১৭ নভেম্বর ২০১৮

আরো ঘনিষ্ঠ হচ্ছে রাশিয়া-চীন-তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বিরোধের জের

আরো ঘনিষ্ঠ হচ্ছে রাশিয়া-চীন-তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বিরোধের জের - সংগৃহীত

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন জানিয়েছেন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং আগামী সেপ্টেম্বরে রাশিয়া সফরে আসছেন। শি জিনপিং রাশিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় শহর ভ্লাদিভস্তকে একটি অর্থনৈতিক ফোরামের সম্মেলনে অংশ নেবেন বলে প্রেসিডেন্ট পুতিন জানান।

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বিরোধে জড়িয়ে পড়েছে রাশিয়া এবং চীন উভয় দেশ। এর ফলে দুই দেশই একে অপরের আরো ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এদিকে ন্যাটোর সদস্য হয়েও রাশিয়া-চীনের ঘনিষ্ঠ হচ্ছে তুরস্ক। ওয়াশিংটনের পদক্ষেপের জবাবে মার্কিন পণ্যের উপর শাস্তিমূলক শুল্ক চাপায়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট। এদিকে আমেরিকার দাবি, বর্তমান অর্থনৈতিক দুরাবস্থার জন্য তুরস্ক একাই দায়ী।

ওয়াশিংটন থেকে প্রবল চাপের মুখে পড়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান পাল্টা পদক্ষেপ নিলেন। তিনি আমেরিকায় তৈরি ইলেকট্রনিক পণ্য বর্জন করার ডাক দেবার পাশাপাশি সে দেশ থেকে গাড়ি, তামাক, মদসহ বেশ কয়েকটি পণ্যের আমদানির ক্ষেত্রে শুল্কের হার দ্বিগুণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। 

আমেরিকায় তৈরি অ্যালকোহলযুক্ত পানীয়র ক্ষেত্রে ১৪০ গুণ শুল্ক বাড়ানো হয়েছে, গাড়ির ক্ষেত্রে তা ১২০ শতাংশ। প্লাস্টিক ও কয়লার ক্ষেত্রেও শাস্তিমূলক শুল্ক চাপিয়েছেন এরদোগান। এর আগে মার্কিন প্রশাসন তুরস্ক থেকে ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম আমদানির ক্ষেত্রে বাড়তি শুল্ক চাপিয়েছিল। প্রেসিডেন্ট ও তার প্রশাসন সঙ্কট কাটাতে এখনো নমনীয় হতে প্রস্তুত নন।

জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছেন এরদোগান। বিদেশি পণ্যের উপর নির্ভরতা কমাতে দেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার উপর জোর দিয়েছেন তিনি। ন্যাটো সদস্য দেশ হওয়া সত্ত্বেও রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে নতুন জোট গড়ার হুমকিও দিয়েছেন তিনি।

আর্থিক ও অর্থনৈতিক সঙ্ককটর জের ধরে তুর্কি লিরার বিনিময় মূল্য চলতি বছরে প্রায় ৪০ শতাংশ কমে গেছে। সমস্যা এখনো রয়ে গেছে। তুরস্কের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পদক্ষেপ সত্ত্বেও বাজারে অনিশ্চয়তা কাটছে না।

অনেক বিশেষজ্ঞ সংকট কাটাতে কড়া আর্থিক নীতি ও কড়া হাতে সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দিচ্ছেন। এদিকে ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, তুরস্কের অর্থনৈতিক দুরবস্থা মোটেই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে শুরু হয়নি। অর্থনীতিবিদদের প্রশ্ন করলেও তারা বলবেন, যে সাম্প্রতিক মার্কিন নীতি ও সেগুলি কার্যকর করার সাথে তুরস্কের ঘটনাবলির সম্পর্ক নেই।

হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, তুরস্কে আটক মার্কিন যাজক ব্রানসনসহ অন্যান্য মার্কিন নাগরিক ও দূতাবাস কর্মী এখনো মুক্তি না পাওয়ায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অত্যন্ত হতাশ হয়েছেন। ব্রানসন মুক্তি না পেলে আরো কড়া অর্থনৈতিক চাপের ইঙ্গিত দিয়েছে মার্কিন প্রশাসন।

সোমবার মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন ওয়াশিংটনে তুরস্কের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে মার্কিন যাজক ব্রানসনের বিষয়ে আলোচনা করেন। তুরস্কের সরকার এখনো পর্যন্ত সে দেশের বিচার ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করতে অস্বীকার করছে।

চীন-রাশিয়া সম্পর্ক আরো জোরদার করতে চান শি-পুতিন
এএফপি, ১০ জুন ২০১৮

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং শুক্রবার বেইজিংয়ে রাষ্ট্রীয় সফরে আসা রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনকে স্বাগত জানিয়ে দুই দেশের চলমান সম্পর্কের প্রশংসা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়া দুই বৃহৎ রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধানদের এ সাক্ষাৎ বিশ্ব-রাজনীতিতে নতুন বাঁকের সূচনা করতে পারে। 

দ্য গ্রেট হলে দুই নেতার সাক্ষাতের আগে রুশ নেতাকে গার্ড অব অনার ও শিশুদের পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে বরণ করে নেয়া হয়। সাক্ষাতে পুতিনকে শি বলেন, আন্তর্জাতিক অবস্থার যত পরিবর্তনই হোক না কেন, চীন ও রাশিয়া সব সময়ই পারস্পরিক সম্পর্কের উন্নয়নকে প্রাধান্য দিয়ে এসেছে। এ ছাড়া দু’টি দেশ সব সময়ই পরস্পরের মূল আগ্রহগুলোকে জোরালোভাবে সমর্থন করেছে, বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদার করেছে এবং ‘অভিন্ন উদ্দেশ্যে একটি সম্প্রদায়’ গঠনের জন্য বৈশ্বিক পর্যায়ে অংশগ্রহণ করেছে।

চীন ও রাশিয়ায় গত কয়েক দশকের সবচেয়ে শক্তিশালী দুই নেতা শি ও পুতিন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ করে আসছেন, দেশ দু’টি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ও নীতিকে আঘাত করছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে দুই নেতার সম্পর্ক আরো জোরদার হয়েছে। পুতিন জানান, দুই নেতার মধ্যে ‘ফলপ্রসূ’ আলোচনা হয়েছে। তিনি বলেন, রাশিয়া ও চীনের মধ্যে সম্পর্ক মৈত্রীর, প্রতিবেশীসুলভ এবং তারা কৌশলগত অংশীদারিত্বের চেতনায় সম্পর্কোন্নয়ন করছে।

বিশ্লেষকেরা মনে করেন, দুই নেতাই একই ধরনের নেতৃত্বশৈলী অনুসরণ করেন। কার্নেগি মস্কো সেন্টারের সিনিয়র ফেলো আলেক্সান্ডার গাবুয়েভ বলেন, শি ও পুতিন আত্মার বন্ধু, যারা তাদের নিজ নিজ দেশকে আবার মহান করতে চান। দু’জনই মার্কিন আধিপত্যবাদের প্রতি অবিশ্বাসী, দু’জনই মার্কিন মনোভাবগুলোকে সন্দেহ করেন এবং দু’জনই কর্তৃত্বপরায়ণ ব্যক্তিত্বের শাসক। মার্চে পুতিন চতুর্থ মেয়াদে পুনর্নির্বাচিত হন। একই মাসে চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি শিকে আজীবন ক্ষমতায় রাখতে যে আইনি বাধা ছিল তা তুলে নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্যযুদ্ধ এড়ানোর জন্য বর্তমানে চীন আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে, অপর দিকে সিরিয়া ও ইউক্রেনসহ বেশ কিছু ইস্যুতে ওয়াশিংটনের সাথে মস্কোর গভীর মতানৈক্য চলছে।

সামরিক শক্তি বাড়াতেই এস-৪০০ কিনছে তুরস্ক

তুরস্কের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সোলায়মান সোয়লু বলেছেন, তার দেশের নিরাপত্তা রক্ষা করার অধিকার অনস্বীকার্য এবং এজন্য রাশিয়ার তৈরি এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার কোনো প্রচেষ্টা বাদ রাখবে না আঙ্কারা।

তিনি বলেন, ‘বর্তমানে নিজের ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করার ক্ষমতা তুরস্কের নেই। এ অবস্থায় রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিনলে তুরস্কের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করবে। যেসব দেশ তুরস্ককে উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিনতে বাধা দিচ্ছে তারা তুরস্কের সামরিক শক্তি দুর্বল করতে চায়।’

সোয়লু আরো বলেন, ‘এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনা হবে তুরস্কের জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার স্বার্থে এবং এ নিয়ে রাজনীতি করার কিছু নেই। রুশ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা কিনলে তুরস্কের অবস্থান শক্ত হবে।’

বৃহস্পতিবার তুরস্কের ইংরেজি ভাষার দৈনিক হুররিয়াত পত্রিকা অজ্ঞাত কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে একটি খবর দিয়েছে যাতে বলা হয়েছে, মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, তুরস্ক এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যস্থা কিনলেও যেন ব্যবহার না করে।

এস-৪০০ হচ্ছে একটি উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যা ৪০২ কিলোমিটার দূরের শত্রুর ক্ষেপণাস্ত্র, যুদ্ধবিমান কিংবা ড্রোনকে চিহ্নিত ও ধ্বংস করতে সক্ষম। এর আগে এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শুধুমাত্র চীন ও ভারতের কাছে বিক্রি করেছে রাশিয়া।

২০১৫ সালে আমেরিকা তুর্কি সীমান্ত থেকে পেট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরিয়ে নেয়ার পর আংকারা নিজের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করার চেষ্টা করছে। এজন্য গত বছরের শেষ দিকে তুরস্ক রাশিয়ার সঙ্গে একটি চুক্তি চূড়ান্ত করেছে। চুক্তি অনুসারে ২০১৯ সালের শেষ দিকে কিংবা ২০২০ সালের প্রথম দিকে এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহ শুরু করবে মস্কো।


আরো সংবাদ