০১ ডিসেম্বর ২০২০

ওয়াসার পানির ভুতুড়ে বিল

-

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে রাজধানীর ভাড়াটিয়াদের অনেকেই গ্রামে চলে গেছেন। করোনা থেকে মুক্ত থাকতে বারবার হাত ধোয়ার পরামর্শ দেয়া হলেও বাড়িতে নিয়মিত অবস্থানকারীদের ক্ষেত্রে ততটা প্রয়োজন পড়েনা। ফলে পানির ব্যবহার কমেছে কিন্তু পানির বিল বেড়েছে কয়েকগুণ। বিল পেয়ে চক্ষু চড়ক গাছ বাড়ি মালিকদের। তারা ভুতুড়ে বিলের কারণ জানতে ওয়াসার অফিসগুলোতে ধরনা দিচ্ছেন কিন্তু কোনো সমাধান পাচ্ছেন না।
রাজধানীর বাড্ডার বাসিন্দা আমিনুল হক। তার বাড়িতে তিনি ছাড়াও চারটি পরিবার ভাড়া থাকে। এ মাসে তার পানির বিল এসেছে ৫৮০০ টাকা। আমিনুল হক নয়া দিগন্তকে বলেন, পানির বিল বৃদ্ধির কারণে কিছু বাড়তে পারে। সর্বোচ্চ দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা হতে পারে। কিন্তু এখন যেখানে অনেক ভাড়াটিয়া চলে গেছে সেখানে এত অস্বাভাবিক বিল কেন বুঝতে পারছি না।
রাজধানীর ৫৩১/বি/১ পশ্চিম শেওড়াপাড়ার (সাদেক মসজিদ গলি) কাদামাটি আবাসিক ভবনটির বিপরীতে এতদিন প্রতি মাসে পানির বিল আসত ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা। গত চার-পাঁচ মাস হলো সেই বিল বেড়ে ১৬-১৭ হাজার টাকা দাঁড়িয়েছে। কিন্তু ভবনের বাসিন্দারা পানির ব্যবহার বাড়াননি। আগের মতোই তারা পানি ব্যবহার করেন। এই মাত্রাতিরিক্ত পানির বিল বৃদ্ধির কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না তারা। ওয়াসার সাথে যোগাযোগ করেও কোনো সুরাহা করতে পারেননি। ওয়াসা থেকে বলা হচ্ছে মিটারে যা রিডিং দেখাচ্ছে, তারা সেটাই বিল করছেন।
গতকাল মহাখালি ওয়াসা অফিসে দেখা যায়, পানির বিল নিয়ে বিপাকে পড়া কয়েক শ’ মানুষের দীর্ঘ লাইন। তারা অভিযোগ জানাতে এসেছেন। তারা বলেন, অসংখ্য ভবনের বিপরীতে মাত্রাতিরিক্ত বিল আসছে। সম্প্রতি এটা ব্যাপক পরিমাণ বেড়েছে। কিন্তু ওয়াসা কোনো গা করছে না। মাঝেমধ্যে গ্রাহককে মিটার বদলাতে বলা হচ্ছে। বদলানোর পরও বিলের তেমন হেরফের হচ্ছে না।
ওয়াসায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রতি বছর জুলাই মাস থেকে পানির দাম ৫ শতাংশ হারে বাড়ে। এ হিসাবে প্রতি হাজারে ৫০ টাকা বাড়তে পারে। দাম বৃদ্ধির সাথেও বিলের কোনো সামঞ্জস্য তারা খুঁজে পাচ্ছেন না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এক সময় ওয়াসায় সিস্টেম লস ছিল প্রায় ৪০ শতাংশ। সেই সিস্টেম লস কমাতে রাজস্ব আদায় কার্যক্রম বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়ার উদ্যোগ নেয় ওয়াসা। ২০০৯ সাল থেকে পানির বিল তৈরি, সরবরাহ ও আদায়-সংক্রান্ত যাবতীয় দায়িত্ব দেয়া হয় ঢাকা ওয়াসা শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নকে। তারা পিপিআই (প্রোগ্রাম ফর পারফরম্যান্স ইমপ্রুভমেন্ট) প্রকল্পের আওতায় ঢাকা ওয়াসার রাজস্ব আদায়ের যাবতীয় দায়িত্ব পায়। অবশ্য আইনসম্মত কি না তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ওয়াসার সাথে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী আদায়কৃত অর্থের ১০ শতাংশ পাবে পিপিআই প্রকল্প কর্তৃপক্ষ বা ঢাকা ওয়াসা শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়ন। ইউনিয়নের সদস্যরা ওই অর্থের ভাগীদার হবে। বাকি অর্থ পাবে ওয়াসা। প্রথমে দু’টি অঞ্চলের দায়িত্ব পিপিআইকে দেয়া হয়। ওই দু’টি অঞ্চলে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির পর পর্যায়ক্রমে ১৩টি অঞ্চলের সাতটির দায়িত্বও পিপিআইকে দেয়া হয়। এসব এলাকার মধ্যে রয়েছেÑ ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, আদাবর, বৃহত্তর মিরপুর, কাফরুল, গুলশান, মহাখালী, বনানী, বারিধারা, মতিঝিল, কদমতলী, বাসাবো, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, বাড্ডা, উত্তরা প্রভৃতি। অবশ্য একের পর এক নতুন এলাকা পিপিআইর অধীনে আসার পর ওয়াসার রাজস্ব আদায়ও বেড়ে যায়। সিস্টেম লসও কমে ২০ শতাংশে দাঁড়ায়। এতে অনেকটা বাহবাও পেয়েছে ওয়াসা। তবে অভিযোগ রয়েছে, প্রকৃত সিস্টেম লস কমেনি। গ্রাহকদের কাছ থেকে অবৈধভাবে মাত্রাতিরিক্ত বিল আদায় করে রাজস্ব বাড়ানো হয়েছে।
জানা যায়, পিপিআইর অধীনে যাওয়ার পর থেকেই ওয়াসার বিল বাড়ছে। বাড়ছে লাভের পরিমাণ। ওয়াসার বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১১-১২ অর্থবছরে ৫ হাজার ৭৪ কোটি টাকার পানি বিক্রি করে লাভ হয় ৪ কোটি টাকা। ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৫ হাজার ৭৪৮ কোটি টাকার পানি বিক্রি করে লাভ হয় ৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৬ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকার পানি বিক্রি করে লাভ হয় ৭ কোটি টাকা, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৭ হাজার ৯৭২ কোটি টাকার পানি বিক্রি করে লাভ হয় ১০ কোটি ৪৮ লাখ টাকা, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৯ হাজার ৭১৩ কোটি টাকার পানি বিক্রি করে লাভ হয় ১৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা। তবে ওয়াসার পানির উৎপাদন কিন্তু তেমন একটা বাড়েনি। ২০১৩ সালে ওয়াসার পানির উৎপাদন ছিল প্রতিদিন গড়ে ২৪২ কোটি লিটার, ২০১৬ সালের হিসাবে দেখা যাচ্ছে উৎপাদন হয়েছে প্রতিদিন গড়ে ২৪৫ কোটি লিটার। কিন্তু ২০১৩ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে রাজস্ব আদায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা ওয়াসার বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক উত্তম কুমার রায় নয়া দিগন্তকে বলেন, বিলের ব্যাপারে আমরাও ফোনে অনেক অভিযোগ পাচ্ছি। তবে গ্রাহকরা জানেন প্রতি জুলাই মাসে ৫% হারে দাম বাড়ানো হয়। তবে এবার সরকার মোট ২৫ শতাংশ দাম বাড়িয়েছে। যেটা পত্রিকার মাধ্যমে গ্রাহকরাও সবাই জানে। তা ছাড়া করোনার কারণে এপ্রিল মাসে কর্মীরা যারা ফিল্ডে যেতে পারেননি তাদের বলা হয়েছিল আগের মিটার রিডিং দেখে কিছু কম বিল করতে। এ মাসে সেটা সমন্বয় করা হয়েছে। এ কারণেও পানির বিল বেড়েছে। তা ছাড়া করোনার কারণে মানুষ বেশি বেশি হাত ধোয়ার কারণে পানির ব্যবহারও বেড়েছে। এ জন্য গ্রাহকদের বলব আপনারা মিটার রিডিংটা ঠিকমতো দেখেন। যদি বেশি অসামঞ্জস্য মনে হয় আমাদের জানান। তাহলে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বরত মিটার রিডারদের বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নেবো।

 


আরো সংবাদ