Naya Diganta

সিরিয়া সঙ্কট ও চীন-রাশিয়ার সাথে তুরস্কের সম্পর্ক

সিরিয়া সঙ্কট ও চীন-রাশিয়ার সাথে তুরস্কের সম্পর্ক

চলতি সপ্তাহে কাজাখ রাজধানী নূর সুলতানে অর্থাৎ আগের আসতানায় সিরিয়া পরিস্থিতি নিয়ে ১২তম আসতানা আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। তুরস্ক, রাশিয়া এবং ইরানের মধ্যে অনুষ্ঠিত আগের ১১টি সভায় সিরিয়ার দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ ও সঙ্ঘাত অবসানের লক্ষ্যে একটি সমাধান খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে কিছু বাস্তবধর্মী ফলাফল বেরিয়ে আসে। সিরিয়ার সংবিধান নতুন করে প্রণয়নের লক্ষ্যে একটি সাংবিধানিক কমিটি গঠনের লক্ষ্যে নতুন করে উদ্যোগ নেয়ার জন্য উচ্চপর্যায়ের সর্বশেষ এই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।

সভার আগে জানানো হয় তিনটি জামিনদার রাষ্ট্র আসতানা শান্তি প্রক্রিয়ায় অন্যান্য দেশের যোগদানের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে পারে। ইতোমধ্যেই চীন, জার্মানি, ইরাক, জর্দান এবং লেবানন যে সম্ভাব্য নতুন সদস্য হতে পারে সে বিষয়টি উত্থাপন করা হয়েছে। এসব দেশের প্রত্যেকের আসতানা শান্তি প্রক্রিয়ায় যোগদানের কারণ রয়েছে। তুরস্কের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার দুই প্রতিবেশী জর্দান ও লেবানন বিপুলসংখ্যক সিরীয় উদ্বাস্তুকে আশ্রয় দিয়েছে। ইউরোপে উদ্বাস্তুপ্রবাহ নিয়ে ইউরোপের দেশ জার্মানি তুরস্কের সাথে গুরুত্বপূর্ণ আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। সিরিয়ার যুদ্ধ ও সঙ্ঘাতের সময় চীন প্রধানত জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে পুরোপুরিভাবে সিরীয় সরকারকে সমর্থন দিয়েছে। এ ছাড়াও আসতানা সম্মেলনের মূল কথা হচ্ছে বৃহত্তর পরিস্থিতি দেখার জন্য সর্বশেষ অবস্থার দিকে তাকানো গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভেদ জারিফ গত সপ্তাহে সরকারি সফরে তুরস্কে গিয়েছিলেন। এর একদিন আগে তিনি সিরিয়া সফর করেন। জাভেদ জারিফ উভয় দেশের রাজধানীতে সফরের সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনা করতে গিয়ে দ্বিপক্ষীয় বিষয়ে প্রাধান্য দিলেও তার সফরের সময়সূচি এবং তুরস্ক ও সিরিয়ায় তার আলাপ-আলোচনায় মূল বিষয় হিসেবে দেখা যায় দু’টি প্রতিবেশী দেশেই তিনি সিরিয়ার যুদ্ধ অবসানে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা নিয়ে আলোচনা করেছেন।

কয়েক দিন পর, সিরিয়া সরকার এবং সশস্ত্রবিরোধী পক্ষের মধ্যে আসতানা শান্তি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বন্দিবিনিময় হয়। তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ কথা জানানো হয়। বিরোধীপক্ষের নিয়ন্ত্রিত শহর আলসাবের দক্ষিণের আবু আল জিনদেন থেকে প্রত্যেক পক্ষের নয়জন বন্দিবিনিময় করা হয়।

আঙ্কারা, মস্কো এবং তেহরানের মধ্যসারির যৌথ প্রচেষ্টার ফলে এই বন্দিবিনিময় সম্পন্ন হয়। এদিকে বন্দিবিনিময়ের এক দিন পর রাশিয়ার যুদ্ধ বিমানগুলো সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ইদলিবের পল্লী এলাকায় একের পর এক হামলা চালায়।
এসব অগ্রগতির সাথে সেখানে রাশিয়ার এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং আমেরিকার এফ-৩৫ অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান ক্রয়ের ব্যাপারে আঙ্কারার সিদ্ধান্তে এখনো বিতর্ক চলছে।

আমেরিকা ও ন্যাটোর মিত্র তুরস্ক বিষয়টি নিয়ে বাধার মুখে পড়লেও এই সপ্তাহে মস্কো জানায়, তারা আগামী জুলাই মাসে তুরস্কের কাছে এস-৪০০ সরবরাহ শুরু করবে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পরে গত বুধবার একটি বৈঠকে বসার জন্য একত্রে আসেন। তুরস্কের সংবাদমাধ্যমে এই বৈঠককে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বর্ণনা করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্র গত সোমবার ইরানের তেল আমদানিকারী বৃহত্তম কয়েকটি দেশ যাদেরকে তেল আমদানির লক্ষ্যে নিষেধাজ্ঞার বাইরে রাখা হয়েছিল মে মাসের প্রথমার্ধে সেসব দেশের সুবিধার অবসান ঘটানো হবে বলে ঘোষণা দেয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আঞ্চলিক রাজধানীতে আবার উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। এটা হলো তেহরান সরকারের ওপর চাপ বৃদ্ধি করার প্রচেষ্টা। এটা আঙ্কারা ও বেইজিং এ বিস্ময় সৃষ্টি করেছে। চীন এবং তুরস্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কয়েকটি অভিন্ন ক্ষেত্র খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছে এবং উভয় দেশই বলেছে তারা ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা অগ্রাহ্য করে ইরান থেকে তেল আমদানি অব্যাহত রাখবে। এসব অগ্রগতির সাথে সাথে গত মঙ্গলবার দেখা গেল চীনের বিশাল বিনিয়োগ প্রকল্প বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে সহযোগিতা জোরদার করার লক্ষ্যে তুরস্ক ও চীনের কর্মকর্তারা একত্র হয়েছেন। বেইজিং তুরস্কে তার বিনিয়োগ দ্বিগুণ করার দিকে তাকিয়ে আছে। এই প্রকল্পে ২০২১ সাল নাগাদ ছয় শ’ কোটি ডলার বিনিয়োগ করা হবে। আঙ্কারায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত দেংলি এ কথা জানান। এদিকে জ্বালানি সহায়তা সম্প্রসারণে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়ে তুরস্ক এবং চীন তুরস্কে একটি নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট নির্মাণের জন্য আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। রাশিয়ার রোসাতম তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চলীয় মেরসিন প্রদেশে তুরস্কের প্রথম নিউক্লিয়ার তথা পরমাণু প্ল্যান্ট আক্কুয়োইয়ো নির্মাণ করছে। দু’দেশের মধ্যকার ২০১০ সালের চুক্তির আওতায় এই পরমাণু প্ল্যান্ট নির্মাণ করা হচ্ছে। দু’দেশের মধ্যে যৌথ গ্যাস প্রকল্পও রয়েছে।

এটি বলা নিষ্প্রয়োজন যে, সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে রাজনৈতিক কারণে বিশ্বশক্তি রাশিয়াও চীনের সাথে একই টেবিলে তুরস্ককে টেনে নিয়ে এসেছে। আগামী দিন ও সপ্তাহগুলোতে বাণিজ্য ও জ্বালানি এবং অন্যান্য ইস্যু তাদের আরো কাছে নিয়ে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

লেখক : তুরস্কের একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক
আরব নিউজ থেকে ভাষান্তর : মুহাম্মদ খায়রুল বাশার