২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

ভ্যানচালক থেকে আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়

হেমায়েত মোল্লা - ছবি : নয়া দিগন্ত

হেমায়েত মোল্লা। বাগেরহাটের মোরলগঞ্জ থানার কাটাবুনিয়া গ্রামের কৃষক পরিবারের সন্তান। পড়ালেখা করেননি। কোনোমতে নিজের নাম লিখতে পারেন এবং সই করতে পারেন। ২০০৯ সালে জীবিকার টানে ঢাকায় এসে অন্য পেশায় না গিয়ে মনে মনে ঠিক করেন স্কুলভ্যান চালাবেন। নিজে পড়ালেখা করেননি বলে স্কুলের ছাত্র আনা নেয়া করেই তৃপ্তি খুঁজেন। এই হেমায়েত মোল্লা বর্তমানে জাতীয় ক্যারম চ্যাম্পিয়ন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ৭ নম্বর র‌্যাঙ্কিংয়ের অধিকারী।

দুই সন্তানের জনক হেমায়েতের বড় মেয়ে পড়ে অষ্টম শ্রেণীতে, ছেলে চতুর্থ শ্রেণীতে। ২০০৯ সালে বাসাবোয় থেকে স্কুলভ্যান চালালেও ক্যারম খেলায় পটু হেমায়েত ২০১২ সালে জানতে পারেন স্টেডিয়াম এরিয়ায় ক্যারম ফেডারেশন রয়েছে এবং সেখানে ক্যারম কম্পিটিশন হয়। ওই সময়ই ক্যারমের একটি টুর্নামেন্টে অংশ নিয়ে রানার আপ হন। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। ২০১২ সালে শ্রীলঙ্কা, ২০১৪ সালে মালদ্বীপে আন্তর্জাতিক চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিয়ে র‌্যাঙ্কিংয়ে অষ্টম এবং ২০১৫ সালে দিল্লিতে ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিয়ে সপ্তম র‌্যাঙ্কিংয়ে সাতে উঠে আসেন।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনের র‌্যাঙ্কিংয়ে এলেও সংসারের র‌্যাঙ্কিংয়ে এখনো পিছিয়ে হেমায়েত। নির্দিষ্ট কোনো পেশায় নেই তিনি। ভ্যানও চালান না। বিভিন্ন জেলায় গিয়ে গিয়ে বাজিতে ক্যারম খেলে যা কামাই করেন তাতেই সংসার চলে। স্বপ্ন দেখতেন কোনো কোম্পানিতে একটা চাকরি করবেন। মাস গেলে বেতন পাবেন। তার চাকরিটিই হবে ক্যারম খেলাকেন্দ্রিক। অর্থাৎ তিনি খেলার জন্যই কাজ করবেন কোনো কোম্পানিতে।

দীর্ঘ ৯ বছর পর স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এবার প্রথমবারের মতো জাতীয় ক্যারম চ্যাম্পিয়নশিপে ওয়ালটনের হয়ে খেলে চ্যাম্পিয়ন হন। তিনি শুনেছেন ওয়ালটন কোম্পানি বিভিন্ন প্রতিভাকে চাকরি দেয়। সেই আশায়ই খেললেন ওয়ালটনের ব্যানারে। তবে ওয়ালটনের ইকবাল বিন আনোয়ার বলেন, ‘তার সাথে আমরা চাকরির ব্যাপারে কোনো কমিটমেন্টে যাইনি। তাকে আশ্বাস দিয়ে যদি চাকরিটা না হয়, তাহলে বেশি কষ্ট পাবে। বিশেষ করে তাদের সভাপতি জুনায়েদ আহমেদ পলক অন্তত পরিচিত এবং স্বনামধন্য একজন মানুষ। তিনি চাইলেই হেমায়েতকে যেকোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি দিতে পারেন। আমরা এই চ্যাম্পিয়নশিপের জন্য শুধু তাকে ১০ হাজার টাকা দিয়ে পুরস্কৃত করেছি।’

হেমায়েত জানালেন, ‘বাবা নেই। মাকে দেখভাল করতে হয়। সংসার দেখব নাকি ক্যারমে মনোযোগ দেবো। যতটুকু খেলি তাতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এর চেয়ে ভালো করা সম্ভব নয়। নিয়মিত অনুশীলন এবং বিদেশী কোনো এক কোচের কাছে শিখতে পারলে ভালো হতো। দেশকে আরো কিছু দিতে পারতাম।’

তিনি আরো বলেন, ‘১২ বছর বয়সে ক্যারম খেলা শুরু করি। দুলাভাই নৌকায় করে মাছ বিক্রি করতেন। তার সাথে গিয়ে বিভিন্ন ঘাটে সময় পেলে ক্যারম খেলতাম। এ জন্য বাবা আমাকে অনেক মেরেছেন। উপজেলায় যখন আমার নাম ডাক হলো তখন থেকে আর কিছু বলেননি। শ্রীলঙ্কায় যখন খেলতে গেলাম তখন বাবা চেয়ারম্যানকে গিয়ে বলেছে আমার ছেলে শ্রীলঙ্কা খেলতে যাবে কখনো ভাবিনি। অথচ এই ছেলেকে কত মেরেছি! স্ত্রী তো সারাক্ষণ সংসারের কথা বলতেই থাকে। বলে, পেটে ভাত না থাকলে, পোলাপান পড়ালেখা না করতে পারলে কী লাভ তোমার ওই ক্যারম খেলে। বাড়িতে ঘর নেই। গ্রামের বাড়িতেও ভাড়া থাকো। কবে হবে তোমার ঘর। কিন্তু কী করব। ক্যারম ফেডারেশনের সেক্রেটারি লিয়ন ভাই অনেক সাহায্য করেন। কেউ যদি আমাকে একটি চাকরি দেয় তাহলে সংসার, ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া, নিজের প্র্যাকটিস সবই হয়। কিন্তু কে দেবে চাকরি!’


আরো সংবাদ