২২ জুলাই ২০১৯

কলাপাড়ায় দখলে আন্ধারমানিক নদীর অস্তিত্ব সঙ্কট

আন্ধারমানিক নদীর পাড় দখল করে গড়ে তোলা স্থাপনা দেখা যাচ্ছে হনয়া দিগন্ত -

আন্ধারমানিক নদী। নামের মাধ্যমে যেন মন ছুঁয়ে যায়। কিন্তু সেই আন্ধারমানিক এখন মৃতপ্রায়। পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার প্রধান নদী। নামটি শুনে অনেকেই হয়তো টিপ্পনি কেটে বলবেন, অন্ধকারে আবার মানিক হয় কী করে! অবাক হওয়ার মতো হলেও সত্য কিন্তু এটাই। এ এলাকার মানুষের জীবনযাত্রায় এ নদী ‘মানিক’ ছড়িয়েছে। নিজের দেহ নিংড়ে উৎপাদন করছে কৃষকেরা সোনালি ফসল। বুকে আগলে রাখছে রুপালি ইলিশ।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) তথ্য মতে, আন্ধারমানিক নদীর পানি প্রবাহের দৈর্ঘ্য ৩৯ কিলোমিটার ও গড় প্রস্থ ৩৩০ মিটার। এই নদীর গভীরতা ১৫ মিটার। এখন প্রতি বছর অন্তত পাঁচ ফুট কমে যাচ্ছে নদীর প্রস্থ। নদীটির দুই পাড়ে পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে।
কলাপাড়া পৌরশহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে নদীটির এক প্রান্ত মিলেছে বঙ্গোপসাগরে এবং অন্য প্রান্ত রাবনা বাঁধ চ্যানেলে মিলিত হয়েছে। মধ্যখানে আন্ধারমানিকের সাথে মিলিত হয়েছে কচুপাত্রা, টিয়াখালী, লোন্দা, আরপাঙ্গাশিয়া ও দোন নদীসহ উপচে টুইটুম্বুর হয়ে যেত এর শাখা-প্রশাখা। সময়ের সাথে সাথে মøান হয়ে এসেছে আন্ধারমানিকের স্রোতের টান। মরে গেছে মিঠাগঞ্জ ইউনিয়েনের সাপুড়িয়া খাল। খাল ভরাটের কারণে ডালবুগঞ্জ ইউনিয়নসহ মধুখালী, বৈধ্যপাড়া, পখিয়াপাড়া, চড়পাড়াসহ অন্তত ১০টি গ্রামের নৌ যোগাযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছে। একইভাবে লালুয়া ইউনিয়নের মধ্যভাগ দিয়ে প্রবাহিত খালটিও হোতায় পরিণত হয়েছে। ফলে থমকে গেছে লালুয়া ও ধুলাসারের সাথে নৌ চলাচল। টিয়াখালীর অংশের লোন্দা নদীর হয়েছে একই হাল। ধীরে ধীরে ভরাট হয়ে গেছে এ নদীর সাথে মিলিত প্রায় ২০টি খাল। আন্ধারমানিক নদীর প্রবাহ কমে যাওয়ায় কলাপাড়া শহরের মধ্যভাগ দিয়ে প্রবাহিত চিংগড়িয়া খালটির অস্তিত্ব আজ বিপন্ন প্রায়। এ কারণেই এখন সামান্য বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয় কলাপাড়া পৌরশহরে। খাল নদী ভরাটের কারণে কৃষি ভাণ্ডার খ্যাত নীলগঞ্জ, চাকামইয়া, টিয়াখালী, লালুয়া, মিঠাগঞ্জ, ধানখালী ইউনিয়নসহ তালতলী উপজেলার চাউলাপাড়া, বড়বগী, কড়ইবাড়িয়া, ইউনিয়নের কৃষি উৎপাদনে ও বিপর্যয় নেমে এসেছে। এ ছাড়া কচুপাত্রা নদীর প্রবেশ মুখে দেয়া হয়েছে বাঁধ। যার ফলে কৃষি জমিতে পড়েছে এর ক্ষকিকর প্রভাব। আরপাঙ্গাশিয়ার সংযোগস্থলটিও আজ ভরাট প্রায়। পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় ভরাট হয়ে গেছে দোন নদীর প্রায় ২৫ কিলোমিটার।
সরেজমিনে দেখা গেছে, আন্ধারমানিক নদীর শেখ কামাল সেতু সংলগ্ন এলাকার স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, আন্ধারমানিক নদী কোনো খনন না করায় আন্ধারমানিক নদীর তল দেশে পলি জমে নাব্যতা হারিয়ে এক কালের উত্তাল নদী ছন্দ হারিয়ে মরাখালে পরিণত হয়েছে। এতে বিলুপ্তি হয়ে যাচ্ছে জীববৈচিত্র্য ও মৎস্যসম্পদ। হাজার হাজার জেলে পূর্ব পুরুষের পেশা ছেড়ে বেকাত্ব গোছাতে বেছে নিয়েছেন অন্য পেশা। মৎস্য অধিদফতর এই নদীতে অবৈধ জাল দিয়ে মৎস্যসম্পদ নিধন বন্ধে সচেষ্ট রয়েছে। এ ছাড়া নভেম্বর থেকে জানুয়ারি এই তিন মাস এ নদীতে সব ধরনের মাছ শিকার বন্ধ থাকে। নদী ভরাট হলেও প্রাকৃতিক কারণে প্রজনন কালে ডিম দেয়ার জন্য গভীর সমুদ্র থেকে আন্ধারমানিক নদীতে ছুটে আসে মা ইলিশ। ইলিশের বংশ বৃদ্ধির লক্ষ্যে আন্ধারমানিকে অভয়াশ্রয় ঘোষণা করে সরকার। একটি প্রভাবশালী মহল ফ্রি-স্টাইলে গিলে খাচ্ছে আন্ধারমানিকের তীরসহ নদী। প্রতিদিন তোলা স্থাপনার সংখ্যা বাড়ছে। পৌরসভা কর্তৃপক্ষ শহরের ময়লা-আবর্জনা ফেলছে আন্ধারমানিকের লঞ্চঘাট এলাকায়। ফলে দূষণের কবলে পড়ে বিপর্যয় নেমে আসছে। তা ছাড়া কলাপাড়া পৌরসভার পানি এ আন্ধারমানিক নদী দিয়ে নিষ্কাশন হয়। যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। সবচেয়ে বেশি স্থাপনা তোলা হয়েছে কলাপাড়া পৌরশহর এলাকায়। বহুতলসহ পাকা-আধাপাকা টিনশেড স্থাপনা তোলা হচ্ছে আন্ধারমানিকের প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকায়। অধিকাংশ আন্ধারমানিকের উত্তর পাড়ে। দেখা গেছে, নাচনাপাড়া ফেরিঘাট থেকে ফিশারি পর্যন্ত এলাকায় আন্ধারমানিক নদী তীরসহ দখল করে তোলা হচ্ছে স্থাপনা। নীলগঞ্জ, চাকামইয়া, তালতলীর চাউলাপাড়া, কড়ইবাড়িয়া ইউনিয়নের প্রায় ২০ হাজার একর জমি চাষাবাদে ভয়াবহ সমস্যার আশঙ্কা করছেন কৃষক। জলবায়ুর দ্রুত পরিবর্তনজনিত কারণে উপকূলীয় কলাপাড়ার প্রধান এই নদীটি এখন নৌ-চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া মাঝখানে বহু পয়েন্টে জেগে উঠেছে চর।
কলাপাড়ায় প্রবীণ সাংবাদিক বশির উদ্দিন বিশ্বাস আক্ষেপ করে বলেন, উত্তাল আন্ধারমানিক নদী আজ স্মৃতির গহিনে হারিয়ে যাচ্ছে। ভয়াবহ নাব্যতা সঙ্কটে আন্ধারমানিক নদীর অববাহিকায় পরিবেশ বিপর্যয় দেখা দেয়াসহ কৃষি আবাদে নেমে এসেছে স্থবিরতা। তাই দুই পাড়ের মানুষের প্রাণের দাবি অতি দ্রুত নদী ড্রেজিং করে পানিপ্রবাহ আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হোক। তিনি আরো বলেন, আন্ধারমানিক নদী আমাদের এখানকার ঐতিহ্য। এটি রক্ষা করা জরুরি। নদীটি রক্ষার পাশাপাশি নদীর চর পড়ে ভরাট অংশ যাতে কেউ দখল করতে না পারে সেজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার যৌক্তিকতা তুলে ধরেন।
কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানভীর রহমান জানান, আমি আসার পর কিছু নদীর পারে অবৈধ আরসিসি পিলার করে ভবনের কাজ বন্ধ করে দিয়েছি। কিন্তু তারপরও কিছু লোক ভবন তুলছে। আমি নিজে দুইজনকে দুই বছরের জেল দিয়েছি। আন্ধারমানিক নদীর পাড়ে যেসব অবৈধ স্থাপনা আছে ডিসি স্যারে ম্যাজিস্ট্রেট পাঠিয়ে যেকোনো সময় ভেঙে দিতে পারেন। নদী সঙ্কোচিত হয়ে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত না হয় তার ব্যবস্থা করা হবে।
পটুয়াখালী জেলা প্রশাসক মতিউল ইসলাম চৌধুরী জানান, অনেক জায়গায় খালÑ নদী খনন শুরু করে দিয়েছে সরকার। আর কেউ যদি অবৈধভাবে খাল দখল করে তা উদ্ধার করা হবে এবং তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। নেদারল্যান্ড ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ নামে অবৈধ খাল-নদী উচ্ছেদ একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে।

 


আরো সংবাদ

সকল




gebze evden eve nakliyat instagram takipçi hilesi