২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮
২ শিক্ষক‌কে চাক‌রি থে‌কে অব্যাহ‌তি

‌ঢাবির সেই বিত‌র্কিত নি‌য়োগ আট‌কে দি‌লো সি‌ন্ডি‌কেট

ঢাবি
আট‌কে দেয়া হ‌য়ে‌ছে ঢাবির সমাজ‌বিজ্ঞান বিভা‌গের সেই বিত‌র্কিত প্রার্থীর নি‌য়োগ। - নয়া দিগন্ত

শিক্ষা ছুটি নিয়ে বিদেশ যাওয়ার পর নোটিশ দিলেও যোগদান না করায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষককে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। আট‌কে দেয়া হ‌য়ে‌ছে সমাজ‌বিজ্ঞান বিভা‌গের সেই বিত‌র্কিত প্রার্থীর নি‌য়োগ। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আসন্ন ৫১তম সমাবর্তনের পূর্ব‌নির্ধা‌রিত বক্তা পরিবর্তন হয়েছে।

সোমবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেয়া হয় ব‌লে সি‌ন্ডি‌কে‌টের এক‌া‌ধিক সূত্র নি‌শ্চিত ক‌রে‌ছে।

চাকরি হারানো দুই শিক্ষক হলেন অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাশফিকুর রহমান খান ও উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের প্রভাষক তামান্না আফরিন রিমি।

একই ইস্যুতে বেশ কয়েকজন শিক্ষককে চাকরিতে যোগদান করতে ৮ সপ্তাহের সময় দেয়া হয়েছে।

সমাজবিজ্ঞান বিভাগে প্রভাষক পদে নিয়োগে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠায় একজনের নিয়োগ বাদ দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী বোর্ড সিন্ডিকেট। এর আগে এ নি‌য়ো‌গের অসঙ্গ‌তি নি‌য়ে প্রতি‌বেদন প্রকাশ হয় দৈনিক নয়া দিগন্তে।

নিয়োগে বাদ পড়া প্রার্থীর নাম এস এম ফাইজুল হক ইশান। তার থিসিস সুপারভাইজার ছিলেন সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম। তাকে বিভাগ কর্তৃক ইচ্ছাকৃত শিক্ষক বানানোর প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল বলে বাকি নিয়োগপ্রার্থীদের অভিযোগ ছিল।

সূত্র জানায়, সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানের সভাপতিত্বে সিন্ডিকেটের সভা বসে। রাত ৯টায় এ সভা শেষ হয়। সভায় সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে ভিসি অধ্যাপক আখতারুজ্জামান ইশানের এ নিয়োগ বাদ দেন। তবে বাকি দুজনকে প্রভাষক পদে স্থায়ী নিয়োগ দিয়েছে সিন্ডিকেট। নিয়োগপ্রাপ্ত সে দু’জন হলেন- ইসরাত জাহান ইয়ামুন ও ওয়াসিফা তাসনীম শাম্মা। তাদের মধ্যে ইয়ামুনের অনার্স ও মাস্টার্সের সিজিপিএ যথাক্রমে ৩ দশমিক ৭৪ ও ৩ দশমিক ৮৮, ওয়াসফিয়া শাম্মার সিজিপিএ যথাক্রমে ৩ দশমিক ৭২ ও ৩ দশমিক ৮৩। তারা দুজনই অনার্স ও মাস্টার্সে মেধাক্রমে প্রথম।

অন্যদিকে সমাবর্তন বক্তা নির্ধারণ করা হয়েছে জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামানকে। এর আগে গত ৩০ এপ্রিল সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এবারের ‘সমাবর্তন বক্তা’ হিসেবে লাইবেরিয়ার নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত মিজ. লেমাহ গবায়েইকে আমন্ত্রণ জানানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। উক্ত সমাবর্তন অনুষ্ঠানে তাকে ডক্টর অব লজ ডিগ্রি প্রদানেরও সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ত‌বে অনিবার্য কার‌ণে মিজ. লেমাহ সমাবর্তন বক্তা হি‌সে‌বে থাক‌তে না পারায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হ‌য়ে‌ছে।

‌সিন্ডিকেট সদস্য ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. হাসানুজ্জামান নয়া দিগন্ত‌কে ব‌লেন, সোমবার বিশ্ববিদ্যাল‌য়ের সি‌ন্ডি‌কেট সভায় এসব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হ‌য়ে‌ছে। সমাজ‌বিজ্ঞান বিভা‌গের উক্ত প্রার্থী‌কে নি‌য়ে বিতর্ক উঠ‌লে তা আট‌কে দেয় সি‌ন্ডি‌কেট। পাশাপা‌শি দুই প্রভাষ‌কে এর আগে বেশ ক‌য়েকবার চাক‌রি‌তে যোগদা‌নের জন্য বলা হ‌লেও তারা আসেননি। ফ‌লে সি‌ন্ডি‌কেট সর্বসম্ম‌তিক্রমে তা‌দের অব্যাহ‌তির সিদ্ধান্ত নেয়।

আরো পড়ুন :
ঢাবিতে মেধা নয়, নবম জনকে শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সমাজবিজ্ঞান বিভাগে মেধাকে পাশ কাটিয়ে অপেক্ষাকৃত কম মেধাবীকে এবং পছন্দের প্রার্থীকে শিক্ষক নিয়োগে সুপারিশের অভিযোগ উঠেছে। একই বিভাগ থেকে গ্রাজুয়েশন শেষ করা এবং দুটোতেই (অনার্স এবং মাস্টার্স) প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করা বিভিন্ন বর্ষের প্রার্থীদের বাদ দিয়ে মেধাক্রমের নবম স্থানে থাকা এক প্রার্থীকে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে।

এতে আবেদনকারী অন্যান্য প্রার্থী, বিভাগের শিক্ষক, এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষকদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করেছে। সূত্র জানায়, গত ১৩ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. নাসরীন আহমাদের সভাপতিত্বে সমাজবিজ্ঞান বিভাগে তিনজন প্রভাষক (স্থায়ী) নিয়োগের জন্য বোর্ড সভা বসে। অন্যান্য বোর্ড সদস্যরা ছিলেন সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক সাদেকা হালিম, বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নেহাল করিম, অধ্যাপক মনিরুল ইসলাম খান ও অধ্যাপক ড. জিনাত হুদা। বোর্ডে ৩৪ জন প্রার্থীর মধ্য থেকে তিনজনকে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা।

সুপারিশকৃতরা হলেন ইশরাত জাহান ইয়ামুন; সিজিপিএ অনার্স ও মাস্টার্স যথাক্রমে ৩.৭৪ ও ৩. ৮৮, ওয়াসফিয়া শাম্মা; সিজিপিএ যথাক্রমে ৩.৭২ ও ৩.৮৩ এবং ফাইজুল হক ইশান; সিজিপিএ যথাক্রমে ৩.৫৮ এবং ৩.৭৫ (মেধাক্রম নবম)। এদের মধ্যে ফাইজুল হক ইশানকে নিয়োগের সুপারিশ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সূত্র জানায়, অন্তত ১৫ জন প্রার্থী সিজিপিএতে তার থেকে এগিয়ে ছিলেন। এর মধ্যে তিনজন প্রার্থী ছিলেন যারা অনার্স ও মাস্টার্স উভয় পরীক্ষাতেই প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকারী। এছাড়া অন্তত দুইজন প্রার্থী ছিলেন যারা উভয় পরীক্ষায় মেধাক্রমে তৃতীয় ছিলেন।

সুপারিশকৃত ফাইজুল হক ইশানের থেকে মেধাক্রমে এগিয়ে থাকা কিছু প্রার্থী হলো- সাইফুল ইসলাম অনার্স ও মাস্টার্সে সিজিপিএ যথাক্রমে ৩.৬৬ ও ৩.৮২ (মেধাক্রম প্রথম), মুহাম্মদ আনোয়ার হোসাইন সিজিপিএ যথাক্রম ৩.৭৬ ও ৩.৯২ (মেধাক্রম প্রথম), তৌহিদ হোসেন খান (অনার্সে প্রথমস্থান বিদেশি ডিগ্রি আছে), এবিএম নুরুল্লাহ সিজিপিএ যথাক্রম ৩.৬৩ ও ৩.৭৬, শেখ রুকাইয়া হাসান সিজিপিএ ৩.৭১ ও ৩.৭৩, রাসেল হোসাইন সিজিপিএ ৩.৬৩ ও ৩.৭৮ (মেধাক্রম তৃতীয়), শামসুল আরেফিন সিজিপিএ ৩.৬৬ ও ৩.৭৩ (মেধাক্রম তৃতীয়), মাসুদুর রহমান সিজিপিএ ৩.৬৫ ও ৩.৬৮।

নিজেদের থেকেও অনেক কম যোগ্য প্রাথীকে নিয়োগের সুপারিশ করা নিয়ে মেধাতালিকায় শীর্ষে থাকা প্রার্থীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেন এক প্রার্থী বলেন, ভাইভা বোর্ডে ইচ্ছাকৃতভাবে হেনস্তা করা হয়েছে আমাদের। শীর্ষ মেধাবীদের বাদ দিয়ে অন্যদের শিক্ষক করলে পরিশেষে বিশ্ববিদ্যালয়ই ক্ষতিগ্রস্থ হবে। এমন ঘটনায় মতামত চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন সিনিয়র শিক্ষক ক্ষোখ প্রকাশ করে বলেন, সাবেক ভিসি অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিক অযোগ্যদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন বলে অভিযোগ তুলতেন বর্তমান বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসনে থাকা লোকজন।

এখন তারাই আবার সে পথে হাটতে চেষ্টা করেছেন। যোগ্যদের বাদ দিয়ে সুপারিশ করছেন। এটি বিশ^বিদ্যালয়ের জন্য আত্মঘাতী হবে। তারা আরো বলেন, মেধাকে পাশ কাটিয়ে অনুগতদের নিয়োগ দিলে বিশ^বিদ্যালয়ে এক সময় যোগ্য শিক্ষকদের সঙ্কটে পড়বে। সেই সাথে অনুগতদের নিয়োগ দেয়ার প্রবণতা চালু থাকলে চাটুকারদের আখড়ায় পরিণত হবে দেশের এ গর্বের বিদ্যাপীঠ।

এদিকে, সুপারিশকৃত ইশানের থিসিসের সুপারভাইজার ছিলেন সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের বর্তমান ডিন অধ্যাপক সাদেকা হালিম। ভাইভাতে তিনি তাকে অধিক নম্বর দিয়েছেন বলে অন্যান্য নিয়োগপ্রার্থীরা অভিযোগ তুলেছেন। এছাড়া তাকে আগে থেকে শিখিয়ে নিয়ে আসা হয় বলে একজন বোর্ড সদস্য অভিযোগ তোলেন। তবে এর সত্যতা যাচাই করা যায়নি। মেধাবীদের রেখে তুলনামূলক কম মেধাবীকে সুপারিশের বিষয়ে অধ্যাপক সাদেকা হালিম নয়া দিগন্তকে বলেন, নিয়োগ বোর্ডের সভাপতি ছিলেন প্রোভিসি ম্যাম। তাকে জিজ্ঞেস করেন। সিদ্ধান্তটি সভার সর্বসম্মতিক্রমে হয়েছে। আমি বোর্ডের সাধারণ একজন সদস্য। তার বেশি কিছু না।

বোর্ডের আরেক সদস্য অধ্যাপক ড. নেহাল করিম বলেন, হ্যাঁ এমন হয়েছে। তবে নিয়োগ বোর্ডের সভাপতিই ভালো জানেন কি জন্য তিনি তাদের নিয়েছেন। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে প্রোভিসি প্রশাসন অধ্যাপক ড. নাসরীন আহমাদের সাথে যোগাযোগের জন্য একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। সার্বিক বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, বোর্ডের সভাপতি ছিলেন প্রোভিসি (শিক্ষা)। তিনিই সবচেয়ে ভাল জানবেন। এটাতো একটা গোপনীয় ব্যঅপার এখনো আমাদের নজরে আসে নি।

সেটা নিয়ে আগে ভাগে মন্তব্য করা ঠিক হবে না। তবে বিষয়টি আমাদের নজরে থাকবে। প্রসঙ্গত, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের জন্য প্রোভিসি (শিক্ষা) এর সভাপতিত্বে বোর্ড বসে। বোর্ডে সুপারিশকৃতদের বিশ^বিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় চূড়ান্ত নিয়োগ দেয়া হয়। আগামী সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভা রয়েছে। এর আগেও বর্তমান ভিসির সময়ে বিশ^বিদ্যালয়ের কয়েকটি বিভাগে নিয়ম বহির্ভূত সুপারিশ করা হয়। তবে সিন্ডিকেটে তা বাতিল হয়ে যায়।


আরো সংবাদ