Naya Diganta

জন্ম থেকেই যিনি বিস্ময়

জন্ম থেকেই যিনি বিস্ময় - জামান শামস

৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে ১২ রবিউল আউয়াল মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা: জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের অব্যবহিত পরেই দাদা আবদুুল মুত্তালিব তাঁকে কোলে নিয়ে ছুটলেন কাবার আঙ্গিনায়। সেখানে দাঁড়িয়ে এই উপহারের জন্য আল্লাহর শোকর আদায় করলেন। স্তন দানের জন্য খোঁজা শুরু হলো ধাত্রী জননীর। বন্ধু সাদ গোত্রের হালিমা বিনতে আবু জুআবকে পাওয়া গেল।

তিনি বলেন, তিনি তার স্বামী আল হারিস ও কোলের শিশুকে সাথে নিয়ে অন্যান্য মহিলাদের সাথে দুগ্ধপোষ্য শিশুর সন্ধানে বেরিয়েছিলেন। দুর্ভিক্ষের বছর ছিল সেটা। তাদের সহায় সম্বল তেমন কিছুই ছিল না, কেবল একটি দুর্বল মাদি উট ব্যতীত। তার স্তনে এক ফোঁটা দুধ ছিল না, যে কারণে ক্ষুধার্ত শিশুর কান্নায় রাতে কারো ঘুম হয়নি। উটনিও দুধ দিতে পারেনি।

তিনি আরো বলেন, আমরা আশা করেছিলাম বৃষ্টি হবে, ঠাণ্ডা হবে প্রকৃতি। আমি একটা গাধার পিঠে চড়ে যাচ্ছিলাম। গাধাটা ছিল বেশ দুর্বল এবং হাড় জিরজিরে। ফলে সবার পেছনে পড়ে গিয়েছিল। আমরা অনেক বিলম্বে মক্কা পৌঁছি। অতঃপর দুগ্ধপুত্রের সন্ধান করতে থাকি। রাসূলুল্লøাহকে গ্রহণ করার জন্য কারোই তেমন আগ্রহ ছিল না। প্রধানত, তিনি ছিলেন ইয়াতিম এবং দ্বিতীয়ত এই পরিবারের কাছে দুধমাকে দেয়ার মতো তেমন অর্থ ছিল না।

হালিমা বলেন, ‘আমরা ব্যতীত সব আগত মহিলাই ইতোমধ্যে বাচ্চা পেয়ে আনন্দে বাড়ি ফেরার অপেক্ষায়। আমি আমার স্বামীকে বললাম, তবে আর কী করা! আল্লাহর ইচ্ছায় আমি এই বাচ্চাকেই নেবো। হয়তো আল্লাহ আমাদের বরকত দেবেন। আর কোনো ভাবনা ব্যতিরেকে তাকে নিয়েই রওনা দেয়ার প্রস্তুতি চলল।

আমি খুব অবাক হলাম, যেই মাত্র তাকে কোলে তুলে বুকে চেপে ধরলাম, সমস্ত বুক ভরে গেল দুধে। এমনকি উপচে পড়ছিল। পরম তৃপ্তিভরে শিশু নবী সা: দুধ পান করলেন। দুধ পেয়ে আমার নিজের শিশুটিও পরিতৃপ্ত হলো। তারপর দুজনই ঘুমাল। আমার স্বামী উটনির কাছে গেলেন। সেখানেও অবাক করা ব্যাপার। তার বাঁটভর্তি দুধ, তিনি সাগ্রহে দোহন করলেন। আমরা দুজনই জীবনে এই প্রথমবার তৃপ্তির সাথে দুধপান করলাম।’ সুবহান আল্লাহ।
‘সকালে আমার স্বামী বলছেন, হালিমা! তুমি জানো না তুমি কী এক প্রিয় সম্পদ গ্রহণ করেছ! আমার কোনো কথা জবান থেকে বের হচ্ছিল না। শুধু আল্লাহর কৃতজ্ঞতায় আলহামদুলিল্লাহ বললাম।

অনেকটুকু বিশ্রামের পর বাড়ির উদ্দেশে রওনা করলাম। আমি তাকে নিয়ে গাধার পিঠে বসলাম। গাধাটি এত বেগে চলছিল যেজন্য অন্য গাধারা কিছুতেই তার সাথে তাল মিলাতে পারছিল না। আমার সঙ্গীরা বলল, এটা কি সেই গাধা যাকে নিয়ে তোমরা এই শহরে এসেছিলে? তারা আশ্চর্য হচ্ছিল আচানক এমন ঘটনা দেখে।

বনি সাদের বাড়িতে ফিরে এলাম। সত্যি বলতে কি! বনু সাদের জমিনের মতো এত রুক্ষ্ম আর অনুর্বর জমিন কোথাও দেখিনি। এর আগে আমাদের উটগুলো কখনোই খাবার পেত না। সন্ধ্যাবেলা উটগুলো পেটের ক্ষুধা নিয়ে বাড়ি ফিরত। শিশু নবী সা:-কে বাড়িতে আনার পর উটের না খাবারের ঘাটতি হয়েছে আর না দুধের কমতি হয়েছে। পড়শিরা বলাবলি করত, তোমরা আবু জুআবের মেয়ের রাখাল যেদিকে যায়, সেদিকে যাওনা কেন? (ইবনে ইসহাক প্রণীত সিরাতে রাসূলুল্লাহ সা: থেকে)

হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর বংশধরের প্রতি রহমত নাজিল করো যেমন রহমত নাজিল করেছিলে ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ও তার বংশধরের প্রতি। নিশ্চয় তুমি প্রশংসনীয় ও মর্যাদাবান। হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মাদ সা: ও তাঁর বংশধরের প্রতি বরকত নাজিল করো যেমন বরকত নাজিল করেছিলে ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ও তার বংশধরের প্রতি। নিশ্চয় তুমি প্রশংসনীয় ও মর্যাদাবান। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৯৭০)
লেখক : সাবেক অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ।