Naya Diganta

শিশুদের অপরাধ যতই গুরুতর হোক ১০ বছরের বেশি সাজা দেয়া যাবে না

শিশুদের অপরাধ যতই গুরুতর হোক না কেন, তাদের ১০ বছরের বেশি সাজা দেয়া যাবে না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। রায়ে বলা হয়েছে, আইনের সাথে সঙ্ঘাতে জড়িত শিশুর বিচারের এখতিয়ার শিশু আদালতের। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল কোনোভাবে শিশু আদালতের এখতিয়ার প্রয়োগ করতে পারে না। অভিযুক্ত শিশুটির অপরাধ যাই হোক না কেন তাকে ১০ বছরের বেশি সাজা দেয়া যাবে না। আর আইনের সঙ্ঘাতে আসা শিশুর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীর সাক্ষ্যমূল্য নেই। তাই এই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীকে সাজা দেয়ার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। বিচারপতি মো: শওকত হোসেন, বিচারপতি মো: রুহুল কুদ্দস ও বিচারপতি এ এস এম আবদুল মোবিনের হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চের দেয়া এ রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। ২০১৯ সালের ২৮ আগস্ট হাইকোর্ট এ রায় দেন। মো: আনিস মিয়া বনাম রাষ্ট্র নামের এ মামলায় আইনজীবী ছিলেন এস এম শাহজাহান ও আবু হানিফ।
এ মামলায় অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে আদালতে মতামত দিয়েছেন প্রবীণ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন, সিনিয়র আইনজীবী এম আই ফারুকী ও আইনজীবী শাহদীন মালিক।
হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়েছে, শিশুর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী গ্রহণ কিশোর বিচারব্যবস্থার ধারণার পরিপন্থী। নিউরোসায়েন্স এবং সাইকোলজিকাল গবেষণা অনুযায়ী শিশুরা তাদের কর্মের পরিণতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল নয়। তারা আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। বস্তুত, মস্তিষ্কের (ব্রেইন) যে অংশ আবেগ ও যৌক্তিকতা নিয়ন্ত্রণ করে, শিশু অবস্থায় মস্তিষ্কের সে অংশ পরিপক্ক হয় না। শিশুরা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীর পরিণতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখে না। অনেক ক্ষেত্রে তারা অপরাধের দোষ নিজের ঘাড়ে চাপিয়ে নেয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিছু সুবিধা পাওয়ার প্রলোভনে শিশুরা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিতে রাজি হয়ে যায়।
হাইকোর্ট বেঞ্চ তাদের রায়ে মানবাধিকার সংগঠন ব্লাস্টের একটি মামলার রায় পর্যালোচনাসহ বাংলাদেশ, ভারত, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ আদালতের নজিরগুলো উল্লেখ করেছেন। পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের লিখিত আর্টিকেল, বই, সায়েন্টিফিক রিসার্চের ফলাফল নিয়েও আলোচনা করে নিম্নোক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। সিদ্ধান্তগুলো হলো: শিশুর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীর কোনো সাক্ষ্যগত মূল্য নেই। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী কোনো শিশুকে সাজা দেয়ার ক্ষেত্রে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। অপরাধ যা-ই হোক না কেন, একজন শিশুকে ১০ বছরের বেশি সাজা প্রদান করা যাবে না।
উল্লেখ্য, শিশুর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী গ্রহণ সংক্রান্ত বিষয়ে দেশের ফৌজদারি কার্যবিধিতে সুনির্দিষ্ট কোনো বিধান নেই। শিশুদের শারীরিক ও মানসিক গঠন বিবেচনায় ১৯৭৪ সালের শিশু আইন অনুযায়ী বিচারকার্য পরিচালিত হয়ে আসছে। ২০১৩ সালে নতুন শিশু আইন প্রণয়ন করা হয়। এই আইনে শিশুর বয়স, জবানবন্দী গ্রহণ, দণ্ড ও শিশু শোধনাগারসহ বিশেষ বিশেষ বিধান রাখা হয়। এ বিষয়ে দেশের উচ্চ আদালতের পক্ষে-বিপক্ষে রায় ছিল। সে কারণে হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চ গঠনের জন্য প্রধান বিচারপতির বরাবর একটি আবেদন পাঠানো হয়েছিল। ওই আবেদনের ধারাবাহিকতায় বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় প্রধান বিচারপতি হাইকোর্টে তিন সদস্যবিশিষ্ট ফুলবেঞ্চ গঠন করে দেন।