Naya Diganta

ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে

বেড়েছে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা। গতকাল সারা দেশে আক্রান্ত হয়েছে এক হাজার ৬২৬ জন। আগের দিন গত মঙ্গলবার আক্রান্ত হয়েছিল এক হাজার ৫৭২ জন। গতকাল আগের দিনের চেয়ে বেড়েছে ৫৪ জন। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদফতর আরো সাতজনের মৃত্যু নিশ্চিত করেছে। এটা নিয়ে সরকারি হিসাবে মৃত্যুর সংখ্যা পৌঁছল ৪৭-এ। যদিও ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা শতাধিক। গত জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ৫৭ হাজার ৯৯৫ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন।
গতকালও ঢাকার বাইরের চেয়ে রাজধানী ঢাকায় আক্রান্তের হার কম ছিল। গতকাল রাজধানীতে আক্রান্ত হয়ে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন যথাক্রমে ৭১১ ও ৯১৫ জন।
চলতি আগস্টের ২১ তারিখ পর্যন্ত সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৩৯ হাজার ৫৩৪ জন। গত জুলাই মাসে আক্রান্ত হয়েছেন ১৬ হাজার ২৫৩ জন। অপর দিকে গত জুনে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল এক হাজার ৮৮৪ জন। গতকাল সারা দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন ছয় হাজার ২৭৮ জন।
আগস্টের তিন সপ্তাহ চলে গেলেও এখনো ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা না কমার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞেরা। স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাজধানীতে সবচেয়ে বেশি মশা জন্মে থাকে নির্মাণাধীন ভবনের ভেতরে ও এর আশপাশে। এত প্রচারণার পর রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে নির্মাণাধীন ভবনের আশপাশে পানি জমে থাকতে দেখা গেছে এবং এসব পানিতে হাজার হাজার মশা উড়ে বেড়াতেও দেখা গেছে। আরেকটি বড় কারণ ছাদের মধ্যে জমে থাকা পানি। অনেক ভবন রয়েছে শুধু নিরাপত্তার কারণে ছাদের দরোজা খোলা হয় না। সেখানে যে পানি জমে মশা জন্মাচ্ছে সে খবর বাড়িওয়ালাদের জানা নেই।
আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তির চেয়ে হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ির ফেরার হার বেশি। স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা থেকে জানানো হয়েছে গতকাল ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরা ডেঙ্গু রোগী ছিল ৭৬৪ জন এবং রাজধানীর বাইরের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন এক হাজার ৫৪ জন।
গত ১৫ আগস্ট থেকে গতকাল ২১ আগস্টের মধ্যে গত দিনে ডেঙ্গু আক্রান্তের তুলনা করা হলে আক্রান্তের সংখ্যা নিম্নগতিই ছিল। কিন্তু মাঝখানে ১৮ ও গতকাল ২১ আগস্ট কেবল আগের দিনের তুলনায় বেড়ে যায় আক্রান্তের সংখ্যা।
আক্রান্তের সংখ্যা ১৫ আগস্ট ছিল ১৯৩৩ জন, ১৬ আগস্ট ১৭২১ জন, ১৭ আগস্ট ১৪৬০ জন, ১৮ আগস্ট ১৭০৬ জন, ১৯ আগস্ট ১৬১৫ জন, ২০ আগস্ট ১৫৭২ এবং গতকাল ২১ আগস্ট আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১৬২৬ জন।
গতকাল দুপুর ১২টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেই ভর্তি হয়েছে ১১৫ জন। মিটফোর্ড হাসপাতালে ৫৫ জন, ঢাকা শিশু হাসপাতালে ২৫, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ৫৯, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৭, পুলিশ হাসপাতালে ২৪, মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৬৮, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ৫১, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ২৮ জন, বিজিবি হাসপাতালে ৩ জন। ঢাকার বাইরের ঢাকা বিভাগে ২৯৫, চট্টগ্রাম বিভাগে ১১৮, খুলনা বিভাগে ১৭৫, রাজশাহী বিভাগে ৯৭, রংপুর বিভাগে ৪০, বরিশাল বিভাগে ১২৭, সিলেট বিভাগে ১১ এবং ময়মনসিংহ বিভাগে ৫২ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
ফরিদপুরে রোগীর সংখ্যা ১৩ শ’ ছাড়াল
ফরিদপুর সংবাদদাতা জানান, ফরিদপুরে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১৩ শ’ ছাড়িয়ে গেছে। তাদের মধ্যে অনেকেই চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরে গেলেও ৩৭৬ জন রোগী এখনো বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। তাদের মধ্যে ফরিদপুরের হাসপাতালে সাতজন এবং ফরিদপুরের বাইরে ঢাকায় মারা গেছেন আরো পাঁচজন রোগী এই ডেঙ্গুজ্বরে। সর্বশেষ গত ২৪ ঘণ্টায় ফরিদপুরে নতুন করে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬৯ জন। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে এ তথ্য।
জানা গেছে, বর্তমানে ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এ জ্বরে ২৯৪ জন ভর্তি রয়েছেন। হাসপাতালগুলোতে রোগীদের উপচে পড়া ভিড়। হাসপাতালের ফ্লোর ছেড়ে ডেঙ্গু রোগীরা চিকিৎসা নিতে চলাচলের প্যাসেজ ও সিঁড়ি বারান্দায় অবস্থান নিয়েছেন। এত সংখ্যক রোগীকে চিকিৎসা দিতেও হিমশিম খাচ্ছেন ডাক্তার ও নার্সরা। অন্য রোগীদের চিকিৎসাও ব্যাহত হচ্ছে। কয়েকজন নার্সের সাথে আলাপকালে তারা বলেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা এই দায়িত্ব পালন করছেন। তবে তারা কোনো ঝুঁকিভাতা পাচ্ছেন না।
ফরিদপুরের সিভিল সার্জন ডা: মোহা: এনামুল হক জানান, দিনদিন ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। পরিস্থিতিরও অবনতি হচ্ছে। তিনি জানান, এ পর্যন্ত ৭৮৮ জন ডেঙ্গুর চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। ১৮৮ জনকে ঢাকায় প্রেরণ করা হয়েছে। তবে শিশুসহ সাতজন মারা গেছেন ফরিদপুরের হাসপাতালে। গত ২০ জুলাই থেকে এ পর্যন্ত ফরিদপুরের ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন এক হাজার ৩৫৯ জন বলে জানান তিনি।
রাজবাড়ীতে একজনের মৃত্যু
রাজবাড়ী সংবাদদাতা জানান, রাজবাড়ীতে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত এক ভ্যানচালক গতকাল ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মারা গেছেন। ডেঙ্গু আক্রান্তে মৃত্যুবরণকারী সাহেব আলী (৪৫) রাজবাড়ী সদর ইউনিয়নের রামকান্তপুর ইউনিয়নের মাটিপাড়া গ্রামের মোনছের সরদারের ছেলে।
গতকাল পর্যন্ত রাজবাড়ীর বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালগুলোতে নতুন করে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন ১০ জন। এ ছাড়া গত দুই দিনে ভর্তি হয়েছেন ২২ জন। বর্তমানে ডেঙ্গু চিকিৎসায় রাজবাড়ী সদর হাসপাতালসহ উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ৩৬ জন রোগী ভর্তি আছেন। তবে ঈদের পর হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগী ভর্তির সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি। গতকাল বিকেল পর্যন্ত সদর হাসপাতালে ২১ জন, পাংশা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ১২ জন, বালিয়াকান্দি উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ২ জন এবং গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে একজন ডেঙ্গুরোগী ভর্তি আছেন। সব মিলিয়ে রাজবাড়ীর সদর হাসপাতালসহ বিভিন্ন উপজেলা হাসপাতালগুলোতে মোট ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন ৩৬ জন।
গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন ১০ জন এবং এ পর্যন্ত রাজবাড়ীতে ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে ২৬৫ জন। তবে হাসপাতালগুলো থেকে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করে ২৩৫ জন রোগী ভালো হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। ডেঙ্গু রোগীদের মধ্যে বেশির ভাগ রোগীই ছিল ঢাকা থেকে জ্বর নিয়ে আসা। নিহতের পিতা মোনছের সরদার বলেন, শাহেদ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে তাকে রাজবাড়ী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য গত রোববার ফরিদপুর হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত সোমবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে তার মৃত্যু হয়। সাহেব আলীর জামাতা জাহাঙ্গীর মোল্লা বলেন, ঈদের আগের তিনি ঢাকায় বেড়াতে যান। সেখান থেকে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে এসে রাজবাড়ী জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানে তার অবস্থার অবনতি হলে তাকে ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। পরে সেখানে সোমবার রাতে তার মৃত্যু হয়। ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা: কামদা প্রসাদ সাহা বলেন, রাজবাড়ী সদর হাসপাতাল থেকে রেফার্ড হয়ে গতকাল সোমবার দুপুরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় সাহেব আলী ভর্তি হন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাতেই তার মৃত্যু হয়।
রাজবাড়ী সিভিল সার্জন ডা: মাহফুজার রহমান সরকার বলছেন, তারা ডেঙ্গু চিকিৎসায় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। যাতে একটি রোগীও যেন কোনো ধরনের অবহেলায় মারাত্মক দুর্ঘটনায় না পড়েন। এডিস মশার হাত থেকে বাঁচতে অবশ্যই বাড়ির চার পাশ পরিষ্কারপরিচ্ছন্ন রাখা অত্যন্ত জরুরি বলে তিনি মনে করেন। সিভিল সার্জন বলেন, মানুষ অনেক সচেতন হয়েছে। এখন জেলার সব হাসপাতালে দেখা যায় ডেঙ্গু পরীক্ষায় কাউন্টারগুলোতে প্রচণ্ড ভির রয়েছে। কোনো ধরনের জ্বর হলেই রোগীরা আতঙ্কিত হয়ে ডেঙ্গু পরীক্ষা করতে আসছেন।