Naya Diganta

ইসলামের সামাজিক আদব

হজরত শাহ ওলীউল্লাহ রহ: ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা’ গ্রন্থে ‘আদব-সম্মান’-এর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে অত্যন্ত সুন্দর পর্যালোচনা করেছেন। যার সারসংক্ষেপ নিম্নরূপÑ
‘সবগুলো সভ্য দেশের অধিবাসী পানাহার, ওঠাবসা, চালচলন, পোশাক-আশাক ইত্যাদিতে সামাজিক ও সম্মিলিত জীবনযাপনে কিছু আদব-শিষ্টাচার ও নিয়মনীতি মেনে চলাকে আবশ্যকীয় মনে করে থাকে। যেমনÑ
* অনেকে তার ভিত্তি হিসেবে স্বভাবজাত নিয়মরীতিকে কর্মকৌশলস্বরূপ বেছে নিয়েছে এবং সেসব আদবকে গ্রহণ করেছে, যা চিকিৎসা ও অভিজ্ঞতার আলোকে কল্যাণকর।
* অনেকে সেসবের ভিত্তি ধর্মীয় নিয়মনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাতে তারা তাদের ধর্মের অনুশাসনকে মেনে চলা আবশ্যকীয় জ্ঞান করে নিয়েছে।
* অনেকে বিষয়টিতে নিজ নিজ রাজা-বাদশা, দার্শনিক ও ধর্মগুরুদের অনুকরণ করে নিয়েছে।
* এসব ছাড়াও আরো নিয়মনীতি বিদ্যমান হয়ে থাকে; যার মধ্যে কোনোটি উপকারী হয়ে থাকে আবার কোনোটি ক্ষতিকরও হয়ে থাকে। আবার কোনোটি এমনও হয়ে থাকে, যাতে বাস্তবে উপকার-অপকার কোনোটিই থাকে না। যে কারণে উচিত ছিল, যা কল্যাণকর তা মেনে চলার নির্দেশ প্রদান; আর যা অকল্যাণকর তা নিষেধ করে দেয়া এবং যা কল্যাণকর বা অকল্যাণকর কোনোটাই নয় তা সাধারণভাবেই বৈধ হিসেবে বহাল রাখা।
ইসলামী শরিয়ত আলোচ্য সামাজিক আদব-শিষ্টাচারের ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর প্রতি লক্ষ রেখেছে :
১. এসব আদব-শিষ্টাচার পালন করাকালীন বা পালন করতে গিয়ে মানুষ কখনো আল্লাহকে ভুলে যায়। তাই শরিয়ত এসব আদব পালনের আগে এবং তা পালনকালীন তার সাথে কয়েকটি ‘মাসনুন দোয়া’ যুক্ত করে দিয়েছে। যেগুলো আল্লাহকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
২. কোনো কোনো কাজকর্ম ও পন্থাপদ্ধতি শয়তানি স্বভাবের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে থাকে। উদাহরণত, একটি জুতো পরে চলা, বাম হাত দ্বারা আহার করা ইত্যাদি। যে কারণে শরিয়ত তা নিষেধ করে দিয়েছে। কোনো কোনো কাজ এমন রযেছে, যা ফেরেশতাদের সাথে সামঞ্জস্য রাখে। উদাহরণত, ঘরে প্রবেশ ও বের হওয়াকালীন দোয়া পাঠ করা। যে কারণে শরিয়ত তেমনটির প্রতি উৎসাহিত করেছে।
৩. কিছু বিষয় এমন আছে, যা থেকে কখনো কষ্ট-বিপদ পৌঁছতে পারে; যেমনÑ এমন কোথাও শয়ন করা যেখানে উপরে ছাদ বা আড় নেই কিংবা শয়নকালীন বাতি জ্বালিয়ে রাখা। এ থেকেও শরিয়ত নিষেধ করে দিয়েছে।
৪. কোনো আদব-নিয়ম এমন হয়ে থাকে, যে ক্ষেত্রে অনারব লোকজনের বিলাসী সভ্যতার বিরোধিতা করা উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। উদাহরণত পুরুষের রেশমি কাপড় পরিধান করা। ছবিযুক্ত কাপড় ঝুলানো বা সোনা-রুপার পাত্রে পানাহার। তাই এরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
৫. কোনো কোনো বিষয়বস্তু ভাব-মর্যাদা ও সভ্যতা পরিপন্থী হয়ে থাকে এবং মানুষকে হিংস্র ও বন্য স্বভাবের দিকে ধাবিত করে দেয়। মহানবী সা: তা থেকেও নিষেধ করে দিয়েছেন। যেন তাতে ত্রুটি ও বাড়াবাড়িমুক্ত ভারসাম্যপূর্ণ মধ্যম পন্থাপদ্ধতি সামনে এসে যায়।
ওই বিবরণ সামনে রাখলে এ বিষয়টি অনুধাবন করা যায় যে, জগতের সব সভ্য ও অভিজাত জাতি-সম্প্রদায়ের সামষ্টিক ও সামাজিক আদব-শিষ্টাচারের ভিত্তি যেসব আদব-নিয়মের ওপর ছিল; ইসলামের বিধিবিধানে এবং মহানবী সা:-এর নির্দেশগুলোতে তার সব কিছু এসে গেছে। ধর্মীয়, নৈতিক ও চারিত্রিক, চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যগত, মোটকথা সর্বপ্রকার কল্যাণ ও উপকারিতা এসব আদবের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সুতরাং বলা যায়, এসব আদবের প্রতি যতœবান থাকলে, তাতে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি, মহানবী সা:-এর অনুসরণ, আত্মা ও দেহের সার্বিক পরিশুদ্ধি, গৃহের পরিচ্ছন্নতা, চারিত্রিক উন্নতি, সামাজিক কল্যাণ, স্বাস্থ্যের সুরক্ষা ও উন্নতি, মনীষীদের পরীক্ষিত কর্মপন্থা ও জীবনযাপন প্রণালী মোতাবেক হেদায়েত ভাগ্যে জুটে থাকে। এসবেরই সমন্বিত নাম হচ্ছে ‘ইসলামের সামাজিক আদব’।
ইসলাম এসব আদবের মধ্যে বিরাট আকর্ষণ রেখেছে। এর যে বিষয়গুলো মৌলিক ও আসল পর্যায়ের তা সম্পর্কে পবিত্র কুরআন ও হাদিস শরিফে জোর তাগিদ করা হয়েছে। এসব তাগিদ থেকে তার গুরুত্ব প্রকাশ পায়। এর মধ্যে কোনো কোনো বিষয় এমন যা সমকালীন কল্যাণ, আন্তঃদেশীয় সামাজিকতা ও সময়ের পরিবর্তনে পরিবর্তিত হতে পারে। এমন সব আদবের ক্ষেত্রে ইসলাম ধর্মে বেশি গুরুত্বও দেয়নি আবার তা পরিহারে অধিক কড়াকড়ি, ধমকও দেয়নি। কেবল তার জাগতিক কল্যাণ ও উপকারিতার প্রতি আলোকপাত করেছে। তাই এতে যদি এমন পরিবর্তন করা হয়, যাতে তার আসল উদ্দেশ্য ঠিক থাকে এবং তার সৌন্দর্য আরো বৃদ্ধি পায় তাহলে সেটি মন্দ বলে বিবেচিত হয় না। উদাহরণত হাত ধোয়ার ক্ষেত্রে মাটি ব্যবহারের পরিবর্তে সাবান ব্যবহার করা হয়, তোয়ালে ব্যবহার করা হয়, ছুরি দিয়ে গোশত কাটা হয়, প্লেট-গ্লাস পৃথক পৃথক হয় ইত্যাদি। এসবের ক্ষেত্রে পুরোপুরি অনুমতি প্রদান করা যায়। কিন্তু এমন আনুমতি প্রদান সত্ত্বেও প্রেম-ভালোবাসার একটা পর্যায় থাকে। তা হচ্ছে, যারা এ ক্ষেত্রে প্রিয়নবী সা:-এর অনুপুঙ্খ অনুসরণে আগ্রহী তারা সময়ের পরিবর্তন যতই হোক না কেন, তারপরও মহানবী সা: এসব ক্ষেত্রে যতটুকু, যেভাবে করেছেন তা হুবহু সেভাবেই করতে চান, করতে পারেন। আর এটাই হচ্ছে পরিপূর্ণ ঈমানের পরিচায়ক এবং সামাজিক আদবের ক্ষেত্রে এমন কর্মপন্থা অনুসরণের স্বাদই আলাদা। জ্ঞানীদের জন্য ইঙ্গিতই যথেষ্ট।
লেখক : মুফতি, ইফা