Naya Diganta

গণধর্ষণে অভিযুক্তরা ‘এনকাউন্টারে নিহত’ হওয়ায় ভারতীয়রা কেন উল্লাস করছে

ভারতে গণ-ধর্ষণে অভিযুক্ত চারজন পুরুষ পুলিশের সাথে ‘এনকাউন্টারে’ নিহত হওয়ার পর সারাদেশে লোকজন উল্লাস প্রকাশ করেছে। গত সপ্তাহে হায়দারাবাদে ২৭ বছর বয়সী একজন পশু চিকিৎসককে ধর্ষণের অভিযোগে তাদেরকে আটক করা হয়েছিল।

এরপর পুলিশের সাথে এনকাউন্টারে তারা নিহত হওয়ার পরপরই প্রায় দু'হাজার মানুষ ওই পুলিশ স্টেশনের সামনে জড়ো হয়। তারা ‘পুলিশ জিন্দাবাদ’ বলে স্লোগান দেয় এবং নিজেদের মধ্যে মিষ্টি বিতরণ করে। নিহত ওই তরুণীর পুড়ে যাওয়া লাশ যেখান থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল এবং যেখানে চারজন অভিযুক্তকে হত্যা করা হয় সেখানে লোকজন ফুল ছিটিয়ে দেয়।

নিহত পশু চিকিৎসক যে এলাকায় থাকতেন সেখানেও লোকজন জড়ো হয়ে আনন্দ উল্লাসে মেতে ওঠে, তারা আতসবাজি জ্বালায় ও মিষ্টি বিতরণ করে। অনলাইনে লোকজনের আনন্দ প্রকাশ এখনও চলছে। অভিযুক্তরা নিহত হওয়ার কারণে তারা পুলিশকেও অভিনন্দন জানাচ্ছে।

কিন্তু এর পেছনে কারণ কী?

অভিযুক্তরা নিহত হওয়ায় সাধারণ লোকজন যে আনন্দ প্রকাশ করছেন তার একটি কারণ হচ্ছে ভারতীয় বিচার ব্যবস্থার শ্লথ গতি। বিচারের ওপর আস্থাহীনতার কারণে তারা 'তাৎক্ষণিক বিচার'কে স্বাগত জানাচ্ছেন। কোন একটি মামলার বিচার সম্পন্ন হতে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর এমনকি যুগের পর যুগও চলে যায়। আদালতে ঝুলে আছে লাখ লাখ মামলা। তার মধ্যে ধর্ষণ সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা দেড় লাখেরও বেশি। এর ফলে বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ধীরে ধীরে অনেক কমে গেছে।

এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে ২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসে চলন্ত বাসে ২৩ বছর বয়সী মেডিকেলের ছাত্রীকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাটি। এই ঘটনাটি শুধু ভারতেই নয়, সারাবিশ্বেই আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এর প্রতিবাদে সারা ভারতেই দিনের পর দিন প্রতিবাদ বিক্ষোভ হয়েছে।

এর ফলে সরকার কঠোর আইন করতে বাধ্য হয়, এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের বিধানও রাখা হয়। কিন্তু এতো কিছুর পরেও নৃশংস ওই ঘটনার বিচার খুবই ধীর গতিতে চলতে থাকে। সাত বছর পরে এসে মেডিকেলের ওই ছাত্রীর মা আশা দেবী অভিযোগ করেছেন যে, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ধর্ষণকারীরা রায়ের কার্যকর বিলম্বিত করার জন্যে আইনের সব ধরনের ফাঁক ফোঁকর ব্যবহারের চেষ্টা করছে।

হায়দারাবাদে ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্ত চার ব্যক্তি নিহত হওয়ার পর আশা দেবীও পুলিশকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন,‘গত সাত বছর ধরে আমি সর্বত্র দৌঁড়াদৌঁড়ি করছি। আমার মেয়ে নির্ভয়ার হত্যাকারীদের মৃত্যুদণ্ড যাতে খুব শিগগিরই কার্যকর করা হয় সেজন্য আদালত ও সরকারের কাছে অনুরোধ করছি।’

‘পুলিশ যে শাস্তি দিয়েছে তাতে আমি খুব খুশি। তারা একটা দারুণ কাজ করেছে। আমার দাবি পুলিশের এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যাতে কোন ব্যবস্থা নেয়া না হয়।’

ভারতে ধীরগতির বিচার ব্যবস্থার কারণে মানুষের হতাশার প্রতীক হয়ে ওঠেছেন এই আশা দেবী।

গত সপ্তাহে তরুণী পশু চিকিৎসকে ধর্ষণ ও পরে পুড়িয়ে মারার ঘটনাটি প্রকাশিত হওয়ার পরেও অনেকে একই রকমের হতাশা প্রকাশ করছিলেন। তাদের অভিযোগ যে এরকম একের পর ধর্ষণের ঘটনা ঘটতেই থাকবে, কারো কোন বিচার হবে না।

বিচার ব্যবস্থার প্রতি এই অনাস্থার কারণেই অনেকে এনকাউন্টারে মৃত্যুর মতো ‘তাৎক্ষণিক বিচারকে’ সমর্থন দিচ্ছেন। এ কারণে সাম্প্রতিক কালের ভারতীয় ছবিতেও পুলিশের হাতে এরকম বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তুলে ধরা হচ্ছে, যেখানে তাদেরকে নায়কের মতো বীর হিসেবেই চিত্রিত করা হচ্ছে।

তবে কেউ কেউ আছেন যারা এধরনের হত্যাকাণ্ডের সমালোচনা করে এর তীব্র বিরোধিতা করছেন। তারা বলছেন, বিচারের আগেই অভিযুক্তদের এভাবে হত্যা করা কিছুতেই গ্রহণযোগ্য নয়।

হায়দারাবাদ কাউন্সিল ফর সোশাল ডেভেলপমেন্টের কল্পনা কান্নাবিরান বলছেন,‘আমরা যে উত্তর খুঁজছি সেটা ট্রিগার-হ্যাপি পুলিশের আইন অমান্য করার মধ্যমে পাওয়া যাবে না।’

‘ভিকটিমের শোকগ্রস্ত পরিবার কিংবা শোকের মাধ্যমে বিচারের পথ নির্ধারিত হয় না। বিচার হচ্ছে এসময় তাদেরকে সাহায্য সমর্থন দেয়া এবং অভিযুক্তদের যাতে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে বিচার করা যায় সেটা নিশ্চিত করা।’

অনেকেই প্রশ্ন করছেন, পুলিশ যে আসলেই অপরাধীদের গ্রেফতার করেছে তার গ্যারান্টি কী? এমনও তো হতে পারে যে তারা মানুষের ক্ষোভ প্রশমনের জন্যে দরিদ্র কিছু ট্রাক চালককে ধরে একাজটা করেছে!

কিন্তু এধরনের প্রশ্ন যারা করেছেন, শুক্রবার তাদের সংখ্যা খুব একটা বেশি ছিল না। সূত্র : বিবিসি।