাহ কবুল করেছেন। এ দিনে হজরত আদম আ:-এর তওবা কবুল হয় এবং নূহ আ:-এর কিস্তি প্লাবন থেকে মুক্তি পায়। এ দিনেই হজরত ইউনুছ আ: মাছের পেট থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন এবং হজরত আইয়ুব আ: কঠিন ব্যাধি থেকে আরোগ্য লাভ করেন। এ দিনেই হজরত মূসা আ: ফিরাউনের নির্মম নির্যাতন থেকে নিষ্কৃতি পান এবং হজরত ঈসা আ: আসমানে উত্থিত হন। সর্বোপরি এ দিনে বাতিলের মোকাবেলায় ইমাম হুসাইন রা: কারবালার প্রান্তরে শাহাদাতের সুধা পান করে কারো কাছে মাথা অবনত না করার মহান শিক্ষা দিয়ে যান।
কারবালা প্রান্তরে সংঘটিত ঘটনার সংক্ষিপ্তসার
শহীদী কারবালার ঘটনাবলির সাথে অনেকাংশেই জড়িয়ে আছে মুসলমানদের ঈমান, আকিদাসহ ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক নিপীড়ন ও জুলুমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর ইতিহাস। হিজরি ৬১ সনের ১০ মহররম এ ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিল কুফার সীমান্তবর্তী অঞ্চলে। খুলাফায়ে রাশেদার পর হজরত মুয়াবিয়া রা: ইসলামী রাষ্ট্রের একচ্ছত্র নেতা হন।
ন্যায় ও শান্তির দিশারি রাসূলুল্লাহ সা:-এর প্রিয় দৌহিত্র ইমাম হুসাইন রা: অসত্য, অধর্ম ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্য, ধর্ম ও ন্যায়কে চির উন্নত ও সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য পরিবার পরিজনসহ নিজ জীবনকে উৎসর্গ করে শাহাদত বরণ করেছিলেন। প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়, খেলাফত বনাম ইসলামী গণতন্ত্রের আদর্শ রক্ষা করতে গিয়ে রাজতন্ত্র এবং স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে পথ রুখে সপরিবারে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে কেন শাহাদতের কঠিন সুধা পান করেছিলেন?
ইসলাম পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান বিধায় শুধু ব্যক্তির বিশ্বাসেই নয়, কর্মেও সংস্কার চায়। সংস্কার আনতে চায় রাষ্ট্রেও। ফলে একজন প্রকৃত মুসলিম শুধু নিজের নয়, রাষ্ট্রের সংস্কারেও সচেষ্ট হন। ইসলাম তার অনুসারীদের কাছে প্রত্যাশা করেÑ অন্যান্য সব দীন-ধর্ম ও মতবাদের ওপর বিজয়ী হতে। মিথ্যার স্থলে সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে। ইসলাম ধর্ম কর্মকে নামাজ, রোজা, তাসবিহ-তাহলিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তা প্রতিষ্ঠায় সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে।
ইসলামের পূর্ণাঙ্গ অনুসারী ইমাম হুসাইন রা: ছিলেন শান্তির প্রতীক, তবে সে শান্তি জালিমের প্রবর্তিত শান্তি নয়। তিনি ছিলেন অতীব বিনয়ী, তবে অসত্যের বিরুদ্ধে অতি বিদ্রোহীও বটে। ইসলাম ধর্মের বিধান পূর্ণ বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞার কারণেই এজিদের সাথে সহাবস্থান সম্ভব হয়নি ইমাম হুসাইন রা:-এর। যেমন সম্ভব হয়নি হজরত ইবরাহিম আ: ও নমরুদ, হজরত মূসা আ: ও ফিরাউন এবং রাসূলুল্লাহ সা: ও আবু জেহেল, আবু লাহাবসহ অন্যান্য ধর্মদ্রোহীর সাথে। সত্য ও মিথ্যা, হক ও বাতিল সমন্বয়ী নয়, সঙ্ঘাতই অনিবার্য। এ সঙ্ঘাতের অবর্তমানে সত্যের সত্যতাই সন্দেহযুক্ত হয়। বাতিলপন্থী এজিদের সাথে সম্প্রীতি এ জন্যই ইমাম হুসাইন রা:-এর কাছে অচিন্তনীয় ছিল, তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন এজিদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের ভূমিকা কী হবে। শাহাদতের মধ্য দিয়ে ইসলামের চেতনাকে তিনি জীবন্ত করে গেছেন। নিজের ও সেই সাথে পরিবারের রক্ত ঢেলে তিনি শিখিয়ে গেছেন বাতিলের সাথে আপস নয় কখনোই।
শেষ কথা
কারো কাছে মাথা নত নয়, একমাত্র মহান স্রষ্টা আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে নিয়ে তাঁকেই একমাত্র অধিপতি হিসেবে মেনে তাঁর কাছে মাথা নত করা এবং রাসূলুল্লাহ সা: প্রদর্শিত পথে জীবনকে পরিচালনা করাই আশুরার মূল শিক্ষা। মূলত কুরআন ও বিশুদ্ধ হাদিসের আলোকে জীবন গড়াই হবে প্রতিটি মুসলিমের পবিত্র দায়িত্ব।
লেখক : প্রবন্ধকার