Naya Diganta

করোনা রোগীদের মৃত্যু সবই হচ্ছে হাসপাতালে

করোনাক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণকারীদের প্রায় সবই হচ্ছে হাসপাতালে। এর বাইরেও কিছু হচ্ছে কিন্তু করোনা শনাক্ত না হওয়ায় ওই মৃত্যুটা করোনা হিসেবে ধরা হচ্ছে না। গতকাল শুক্রবার করোনা আক্রান্ত মৃত্যুবরণকারীদের সংখ্যা ছিল ২৪ জন। এ নিয়ে সারা দেশে গত ১৮ মার্চের পর থেকে মোট মৃত্যু সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ছয় হাজার ৭২২ জনে। অন্য দিকে গতকাল নতুন করে করোনা শনাক্ত হয়েছেন দুই হাজার ২৫২ জন। তবে একই সময়ে ২৪ ঘণ্টায় করোনা থেকে সুস্থ হয়েছেন দুই হাজার ৫৭২ জন। গতকাল সকাল পর্যন্ত পূর্বের ২৪ ঘণ্টায় নমুনা পরীক্ষার ভিত্তিতে করোনা শনাক্তের পরিমাণ ছিল ১৪.৫৯ শতাংশ। এ ছাড়া গত মার্চ থেকে গতকাল পর্যন্ত সারা দেশে করোনা শনাক্তের হার ১৬.৭১ শতাংশ।
সারা দেশে করোনায় মারা যাওয়া ছয় হাজার ৭২২ জনের মধ্যে পাঁচ হাজারই পুরুষ। করোনা শনাক্তের মধ্যে নারীর চেয়ে পুরুষের হার বেশি। শতকরা হিসেবে পুরুষ ৭৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ আর নারী ২৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে করোনায় মারা যাওয়া ২৪ জনের মধ্যে পুরুষ ২০ জন এবং নারী চারজন। করোনায় মৃত্যুর প্রথম ব্যক্তিটিও ছিল ৭০ ঊর্ধ্ব বয়সের একজন পুরুষ। তিনি যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী তার আত্মীয়ের সংস্পর্শে এসে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
চিকিৎসকেরা বলছেন, আমাদের নারীরা ঘরেই থাকেন বেশি, কাজের প্রয়োজনের পুরুষরা বেশি ঘরের বাইরে যান। ফলে পুরুষই বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। ঘরে আসার পর অথবা করোনা শনাক্তের পর পুরুষরা যদি বুঝতে পারেন যে তাদের জ্বর অথবা করোনার অন্য কোনো লক্ষণ দেখা দিয়েছে তাহলে অনেকেই নিজেকে আইসোলেট করে ফেলেন অন্যদের থেকে। সে কারণে ঘরের নারী সদস্যরা কম আক্রান্ত হচ্ছেন।
করোনায় মৃত্যুবরণকারী মোট ছয় হাজার ৭৭২ জনের মধ্যে ষাটোর্ধ্ব সংখ্যা ছিল তিন হাজার ৬১৫ জন। অর্থাৎ, মোট মৃত্যুর ৫৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ। ৫১ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে রয়েছেন এক হাজার ৭৫৪ জন। এই বয়সী মোট মৃত্যুর ২৫ দশমিক ৯০ শতাংশ। ৪১ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে রয়েছেন ৮১৪ জন এবং মোট মৃত্যুর ১২ দশমিক শূন্য দুই শতাংশ। ৩১ থেকে ৪০ বছর বয়সী মৃত্যুবরণ করেছেন ৩৪৯ জন এবং এরা মোট মৃত্যুর পাঁচ দশমিক ১৫ শতাংশ। ২১ থেকে ৩০ বছর বয়সী মৃত্যুবরণ করেছেন ১৫২ জন এবং এরা মোট মৃত্যুর দুই দশমিক ২৪ শতাংশ। ১১ থেকে ২০ বছর বয়সীদের মৃত্যুর সংখ্যা ৫৫ জন এবং এরা মোট মৃত্যুর শূন্য দশমিক ৮১ শতাংশ। এ ছাড়া শূন্য থেকে ১০ বছর বয়সী মৃত্যুবরণকারীদের সংখ্যা ৩৩ এবং এরা মোট মৃত্যুর শূন্য দশমিক ৪৯ শতাংশ।
সামেক হাসপাতালের চিকিৎসকসহ দুইজনের মৃত্যু
সাতক্ষীরা সংবাদদাতা জানান, সাতক্ষীরায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে একজন চিকিৎসক ও করোনা উপসর্গ নিয়ে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। গরিবের ডাক্তার নামে পরিচিত সবার প্রিয় সাতক্ষীরা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের প্রথম তত্ত্বাবধায়ক এবং নলতা ম্যাটস-এর অধ্যক্ষ পরিচালক ডা: শেখ শাহজাহান আলী (৬০) করোনায় আক্রান্ত হয়ে গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টায় ঢাকার একটি হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন। তিনি সাতক্ষীরার স্বাস্থ্যসেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে কাজ করেছেন নিবেদিতপ্রাণ হিসেবে। ডা: শেখ শাহজাহান আলী প্রথমে মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণজনিত কারণে হাসপাতালে ভর্তি হন এবং পরবর্তীতে করোনা আক্রান্ত হন। সাতক্ষীরা জেলা বিএমএর পক্ষ থেকে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হয়েছে।
এ দিকে করোনা উপসর্গ নিয়ে সামেক হাসপাতালে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল শুক্রবার ভোরে হাসপাতালের আইসিইউতে তার মৃত্যু হয়। মারা যাওয়া সাবিত্রী দাস (৫৪) সাতক্ষীরা সদর উপজেলার তলুইগাছা গ্রামের হরেন্দ্র নাথ দাসের স্ত্রী। মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা: রফিকুল ইসলাম জানান, জ¦র, সর্দি ও কাশিসহ করোনার উপসর্গ নিয়ে গত বৃহস্পতিবার সকালে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি হন সাবিত্রী দাস। এ নিয়ে জেলায় করোনার উপসর্গ নিয়ে ৪ ডিসেম্বর শুক্রবার পর্যন্ত মারা গেছেন অন্তত ১২২ জন। আর ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন আরো ৩১ জন।
বগুড়ায় একজনের মৃত্যু
বগুড়া অফিস জানায়, বগুড়ায় করোনায় নতুন করে আরো ২৮ জন আক্রান্ত এবং একজন মারা গেছেন। আক্রান্তদের মধ্যে ২৭ জন বগুড়া সদরের বাসিন্দা। মৃত ব্যক্তি শহরের সূত্রাপুরস্থ মফিজ পাগলার মোড়ের বাসিন্দা ব্যবসায়ী আব্দুল হালিম (৭৫)। তিনি গত কয়েক দিন আগে করোনা পজিটিভ হয়ে নিজ বাসাতেই চিকিৎসাধীন ছিলেন। এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন বগুড়া সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: সামির হোসেন মিশু। এ ছাড়া বৃহস্পতিবার জেলার শাজাহানপুর উপজেলার বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম (৫০) করোনায় মারা গেছেন। বগুড়া জেলার ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা: মোস্তাফিজুর রহমান তুহিন জানান, দু’টি পিসিআর ল্যাবে বৃহস্পতিবার ২০৭টি নমুনা পরীক্ষা শেষে ২৮ জন করোনা পজিটিভ হয়। এ নিয়ে জেলায় করোনা আক্রান্ত হয়েছেন আট হাজার ৯৬১ জন, মারা গেছেন ২১২ জন, সুস্থ হয়েছেন আট হাজার ১৫০ জন ও চিকিৎসাধীন আছেন ৫৯৯ জন।
চট্টগ্রামে করোনা আক্রান্ত ২৬ হাজার ছাড়াল
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, চট্টগ্রামে দ্রুতগতিতে বাড়ছে করোনার সংক্রমণ। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুনভাবে শনাক্ত হয়েছেন ২৪০ জন। মাত্র চার দিনে পেরোল এক হাজারেরও বেশি। এ নিয়ে চট্টগ্রামে মোট করোনা শনাক্ত রোগী এখন ২৬ হাজার ৬৫ জন। এদের মধ্যে নগরের রোগী ১৯ হাজার ৭৫৪ জন এবং উপজেলা পর্যায়ে ৬ হাজার ৩১১ জন। আক্রান্তদের মধ্যে মারা গেছেন ৩২০ জন। যাদের ২২৫ জন নগরের এবং ৯৫ জন বিভিন্ন উপজেলার। অন্য দিকে ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত করোনা থেকে সুস্থ হয়েছেন ২৩ হাজার ৪৬৮ জন। গতকাল শুক্রবার দুপুরে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা: শেখ ফজলে রাব্বি এসব তথ্য জানান।
সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার মেডিক্যাল কলেজ ল্যাবসহ চট্টগ্রামে ৯টি ল্যাবে নমুনা পরীক্ষা হয়েছে এক হাজার ৭০২টি। এরমধ্যে বিআইটিআইডিতে ২৬ জন, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ ল্যাবে ১০২ জন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাবে ৩৭ জন, ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাবে আটজন, আরটিআরএলতে আটজন, ইম্পেরিয়াল হাসপাতাল ল্যাবে ৩১ জন, শেভরন ক্লিনিক্যাল ল্যাবরেটরিতে ১৫ জন, মা ও শিশু হাসপাতাল ল্যাবে ১২ জন এবং কক্সবাজার মেডিক্যাল কলেজ ল্যাবে চট্টগ্রামের একজনের শরীরে করোনাভাইরাস পাওয়া গেছে।
বাজিতপুরে ১ জন আক্রান্ত
কটিয়াদী (কিশোরগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে গত ২৪ ঘণ্টায় ১ জন করোনায় আক্রান্ত এবং চারজন সুস্থ হয়েছেন। সুস্থদের মধ্যে ২ জন পুরুষ এবং ২ জন নারী রয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার রাতে বাজিতপুর হাসপাতালের ডা: তাহলিল হোসেন শাওন নয়া দিগন্তকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন। বাজিতপুর উপজেলার সরারচর ইউনিয়নের কামালপুর গ্রামের নতুন একজনসহ উপজেলায় সর্বমোট ২৮৩ জন আক্রান্ত হলেন। তাদের মধ্যে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে।
এ দিকে বাজিতপুর উপজেলায় গত ২৪ ঘণ্টায় চারজনসহ মোট ২৭০ জন করোনামুক্ত হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। বর্তমানে উপজেলায় ৮ জন আক্রান্ত ব্যক্তি তাদের নিজ বাড়িতে আইসোলেশনে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।