Naya Diganta

শাঁওইলের চাদর ও কম্বল যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে

শাঁওইলের চাদর ও কম্বল যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে

বগুড়ার শাঁওইলের তৈরি কম্বল ও চাদর দেশের সীমা ছাড়িয়ে রপ্তানি হচ্ছে মধ্যপ্রচ্যের বিভিন্ন দেশে। পুরানো সুয়েটারের সুতা, ঝুট থেকে বাছাই করা সুতা দিয়ে নতুন করে বুনানো সস্তা কম্বল ও চাদরের কদর বাড়তে শুরু করেছে দেশ-বিদেশে। এতে করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন ওই এলাকার হাজার হাজার মানুষ।

তাঁতী, ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, পুরাতন সুতা বাছাই ও উল্টা চড়কায় সুয়েটারের সুতা খুলে কাজে বগুড়া, জয়পুরহাট ও নওগাঁ জেলার প্রায় ৫০ হাজারের অধিক মানুষ কম্বল ও চাদর বানিয়ে জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করছেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা শাঁওইল গ্রাম থেকে প্রতি শীত মৌসুমে প্রায় কয়েক কোটি টাকার কম্বল ও চাদর ক্রয় করে থাকেন। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না থাকার পরও সম্ভাবনাময় এ শিল্প স্থানীয়দের প্রচেষ্টায় আজ দেশ ও বিদেশের বাজার দখল করে নিয়েছে বলে জানান তিনি।

প্রবীণ তাঁত কারিগর মোজাহার হোসেন, মকবুল হোসেন, আব্দুল হামিদ, ফজলুর রহমান, আফজাল হোসেন, মীর কাশেম আলী জানান, জেলা শহর থেকে ৩৮ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত শাঁওইল গ্রাম। এই গ্রামের তাঁতি সম্প্রদায়ের লোকেরা পূর্বে গামছা এবং লুঙ্গি তৈরি করে স্থানীয় হাটবাজারে বিক্রি করতো। বাজারে এর ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি হলে গার্মেন্টের সুতা কিনে শুরু করে বিভিন্ন ডিজাইনের চাদর ও কম্বল বুনানো। প্রথম দিকে গ্রামের পুরুষরা চাদর ও কম্বল বুনন ও বিক্রি শুরু করলেও এখন নারী পুরুষরা মিলে এ কাজ করেন। কৃষি প্রধান এলাকায় বাড়তি আয়ের উৎস হিসেবেই এই তাঁতি স¤প্রদায় কম্বল ও চাদর বুনন শুরু করেন। এভাবে যতদিন অতিবাহিত হয়েছে শাঁওইল গ্রামের চাদর কম্বলের কদর ততই বেড়েছে। এখন শুধু শাঁওইল গ্রামেই নয় তাদের দেখাদেখি পার্শ্ববর্তী গ্রামের শত শত পরিবার তৈরি করছে শীতকালে ব্যবহারের জন্য বাহারি রকমের চাদর ও কম্বল। বর্তমানে শাঁওইল গ্রামের প্রতিটি বাড়িতেই রয়েছে ছোট-বড় দু'একটি তাঁত মেশিন। শীতকালে পুরুষের পাশাপাশি গৃহবধূরাও কম্বল আর চাদর বুননে ব্যস্ত থাকেন।

এ ব্যাপারে ওই গ্রামের তাঁত শিল্প কারিগর আলিমুদ্দিন শেখ জানান, দৈনিক মজুরীর ভিত্তিতে কম্বল বুননের কাজ করেন তিনি। শীত আসার আগে থেকেই তারা এ কাজ শুরু করেন। শীত মৌসুমের পরেও চলে এ কাজ। বড় মহাজনরা ডিজাইন দিয়ে সারা বছর চুক্তিতে কাজ করে নেয়। একই গ্রামের গৃহবধু আয়শা সিদ্দিকা জানান, তিনি একটি তাঁত মেশিন বসিয়ে চাদর বুননের কাজ করেন। এ তাঁত মেশিনের উপর নির্ভর করে ৪ জনের সংসার চলে। তিনিসহ পরিবারের সব সদস্য সেখানে কাজ করেন। তারা সারা দিনে ১৫ থেকে ২০টি চাদর তৈরি করেন। প্রতিটি চাদর ৩৫ থেকে ৪০ টাকা লাভে বিক্রি করেন। ওই গ্রামের চাদর তৈরির কারিগর রেজাউল করিম জানান, আগে লাভ হতো বেশি। এখন রং ও সুতার দাম বেড়ে যাওয়ায় কম্বল তৈরিতে খরচ পড়ছে বেশি। তার মতো গ্রামের সবাই নিজেদের তাগিদেই এ কম্বল ও চাদর বুনে যাচ্ছেন। কম্বল চাদরের পাশাপাশি গামছা, সুয়েটার, হাত মোজা, শিশুদের জন্য বিভিন্ন ডিজাইনের শীতের কাপড়ও তৈরি হচ্ছে।

শাঁওইল হাট ও বাজার কমিটির সভাপতি মোফাজ্জল হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক ফারুক হোসেন জানান, সাঁওইল গ্রামসহ আশপাশ গ্রামের হাজার হাজার মানুষ কম্বল চাদর তৈরি করে নিজেদের ভাগ্যোন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। এ কাজের সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রায় অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ। বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা কম্বল ও চাদর ক্রয় করতে আসেন। প্রতি রবিবার ও বুধবার ভোর থেকে শুরু বেলা ১০টা পর্যন্ত চলে এ হাটে বেচাকেনা। হাটবার ছাড়াও বেচাকেনা হয়। পাইকারি ব্যবসায়ীরা এখান থেকে কেনাকাটা করে বিভিন্ন জেলায় চাদর ও কম্বল সরবরাহ করার পাশাপাশি সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমারসহ মধ্য প্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে সরবরাহ করেন।