Naya Diganta

কমছে না ঈদযাত্রায় ভোগান্তি

প্রতি ঈদে নাড়ির টানে কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফেরেন লাখো মানুষ। এবারো ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রিয়জনের কাছে ছুটে যান ঘরমুখো মানুষ। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা থেকে সবচেয়ে বেশি মানুষ ছুটে যান দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে। আর ঈদযাত্রা উপলক্ষে বাস, লঞ্চ আর ট্রেনে যাতায়াত করে থাকেন যাত্রীরা। সবার স্বপ্ন একটাইÑ স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপদে বাড়ি ফেরা। তার পরও নানা ঝক্কি মাথায় নিয়ে ছুটতে হয় প্রিয়জনদের কাছে। এবার ঈদযাত্রায় যাত্রীদের ভোগান্তি কোনো অংশেই কম ছিল না। যাত্রীদের সীমাহীন কষ্ট আর ভোগান্তি সয়ে গ্রামে স্বজনদের কাছে ফিরতে হয়েছে। যে কষ্টের ছাপ তাদের চোখেমুখে ফুটে ওঠে। ঈদযাত্রার ভোগান্তির চিত্র নতুন কিছু নয়, এটি পুরনো।
ঈদে ঘরমুখো মানুষের দুর্ভোগ কোনোভাবেই পিছু ছাড়ছে না। সড়কপথ-রেলপথ-নৌপথ সব স্থানে দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে ঘরমুখো মানুষের। প্রতি ঈদের মতো এবারো ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। একইভাবে বাস টার্মিনালগুলোতে বাস থাকলেও তা নির্ধারিত সময়ের দু-তিন ঘণ্টা বিলম্বে ছেড়ে যায়। অতিরিক্ত ভাড়া আর রাস্তায় যানজটের কবলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গরমের মধ্যে বাসে বসে কাটাতে হয়েছে যাত্রীদের। প্রতি ঈদে ঘরমুখো যাত্রীদের চাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের সড়ক, নৌ ও ট্রেন তিন রুটেই বেড়েছে যাত্রীর ভোগান্তি। নৌপথে নদীর নাব্যতা সঙ্কট আর তীব্র স্রোতের জন্য সব রুটেই পারাপারের ফেরির অপেক্ষায় দুই তীরে আটকে থাকে শত শত গাড়ি। আর ফেরির অপোয় থাকতে হয় যাত্রীদের। যেখানে গন্তব্যে যেতে ৮ ঘণ্টা লাগার কথা, সেখানে কোনো কোনো রুটে ২০ ঘণ্টারও বেশি লেগেছে। আর সীমাহীন ভোগান্তির শিকার হতে হয় নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের।
এ বছর ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয়ে যাত্রীদের ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করে কমলাপুর রেলস্টেশনে। ঈদের পাঁচ দিন আগে থেকেই যাত্রীদের চাপ দেখা যায় বাস, ট্রেন ও লঞ্চে। আর সোমবার থেকে ঘরমুখো মানুষের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে কমলাপুর স্টেশনে। ট্রেনের টিকিট সংগ্রহের জন্য যেমন ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে কাক্সিত টিকিট সংগ্রহ করতে হয়েছে, তেমনি ট্রেনের জন্য অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ট্রেন পাওয়া গেলেও নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে ট্রেন ছেড়ে গেছে। কাক্সিত ট্রেনের অপোয় প্ল্যাটফর্মে বসে অলস সময় কাটাতে হয়েছে দূরপাল্লার যাত্রীদের। তবে সবচেয়ে বেশি ভিড় দেখা গেছে উত্তরবঙ্গগামী ট্রেনগুলোতে। তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না ট্রেনগুলোতে। যে যেভাবে পেরেছেন সেভাবে গেছেন। অনেকে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনের ছাদে বসে গন্তব্যে যাত্রা করেন। যাত্রীদের অভিযোগ, প্রায় প্রতিটি ট্রেনই দেড় থেকে তিন ঘণ্টা দেরিতে ঢাকা ছেড়েছে। এতে স্টেশনে গরমে অসুস্থ হয়ে পড়েন অনেক যাত্রী। এ ছাড়া শিশুদের নিয়ে তাদের অভিভাবকদের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। সময়মতো ট্রেন ঢাকা পৌঁছতে না পারায় শিডিউল অনুযায়ী ঢাকা থেকে ছেড়ে যায়নি কোনো ট্রেন।
বরাবরের মতো এবারো কাঁঠালবাড়ি-শিমুলিয়া নৌরুটে যানবাহনের চাপ ছিল অত্যধিক। যে কারণে ফেরির অপেক্ষায় ছিল শত শত গাড়ি। এ দিকে নাব্যতা সঙ্কটে এই রুটে ফেরি চলাচল মারাত্মক ব্যাহত হয়েছে। ফেরি ধীরগতিতে চলাচলের কারণে পারাপারে সময় বেশি লেগেছে। মাওয়া-কাওড়াকান্দি নৌরুটেও ফেরির অপেক্ষায় ছিল শত শত গাড়ি। এ কারণে এখানে যাত্রীদের চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছে। আরিচা ফেরি ঘাটে তীব্র স্রোতের কারণে ফেরি চলাচলে বিঘœ ঘটে। ফলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফেরি পারাপার না হওয়ায় কোনো যানবাহনই সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছতে পারেনি। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবার নির্বিঘেœ যাতায়াতের জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়। তার পরও সড়কের সেই পুরনো চিত্রই চোখে পড়ে। মহাসড়কগুলোতে পুলিশ প্রশাসনকে সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে, তবু ভোগান্তি থেকে রক্ষা পাননি যাত্রীরা। সোমবার ভোর থেকে মহাসড়কের টাঙ্গাইলের অংশে বঙ্গবন্ধু সেতু থেকে পুংলী ব্রিজ পর্যন্ত তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। এ কারণে দুর্ভোগে পড়েন ঘরমুখো যাত্রী ও চালকেরা। গাজীপুরে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যানজট প্রকট আকার ধারণ করে। ঢাকা-টাঙ্গাইল সড়কের যানবাহনগুলো ঢাকা থেকে বের হতে কয়েক ঘণ্টা লেগেছে বিশেষ করে গাবতলী ও সাভারে হাজার হাজার বাস লাইনে দাঁড়িয়ে থেমে থেমে চলেছে। টঙ্গী থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত থেমে থেমে যানবাহন চলাচল করেছে। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কেও একই চিত্র দেখা যায়। আবার সময়মতো বাস না আসায় ভোগান্তিতে পড়েছেন উত্তরবঙ্গগামী যাত্রীরা। ঈদে বাড়তি মানুষের চাপ ছিল বাস-টার্মিনালগুলোতে। সেই সুযোগে বাসের অতরিক্তি ভাড়া আদায় করা হয়েছে, এমনটিই অভিযোগ করেছেন সব রুটের যাত্রীরা। প্রতিটি রুটে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া আদায় করেছে পরিবহন মালিক কর্তৃপক্ষ। ঈদের তিন দিন আগে থেকে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের চন্দ্রা এলাকা দিয়ে যান চলাচলে কিছুটা বাধাপ্রাপ্ত হয়। গাড়ির দীর্ঘ সারি থাকায় থেমে থেমে চলাচল করেছে এই রুটের গাড়ি। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের টঙ্গী থেকে চন্দ্রা চৌরাস্তা পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার সড়কে জ্যামে থেমে থেমে চলেছে গণপরিবহন। যানবাহনের বাড়তি চাপ এবং সরু সড়কের কারণে যানজট সৃষ্টি হয় বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। ঢাকা-চট্টগ্রাম-কুমিল্লা মহাসড়কের ঢাকা থেকে দাউদকান্দি পর্যন্ত ধীরগতিতে চলেছে সব ধরনের যানবাহন। এ রুটেও প্রতি বছর ঈদে যাত্রীদের লাগামহীন কষ্ট ভোগ করতে হয়। তার পরও নাড়ির টানে বাড়ি ফেরেন লাখো মানুষ।
সোমবার ভোর থেকে যাত্রীদের ভিড়ে মুখরিত হয়ে ওঠে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল। তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না ঘাট, প্ল্যাটফর্ম, লঞ্চের ডেক আর করিডোরে। নাড়ির টানে ছুটে চলছেন যে যার গন্তব্যে। বাস বা ট্রেনে প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যেই যেতে হচ্ছে গন্তব্যে। সোমবার সকাল সাড়ে ৫টার দিকে টার্মিনাল ঘুরে এমন দৃশ্য ল করা যায়। যাত্রীরা ভোর থেকে ঘাটে আসতে থাকেন। কমলাপুর বিআরটিসি বাস ডিপো, গাবতলী, সায়েদাবাদ ও মহাখালী বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, অতরিক্তি যাত্রীর চাপে মানুষ ছাদে যাত্রা করেন। কমলাপুর স্টেশনে গিয়ে দখো যায়, ট্রেনে যে যাত্রী আছে, তার চেয়ে বেশি যাত্রী আছে দাঁড়িয়ে ও ছাদে। যারা বাস বা ট্রেনে সিট পাননি, তারা প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, মিনিবাস, আবার কেউ কেউ খোলা ট্রাকেই ছুটেছেন গন্তব্যে। রাজধানীতে চলাচলকারী অনেক বাস ঈদে বেশি ভাড়ার লোভে দূরপাল্লার যাত্রী বহন করেছে। এই গাড়িগুলোতে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করেছেন যাত্রীরা। ঈদের দুই দিন আগে সোমবার থেকে রাজধানীর মহাখালী বাস টার্মিনালে দেখা যায়, ভোর থেকেই যাত্রীরা ভিড় করছেন। কেউ বসে আছেন অগ্রিম টিকিট নিয়ে বাসের অপেক্ষায় আবার কেউ আছেন টিকিট পাওয়ার অপেক্ষায়। তবু বাসের দেখা মিলছে না কাউন্টারগুলোতে।
দেশের এই তিন রুটের মধ্যে এবার রেলপথেই ভোগান্তি সবচেয়ে বেশি ছিল। প্রচণ্ড গরমে রেলস্টেশনে ঘরমুখো যাত্রীরা অবর্ণনীয় কষ্ট করেছেন। পাশাপাশি শিডিউল বিপর্যয়ে অপোর প্রহর শেষ হয় না অনেক যাত্রীর।
সব মিলিয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হয়েছেন ঈদে ঘরমুখো সাধারণ যাত্রীরা। ঈদ এলেই বাড়তি আয়ের নেশায় বেপরোয়া হয়ে যান পরিবহনের মালিক ও চালকেরা। কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে বাস, লঞ্চ ও ট্রেনে অতিরিক্ত যাত্রী বহন করে থাকেন। যে কারণে অনাকাক্সিত দুর্ঘটনার শিকার হতে হয় ঘরমুখো যাত্রীদের। পোহাতে হয় সীমাহীন দুর্ভোগ। ঈদে যাত্রীদের দুর্ভোগ কমাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিলে হয়রানি কিংবা দুর্ভোগ অনেকটা লাঘব করা সম্ভব, এমনটিই মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। সেই সাথে সচেতন হতে হবে প্রতিটি নাগরিককে। তাহলেই সহনীয় পর্যায়ে আসবে সড়কের দুর্ভোগ।