Naya Diganta

কারাগারে খালেদা জিয়ার বিচার সংবিধানের লঙ্ঘন : সুপ্রিম কোর্ট বার

বিএনপি
কারাগারে খালেদা জিয়ার বিচারকে সংবিধানের লঙ্ঘন বলছে সুপ্রিম কোর্ট বার

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন অভিযোগ করে বলেছেন, ঢাকার পুরাতন কেন্দ্রীয় কারাগারের যে কক্ষটিকে আদালত হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে তা বাংলাদেশ সংবিধানের আর্টিক্যাল ৩৫(৩) এবং ফৌজদারী কার্যবিধির ৩৫২ ধারা মোতাবেক কোনো উন্মুক্ত আদালত নয় বা হতে পারে না।

‘সেখানে পাবলিক তো দূরের কথা খালেদা জিয়া ও অন্যান্য আসামিদের নিয়োজিত আইনজীবী কিংবা আত্মীয়-স্বজন প্রবেশ এবং আদালতের কার্যক্রম দেখা বা শোনার কোনো সুযোগ নাই। নাটক সিনেমায় যে রকম দেখানো হয় সেই আকৃতির একটি আদালত কক্ষ বসানো হয়েছে। যেটা একটি গুহার মতো স্যাঁতস্যাঁতে। সেখানে স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়ার সুযোগ নেই’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আজ বৃহস্পতিবার খালেদা জিয়ার বিচারকার্য পরিচালনার জন্য ঢাকা পুরাতন কেন্দ্রীয় কারাগারে অস্থায়ী আদালত স্থাপন করার বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবীর ব্যানারে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

লিখিত বক্তব্যে জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সংবিধানের আর্টিক্যাল ৩৫(৩) এবং ফৌজদারী কার্যবিধি ৩৫২ ধারা মোতাবেক আদালত বলতে একটি উন্মুক্ত আদালতের কথা বলা হয়েছে যেখানে যেকোনো পাবলিকের সাধারণভাবে প্রবেশাধিকার থাকে। কিন্তু আপনারা জানেন যে, সেখানে পাবলিক তো দূরের কথা বেগম খালেদা জিয়া ও অন্যান্য আসামিদের নিয়োজিত আইনজীবী কিংবা আত্মীয়-স্বজন প্রবেশের সুযোগ নেই।’

কারা অভ্যন্তরে গঠিত আদালতটি মোটেই উন্মুক্ত আদালত না হওয়ায় এবং সেখানে পাবলিক ট্রায়াল হওয়ার কোনো সুযোগ না থাকায় এইরূপ বেআইনি আদালতে বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলার বিচার কার্যক্রম চলার আইনগত কোনো সুযোগ নেই।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে থাকা অন্য মামলার শুনানির জন্য কারাগারের ভেতরে আদালত বসানোর বিষয়ে প্রজ্ঞাপন প্রত্যাহার করে উন্মুক্ত স্থানে বিচারকার্য পরিচালনা করার দাবি জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকনসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

আরো পড়ুন :
সাদা কাপড়ে ঢাকা ছিল খালেদা জিয়ার হাত-পা
নয়া দিগন্ত অনলাইন, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮
অসুস্থ খালেদা জিয়াকে হুইল চেয়ারে করে হাজির করা হয়েছিল অস্থায়ী আদালতে। বুধবার নাজিমুদ্দিন রোডের পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগারে এই আদালত স্থাপন করা হয়, যেখানে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার বিচার অনুষ্ঠিত হয়েছে।

দেশে প্রথমবারের মতো কারা অভ্যন্তরে স্থাপিত এই আদালতে আসামিপক্ষের কোনো আইনজীবী ছিলেন না। বুধবার শুনানিতে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনজীবী বক্তব্য দেন। এ ছাড়া পর্যবেক্ষক হিসেবে ঢাকা জেলা বারের আইনজীবী গোলাম মোস্তফা বক্তব্য দেন।

বুধবার শুনানি শেষে আদালত ১২ সেপ্টেম্বর মামলার পরবর্তী দিন রেখেছেন। সে সময় পর্যন্ত খালেদা জিয়ার জামিন বহাল থাকবে।

বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, ‘এখানে ন্যায়বিচার নেই। যা ইচ্ছে তাই সাজা দিতে পারেন। যত ইচ্ছে সাজা দিতে পারেন। আমি অসুস্থ। আমি বারবার আদালতে আসতে পারব না। আর এভাবে বসে থাকলে আমার পা ফুলে যাবে। আমি খুবই অসুস্থ, আমার হাত-পা প্যারালাইজড হয়ে যাচ্ছে। আমার সিনিয়র কোনো আইনজীবী আসেনি। এটা জানলে আমি আসতাম না।’

এর আগে, ৫ নম্বর বিশেষ আদালতের বিচারক ড. আক্তারুজ্জামান আদালতে প্রবেশ করেন বেলা ১১টা ৭ মিনিটে। তার আগে সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে আইনজীবী ও সাংবাদিকরা প্রবেশ করেন। দুপুর ১২টা ১২ মিনিটে খালেদা জিয়াকে একটি হুইল চেয়ারে করে আদালতে আনা হয়। আদালত চলে আধা ঘণ্টারও কম সময়।

শুনানি শেষে আদালত আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর মামলার শুনানির দিন রেখেছেন।

আদালতে কারাগার বসানো উপলক্ষে সকাল থেকে কারাগার এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা নেওয়া হয়েছে। কারাগারের সামনের সড়কে যানবাহন ও সাধারণ মানুষের চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

সকালে পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের বিভিন্ন স্থানে বসানো হয়েছে তল্লাশি চৌকি। কারাগারের ফটকের সামনে নিরাপত্তা অন্যান্য দিনের চেয়ে আরো জোরদার ছিল। গলির মুখে মুখেও ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। বন্ধ রাখা হয়েছিল ওই এলাকার দোকানপাট।

বুধবার সকাল থেকে কারাগারের সামনে অবস্থান নেন গণমাধ্যমকর্মী, বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার আইনজীবী ও নেতাকর্মীরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি প্রস্তুত রাখা হয়েছিল ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের গাড়ি।

বিশেষ আদালত-৫-এর কর্মকর্তা তাজুল ইসলাম আদালত শুরু আগে বলেছিলেন,‘এরই মধ্যে আসামি ও বাদীপক্ষের আইনজীবীদের বলে দেওয়া হয়েছে, তাদের ছয়জন করে মোট ১২ জন কারা অভ্যন্তরে বসা আদালতে যেতে পারবেন। ছয়জন আইনজীবীর তালিকা জমা দেওয়ার জন্য আসামিপক্ষের প্রধান আইনজীবী এ জে মোহাম্মদ আলী এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রধান আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজলকে বলা হয়েছে।’

কারাগারে সাংবাদিকদের প্রবেশের অনুমতি ছিল। তবে সেখানে কোনো ক্যামেরাপারসনকে যেতে দেওয়া হয়নি। সাংবাদিকদের মোবাইল রেখে শুধু আইডি কার্ড নিয়ে যেতে পারবেন বলে জানান তাজুল ইসলাম।

মঙ্গলবার বিকেলে কারা অভ্যন্তরে আদালত বসা নিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে আইন মন্ত্রণালয়। তবে একে ‘আইন পরিপন্থী’ বলেছেন খালেদা জিয়ার দল বিএনপি ও তার আইনজীবীরা।

আইন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ‘নিরাপত্তাজনিত কারণে সরকারি আলিয়া মাদ্রাসার মাঠে স্থাপিত অস্থায়ী আদালত থেকে নাজিমুদ্দিন রোডে অবস্থিত পুরাতন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রশাসনিক ভবনের কক্ষ নম্বর ৭-কে অস্থায়ী আদালত ঘোষণা করা হয়েছে। এখন থেকে সেখানেই খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া চ্যারিটেবল দুর্নীতি মামলার বিচারকাজ সম্পন্ন হবে।’

চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় মোট আসামি চারজন। খালেদা জিয়া ছাড়া অভিযুক্ত অপর তিন আসামি হলেন—খালেদা জিয়ার তৎকালীন রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, হারিছ চৌধুরীর তৎকালীন একান্ত সচিব জিয়াউল ইসলাম মুন্না এবং ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার একান্ত সচিব মনিরুল ইসলাম খান। এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছেন মোট ৩২ জন।

২০১০ সালের ৮ আগস্ট তেজগাঁও থানায় জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা করা হয়।

মামলার অভিযোগ থেকে জানা গেছে, জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে অবৈধভাবে তিন কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা লেনদেনের অভিযোগে খালেদা জিয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে ২০১০ সালের ৮ আগস্ট তেজগাঁও থানায় মামলাটি দায়ের করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

২০১২ সালের ১৬ জানুয়ারি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের উপপরিচালক হারুন-অর-রশীদ সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়।

এর আগে গত ৮ ফেব্রুয়ারি দুদকের দায়ের করা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫-এর বিচারক ড. আখতারুজ্জামান। এ মামলায় খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমানসহ অন্য আসামিদের ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া অর্থদণ্ডও করা হয়। রায়ের পর খালেদা জিয়া রাজধানীর নাজিমুদ্দিন রোডের পুরাতন কেন্দ্রীয় কারাগারে সাজা ভোগ করছেন।