Naya Diganta

সৎ কাজ ও অসৎ কাজ সমান নয়

আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আচ্ছা তোমার রবের পক্ষ থেকে তোমার ওপর যে কিতাব নাজিল হয়েছে, তাকে যে ব্যক্তি সত্য মনে করে আর যে ব্যক্তি এ সত্যটির ব্যাপারে অন্ধ, তারা দু’জন সমান হবে, এটা কেমন করে সম্ভব? উপদেশ তো শুধু বিবেকবান লোকেরাই গ্রহণ করে। আর তাদের কর্মপদ্ধতি এমন হয় যে, তারা আল্লাহকে প্রদত্ত নিজেদের অঙ্গীকার পালন করে এবং তাকে মজবুত করে বাঁধার পর ভেঙে ফেলে না। তাদের নীতি হয়, আল্লাহ যেসব সম্পর্ক ও বন্ধন অক্ষুণœ রাখার হুকুম দিয়েছেন, সেগুলো তারা অক্ষুণœ রাখে, নিজেদের রবকে ভয় করে এবং তাদের থেকে কড়া হিসাব না নেয়া হয় এই ভয়ে সন্ত্রস্ত থাকে। তাদের অবস্থা হয় এই যে, নিজেদের রবের সন্তুষ্টির জন্য তারা সবর করে, নামাজ কায়েম করে, আমার দেয়া রিজিক থেকে প্রকাশ্যে ও গোপনে খরচ করে এবং ভালো দিয়ে মন্দ দূরীভূত করে। আখেরাতের গৃহ হচ্ছে তাদের জন্যই।’ (সূরা আর রাদ : ১৯-২২)
আল্লাহ তায়ালা অন্যত্র বলেন, ‘হে নবী সৎ কাজ ও অসৎ কাজ সমান নয়। তুমি অসৎ কাজকে সেই নেকি দ্বারা নিবৃত্ত করো যা সবচেয়ে ভালো। তা হলে দেখবে যার সাথে তোমার শত্রুতা ছিল, সে অন্তরঙ্গ বন্ধু হয়ে গেছে।’ (সূরা হা-মিম আস সেজদা : ৩৪)
উল্লিখিত আয়াতে বিবেকবান মুমিনের কর্মপদ্ধতি, নীতি ও বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়েছেÑ
কর্মপদ্ধতি হলো : ‘তারা আল্লাহকে প্রদত্ত নিজেদের অঙ্গীকার পালন করে এবং তাকে মজবুত করে বাঁধার পর ভেঙে ফেলে না।’ এটি হচ্ছে অনন্তকালীন অঙ্গীকার যা সৃষ্টির শুরুতেই আল্লাহ সব মানুষের কাছ থেকে নিয়েছিলেন। তিনি অঙ্গীকার নিয়েছিলেন, মানুষ একমাত্র তাঁর বন্দেগি করবে। সূরা আরাফের ১৭২ নম্বর আয়াতে আরো স্পষ্ট আকারে বলা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘আর হে নবী! লোকদের স্মরণ করিয়ে দাও সেই সময়ের কথা, যখন তোমাদের রব বনি আদমের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাদের বংশধরদের বের করেছিলেন এবং তাদেরকে তাদের নিজেদের ওপর সাক্ষী বানিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেনÑ ‘আমি কি তোমাদের রব নই? তারা বলেছিল, নিশ্চয়ই তুমি আমাদের রব, আমরা এর সাক্ষ্য দিচ্ছি। এটা আমি এ জন্য করেছিলাম; যাতে কিয়ামতের দিন তোমরা না বলে বসো, আমরা এ কথা তো জানতাম না।’ প্রত্যেকটি মানুষের কাছ থেকে নেয়া এ অঙ্গীকার তার প্রকৃতির মধ্যে মিশে আছে। মায়ের গর্ভ থেকে মৃত্যু অবধি অর্থাৎ আল্লাহর সৃষ্টি কর্মের মাধ্যমে মানুষের অস্তিত্ব লাভ এবং তাঁর প্রতিপালন কর্মকাণ্ডের আওতাধীনে সে প্রতিপালিত হতে থাকে তখই এটি পাকাপোক্ত হয়ে যায়। আল্লাহর রিজিকের সাহায্যে জীবন যাপন করা, তাঁর সৃষ্ট প্রত্যেকটি বস্তুকে কাজে লাগানো এবং তাঁর দেয়া শক্তিগুলো ব্যবহার করাÑ এগুলো মানুষকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে একটি বন্দেগির অঙ্গীকারে বেঁধে ফেলে। কোনো সচেতন, বিবেকবান ও বিশ্বস্ত মানুষ এ অঙ্গীকার ভেঙে ফেলার সাহস করতে পারে না।
নীতি হলো : ‘তাদের নীতি হয়, আল্লাহ যেসব সম্পর্ক ও বন্ধন অক্ষুণœ রাখার হুকুম দিয়েছেন, সেগুলো তারা অক্ষুণœ রাখে, নিজেদের রবকে ভয় করে এবং তাদের থেকে কড়া হিসাব না নেয়া হয় এই ভয়ে সন্ত্রস্ত থাকে।’ এমন সব সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক যেগুলো প্রতিষ্ঠিত হলেই মানুষের সামগ্রিক কল্যাণ ও সাফল্য নিশ্চিত হয়। বিশ্ব মুসলিমদের মাঝে অশান্তির প্রধান কারণ হলো, তারা আজ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শতধাবিভক্ত হয়ে গেছে। হোক তাদের ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক বা হোক তা ধর্মীয়। আল্লাহর ভয় ও আখেরাতের কড়ায়গণ্ডায় হিসাব দিতে হবে সে ভয়ও তাদেরকে বিচলিত করে না। অথচ স্বয়ং আল্লাহর রাসূল সা: এ হিসাবের ভয়েও বিচলিত হতেন। তিনি হজরত আয়েশা রা:কে নামাজে এ দোয়া করতে শিখিয়েছেন ‘আল্লাহুম্মা হাসিবনি হিসাবাই ইয়াসিরা’ হে আল্লাহ! আমার হিসাব নিও সহজ করে।
কার্যক্রম বা বৈশিষ্ট্য হলো : ‘তাদের অবস্থা হয় এই যে, নিজেদের রবের সন্তুষ্টির জন্য তারা সবর করে, নামাজ কায়েম করে, আমার দেয়া রিজিক থেকে প্রকাশ্যে ও গোপনে খরচ করে এবং ভালো দিয়ে মন্দ দূরীভূত করে। আখেরাতের গৃহ হচ্ছে তাদের জন্যই।’ তারা সবর করে মানে নিজেদের প্রবৃত্তি ও আকাক্সক্ষা নিয়ন্ত্রণ করে, অনুভূতি ও ঝোঁক প্রবণতাকে নিয়ম ও সীমার মধ্যে আবদ্ধ রাখে, আল্লাহর নাফরমানিতে বিভিন্ন স্বার্থলাভ ও লোভ-লালসার চরিতার্থ হওয়ার সুযোগ দেখে পা পিছলে যায় না এবং আল্লাহর হুকুম মেনে চলার পথে যেসব ক্ষতি ও কষ্টের আশঙ্কা দেখা দেয়; সেসব বরদাশত করে যেতে থাকে। এ দৃষ্টিতে বিচার করলে মুমিন আসলে পুরোপুরি সবরের জীবন যাপন করে। কারণ সে আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় এবং আখেরাতের স্থায়ী পরিণাম ফলের প্রতি দৃষ্টি রেখে এ দুনিয়ার আত্মসংযম করতে থাকে এবং সবরের সাথে মনের প্রতিটি পাপপ্রবণতার মোকাবেলা করে। নামাজ কায়েম করে। সমাজে পুরোপুরি নামাজ যাতে চালু হয়ে যায় সেই লক্ষ্যে কাজ করে। আর আল্লাহর দেয়া রিজিক থেকে প্রকাশ্যে ও গোপনে খরচ করে। ফরজ খরচ তথা জাকাত এবং অন্যান্য সাদাকা এবং আল্লাহর রাস্তায় দান করে।
তারা মন্দের মোকাবেলায় একই মন্দ বা অন্য কোনো মন্দ কাজ দিয়ে করে না, বরং মন্দের, মোকাবেলায় ভালো কোনো কাজের মাধ্যমে করে। অন্যায়কে প্রতিহত করার জন্য অন্যায়ের সাহায্য গ্রহণ না করে ন্যায়ের সাহায্য গ্রহণ করে। কেউ তাদের প্রতি যতই জুলুম করুক না কেন, তার জবাবে তারা পাল্টা জুলুম করে না বরং ইনসাফ করে। কেউ তাদের বিরুদ্ধে যতই মিথ্যাচার করুক না কেন, জবাবে তারা পাল্টা সত্যই বলে। কেউ তাদের সাথে যতই বিশ্বাস ভঙ্গ করুক না কেন, জবাবে তারা বিশ্বস্ত আচরণই করে থাকে। রাসূলুল্লাহ সা:-এর নি¤েœাক্ত হাদিসটি এ অর্থই প্রকাশ করেÑ ‘তোমরা নিজেদের কার্যধারাকে অন্যের কর্মধারার অনুসারী করো না। এ কথা বলা ঠিক নয় যে, লোকেরা ভালো করলে আমরা ভালো করব এবং লোকেরা জুলুম করলে আমরাও জুলুম করব। তোমরা নিজেদেরকে একটি নিয়মের অধীন করো। যদি লোকেরা সদাচরণ করে তোমরাও সদাচরণ করো। আর যদি লোকেরা তোমাদের প্রতি অসৎ আচরণ করে, তাহলে তোমরা জুলুম করো না।’
রাসূল সা:-এর আরেকটি হাদিস একই অর্থ প্রকাশ করে। রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, আল্লাহ আমাকে ৯টি কাজের হুকুম দিয়েছেন। এর মধ্যে তিনি এ চারটি কথা বলেছেনÑ কারো প্রতি সন্তুষ্ট বা অসন্তুষ্ট যাই থাকি না কেন, সর্বাবস্থায় আমি যেন ইনসাফের কথা বলি। যে আমার অধিকার হরণ করে, আমি যেন তার অধিকার আদায় করি। যে আমাকে বঞ্চিত করবে, আমি যেন তাকে দান করি। আর যে আমার প্রতি জুলুম করবে, আমি যেন তাকে মাফ করি। একই অর্থ প্রকাশ করে নি¤েœর হাদিসটিও। ‘যে তোমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে, তুমি তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করো না।’ হজরত উমর রা: উক্তিটিও এ অর্থ প্রকাশ করেÑ ‘যে ব্যক্তি তোমার প্রতি আচরণ করার ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করে না, তুমি আল্লাহকে ভয় করে তার প্রতি আচরণ করো।
এ ভাগ্যবান কারা : আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘ধৈর্যশীল ছাড়া এ গুণ আর কারো ভাগ্যে জোটে না এবং অতি ভাগ্যবান ছাড়া এ মর্যাদা আর কেউ লাভ করতে পারে না।’ (সূরা হা-মিম আস সেজদা : ৩৫) অসৎ কর্ম বা দুষ্কর্মকে সৎকর্ম দ্বারা মোকাবেলা করা কোনো ছেলেখেলা নয়। এ জন্য দরকার সাহসী লোকের। এ জন্য দরকার দৃঢ় সঙ্কল্প, সাহস, অপরিসীম সহনশীলতা এবং চরম আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা। কেবল সেই ব্যক্তিই এ কাজ করতে পারে, যে বোঝে শোনে ন্যায় ও সত্যকে সমুন্নত করার জন্য কাজ করার দৃঢ় সঙ্কল্প গ্রহণ করেছে, যে তার প্রবৃত্তিকে সম্পূর্ণরূপে জ্ঞান-বুদ্ধি ও বিচারশক্তির অনুগত করে নিয়েছে এবং যার মধ্যে নেকি ও সততা এমন গভীরভাবে শিকড় গেড়ে বসেছে যে, বিরোধীদের কোনো অপকর্ম ও নোংরামি তাকে তার উচ্চাসন থেকে নামিয়ে আনতে সফল হতে পারে না। অত্যন্ত উঁচু মর্যাদার মানুষই কেবল এসব গুণের অধিকারী হয়ে থাকে। আর যে ব্যক্তি এসব গুণের অধিকারী হয়, দুনিয়ার কোনো শক্তিই তাকে সাফল্যের মনজিলে মকসুদে পৌঁছা থেকে বিরত রাখতে পারে না। নীচু প্রকৃতির মানুষ তাদের হীন চক্রান্ত জঘন্য কৌশল এবং কুৎসিৎ আচরণ দ্বারা তাকে পরাস্ত করবে তা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
পুুরস্কার হলো : এ ব্যক্তিদের সাথে আখেরাতে কী ধরনের আচরণ করা হবে নি¤েœাক্ত আয়াতে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছেÑ ‘আখেরাতের গৃহ হচ্ছে তাদের জন্যই। তারা নিজেরা এতে প্রবেশ করবে এবং তাদের সাথে বাপ-দাদারা ও স্ত্রী-সন্তানদের মধ্য থেকে যারা সৎকর্মশীল হবে তারাও তাদের সাথে সেখানে থাকবে। ফেরেশতারা সবদিক থেকে তাদেরকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য আসবে এবং বলবেÑ ‘তোমাদের প্রতি শান্তি। তোমরা দুনিয়ায় যেভাবে সবর করে এসেছ তার বিনিময়ে তোমরা এর অধিকারী হয়েছে।’ কাজেই কতই চমৎকার এ আখেরাতের গৃহ!’ (সূরা আর রাদ : ২২-২৪) আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন, ‘যারা আত্মসংযমী তাদের বিনা হিসাবেই প্রতিদান দেয়া হবে।’ ওমর রা: বলেন, ‘যখন আমরা আত্মসংযমী ছিলাম, তখনকার জীবনই সুন্দর ছিল।’ (বুখারি কিতাবুর রিকাক)

লেখক : ব্যাংকার