Naya Diganta

সহিংসতা বাড়ছেই

গত ১ অক্টোবর রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানার মাতুয়াইল এলাকার দরবার শরিফ গলির সামাদ ভূঁইয়ার টিনশেডের বাড়িতে সাত বছরের শিশু জারিয়াকে ধর্ষণের পর হত্যা করে এক ঘাতক। ভোর ৬টায় ঘুম থেকে জেগে বাড়ির কমন টয়লেটে যায় শিশু জারিয়া। টয়লেট থেকে ফেরার পথে প্রতিবেশী যুবক জারিয়াকে টেনে নিজঘরে নিয়ে যায়। সেখানে ধর্ষণের পর হত্যা করে।
গত ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দেয়ায় নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলায় চরজুবলী ইউনিয়নের বাগ্যা গ্রামে এক গৃহবধূ (৩২) গণধর্ষণের শিকার হয়। নির্বাচনের রাতে ১০ জন মিলে ওই গৃহবধূর বাড়িতে গিয়ে তার স্বামী ও সন্তানদের বেঁধে রেখে তাকে বাইরে নিয়ে গণধর্ষণ করে।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ী ও নোয়াখালীর সুবর্ণচরের এ দু’টি ঘটনার মধ্যেই নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা সীমাবদ্ধ নয়। দেশের প্রায় প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় নিয়মিত ঘটছে এই সহিংসতা। গণমাধ্যমের কল্যাণে এর কিছু অংশ আমাদের নজরে আসে। বেশির ভাগই থেকে যায় দৃষ্টির আড়ালে। নারী নীরবে বয়ে বেড়ান এই সহিংসতা ও নির্যাতনের যন্ত্রণা।
জ্ঞানবিজ্ঞান, শিক্ষাদীক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নারীর উপস্থিতি ও অগ্রগতি অনেক বেড়েছে। বেড়েছে নারীর ক্ষমতায়ন। একইভাবে বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন বাংলাদেশের নারীরা। ইতোমধ্যে অনেকে বিশ্বের কাছে রোল মডেল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন। অথচ নারীর প্রতি সহিংসতা ও নারী নির্যাতনের মাত্রা কমেনি এতটুকুও বরং বেড়েছে। রাজধানীসহ সারা দেশে নারী নির্যাতনের ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলছে। গত এক বছরে সারা দেশে প্রায় চার হাজার নারী নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার হয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ভাষ্য মতে, আগের চেয়ে আইনের কড়াকড়ি কিছুটা বাড়ানো হলেও কোনোভাবে নারীর প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতন থামাতে পারেনি বরং এ সংখ্যা প্রতি বছর বেড়েই চলেছে। আইনের শিথিলতা, পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব, নারীকে মানুষ হিসেবে মূল্যায়িত না করাসহ সমাজের নানা বৈষম্যমূলক নীতি ও আচরণের কারণে নারী নির্যাতন ও নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়ে চলছে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য মতে, ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত গত এক বছরে রাজধানীসহ সারা দেশে তিন হাজার ৯১৮ জন নারী ও কন্যা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এ সংখ্যা গত বছরের তুলনায় অনেক বেড়েছে।
পরিসংখ্যান মতে, ২০১৮ সালে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৯৪২টি। এর মধ্যে গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৮২ জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৬৩ জনকে। এ ছাড়া, ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ১২৮ জনকে। একই সময়ে শ্লীলতাহানির শিকার হয়েছেন ৭১ জন, যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১৪৬ জন নারী ও কন্যাশিশু।
মহিলা পরিষদের তথ্য মতে, গত ১২ মাসে সারা দেশে এসিড সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন ১৯ জন। এতে তিনজনের মৃত্যু ঘটে। অগ্নিদগ্ধ হয়েছেন ৭৩ জন, যাতে মৃত্যু ঘটে ১৯ জনের। এ সময় অপহরণের ঘটনা ঘটেছে ১৪৫টি। নারী ও শিশু পাচার হয়েছে ৪১ জন। পাচারের শিকার নারী ও শিশুর মধ্যে ১৫ জনকে বিভিন্ন পতিতালয়ে বিক্রি করা হয়।
পরিসংখ্যান মতে, ২০১৮ সালে ৪৮৮ জন নারী ও শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। এ সময় হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে ৩৯ জনকে। যৌতুকের জন্য নির্যাতনের শিকার হয়েছে ২১২ জন। এর মধ্যে যৌতুকের কারণে হত্যা করা হয়েছে ১০২ জনকে। এ সময় গৃহপরিচারিকা নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৮৭ জন। এর মধ্যে হত্যা করা হয়েছে ৫৮ জনকে। এ ছাড়া নির্যাতনের কারণে চার গৃহকর্মী আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন। উত্ত্যক্ত করা হয়েছে ১৭১ জনকে। উত্ত্যক্তের কারণে অপমান সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন ১৪ জন। আর ফতোয়ার শিকার হয়েছেন ১২ জন।
তথ্য মতে, ২০১৮ সালে বিভিন্ন নির্যাতনের কারণে ৩০৫ জন আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন। এ সময় আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন আরো ১৮ জন। এ ছাড়া একই সময়ে আত্মহত্যায় প্ররোচনার শিকার হয়েছেন ৪৭ জন এবং ৩৭৭ জন নারী ও কন্যার রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে।
এ ছাড়া একই সময়ে বাল্যবিয়ের ঘটনা ঘটেছে ১৯৩টি, এর মধ্যে ৫২ কন্যাশিশুর বাল্যবিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। জোরপূর্বক বিয়ের শিকার হয়েছেন ২১ জন। তবে এই সময়ে ১৪১টি বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ করা গেছে। পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৯ জন। শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ২৮১ জন। এ ছাড়া বিভিন্নভাবে ঘরে-বাইরে আরো অনেক নারী ও কন্যা নির্যাতনের শিকার হয়েছে বলে পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আলেয়া পারভীন বলেন, নারী নির্যাতন আদিমকাল থেকেই চলে আসছে। তবে সময়ের পরিবর্তনে নির্যাতন ও সহিংসতার ধরন পাল্টেছে। নারীর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিই এর অন্যতম কারণ। নারী শুধু ঘরের বাইরেই নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার হচ্ছেন তা নয়, নিজ ঘরেও নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার হচ্ছেন নারীরা। শিশুকাল থেকেই নারী বৈষম্য ও প্রতিবন্ধকতার শিকার হচ্ছে নিজ পরিবারে।
তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের আইনকানুন এমন, অনেক সময় ধর্ষণের ঘটনা আদালতে প্রমাণ করার ক্ষেত্রে ধর্ষণের শিকার মেয়েদের অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়তে হয়।
নারী-শিশু নির্যাতন এত ভয়াবহ মাত্রায় আসার অন্যতম কারণ বিচার না হওয়া। নির্যাতনের যত ঘটনা দেশে ঘটে তার বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মামলা হয় না। অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতা ও অর্থ দিয়ে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়।
সাবেক মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, সরকার কিশোরী ও নারী নির্যাতন বন্ধের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং ইতোমধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপও গ্রহণ করেছে।