Naya Diganta

বিশ্ব কিডনি দিবস

প্রতিবারের মতো এবারও ১২ মার্চ বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশে বিশ্ব কিডনি দিবস ২০২০ পালিত হবে। বিশ্বের সকল জনগোষ্ঠীর প্রতি ১০ জনের ১ জন কিডনি রোগে রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। শুধু জনগণের সচেতনতা নয়, সেই সাথে ডাক্তার, সেবিকা ও জনস্বাস্থ্য সেবার সাথে জড়িত স্বাস্থ্যকর্মী ও বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও সরকারের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কিডনি রোগ সম্বন্ধে সচেতনতা সৃষ্টি করা এই দিবসের লক্ষ্য। সচেতনতার পাশাপাশি প্রতিরোধ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য উদ্ধুদ্ধ করার জন্যও বিশ্ব কিডনি দিবস পালন করা হয়। ইন্টারন্যাশ সোসাইটি অব নেফ্রোলজি (আইএসএন) এবং ইন্টারন্যাশনার ফেডারেশন অব কিডনি ফাউন্ডেশন (আইএফকেএফ) এর যৌথ উদ্যেগে ও বিভিন্ন দেশের স্থানীয় কিডনি সংগঠনের মাধ্যমে এই বিশ্ব কিডনি দিবস পালন হয়ে থাকে। কিডনি রোগ মানব জাতির পঞ্চম মৃত্যুর কারণ এবং স্বাস্থ্য খাতের ২ থেকে ৩ শতাংশ বরাদ্দ এই কিডনি রোগের জন্য ব্যয় হয়ে থাকে। বাস্তবতা হচ্ছেÑ নি¤œ আয়ের দেশে শতকরা ৮০ ভাগ কিডনি রোগী কিডনি ডায়ালাইসিস ও কিডনি সংযোজন থেকে বঞ্চিত। কিডনি রোগের উৎপত্তি ও এর ক্রমাগত কার্যক্ষমতা হ্রাস পাওয়া প্রায় ক্ষেত্রে প্রাথমিক অবস্থায় রোধ করা যেতে পারে। এই বছর বিশ্ব কিডনি দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে ‘সবার জন্য সর্বত্র সুস্থ কিডনি-প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয়, প্রতিরোধ ও চিকিৎসা প্রদান করা’। প্রথম স্তরে প্রাথমিকভাবে কিডনি রোগের ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়গুলীর উপর নজর দিতে হয় এবং কিডনি ও মূত্রনালী, মূত্রথলি ও প্র¯্রাবের রাস্তার কাঠামোগত ক্রুটি চিকিৎসা করা এবং সর্বোপরি কিডনি ক্ষতিকারক কোন ওষুধ ও পরিবেশের কোন রাসায়নিক পদার্থ থেকে বিরত থাকতে হবে। দ্বিতীয় স্তর অর্থাৎ কিডনি রোগের প্রধান দুটি কারণ ডায়বেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। তৃতীয় স্তর অর্র্থাৎ যারা ধীর গতির কিডনি রোগের চিকিৎসায় আছেন এবং শতকরা ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কিডনি কাজ করছে না; তাদের ক্ষেত্রে কিডনি অকেজো রোগের জটিলতা বিশেষ করে হৃদপিণ্ড ও মস্তিষ্কের জটিলতা থেকে প্রতিকারের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এই ব্যবস্থার ফলে এই সকল রোগিদের ডায়ালাইসিস ও কিডনি সংযোজনের সময় বিলম্ব হয়। এই পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য স্থানীয় সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার গুরুত্ব অত্যাধিক। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিশ্বের প্রায় ৮৫ কোটি মানুষ কোনো-না-কোনো কিডনি রোগে আক্রান্ত। এর মধ্যে ধীর গতিতে আক্রান্ত কিডনি রোগীরা কোনো দিন কিডনি কার্যক্ষমতা ফিরে পায় না বরং ধীরে ধীরে সময়ের ব্যবধানে কার্যক্ষমতা হ্রাস পায় এবং এক পর্যায়ে ডায়ালাইসিস ও কিডনি সংযোজন স্তরে পৌঁছায়। তখন ওষুধের মাধ্যমে রোগীকে বাঁচানো যায় না। কিডনি রোগ প্রতিরোধযোগ্য যদি সঠিক সময়ে কিডনি রোগের শনাক্ত করা ও চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হয়। এই ক্ষেত্রে ওষুধের সাথে জীবনযাত্রার অভ্যাস ও খাদ্যের পুষ্টির দিকে নজর দিতে হবে। বলা বাহুল্য কিডনি রোগের শনাক্তকরণ, চিকিৎসা ও সেবাদান বিশ্বের সকল দেশে সমমানের নয়। স্বল্প উন্নয়ন দেশে এই সেবাদানের ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়।
অতএব কিডনি রোগকে আর্ন্তজাতিক ও রাজনৈতিকভাবে সুনজর ও অত্যাবশ্যক জরুরি রোগ হিসাবে মূল্যায়ন করা উচিত। কারণ কিডনি রোগ বিশ্বের একটি অন্যতম স্বাস্থ্য সমস্যা। কিডনি রোগ শুধু হার্ট ও মস্তিষ্কের রোগের ঝুঁকি বহন করে না, এই শরীরে ইনফেকশন ও টিবি রোগের ঝুঁকি বহন করে। কাজেই বাস্তব অবস্থার পরিপ্রক্ষিতে কিডনি রোগকে আন্তর্জাতিক পরিকল্পনায় অন্তর্ভূক্তকরণ ও কিডনি রোগের শনাক্তকরণ এবং এই ব্যাপারে জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা প্রয়োজন।
কিডনি রোগের প্রতিরোধকে তিনভাগে বিভক্ত করা যায়। যেমন-প্রাথমিক প্রতিরোধ অর্থাৎ রোগ হওয়ার আগে ব্যবস্থা নেওয়া যাতে রোগি রোগে আক্রান্ত না হয়। দ্বিতীয় বা সেকেন্ডারি প্রতিরোধ অর্থাৎ রোগকে প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণ ও রোগের প্রথম অবস্থায় চিকিৎসা করা। তৃতীয় ধাপ বা টারশিয়ারি প্রতিরোধ হলো যখন রোগি কিডনি রোগে আক্রান্ত সেই ক্ষেত্রে কিডনি রোগের জটিলতা থেকে প্রতিকার পাওয়ার জন্য চিকিৎসা প্রদান।
প্রাথমিক প্রতিরোধ : কিডনি রোগের প্রথম দুইটি কারণ হচ্ছে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ। অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ দিক হচ্ছেÑ শরীরের স্থূলতা, খাদ্যে অতিরিক্ত আমিষ, মূত্রনালী ও প্রোস্টেটের গঠনতন্ত্রের ক্রুটি, কিডনির ছাকনির প্রদাহ (নেফ্রাইটিস) ও বেদনানাশক ওষুধ সেবন, কিডনির ক্ষতিকারক খনিজ পদার্থ, ক্যান্সারের জন্য ওষুধের ব্যবহার, শরীরের পানি শূন্যতা এবং উচ্চ তাপমাত্রার প্রভাবের জন্য কিডনির ক্ষতি হয়। এ ছাড়া কীটপতঙ্গের জন্য ব্যবহৃত ওষুধের দ্বারা কিডনির ক্ষতি হয়ে থাকে। বয়সজনিত কারণে, জেনেটিক ও পরিবেশের কারণে কিডনি রোগ দেখা দিতে পারে। অনেক সময় হার্টের রোগ এবং লিভার রোগের জন্যও কিডনি রোগ হয়ে থাকতে পারে।
কিডনি অকেজো রোগীর ক্ষেত্রে তৃতীয় স্তরে মানে টারশিয়ারি প্রতিরোধের মধ্যে রক্ত শূন্যতা, খনিজ পদার্থের দুর্বলতা সর্বোপরি হার্ট ও মস্তিষ্কের রোগের প্রতিরোধকে বুঝায়। কিডনি রোগীদের এই স্তরে হার্ট ও মস্তিস্কের রোগের জন্য বেশির ভাগ রোগী মৃত্যুবরণ করে। কিডনি রোগীরা এই দুইটি রোগের জন্য অন্যান্য ঝুঁকি অর্থাৎ স্থূলতা ও রক্তের অতিরিক্ত মাত্রায় চর্বির ঝুঁকি বিশেষ গুরুত্ব রাখে না। কিডনি রোগ নির্ণয়ের জন্য দুইটি পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এর মধ্যে একটি প্র¯্রাবের মধ্যে প্রোটিন বা অ্যালবুমিন নির্গত হওয়া এবং দ্বিতীয়টি রক্তের সেরাম ক্রিয়েটিনিন ও একই সাথে ঊংঃরসধঃবফ এষড়সবৎঁষধৎ ঋরষঃৎধঃরড়হ জধঃব (বএঋজ) পরীক্ষা করাই যথেষ্ঠ। যারা ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, বংশগত কিডনি রোগ, কিডনির ক্ষতিকারক ওষুধ ও হারবাল ওষুধ, নেশার জন্য ওষুধ, স্থানীয় কবিরাজী ওষুধ গ্রহণ করে এবং যাদের স্বাস্থ্য ইতিহাসে আকর্ষিত কিডনি অকেজো হয়েছিল এবং যাদের বয়স ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে এই সব জনগণকে কিডনি রোগের পরীক্ষার নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনতে হবে। এ ছাড়াও অন্যান্য ঝুঁকি অর্থাৎ কম ওজনের নবজাতক শিশু, ধূমপায়ী, বিভিন্ন রকমের শরীরে প্রদাহ কিডনি রোগের ঝুঁকি বহন করে।
কিডনি রোগের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা
একজন সচেতন মানুষ হিসেবে আপনাকে কিডনি রোগ প্রতিরোধে কিছু নিয়ম মানতে হবে এবং জানতে হবে। যেমন ১। ডায়াবেটিস নির্ণয় ও নিয়ন্ত্রণ ২। উচ্চ রক্তচাপ নির্ণয় ও নিয়ন্ত্রণ ৩। শরীরের স্থূলতা কমানো ৪। নিয়মিত কায়িক পরিশ্রম করা ৫। টাটকা শাকসবজি ও ফলমূল গ্রহণ ৬। খাদ্যে অতিরিক্ত চর্বিজাতীয় খাবার পরিহার করা ৭। সঠিক পরিমাণে পানি পান করা ৮। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবন না করা ৯। বেদনানাশক ও ক্ষতিকারক ওষুধ পরিহার করা ১০। ধূমপান ও মধ্যপান থেকে বিরত থাকা ১১। সর্বোপরী ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা।
লেখক : সাবেক পরিচালক ও অধ্যাপক, কিডনি বিভাগ, ন্যাশনাল ইনস্টিটউড অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি