Naya Diganta

উত্তর-দক্ষিণ মহাসড়ক পদ্মার ভাঙনের মুখে

কুষ্টিয়ায় পদ্মার নদীর তীব্র ভাঙনের মুখে পড়েছে উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের মধ্যে যোগাযোগের একমাত্র মহাসড়ক। জেলার মিরপুর উপজেলার তালবাড়িয়া এলাকায় ভাঙতে ভাঙতে জনগুরুত্বপূর্ণ এ মহাসড়কের মাত্র ৮০ মিটারের মধ্যে চলে এসেছে এ নদী। জরুরি ভিত্তিতে নদীভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
এ দিকে ভাঙন প্রতিরোধে স্থানীয়ভাবে ব্যবস্থা নিতে গত বছর পানি উন্নয়ন বোর্ড ৯৯০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করে সংশ্লিষ্ট দফতরে পাঠালেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তা আটকে আছে।
গতকাল সোমবার সকালে এলাকা ঘুরে দেখা গেছে মহাসড়কের একেবারেই কাছে নদীভাঙন চলে এসেছে; যেকোনো মুহূর্তে মহাসড়কের বড় একটি অংশ নদীতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী। তারা জানান, গত দুই সপ্তাহের ব্যবধানে মিরপুর উপজেলার তালবাড়িয়া, বহলবাড়িয়া ও বারুইপাড়া ইউনিয়নের বেশ কিছু এলাকার বাড়িঘর ও আবাদি জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এতে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে কুষ্টিয়া-পাবনা-রাজশাহী-ঢাকা মহাসড়ক। এ মহাসড়ক থেকে এখন নদীর বর্তমান দূরত্ব মাত্র ৮০ মিটার। দ্রুত ভাঙন ঠেকাতে ব্যবস্থা না নেয়া হলে যেকোনো সময় ভেঙে যেতে পারে এ সড়ক।
এ দিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড ভাঙনরোধে হাজার হাজার বস্তা বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলেও কোনোভাবেই ভাঙনরোধ সম্ভব হচ্ছে না বলে এলাকাবাসী জানান। তালবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যান হান্নান মণ্ডল জানান, নদীর অপর প্রান্তে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের পর থেকে পাকশী আণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তার জন্য গাইড বাঁধ দেয়ায় সেখানকার পানি ধাক্কা খেয়ে আমার তালবাড়িয়া ইউনিয়নের পদ্মা নদীর কূলবর্তী এলাকায় প্রচণ্ডভাবে আঘাত হানায় এই ভয়াবহ ভাঙনের সৃষ্টি। গত কয়েক বছর এই সময়ে নদীভাঙন হলেও এবারকার ভাঙন খুবই বেশি ও ভয়াবহ। অল্প সময়ের ব্যবধানে বহুদূর ভেঙে এরই মধ্যে নদীতে চলে গেছে। তিনি জানান, তালবাড়িয়া ইউনিয়নের ফসলি জমি এই পদ্মার ভাঙনে শেষ; এখন শুধু কিছু বাড়িঘর রয়েছে, যা ভাঙনের কবলে অচিরেই পড়বে। তিনি আরো জানান, ভাঙন ঠেকানো না গেলে যেকোনো সময় মহাসড়কটি নদীতে বিলীন হয়ে যাবে। এতে উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। পাশাপাশি কুষ্টিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা বন্যাকবলিত হবে। তিনি অবিলম্বে ভাঙন প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানান।
পদ্মা নদীর তালবাড়িয়া পয়েন্টে ভাঙন নতুন না হলেও এবারের মতো ভাঙন আগে দেখেননি বলে স্থানীয়রা। গত ১৫ বছরে তালবাড়িয়া ও বহলবাড়িয়া ইউনিয়নের ছয়টি গ্রামের প্রায় ছয় হাজার থেকে সাত হাজার ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এবারের ভাঙনে তালবাড়িয়া ইউনিয়নের ঘোড়ামারা ও রানাখড়িয়া গ্রামের বেশ কিছু বাড়ি ও বিস্তীর্ণ আবাদি জমি নদীতে চলে গেছে। এ ছাড়া ভাঙনের মুখে পড়েছে তিনটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তালবাড়িয়া পয়েন্টের বিপরীতে নদীর উত্তর পাড়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য ৩০০ মিটার নদী ভরাট করে বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। এ কারণে নদীর দক্ষিণ পাড়ে ভাঙন এমন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে বলে ধারণা স্থানীয় লোকজন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের।
পদ্মা পাড়ে ভাঙন দেখতে আসছে আশপাশের মানুষজন। দর্শনার্থীদের চোখের সামনেই নদী ভাঙছে আর তাদের মনে আতঙ্ক বিরাজ করছে। ৭০ বছর বয়সী চাঁদ আলীর পাশের গ্রামেই বাড়ি। প্রতিদিন বিকেলে সব কাজ শেষে নদীর পাড়ে মুখে হাত দিয়ে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন আর পুরনো স্মৃতি তার মনে ভেসে আসে। তিনি জানান, এই পদ্মার পাড় ছিল বহু দূরে। এখানে বহু বাড়িঘর ও ফসলি জমি ছিল, কিন্তু কালের আবর্তে সব কিছুই এখন যেন স্মৃতি। তিনি জানান, পানি কমছে আর নদীর ভাঙন বাড়ছে। মহাসড়কের কাছেই চলে এসেছে। জানি না এর ভবিষ্যৎ কী।
এরই মধ্যে মিরপুর উপজেলা চেয়ারম্যান কামারুল আরেফিন সংবাদ সম্মেলন করে নদীভাঙন রোধে সরকারের জরুরি পদক্ষেপ চেয়েছেন। তিনি জানান, এখনই ভাঙন ঠেকাতে না পারলে যেকোনো সময় ভেঙে যেতে পারে মহাসড়ক। এতে প্লাবিত হতে পারে কুষ্টিয়া জেলাসহ খুলনা বিভাগের বিস্তীর্ণ জনপদ। তিনি আরো জানান, ভাঙন ঠেকাতে প্রায় সাত কিলোমিটার স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের জন্য এক বছর আগে একটি প্রকল্প প্রস্তুত করে সংশ্লিষ্ট দফতরে পাঠানো হলেও সাড়া মেলেনি। দ্রুত স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করে এ অঞ্চলের ভিটেমাটিহারা মানুষের পাশে সরকারকে দাঁড়ানোর দাবি জানান তিনি। পানি উন্নয়ন বোর্ড কুষ্টিয়ার নির্বাহী প্রকৌশলী আফসার উদ্দিন জানান, নদীর উত্তর পাড়ে অবকাঠামো নির্মাণের ফলেই এমন ভয়াবহ ভাঙন বলে মনে করা হচ্ছে। ভাঙন ঠেকাতে পদক্ষেপ নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। তবে আশ্বাস নয়, নদীভাঙন ঠেকাতে অবিলম্বে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি স্থানীয় মানুষ ও জনপ্রতিনিধিদের।