Naya Diganta

অর্থনীতির পশ্চিমা মডেল কেন এ দেশে ব্যর্থ হবে?

আমাদের সমাজ একান্তভাবেই একটি ট্রাডিশনাল সোসাইটি বা সনাতন সমাজ। মানব সমাজ বা অর্থনৈতিক সমাজকে চারটি ভাগে ভাগ করা যায় : সনাতন, মুক্তবাজার, নিয়ন্ত্রিত (command) ও ইসলামিক। প্রত্যেক সমাজের নির্দিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। বাংলাদেশে সনাতন সমাজের প্রভাব বেশি। এখানে সমাজের ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে পরিবার। কিন্তু আমাদের অর্থনৈতিক চিন্তাধারা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে প্রাধান্য পাচ্ছে ব্যক্তি। আর ব্যক্তির উত্থানে পরিবার ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। আমাদের পরিবারগুলো সনাতন ধরনের। যে বিয়ের মাধ্যমে মুসলিম পরিবার গঠিত হয়, তার ভিত্তি হলো একটি চুক্তি (agreement)। কিন্তু হিন্দু সম্প্রদায়ের বিয়ে হলো ধর্মীয় সংস্কার বা গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি (sacrament)। তবে হিন্দু মুসলিম, দুই সমাজেরই মৌলিক একক (নধংরপ ঁহরঃ) হলো, পরিবার। আমাদের সংস্কৃতিতেও এই পরিবার প্রভাব বিস্তার করে আছে। বাংলাদেশের সমাজে বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান বা আরো যেসব সম্প্রদায় রয়েছে তাদেরও মৌলিক ভিত্তি হলো পরিবার। অন্য কথায় বলা যায়, পরিবার হলো আমাদের সমাজের মৌলিক চালিকাশক্তি।

কিন্তু আমাদের অর্থনীতি এই সমাজের মৌলিক ভিত্তিকে অনুসরণ করে চলছে না। আমাদের অর্থনীতি চলছে পাশ্চাত্যের চিন্তাধারায় বা বিদেশী ধাঁচে। এটাকে কথিত মুক্তবাজার অর্থনীতি বলা হচ্ছে। পশ্চিমা অর্থনীতি ব্যক্তিকেন্দ্রিক। ফলে পশ্চিমা অর্থনীতির যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে আমাদের পরিবারগুলো ভেঙে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে পরিবার ক্রমেই ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হয়ে নিউক্লিয়ার ফ্যামিলিতে পরিণত হয়েছে, তাও আবার বিকৃত রূপে। মানুষ সাধারণত ‘সফলতা’কে অনুসরণ করে। দুঃখের বিষয়, বাংলাদেশে আমরা একটি পতনোন্মুখ সভ্যতা ও পতনোন্মুখ অর্থনীতিকে অনুসরণ করছি। যুক্তরাষ্ট্রের কথাই ধরা যাক, এটি দেউলিয়া ধরনের একটি রাষ্ট্র। অনেকেই মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রে যেতে পারলে ‘স্বর্গরাজ্য’ হাতে পাওয়া হবে। কিন্তু তারা জানেন না যে, গত পাঁচ বছরে পাঁচ থেকে ১০ হাজার আমেরিকান তাদের নাগরিকত্ব প্রত্যাখ্যান করেছেন। তারা আর আমেরিকার নাগরিক থাকতে চান না।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ে যারা পড়াশোনা করেছেন তারা জানেন, এর মূল নীতি হলো- ডকট্রিন অব কম্পারেটিভ কস্ট বা তুলনামূলক মূল্য তত্ত্ব। সহজ কথায় বলা যায়, কেউ যদি সস্তায় জিনিস তৈরি করে আর আমি তা করতে না পারি, তাহলে প্রথম জনের কাছ থেকে জিনিসটি কিনব, চীনের জিনিস এখানে বেশি আসার কারণ এটাই- চীনের তৈরি করা জিনিস সস্তা, তাই। অনেকেই হয়তো জানেন না, মাত্র ৫০-৬০ বছর আগেও আমেরিকার জিডিপিতে প্রায় ৭০ শতাংশ আয় হতো বাণিজ্য থেকে। এখন তা মাত্র ১০ শতাংশে নেমে এসেছে। তারা অস্ত্রশস্ত্র ছাড়া বাকি সব জিনিসের ক্ষেত্রেই ‘তুলনামূলক মূল্য সুবিধা’ হারিয়ে ফেলেছেন। আর সে কারণে তাদের যুদ্ধ বাধাতে হবে। তারা এখন যুদ্ধ তৈরি (manufacture) করবেন। টিকে থাকতে হলে যুদ্ধ বাধানো ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় নেই। অন্য দিকে, যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যা কমছেই। যুদ্ধ ছাড়া তো তারা অস্ত্রশস্ত্র বিক্রি করতে পারবেন না।

যুক্তরাষ্ট্রের সরকার ব্যবস্থা ঋণভারে কত বেশি জর্জরিত তা হয়তো অনেকেই জানেন না। কারণে ও অকারণে কর এবং সরকারের ওপর কতটা দায়ভার, তা অনেকেরই জানা নেই। সে কারণে মার্কিন সমাজব্যবস্থা এখন এক ধরনের মাফিয়াচক্রের হাতে আটকা পড়েছে। আমেরিকায় সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট বা কেন্দ্রীয় সরকার এক অর্থে নেই। ফেডারেল রিজার্ভ নামে তাদের অর্থব্যবস্থার কথা শুনলে মনে হবে, এটা কোনো কেন্দ্রীয় সরকারি ব্যবস্থা। তা কিন্তু নয়। এটা আসলে একটি ‘মাফিয়া ব্যবস্থা’। সবার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই এ কথা বলছি। তারা অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছেন ডলার নামক কাগজ ছাপানোর মাধ্যমে। এর কোনো স্বকীয় মূল্য (রহঃৎরহংরপ াধষঁব) নেই। ডলারের ৭৫ শতাংশই হলো ধার করা টাকা। তাই আমি স্পষ্টভাবেই বলছি, এই ব্যর্থ অর্থনৈতিক দর্শন নিয়ে চললে বাংলাদেশের অধঃপতন ছাড়া কোনো গতি নেই। তাই আমাদের নিজস্ব গতিতে নিজস্ব অর্থনীতির বিকাশ ঘটাতে হবে।

আমাদের এখানে অর্থনীতির যেসব বই পড়ানো হয়, সেগুলো ইউরোপ-আমেরিকা থেকে ধার করা। এসব পুস্তক নিজেও পড়েছি, পড়িয়েছি। তাই বুঝেছি, তাদের অর্থনীতি আমাদের কল্যাণ করতে পারবে না। কারণ তাদের অর্থনীতি আত্মস্বার্থের চিন্তা করে, আত্মস্বার্থ এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা চালায়। তারা যেন ‘বাবা-মায়ের হাড়’ দিয়েও ব্যবসা করতে চায়। আমেরিকাতে মারা যাওয়াও বেশ গুরুতর ব্যাপার। সেখানে কেউ মারা গেলে তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পেছনে বেশ কয়েক হাজার ডলার ব্যয় করতে হয়। আর এই খরচটি জিএনপি হিসাবে চলে আসে। আমাদের সমাজে কিন্তু বিষয়টি সেরকম নয়। এখানে কেউ মারা গেলে দেখা যাবে, প্রতিবেশীরা তার দাফন-কাফনের ভার নেন। মৃত ব্যক্তির পরিবারের তেমন কোনো আর্থিক ব্যয় ছাড়াই দাফনের কাজ হয়ে যায়। বড়জোর একটি দোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। আমাদের জিএনপির হিসাবে এটা আসে না। এমন আরো অনেক কিছুই আমাদের জিএনপির হিসাবে আসে না। আমাদের মেয়েরা বাড়িতে কত কাজ করেন। কিন্তু তাদের শ্রমের কোনো হিসাব করা হচ্ছে না। আমাদের বহু বেকার ভাইবোন রয়েছে, তাদের আমরা সুরক্ষা দিয়ে রাখছি। সেগুলোরও কোনো হিসাব নেই।

এখানে এমন আরো অনেক বিষয় আছে যা ‘বাজার অর্থনীতি’র তত্ত্বের সাথে মেলে না। আমাদের সমাজে অতিথিদের সমাদর করা হয়, আপ্যায়ন করা হয়। কিন্তু এর জন্য কোনো বিনিময় নেয়া হয় না। এ দেশের গ্রামে অপরিচিত কারো বাড়িতে গেলেও গাছ থেকে ডাব পেড়ে খাওয়ানো হয়। গ্রামের মানুষ হয়তো দল বেঁধে কারো জমির ফসল তুলে দিচ্ছে। এরকম আরো অনেক উপায়ে পরস্পরকে সাহায্য করছে। এই যে শ্রমদান বা আরো অনেক কিছু, সেগুলোর তো আর্থিক মূল্য রয়েছে। অথচ এই মূল্য আর্থিক হিসাবে আসছে না। এসব হিসাব জিএনপিতে যুক্ত হলে মুসলিম বিশ্ব পশ্চিমাদের চেয়ে অনেক সমৃদ্ধ হতে পারত। এ বিষয়গুলো আমাদের অর্থনৈতিক পরিকল্পনাবিদদের অনুধাবন করতে হবে।

আগেই বলেছি, বাংলাদেশ একটি সনাতন অর্থনীতির দেশ। আবার এই সনাতন অর্থনীতি ইসলামী কৃষ্টির সাথে যুক্ত হলেও ওই কৃষ্টিকে আর্থিককরণের কোনো চেষ্টা করা হয়নি। আমাদের অর্থনীতিবিদদের প্রায় সবাই পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত। নিজস্ব সমাজের অর্থনীতি সম্পর্কে তাদের ধ্যান-ধারণা খুব কম। যারা বিদেশ থেকে পড়াশোনা করে আসেন, তাদের পাঠ্যতালিকায় বাংলাদেশের মতো সনাতন সমাজের অর্থনীতি সম্পর্কে কিছুই নেই। আমাদের কৃতিত্বগুলো কখনো কৃষ্টির সাথে যুক্ত হয়নি এবং সামাজিক মূল্যবোধের সাথে অর্থনৈতিক নীতির কোনো সম্পর্ক নেই। তাই আমাদের সমাজকে পরিবর্তন করতে হলে, আমরা যেভাবে স্থূল জাতীয় আয়- জিএনপি হিসাব করছি এবং যার ভিত্তিতে বাজেট প্রণয়ন করা হচ্ছে, সেটাই পরিবর্তন করতে হবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- ‘উন্নয়ন মডেল’ পশ্চিমাদের কাছ থেকে ধার করার কারণে আমাদের অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় ইসলামের স্বেচ্ছামূলক খাতগুলোকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে। এসব খাতকে আর্থিককরণের চিন্তা করা হলে, তা হবে অতীত থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসা। জাকাত, হজ, মসজিদ, ওয়াক্ফ- এসব প্রতিষ্ঠান মুসলিমসমাজের পুনর্গঠনে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে। অথচ এ দেশের ৯০ শতাংশ মানুষ মুসলমান হওয়ার পরও এসব প্রতিষ্ঠানকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়নি। ফলে নিজস্ব খাতগুলোর সম্ভাবনাকে আমরা কাজে লাগাতে পরিনি। সামাজিক সঞ্চয় ও সামাজিক পুঁজি গঠনের জন্য এসব সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হবে। এগুলো হলো চিরস্থায়ী সামাজিক পুঁজি।

এ দেশের সমাজ, মাটি ও মানুষকে ভালোভাবে উপলব্ধি করে এর ভিত্তিতে একটি নতুন অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা স্বনির্ভরতা অর্জনের জন্যই প্রয়োজন। উন্নয়নকে করতে হবে সংস্কৃতিমুখী। উন্নয়ন হতে হবে সুনির্দিষ্ট পর্যায়ে, যাতে তা মাটি ও মানুষের জীবনাচরণ, প্রকৃতি ও স্বভাবের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। তাই অর্থমন্ত্রীকে বলব, আপনি বাংলাদেশের মতো করে জিএনপি হিসাব করুন। পরিবারকে রক্ষা করুন। ব্যক্তি নয়, পরিবারকে ক্ষমতায়ন করুন। মজার বিষয় হলো- পরিবারকে ক্ষমতায়ন করা মানে, আমরা বুঝেছি নারীকে ক্ষমতায়ন করা। নারীকে ক্ষমতায়ন করতে গিয়ে আমরা নৈতিক মূল্যবোধের দিকে নজর দেইনি। এতে আমাদের নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় হয়েছে।

তাই আমাদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শুধু মেরামত করা নয়, এগুলোকে পুরোপুরি বদলে দিতে বিকল্প চিন্তাধারা গ্রহণ করতে হবে। আমাদের সমাজ ও অর্থনীতিতে যে পরিবর্তন ঘটছে, তা হলো প্রান্তিক পরিবর্তন। কিন্তু এই প্রান্তিক পরিবর্তন দিয়ে এ দেশের জনগণের ভাগ্য বদলানো সম্ভব নয়। জাতির ভাগ্য বদলাতে চাইলে চিন্তাধারায়ই আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। যেমন বিদেশী সাহায্য ছাড়া চলার চিন্তা একটি বৈপ্লবিক চিন্তা বৈকি। কিন্তু তা করতে গেলে নিজস্ব সম্পদ সমাবেশের প্রয়োজন। তার জন্য চাই নতুন অর্থনৈতিক মডেল। সেই মডেল উদ্ভাবনই প্রকৃত কাঠামোগত পরিবর্তন। আর সেটা করতে পারলে আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতিহাসে নিজের স্থান করে নিতে পারবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি।

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড;

সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ, ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক, জেদ্দা
[email protected]