Naya Diganta

হীরার দখল নিতে মরিয়া রাশিয়া!

আফ্রিকায় ৫ হাজার কালাশনিকভ মেশিনগান পাঠাল রাশিয়া

মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্রে অনুসন্ধানী রিপোর্ট করতে গিয়ে নিহত রাশিয়ার তিন সাংবাদিক : ইন্টারনেট -
গত সপ্তাহে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের প্রত্যন্ত এলাকায় দুর্বৃত্তদের হাতে রাশিয়ার তিনজন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। এই ঘটনার পর একটি বিষয় সামনে চলে এসেছে; আর তা হলো, প্রভাব বিস্তার ও বিপুল সম্পদ দখলের লক্ষ্যে আফ্রিকায় তৎপরতা চালাচ্ছে ক্রেমলিন। 

উল্লেখ্য, বিশ্বব্যাংকের মতে, বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র দেশ মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র। এই দেশটিসহ আফ্রিকার সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলে চীন দশকের পর দশক ধরে অবস্থান করছে এবং নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে শত শত কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় করেছে। রাশিয়া এখন চীনের অবস্থান দখল করতে ইচ্ছুক। এই লক্ষ্যে এরই মধ্যে দেশটি কাজ শুরু করেছে।

নিহত তিনজন রুশ সাংবাদিক ওয়াগনার প্রাইভেট মিলিটারি কোম্পানির জন্য অনুসন্ধানী রিপোর্ট তৈরি করতে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে গিয়েছিলেন। ইয়েভগেনি প্রিগোঝিন নামক সেন্ট পিটার্সবার্গের একজন ব্যবসায়ী এই গোপন কর্মকাণ্ডের সাথে সংশ্লিষ্ট বলে বিভিন্ন সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি ইয়োভগেনি প্রিগোঝিনের সাথে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তা ছাড়া ২০১৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপ নিয়ে তদন্তে এর আগে রবার্ট মুলার ১২ জন সন্দেহভাজন রাশিয়ান নাগরিকের নাম উল্লেখ করেছিলেন এবং প্রিগোঝিন তাদের মধ্যে অন্যতম। অন্য দিকে, রাশিয়ান সামরিক প্রতিষ্ঠান ওয়াগনার এর আগে যুদ্ধ করার জন্য পূর্ব ইউক্রেন ও সিরিয়ায় ভাড়াটে সৈন্য পাঠিয়েছিল এবং খুব সম্ভবত তারা এখন মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র ও পার্শ্ববর্তী সুদানেও সক্রিয় রয়েছে।

অবশ্য, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের প্রাকৃতিক সম্পদ খুঁজে বের করতে দেশটির বর্তমান সরকারের সাথে রাশিয়া কাজ করছে বলে গত মার্চ মাসে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরো জানায়, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের সামরিক বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিতে অস্ত্র সরঞ্জামসহ পাঁচজন সামরিক ও ১৭০ জন বেসামরিক প্রশিক্ষক পাঠিয়েছে রাশিয়া। খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী ও মুসলিম গ্রুপগুলোর মধ্যে আফ্রিকার এই দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ চলছে। বর্তমানে এখানে জাতিসঙ্ঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী দায়িত্ব পালন করছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়া সেখানে পাঁচ হাজার ২০০টি কালাশনিকভ মেশিনগানসহ বিপুল অস্ত্রশস্ত্র প্রেরণ করে। যদিও এই অস্ত্রশস্ত্র ‘জাতিসঙ্ঘ সমর্থিত গ্রুপগুলোর’ জন্য পাঠানো হয়েছে বলে রাশিয়ার পক্ষ থেকে উল্লেখ করা হয়।

প্যারিসভিত্তিক অনুসন্ধানী ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘আফ্রিকা ইন্টেলিজেন্স’ গত জুলাই মাসে জানায়, লোবায়ি ইনভেস্ট নামক এক কোম্পানির সহায়তায় মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের রাজধানী বাঙ্গুইয়ের পার্শ্ববর্তী একটি অঞ্চল থেকে হীরক উত্তোলন শুরু করেছে। আফ্রিকা ইন্টেলিজেন্স বলছে, লোবায়ি ইনভেস্ট কোম্পানিটি প্রেসিডেন্ট পুতিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী প্রিগোঝিনের প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি এম ইভেস্টের সহায়ক প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি আরো বলেছে, মুসলিম বিদ্রোহীদের সাথে অস্ত্র বিরতির আলোচনায় প্রসিডেন্ট তৌয়াদেরার রাশিয়ান উপদেষ্টারা যথেষ্ট সহায়তা করছেন বিনিময়ে দেশটির খনিজসম্পদের একটা ভাগ রাশিয়া নিয়ে যাচ্ছে।

রাশিয়ার সামরিক প্রতিষ্ঠান ওয়াগনার সিরিয়াতেও একই কৌশল অবলম্বন করছে বলে জনশ্রুতি রয়েছে। যেখানে প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের সেনাদের ভাড়াটে সৈন্য হিসেবে বাশার আল আসাদ সরকারের অধীনে যুদ্ধ করতে পাঠিয়েছে এবং বিনিময়ে দেশটির বিভিন্ন তেল খনি ও তেল পরিশোধনাগার থেকে আয়ের একটা নিদিষ্ট অংশ লাভ করছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে সিরিয়ায় একটি তেল শোধনাগার দখলের সময় রাশিয়ার সামরিক প্রতিষ্ঠান ওয়াগনাগের ভাড়াটে সৈন্যদের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের সংঘর্ষ বেধে যায় এবং তারা বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হয়।

সিরিয়ার তেলের মতোই মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের হীরকও দেশটিতে রাশিয়ার উপস্থিতি ও কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রধান কারণ। ১৯৬০ এর দশকে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র প্রতি বছর প্রায় পাঁচ লাখ ক্যারেট হীরক রফতানি করত। অবশ্য, পার্শ্ববর্তী গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গোয় প্রাপ্ত হীরকগুলো ইন্ডাস্ট্রিয়াল হীরক হলেও মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের হীরকগুলো মূলত মণি-মানের। কিন্তু কেবল অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও সরকারের লোভের কারণে এই বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যায়। এখনো পর্যন্ত বিপুল পরিমাণ হীরক অবৈধভাবে উত্তোলন করে দেশের বাইরে পাচার করা হচ্ছে। এমনকি বৈধ পথে হীরক রফতানির ক্ষেত্রেও আংশিক নিষেধাজ্ঞা জারি আছে। মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের আরেকটি বড় সম্পদ হচ্ছে স্বর্ণ এবং সম্প্রতি নিহত তিনজন রুশ সাংবাদিক স্বর্ণখনির বিষয়ে অনুসন্ধানী রিপোর্ট করতে গিয়েই দুর্বৃত্তদের হাতে নিহত হন। স্বর্ণখনিতে রাশিয়ার কোনো উপস্থিতি আছে কিনা সে ব্যাপারে খোঁজ নিতেই তারা সেখানে গিয়েছিলেন।
সূত্র : ব্লুমবার্গ