০৪ ডিসেম্বর ২০২০

আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুর দু'বছর পর এলআরবি এখন কোন পথে?

আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুর দু'বছর পর এলআরবি এখন কোন পথে? - ছবি : সংগৃহীত

আইয়ুব বাচ্চুর হাত ধরে ১৯৯১ সালের ৫ই এপ্রিল প্রতিষ্ঠিত হয় ব্যান্ড 'এলআরবি'। নব্বইয়ের দশক থেকে আজকের দিন পর্যন্ত বাংলাদেশের রক মিউজিক শ্রোতাদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় গানের দল বা ব্যান্ড `এলআরবি'।

শুরুটা হয়েছিল ইংরেজি গানের কভার থেকে। তারপর রক, সফট রক, হার্ড-রক, ব্লুজ, অল্টারনেটিভ রক, মেলোডি- এমন নানা জনরার গানের সাথে শ্রোতাদের পরিচয় হতে থাকে এই ব্যান্ডের মাধ্যমে। আইয়ুব বাচ্চুর হাত ধরে ১৯৯১ সালের ৫ই এপ্রিল প্রতিষ্ঠিত হয় ব্যান্ড 'এলআরবি'।

আইয়ুব বাচ্চুই একাধারে ছিলেনে এই ব্যান্ডটির গায়ক, লিড গিটারিস্ট, গীতিকার ও সুরকার। তবে ব্যান্ডটির প্রথম নাম এলআরবি নয় বরং ছিল ওয়াইআরবি - ইয়েলো রিভার ব্যান্ড।

সে সময় একটি ক্লাবে পারফর্ম করার সময় সেখানকার উদ্যোক্তারা ভুল করে ব্যান্ডটির নাম লেখেন - লিটল রিভার ব্যান্ড। সেই ভুলটাই আইয়ুব বাচ্চুর পছন্দ হয়ে যাওয়ায় ব্যান্ডটি পরিচিত পায় এলআরবি নামে।

কিন্তু পরে জানা যায় যে, এই একই নামে অস্ট্রেলিয়াতে আরেকটি ব্যান্ড রয়েছে। কিন্তু এলআরবি নামটি ইতোমধ্যে দেশ-বিদেশের শ্রোতাদের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠায়, নামটি পরিবর্তন করতেও চাইছিলেন না ব্যান্ডের সদস্যরা।

এমন অবস্থায় এল-আর-বি এই তিনটি অক্ষর ঠিক রেখে এর `পুরো' নামটি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

এরপর আইয়ুব বাচ্চু এলআরবির নাম রাখেন `লাভ রানস ব্লাইন্ড'। নতুন এই নামেই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আসছে সঙ্গীতের এই দলটি।

এলআরবির প্রায় প্রতিটি অ্যালবাম সুপারহিট হওয়ায় রাতারাতি তার জনপ্রিয়তা শীর্ষে উঠে যায়। এমনও হয়েছে যে অ্যালবাম বাজারে আসতে দেরি হওয়ায় শ্রোতাদের অসংখ্য ফোন পেতে হয়েছে রেকর্ড বিক্রেতাদের।

তবে ২০১৮ সালের ১৮ই অক্টোবর ব্যান্ডটির প্রতিষ্ঠাতা আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুর পর ব্যান্ডের ভেতরে নেতৃত্বের শূন্যতা সৃষ্টি হওয়ায় এই এলআরবি'র ভবিষ্যত নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

২০১৯ সালে মাঝামাঝি সময়ে ব্যান্ডটির নতুন শিল্পী হিসেবে যুক্ত হয়েছিলেন বালাম। তবে এনিয়ে আইয়ুব বাচ্চুর পরিবার এবং ব্যান্ডের সদস্যদের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। আইয়ুব বাচ্চুর পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয় যে, তারা এলআরবির নাম ব্যবহার করে গান গাইতে পারবে না।

এমন অবস্থায় এলআরবি ছেড়ে বালাম গঠন করেন নতুন ব্যান্ড `বালাম এন্ড দ্য লিগ্যাসি'।

এধরণের একের পর এক ঘটনার পর শ্রোতাদের মনে প্রশ্ন জাগে: তাহলে কি আইয়ুব বাচ্চুর সাথে এলআরবি ব্যান্ডও চির বিদায় নিতে যাচ্ছে? জনপ্রিয় ব্যান্ডটির টিকে থাকা নিয়ে এমন অনিশ্চয়তা যেন কিছুতেই মানতে পারছিলেন না ভক্তরা।

এ নিয়ে আইয়ুব বাচ্চুর পরিবারকেও ভক্তদের রোষানলে পড়তে হয়েছিল।

পরে আইয়ুব বাচ্চুর ছেলে এবং ‘আইনগতভাবে ব্যান্ডটির উত্তরাধিকার’ আহনাফ তাজওয়ার গত বছরের ৫ই এপ্রিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক স্ট্যাটাসের মাধ্যমে জানান যে তিনি ও তার পরিবারের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হয়েছে।

তারা চান ব্যান্ড সদস্যরা ‘বালাম এন্ড দ্য লিগ্যাসি’ নয় বরং এলআরবি নামেই এগিয়ে যাক এবং তারা 'এলআরবি' নামে গান করতে পারেন। এ নিয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো বাধা নেই।

আইয়ুব বাচ্চুর পরিবারের এমন আহ্বানের পর নতুন দল নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে ‘বালাম অ্যান্ড দ্য লিগ্যাসি’। নতুন এই ব্যান্ড গঠনের কয়েকদিনের মাথায় পুনরায় তারা এলআরবিতেই ফিরে আসেন।

কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত বেশিদিন টেকেনি। শিল্পী বালামকে নিয়ে এলআরবি পুনর্গঠনের সিদ্ধান্তে ব্যান্ড সদস্যদের মধ্যেও বিভক্তি দেখা দিতে শুরু করে। ব্যান্ডের একটি পক্ষ চাইছিলেন বিরতি নিতে এবং ‘ভয়েস হান্টের’ মাধ্যমে নতুন ভোকাল নিয়ে যাত্রা শুরু করতে।

অন্যদিকে আরেকপক্ষ চাইছিল বালামকে নিয়ে দ্রুত এই ব্যান্ডের কার্যক্রম শুরু করতে। মতের অমিল হওয়ায় ব্যান্ড থেকে সরে দাঁড়ান গিটারিস্ট আবদুল্লাহ আল মাসুদ এবং ম্যানেজার শামীম আহমেদ।

এ নিয়ে শামীম আহমেদ বলেন, ‘দোষটা আসলে আমাদেরই। বাচ্চু ভাই মারা যাওয়ার পর আমরা কেউ ঠিকমতো ব্যান্ডটাকে লিড করতে পারছিলাম না। এ কারণে অনেক ভুলভ্রান্তির জন্ম হয়েছে।’

এরপর ব্যান্ডটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং বেইজ গিটারিস্ট স্বপন ড্রামার রোমেলকে নিয়ে ‘এলআরবি’র নতুন লাইনআপ সাজানোর চেষ্টা করলেও সেটাও বেশিদূর এগোয়নি। তবে এই পুরো বিষয়টি নিয়ে টানাপড়েনের অবসান ঘটে শিল্পীর দ্বিতীয় প্রয়াণ দিবসের প্রাক্কালে।

এবার আইয়ুব বাচ্চুর সব গান সরকারিভাবে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশে তিনিই প্রথম কোন শিল্পী যার গান সরকারি ব্যবস্থাপনায় সংরক্ষণ করা হচ্ছে। এখন থেকে এলআরবির লোগো এবং যেসব গান আইয়ুব বাচ্চু লিখেছেন, সুর দিয়েছেন এবং নিজ কণ্ঠে পরিবেশন করেছেন এমন ২৭২ টি গানের কপিরাইট থাকবে তার পরিবারের কাছে।

আইয়ুব বাচ্চুর স্মরণে বাংলাদেশের কপিরাইট অফিস যে ওয়েবসাইট খুলেছিল সেখানেই গানগুলো ডিজিটাল আর্কাইভ করে সুরক্ষিত রাখা হয়েছে, সেখানে প্রতিটি গানের ইউটিউব লিঙ্কও জুড়ে দেয়া থাকবে।

কপিরাইট অফিসের কর্মকর্তা জাফর রাজা চৌধুরী বলেছেন আইনানুযায়ী এই কপিরাইটের উত্তরাধিকার এখন আইয়ুব বাচ্চুর স্ত্রী ও দুই সন্তানের।

আইয়ুব বাচ্চু নিজে এসব গান বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসে নিজ নামে নিবন্ধন করে গেছেন। তিনি জানান, এখন থেকে কপিরাইটযুক্ত গানগুলি কেবল আইয়ুব বাচ্চুর নামে প্রকাশিত হবে।

আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুর পর এলআরবি ব্যান্ড নিয়ে দলের শিল্পীদের নানামুখী তৎপরতার কারণে পরিবারের পক্ষ থেকে এই ব্যান্ডের নাম নিয়ে গান পরিবেশনার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। এ নিয়ে আইয়ুব বাচ্চুর দুই সন্তান ফাইরুয সাফরা আইয়ুব ও আহনাফ তাজওয়ার আইয়ুব গত আগস্টে এক বিবৃতিতে জানান, তারা চান না বাংলা ব্যান্ড জগতে জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা ব্যান্ডটির নামের কেউ অপব্যবহার করুক।

কর্মকর্তারা বলছেন, পরিবারের অনুমোদন ছাড়া এলআরবির নামে কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করা হলে সেটা হবে বাংলাদেশ কপিরাইট আইনের লঙ্ঘন ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুর পর বিবাদে জড়িয়ে পড়া দুই পক্ষ এই সিদ্ধান্তটি মেনে নিয়েছে বলে জানা গেছে।

যদিও এর আগেই বাংলাদেশ মিউজিক্যাল ব্যান্ডস অ্যাসোসিয়েশনের (বামবা) ঘোষণা করেছিল যে তাদের সদস্যভুক্ত ২৫টি ব্যান্ডের কোনো গান অনুমতি ছাড়া বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিবেশন করা যাবে না। এলআরবি শুরু থেকেই এই সংগঠনটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।

এর ফলে কোন শিল্পী, গানের দল, টিভি রিয়েলিটি শো বা ইন্টারনেটভিত্তিক অন্যান্য সম্প্রচার মাধ্যমে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে এলআরবির গান পরিবেশন করতে চাইলে আগে গানের স্বত্বাধিকারীর লিখিত অনুমতি নিতে হবে।

অন্যথায় ছয় মাস থেকে দুই বছরের কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার থেকে ৪ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে বলে জানিয়েছে কপিরাইট অফিস।

এলআরবির অফিশিয়াল ওয়েবসাইট থেকে জানা গেছে, ১৯৭৮ সালে 'ফিলিংস' ব্যান্ডের মাধ্যমে সঙ্গীত জগতে যাত্রা শুরু করেন আইয়ুব বাচ্চু। এরপর ১৯৮০ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত টানা ১০ বছর তিনি যুক্ত ছিলেন ব্যান্ড "সোলস" এর সাথে। সোলস ছাড়ার পর ১৯৯১ সালের ৫ই এপ্রিল গঠন করেন এলআরবি।

বাংলাদেশে এলআরবি প্রথম কোন ব্যান্ড যারা নিউইয়র্কের ঐতিহাসিক মেডিসন স্কয়ার গার্ডেনে শো করেছে। এছাড়া ভারত, অস্ট্রিয়া, ব্রিটেন, জার্মানি, সিঙ্গাপুর, কাতার, দুবাইসহ আরও বহু দেশে কনসার্ট করেছে জনপ্রিয় এই ব্যান্ড।

ক্যারিয়ারে মোট ১২টি একক এবং একটি ইন্সট্রুমেন্টাল অ্যালবাম করেছেন আইয়ুব বাচ্চু। প্রতিষ্ঠার শুরু থেকে এখন পর্যন্ত দলের স্টুডিও অ্যালবাম ১১টি। মিক্সড অ্যালবাম রয়েছে ৯টি।

এর প্রথম অ্যালবাম ‘এলআরবি ওয়ান’ ‘এলআরবি টু’ বাজারে আসে ১৯৯২ সালে। এটাই ছিল বাংলাদেশের প্রথম ডাবল অ্যালবাম।

পরে ১৯৯৮ সালে , ‘আমাদের’ ও বিস্ময় নামে আরেকটি ডবল অ্যালবাম বাজারে আসে।

এলআরবির অন্য অ্যালবামগুলো হল 'সুখ' (১৯৯৩), 'তবুও' (১৯৯৪), 'ঘুমন্ত শহরে' (১৯৯৫), 'ফেরারি মন' (১৯৯৬), 'স্বপ্ন' (১৯৯৬), মন চাইলে মন পাবে (২০০০), অচেনা জীবন (২০০৩), মনে আছে নাকি নেই (২০০৫), স্পর্শ (২০০৮) এবং যুদ্ধ (২০১২)।

আইয়ুব বাচ্চুর সর্বাধিক জনপ্রিয় গানের মধ্যে রয়েছে ‘সেই তুমি,’ ‘কষ্ট,’ ‘ফেরারি মন’ ‘হাসতে দেখো গাইতে দেখো,’ ‘রূপালী গিটার,’ ‘একদিন ঘুম ভাঙা শহরে।’

সূত্র : বিবিসি


আরো সংবাদ

সকল

সৌদি আরবে ইমাম হোসাইন মসজিদটি ভেঙে ফেলার নির্দেশ (১১৪৮৮)রাজধানীতে সমাবেশের অনুমতি পায়নি সম্মিলিত ইসলামী দলগুলো (১০৬৫১)অপশক্তি মোকাবেলা করে ইসলামের বিজয় নিশ্চিত করতে হবে : মামুনুল হক (৯৪০৬)বায়তুল মোকাররমের সামনে ভাস্কর্যবিরোধীদের মিছিলে লাঠিচার্জ (৮২৫২)কোনো মুসলিম হিন্দু নারীকে বিয়ে করতে পারে কিনা (৭৩৩৯)আওয়ামী লীগের আপত্তি, মামুনুল হকের মাহফিল বাতিল (৬৬৯১)ভাস্কর্য, মহাকালের প্রেক্ষাপট (৬২২৫)ভাস্কর্যের নামে মূর্তি স্থাপন কোনোক্রমে মেনে নেয়া যায় না : সম্মিলিত ইসলামী দলসমূহ (৬১৩০)স্টেডিয়ামগুলোকে জেলে রূপান্তরের অনুমতি না দেয়ায় কেজরিওয়ালের ওপর ক্ষুব্ধ মোদি (৬০৫৭)নাগর্নো-কারাবাখে জয় পেতে কত সৈন্য হারাতে হলো আজারবাইজানকে? (৫৮৭৪)