০৬ অক্টোবর ২০২২, ২১ আশ্বিন ১৪২৯, ৯ রবিউল আওয়াল ১৪৪৪ হিজরি
`

বিশ্বকাপ ট্রফি ও বাংলাদেশের ফুটবল

বিশ্বকাপ ট্রফি ও বাংলাদেশের ফুটবল। - ছবি : সংগৃহীত

সোনায় মোড়ানো বিশ্বকাপ ফুটবলের ট্রফি এসেছিল বাংলাদেশে। না, আমাদের ফুটবলাররা বিশ্বকাপ জয় করে এ ট্রফি ঘরে তুলে আনেননি। কাতার বিশ্বকাপ-২০২২ সামনে রেখে ৫৬টি দেশে প্রদর্শনে ট্রফিটি ঘুরছে। এরই অংশ হিসেবে এটি বাংলাদেশে অর্থাৎ ঢাকায়ও এসেছিল। পাকিস্তান ভ্রমণ করে ট্রফিটিকে আনা হয় বাংলাদেশে। এখান থেকে সেটি গেছে পূর্ব তিমুরে।

বাংলাদেশ ফুটবলপাগল দেশ। বিশ্বকাপ ফুটবল প্রতিযোগিতা শুরু হলে এ দেশের মানুষ সব কিছু ছেড়ে ফুটবল উন্মাদনায় মেতে উঠে। ফুটবল ছাড়া জীবনে যেন আর কোনো আনন্দ নেই। বিশ্ব ফুটবলের দু’টি দল ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনারই ভক্ত বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ। ব্রাজিলের পেলে ও ছন্দময় ফুটবল এবং আর্জেন্টিনার ম্যারাডোনার জন্যই এই আসক্তি। এখন ম্যারাডোনা নেই, কিন্তু মেসি আছেন। তেমনি ব্রাজিলের আছে নেইমার। নতুন করে ফ্রান্সেরও ভক্ত বেড়েছে বাংলাদেশে। রাশিয়া বিশ্বকাপ-২০১৮ এমবাপ্পের খেলা সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। তাই এবার এমবাপ্পে কী করেন সেটা দেখারও আছে কৌতূহল।

বিশ্বকাপের ২২তম কাতার বিশ্বকাপ প্রতিযোগিতা শুরু হচ্ছে ২১ নভেম্বর ২০২২। চলবে ১৮ ডিসেম্বর ২০২২ পর্যন্ত। আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থা ফিফার অন্তর্ভুক্ত ৩২টি জাতীয় ফুটবল দল (পুরুষ) এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে। কাতারের পাঁচটি শহরের আটটি মাঠে অনুষ্ঠিত হবে ম্যাচগুলো। তীব্র গ্রীষ্মকালীন উত্তাপ তথা গরমের কারণে ফিফা প্রতিযোগিতা শীতের সময় করার সিদ্ধান্ত নেয় আগেই। সে কারণে নভেম্বরে হচ্ছে বিশ্বকাপ। ইতোমধ্যে ঘোষণা করা হয়েছে, কাতার-২০২২ বিশ্বকাপ ফুটবল হতে যাচ্ছে ইতিহাসের সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ ও দামি ফুটবল আসর। ২১ নভেম্বর ২০২২ বিশ্বকাপ ফুটবলের উদ্বোধন হবে কাতারের বৃহত্তম শহর আল-খোরের আল-বায়াত স্টেডিয়ামে। আরবের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য তাঁবুর আদলে সব আধুনিক সুযোগ-সুবিধায় এটি নির্মিত হয়েছে। ৬০ হাজার দর্শকের ধারণক্ষমতার এ স্টেডিয়াম রাতে আলোকমালায় দেখায় মনোমুগ্ধকর। ফিফা বিশ্বকাপের উদ্বোধনের সূচনা হবে কাতার-বনাম ইকুয়েডরের মধ্যকার খেলার মধ্য দিয়ে।

বিশ্বকাপ ফুটবলের এ আসর প্রথমবারের মতো আরব বিশ্বের দেশ কাতারে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে ২০০২ ফিফা বিশ্বকাপের পর এটি এশিয়ায় দ্বিতীয় ফিফা বিশ্বকাপের আয়োজন। এটি ৩২টি দলের অংশগ্রহণে আয়োজিত ফিফা বিশ্বকাপের সর্বশেষ আসরও। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় অনুষ্ঠিতব্য ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর হবে ৪৮টি দলের অংশগ্রহণে।
বিশ্বকাপ ট্রফি নিয়ে শুরু করেছিলাম। বাংলাদেশ বিশ্বকাপ কখনো খেলেনি। অদূর ভবিষ্যতে খেলার সম্ভাবনাও ক্ষীণ। তবে বিশ্বকাপের এই ট্রফি বাংলাদেশের ফুটবলাঙ্গন ও দর্শকদের জন্য অনুপ্রেরণার সৃষ্টি করেছে। কাতার বিশ্বকাপ সামনে রেখে কোকাকোলার আয়োজন ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফির বিশ্বভ্রমণ শুরু হয় ১২ মে দুবাই থেকে। ৫৬টি দেশ ঘোরার পথে ৮ জুন ঢাকায় আসে। এটি সোনার তৈরি ট্রফি। একটি ম্যালাকাইট ভিত্তির ওপর এই ট্রফি তৈরি। এর উচ্চতা ৩৬ দশমিক ৮ সেন্টিমিটার এবং ওজন ৬ দশমিক ১ কেজি। এতে ১৮ ক্যারেটের পাঁচ কেজি সোনা ব্যবহার করা হয়েছে। কাচঘেরা এই ট্রফি দেখা যাবে কিন্তু ছোঁয়া যাবে না। শুধু ফিফার নির্দিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা, বিশ্বকাপজয়ী দলের খেলোয়াড় এবং সেই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের রয়েছে ছুঁয়ে দেখার সুযোগ।

এ জন্যই ট্রফিটির সাথে এসেছেন ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপজয়ী ফ্রান্স দলের মিডফিল্ডার ক্রিস্টিয়ান কারেম্বু ও ফিফার সাত সদস্যের প্রতিনিধিদল। বিশ্বকাপ ট্রফিটি একটি বিশেষ বিমানে কোকাকোলা নিয়ে আসে ঢাকায়। বিমানবন্দরে ট্রফিটি পাশে রেখে ছবি তোলেন দেশের কিংবদন্তি ফুটবলার ও বর্তমান বাফুফে সভাপতি সালাউদ্দিনসহ কর্মকর্তারা। কড়া নিরাপত্তায় এটি রাখা হয় র‌্যাডিসন বøু হোটেলে। এরপর এটি সংসদে প্রধানমন্ত্রী এবং বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতিকে দেখানো হয়। র‌্যাডিসন ব্লু হোটেলে আড়াই হাজার নির্বাচিত দর্শককেও ট্রফিটি দেখানো হয়। ট্রফি উপলক্ষ করে আর্মি স্টেডিয়ামে কনসার্টের আয়োজন করা হয়। ২০০২ এবং ২০১২ সালেও বাংলাদেশে এসেছিল বিশ্বকাপ ট্রফি। তবে তখন এসেছিল ট্রফিটির রেপ্লিকা। এই বিশ্বকাপ ট্রফি সৃষ্টি করেছেন ইতালিয়ান শিল্পী সিলভিও গাজ্জানিগা। সাতটি দেশের ৫৩টি ডিজাইন থেকে এটি বাছাই করা হয়। বিশ্বকাপের প্রথম ট্রফি ছিল ‘ভিক্টোরি’ নামে এবং দ্বিতীয়টি ‘জুলেরিমে’ নামে।

১৯৯৮ সালে ফ্রান্স বিশ্বকাপ জয় করেছিল। সেদিন জিদান এবং অঁরিদের সাথে বিশ্বকাপ ট্রফিটা হাতে নিয়েছিলেন বিশ্বকাপজয়ী দলের মিডফিল্ডার ক্রিস্টিয়ান কারেম্বু। বিশ্বকাপ ট্রফির বিশ্বভ্রমণের সঙ্গী হয়ে ঢাকা এসেছিলেন কারেম্বু। তিনিই ট্রফিটা বের করে দেখিয়েছিলেন। আর্মি স্টেডিয়ামেও বিশাল দর্শকদের সামনে ট্রফিটা ধরে সবাইকে দেখান ফরাসি এই মিডফিল্ডার কারেম্বু। তিনি ক্রীড়া সাংবাদিক উৎপল শুভ্রকে সাক্ষাৎকারে বলেন, এবারের বিশ্বকাপ ফাইনাল হবে আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্সের মধ্যে। মেসি ও এমবাপ্পের মধ্যে। তিনি জানান, ঢাকায় এসে শুনেছেন ফুটবল নিয়ে মানুষের উন্মাদনার কথা। শুনেছেন বিশ্বকাপের সময় প্রত্যেকের নাকি একটি দল থাকে। মারামারিও নাকি হয়। তবে তিনি বলেন, ফুটবল কিন্তু শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দেয়ার মাধ্যম।

বিশ্বকাপ ট্রফি চলে গেছে। তবে এ ট্রফি নিয়ে ফুটবল প্রিয় মানুষের আক্ষেপ রয়ে গেছে। সেটা হলো- এই ট্রফিটা বাফুফে ঢাকার বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে দিনব্যাপী প্রদর্শন করতে পারত। স্টেডিয়ামের মাঝখানে ট্রফিটা রেখে দুই পাশে সারি করে দিলে হাজার হাজার মানুষ ট্রফিটা দেখে নয়ন জুড়াতেন। দেশের প্রিয় ফুটবলার সালাউদ্দিন বাফুফের সভাপতি থাকা অবস্থায় এটা কেন হলো না অনেকেই ক্ষোভ জানিয়েছেন। তারা বলেন, বিশ্বকাপ ট্রফিকে উপলক্ষ করে বাংলাদেশের সোনালি যুগের ফুটবলারদের একত্রিতও করতে পারত বাফুফে।

বাংলাদেশের ফুটবল
ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও প্রচলিত খেলা। বিশ্বের ২১১টি দেশে ফুটবল খেলা হয়। এ দেশগুলো আন্তর্জাতিক ফুটবল ফেডারেশন ফিফার সদস্য। একমাত্র যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় খেলাটি ‘সাকার’ নামে পরিচিত। এ ছাড়া সব দেশে ফুটবল নামেই খেলাটি স্বীকৃত। বিশ্বের কোটি কোটি দর্শক খেলাটি দেখে আনন্দ লাভ করে।

বাংলাদেশ অন্যতম ফুটবলপ্রিয় দেশ। ফুটবলকে এ দেশের মানুষ কতটা ভালোবাসে বিশ্বকাপ ফুটবল এলে দেখা যায়। প্রিয় দলের পতাকায় ছেয়ে যায় প্রতিটি বাড়ি। তেমনি প্রায় দলের জার্সি গায়ে জড়িয়ে রাখেন দর্শকরা। তবে দুঃখজনক হচ্ছে ফুটবল খেলায় বাংলাদেশের অগ্রগতি আশানুরূপ নয়। আন্তর্জাতিক ফুটবলে বাংলাদেশের কোনো সাফল্যের নজির নেই। ফিফা ফুটবল খেলা নিয়ে প্রতি বছরই র‌্যাংকিং প্রকাশ করে থাকে। এই র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থা ২০২২ সালে দেখানো হয়েছে ১৯২তম। অর্থাৎ ২১১টি দেশের মধ্যে আমরা মাত্র ১৯টি দেশের আগে রয়েছি।

এক সময় ফুটবলে বাংলাদেশের ছিল ঐতিহ্য। সেই সোনালি অতীতে দেশব্যাপীই হতো ফুটবল খেলার জমজমাট আয়োজন। ঢাকায় অনুষ্ঠিত হতো আন্তর্জাতিক বিভিন্ন টুর্নামেন্ট আগা খান গোল্ডকাপ, প্রেসিডেন্ট গোল্ডকাপ, এশিয়ান কাপ, সাফ গেমস ফুটবল কাপসহ নানা আসর। অভ্যন্তরীণ লিগ বা প্রতিযোগিতাও সবসময় লেগে থাকত। মোহামেডান-আবাহনীর খেলা ঘিরে শুধু ঢাকার দর্শকই নয়, সারা দেশের দর্শকরাই থাকত মাতোয়ারা। এই দুই টিমের খেলা নিয়ে বড় মারামারি অর্থাৎ লঙ্কাকাণ্ডও ঘটে যেত। তেমনি ওয়ারী, ভিক্টোরিয়া, ব্রাদার্স, ওয়ান্ডার্সসহ অসংখ্য ক্লাবের খেলা নিয়েও উত্তেজনা কম হতো না। সালাহউদ্দিন, পিন্টু, হাফিজ, এনায়েত, চুন্নু, আসলাম, কায়সার হামিদ, টুটুলসহ বেশ কয়েকজন ফুটবলারের খেলা দেখতে দর্শকরা হুমড়ি খেয়ে পড়ত মাঠে। কিন্তু সেই সোনালি দিন হারিয়ে গেছে। ফুটবলের জায়গায় এখন স্থান করে নিয়েছে ক্রিকেট, ফুটবল নিয়ে মাতামাতি এখন শুধু দেখা যায় বিশ্বকাপ ফুটবলের সময়। এখন বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে যে মাতামাতি হয়, সেটা একসময় সারা দেশেই হতো আমাদের ফুটবল নিয়ে। এখন অবশ্য এই মাতামাতি দেশব্যাপী হচ্ছে ক্রিকেট নিয়ে। ক্রিকেটের ঘরোয়া নানা আয়োজন দেখা যায় দেশের সবখানে।

ফুটবলের এমন দশা কেন হলো? এর কারণ ফুটবলে পৃষ্ঠপোষকতা কমে গেছে। দেশে আন্তর্জাতিক ফুটবল প্রতিযোগিতার আয়োজন নেই বহু বছর ধরে। সারা দেশে ফুটবল প্রতিযোগিতারও আয়োজন করা হয় না। ফলে ফুটবলার তৈরি হচ্ছে না। সে তুলনায় মেয়েরা অবশ্য ফুটবলে এগিয়ে এসেছে। ফিফা র‌্যাংকিংয়ে মেয়েদের ফুটবলের অবস্থান ১৩৭তম।

সাফ গেমস ফুটবলে একসময় বাংলাদেশের কিছুটা অবস্থান করে নিয়েছিল। কিন্তু গত সাতটি সাফের ফাইনালের একটিতেও উঠতে পারেনি বাংলাদেশ। বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের আলোচিত অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়া। ব্যক্তিগতভাবে জামাল ভ‚ঁইয়া নাম করলেও দলগতভাবে বাংলাদেশ কিছুই করতে পারছে না। স¤প্রতি মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত এশিয়ান কাপের খেলায় বাহরাইনের সাথে ২-০ গোলে এবং তুর্কমেনিস্তানের কাছে ২-১ গোলে জামাল ভূঁইয়ারা হেরে গেলে বাংলাদেশের র‌্যাংকিং ১৯০ থেকে ১৯২-এ চলে যায়।

ফুটবল যেভাবে এলো
এই ভারতীয় উপমহাদেশে ইংরেজরাই ফুটবল নিয়ে আসে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ছত্রছায়ায় ভারতবর্ষের ইংরেজ সামরিক ঘাঁটিগুলো বিশেষ করে মাদ্রাজ, বোম্বে, এলাহাবাদ, দিল্লি, ব্যাঙ্গালোর, পেশোয়ার, সিমলা, লাহোর ও কলকাতায় খেলাটি শুরু হয়। সামরিক ঘাঁটিতে সেনারা দুই দলে বিভক্ত হয়ে একটি গোলক দিয়ে খেলত। এ দেশের মানুষ দূরে দাঁড়িয়ে থেকে কিংবা লুকিয়ে লুকিয়ে ইংরেজদের একটি চামড়ার গোলকে লাথি মারার দৃশ্য দেখত। তারা দেখত সেনারা চামড়ার গোলকে লাথি মারছে আর গোলকটি কখনো উপরে উঠে মাটিতে আছড়ে পড়ছে। আবার সেটা লাথি খেয়ে চলে যাচ্ছে দূরে লাফিয়ে লাফিয়ে। এ তো ভারি মজার খেলা! পরে তারা জানল- এর নাম- ফুটবল।

কলকাতা হেয়ার স্কুলের নগেন্দ্রপ্রসাদ নামে এক ছাত্র মায়ের সাথে ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় গোলাকার বস্তু দিয়ে ছুটাছুটি দেখে অবাক হন। তিনি দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ এই লাথালাথি ও ছুটাছুটি দেখেন। হঠাৎ গোলকটি তার পায়ের কাছে এসে পড়ে। তিনি মনে করেছিলেন এটি ভারী হবে। কিন্তু হাতে নিয়ে দেখেন খুবই হলকা একটি চামড়ার গোলক। একজন ইংরেজ তখন নগেন্দ্রপ্রসাদকে হাসিমুখে বলেন, ‘কিক ইট টু মি’। তাই লাথি মেরে তিনি বলটি পাঠিয়ে দেন। ভারতবর্ষে এই প্রথম একজন ভারতীয়ের ফুটবলে লাথি মারা। এরপর স্কুলে গিয়ে সহপাঠীদের কাছ থেকে চাঁদা তুলে ইংরেজ দোকান থেকে একটি ফুটবল কিনে আনেন নগেন। দাম ৪০ টাকা হলেও ফুটবলের প্রতি বাঙালি নগেনের আগ্রহ দেখে ইংরেজ দোকানি অর্ধেক দামে তা বিক্রি করেন। ‘ক্রীড়া সম্রাট নগেন্দ্রপ্রসাদ’ নামে বইতে বাঙালির প্রথম ফুটবল দর্শন, ফুটবলে লাথি মারা, ফুটবল কিনে ইতিহাস সৃষ্টির কথা লেখা রয়েছে। শুরুতে ক্যালকাটা ক্লাব অব সিভিলিয়ানস এবং ব্যারাকপুরের জেন্টেলম্যান ক্লাব অব ব্যারাকপুর ছিল। এদের খেলায় অংশ নেয়া কিংবা দেখায় ভারতীয়দের অধিকার ছিল না। পরে অবশ্য ১৮৮৯ সালে ট্রেডস কাপ নামে যে টুর্নামেন্ট আয়োজন করা হয় তাতে সামরিক-বেসামরিক দলের পাশাপাশি ভারতীয় হিন্দু দল, মুসলমান দল, কলকাতা ইউরোপীয়ান দল, বিভিন্ন কলেজ দল এবং এ্যাংলো ইন্ডিয়ান দলের মধ্যে এই ফুটবল খেলা হয়েছে। কলকাতার এই ফুটবল জোয়ার পরে ঢাকায়ও এসেছে। প্রথম দিকে ১৮৫৪ সালে চামড়ার বল নিয়ে খেলার প্রচলন এবং পৃষ্ঠপোষকতা ইংরেজদের মাধ্যমেই হয়। ১৮৮৪ সালে শোভাবাজ ক্লাব হয়। সেখান থেকেই মুসলমান যুবকদের উৎসাহে ১৮৯১ সালে হয় মোহামেডান স্পোটিং ক্লাব। পরে হয় মোহনবাগান ক্লাব। ১৮৯৮ থেকে ১৯০৩ পর্যন্ত ঢাকায় হয় ওয়ারী, ভিক্টোরিয়া, আরমানীটোলা, লক্ষ্মীবাজার ক্লাব। ১৮৯৩ সালে গঠিত হয় অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশন। এর মাধ্যমে শুরু হয় ক্লাবগুলোর ফুটবল খেলা। ১৯৩৩ সালে দ্বিতীয় বিভাগ ফুটবল লিগে মোহামেডান চ্যাম্পিয়ন হয়। এরপর মোহামেডান ১৯৩৪ সালে প্রথম বিভাগে খেলতে নামে। ভারতীয় ফুটবল লিগের সূচনা করে ফুটবলের নবযুগের।

১৯৩৭ সালে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবল দল ইংল্যান্ডের ইসলিংটন ঢাকায় আসে। ঢাকা স্পোর্টস অ্যাসোসিয়েশন দলের সাথে খেলায় তারা ১-০ গোলে হেরে যায়। জগন্নাথ কলেজের তৎকালীন ছাত্র ফুটবলার পাখি সেন সেই ঐতিহাসিক গোলটি করেছিলেন। ঢাকায় ১৯১৫ সালে প্রথম বিভাগ ফুটবল লিগ শুরু হয়। এতে ১০-১২টি দল অংশ নিত। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত সময়ে বেশ কিছু খেলোয়াড় নিয়ে জাতীয় দল গঠন করা হয়। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন সাহেব আলী, নবী চৌধুরী, কবির, ওয়াজেদ প্রমুখ। পঞ্চাশের দশকে ফুটবল মাতিয়ে রেখেছেন চুন্না রশিদ, তারাপদ, সাহেব আলী, ওয়াজেদ, মল্লিকরা। ১৯৫৬ সালে ঢাকা স্টেডিয়ামে প্রথম ফ্লাড লাইটে ফুটবল খেলা হয়। প্রথম দিয়ে ওয়ারী ক্লাব ও ভিক্টোরিয়া এবং ওয়ান্ডার্স ক্লাব ফুটবল খেলার উন্নয়নে স্মরণীয় ভ‚মিকা রাখে। ১৯৫৭ সালে ঢাকা মোহামেডান স্পোটিং ক্লাব প্রথম লিগ চ্যাম্পিয়ন হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আবহানী ক্রীড়া চক্র। ১৯৭৪ সালে আবাহনী প্রথম লিগ চ্যাম্পিয়ন হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করে। দলটির অধিনায়ক ছিলেন জাকারিয়া পিন্টু। এভাবেই ফুটবলের পথচলা শুরু হয় এ দেশে।

-লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, সাবেক সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় প্রেসক্লাব


আরো সংবাদ


premium cement