১৬ আগস্ট ২০২২
`

শোকরানা মাহফিলে নির্বাচনের জন্য কওমিদের দোয়া চাইলেন প্রধানমন্ত্রী

সোশ্যাল মিডিয়ায় অপপ্রচার বন্ধে সাইবার ক্রাইম আইন করেছি ; শেখ হাসিনাকে কওমি জননী উপাধি ; মাওলানা শফীকে স্বাধীনতা পদক দেয়ার দাবি
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শোকরানা মাহফিলে উপস্থিত আলেম-ওলামা; ডানে আল্লামা শফীর সাথে প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছা বিনিময় : বাসস -

আগামী নির্বাচনে জয়ের জন্য কওমি মাদরাসার আলেম-শিক্ষার্থী সবার কাছে দোয়া চেয়ে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘সামনে নির্বাচন আছে, আমি আপনাদের দোয়া চাই। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যদি ইচ্ছা করেন নিশ্চয়ই আবার জনগণের খেদমত করার সুযোগ আমাকে দেবেন। আর আল্লাহ যদি না চান দেবেন না, আমার কোনো আফসোস থাকবে না। আমি সব কিছু আল্লাহ ওপর ছেড়ে দিয়েছি।’
গতকাল রোববার দুপুরে রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ‘আল-হাইয়াতুল উলিয়া লিল জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশ’ আয়োজিত ‘শোকরানা মাহফিলে’ প্রধান অতিথির বক্তৃতাকালে তিনি এ কথা বলেন। কওমি মাদরাসা শিক্ষার সর্বোচ্চ স্তর দাওরায়ে হাদিসকে সাধারণ শিক্ষার স্নাতকোত্তরের স্বীকৃতি দেয়ায় এ মাহফিলের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান ও হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী। তিনি প্রধানমন্ত্রীর হাতে শোকরানা ক্রেস্ট তুলে দেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীকে সম্মাননা জানানোর আগে তাকে ‘কওমি জননী’ উপাধি দেন কওমি মাদরাসাগুলোর সর্বোচ্চ সংস্থা ‘আল-হাইয়াতুল উলিয়া লিল জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশ’র সদস্য মাওলানা মুফতি রুহুল আমিন। এ ছাড়া মাওলানা শাহ আহমদ শফীকে স্বাধীনতা পদক দিতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি জোর দাবি জানান শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানের খতিব মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসউদ।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, ‘বাংলাদেশের মাটিতে কোনো সন্ত্রাসী, জঙ্গি ও দুর্নীতিবাজের স্থান হবে না। সবাই ভালো থাকবে, সেভাবে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। দেশে কোনো ভিক্ষুক থাকবে না। যারা কাজ করতে পারবে না তাদের ভাতার ব্যবস্থা করব।’
কওমি আলেম ও শিক্ষার্থীদের সতর্ক করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা কোনো গুজবে কান দেবেন না। গুজব বিশ্বাস করবেন না। সোশ্যাল মিডিয়াতে নানা ধরনের অপপ্রচার চালানো হয়। এই অপপ্রচার বন্ধে এরই মধ্যে আমরা সাইবার ক্রাইম আইন করেছি। কেউ যদি এ ধরনের মিথ্যা অপপ্রচার চালায়, সাথে সাথে সেই আইন দ্বারা তাদের বিচার হবে, গ্রেফতার করা হবে।’
ওলামা-মাশায়েখদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনারা এতিমদের আশ্রয় দিয়েছেন, তাদের শিক্ষিত করছেন, মানুষ করছেন। এর চেয়ে ভালো কাজ আর হতে পারে না। আমরা সনদ দিয়ে তাদের স্বীকৃতি দিয়েছি। এখন তারা বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে চাকরি করে খেতে পারবে। এ জন্য আইন পাস করেছি। পরবর্তীতে কেউ যেন এসে সেটি বন্ধ করতে না পারে। আমরা মসজিদের ইমামদের ভাতা দিচ্ছি। বাংলাদেশের ৮০ হাজার আলেম-ওলামা ভাতা পাচ্ছেন।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশে ৫৬০টি মডেল মসজিদ হচ্ছে। এসব মসজিদে ইসলামী কালচারের ব্যবস্থা থাকবে। এখানেও অনেক আলেম-ওলামার কর্মসংস্থান হবে। আমি হজরত মোহাম্মদ (সা:)-এর পথ অনুসরণ করি। আল্লাহর যা কিছু সৃষ্টি, আল্লাহর নবী যে শিক্ষা দিয়েছেন সেই শিক্ষা নিয়ে পথ চলি এবং চলব। কারো প্রতি বিদ্বেষ নয়, সবার প্রতি রইল আমার শুভ কামনা।’ তিনি বলেন, ‘শুধু আল্লাহর কাছে এটুকু চাই, যেন মান-সম্মানের সাথে যেতে পারি এবং মানুষের সেবা করে যেতে পারি। মানুষের কল্যাণ করে যেতে পারি।’
ধর্ম অবমাননাকারীদের কঠোর শাস্তির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ধর্ম ও নবী করিম (সা:) সম্পর্কে কেউ অবমাননাকর কথা বললে, আইন দ্বারাই তার বিচার হবে। আমরা আইন নিজের হাতে তুলে নেবো না। আইনের মাধ্যমে বিচার করে উচিত শিক্ষা দেয়া হবে যাতে কেউ কোনোভাবে অপপ্রচার চালাতে না পারে।’
সন্ত্রাসীদের কোনো ধর্ম নেই উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘যারা সন্ত্রাসী তাদের কোনো ধর্ম নেই। তাদের কোনো দেশ নেই, তাদের কোনো সমাজ নেই। তারা হচ্ছে সন্ত্রাসী, জঙ্গিবাদী। সত্যিকার ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসীরা কখনো সন্ত্রাসী-জঙ্গিবাদী হতে পারে না।
দুনিয়ার স্বার্থে কওমি স্বীকৃতি দেয়া হয়নি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুনিয়ার স্বার্থের জন্য কওমির সনদের স্বীকৃতি দেইনি। আল্লাহকে রাজি-খুশি করার জন্য স্বীকৃতি দিয়েছি। আমরা চাই, দেশের আলেমরা সম্মান নিয়ে দেশের সেবায় নিয়োজিত থাকবেন।’
তিনি বলেন, ‘যখন কওমি স্বীকৃতির জন্য আমাকে সংবর্ধনা দেয়ার কথা বলা হলো, আমি বলেছি সংবর্ধনা আমার জন্য না। আমরা কওমি সনদ দিতে পেরেছি এর জন্য আল্লাহর কাছে শোকরিয়া আদায় করা দরকার।’
মাদরাসা শিক্ষার উন্নয়ন ও আলেম-ওলামাদের জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিভিন্ন কার্যক্রমের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ধর্মীয় শিক্ষা সংযুক্ত হলেই একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা পূর্ণাঙ্গ হয়। আর কেউ যেন কওমি স্বীকৃতি বাতিল করতে না পারে সেজন্য এই আইন (স্নাতকোত্তর স্বীকৃতি) করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘কওমি মাদরাসার মাধ্যমেই মুসলমানরা শিক্ষা গ্রহণ শুরু করেন। এই মাদরাসার শিক্ষার্থীরাই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন শুরু করেন।’
দেশের প্রতিটি মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে সরকার কাজ করছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কওমি শিক্ষার্থীদের দেশ ও জাতির জন্য কাজ করতে হবে।’
অনুষ্ঠান মঞ্চে কওমি আলেম-ওলামাদের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসন চায় সিঙ্গাপুর
বাসস জানায়, সফররত সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. বিবিয়ান বালাকৃষ্ণণ বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি গতকাল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে গণভবনে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসন চাই। কারণ, তাদের অবস্থান দীর্ঘায়িত হলে তারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে পারে।’ প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম বৈঠক শেষে সফররত পররাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্ধৃতি দিয়ে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন।
ড. বালাকৃষ্ণণ অবশ্য রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরুর প্রশংসা করেন। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্মম অভিযানে দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য রাখাইন থেকে এসব রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এ প্রসঙ্গে সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরার পর সেখানে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন যে, মিয়ানমার সরকার রাখাইনে রোহিঙ্গাদের অবস্থা দেখতে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোকে মিয়ানমার সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী এ সময় পুনর্ব্যক্ত করেন বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা দেশের জন্য বিরাট বোঝা। তিনি বলেন, বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা বিশেষ করে নারী ও শিশুরা মিয়ানমারে ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়েছে। আমরা মানবিক কারণে তাদের আশ্রয় দিয়েছি।
শেখ হাসিনা রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রশংসা করেন। তিনি মিয়ানমারকে বাংলাদেশের বন্ধুভাবাপন্ন দেশ হিসেবে উল্লেখ করে বাংলাদেশের মাটিকে কাউকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করতে না দেয়ার অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগকারীদের জন্য জমি বরাদ্দের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী এসব অঞ্চলে বড় ধরনের বিনিয়োগ করতে সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগকারীদের প্রতি আহ্বান জানান।
বিগত ১০ বছরে বাংলাদেশের ব্যাপক আর্থসামাজিক উন্নয়নের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকারের যথাযথ পদক্ষেপের ফলে গত অর্থবছরে ৭.৮৬ শতাংশ জিডিপি অর্জিত হয়েছে। চলতি অর্থবছরে তা ৮.২৫ শতাংশ হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী সিঙ্গাপুরের মাটি স্বল্পতার কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশের নদীগুলো ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে বিনামূল্যে এ দেশ থেকে বালু-মাটি নিতে সফররত পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী, এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়কারী মো: আবুল কালাম আজাদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব সাজ্জাদুল হাসান, সিঙ্গাপুরে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মোস্তাফিজুর রহমান এবং ঢাকায় সিঙ্গাপুরের হাইকমিশনার ডেরেক লোহ ইইউ-সি বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।


আরো সংবাদ


premium cement