Naya Diganta

বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ১ মাসে কমলো ২২ শতাংশ

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম এক মাসের ব্যবধানে ২২ শতাংশ কমলো। অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম এক মাস আগে যেখানে ছিল প্রতি ব্যারেল ৯০ মার্কিন ডলারের ওপরে, সেখানে গতকাল তা কমে নেমেছে ৭০ দশমিক ৬৫ ডলার। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমে গেলেও দেশে এখনো এর কোনো প্রভাব পড়েনি। বাড়তি দামেই জ্বালানি তেলের দাম কিনতে হচ্ছে গ্রাহকদের।
জ্বালানি তেল আমদানিকারক সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন অব বাংলাদেশের (বিপিসি) এক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের চেয়ে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করা হয় বেশি পরিমাণ। ৫০ লাখ টন ডিজেল আমদানি করা হয়, যেখানে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করতে হয় পাঁচ লাখ টন। এ জ্বালানি তেল পরিশোধিত করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা হয়। ডিজেলের দাম যখন বাড়ানো হয়, তখন প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেল আমদানিতে বিপিসির ব্যয় হতো ৯৭ ডলার। তখন বেশি লোকসান গুনতে হচ্ছিল বিপিসিকে। এ লোকসান সমন্বয় করতে প্রতি লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ৬৫ টাকা থেকে ৮০ টাকায় উন্নীত করা হয়। কিন্তু নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে হঠাৎ করে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমতে শুরু করেছে। এর মধ্যে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের চেয়ে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বেশি পরিমাণ কমে যায়। যেমন নভেম্বরে গড়ে পরিশোধন জ্বালানি তেলের দাম ৯২ ডলারের মধ্যে নেমে আসে। যেখানে নভেম্বরের শুরুতে প্রতি ব্যারেল ৯৭ ডলার উঠে গিয়েছিল। ডিজেল আগের দামে বিক্রি করতে হলে প্রতি ব্যারেল ৭৪ ডলার নামতে হবে। কিন্তু এর পরেও প্রায় সাত ডলার প্রতি ব্যারেলে কমে গেছে। এর প্রভাব স্থানীয় বাজারে এখনো পড়েনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ২০১৩ সালে প্রতি লিটার ডিজেল ৬৮ টাকা বিক্রি করা হতো। তখন ডিজেলের আমদানি ব্যয় প্রায় ১০০ ডলারের কাছাকাছি ছিল। বেশি দামে কিনে কম দামে বিক্রি করায় তখন বিপিসিকে ১০ হাজার কোটি টাকার ওপরে সরকার ভর্তুকি দিতো। কিন্তু ২০১৩ সালের পর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমতে কমতে ২০১৬ সালে প্রতি ব্যারেল ৫০ ডলার নেমে যায়। তখন ডিজেলের দাম প্রতি লিটারে তিন টাকা কমিয়ে ৬৮ টাকা থেকে ৬৫ টাকায় নামিয়ে আনা হয়। এরপর থেকে ডিজেলের দাম আরো কমতে থাকে। একপর্যায়ে জ্বালানি তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ৩০ ডলারের নেমে এসেছিল। কিন্তু তখন আর জ্বালানি তেলের দাম স্থানীয় বাজারে কমানো হয়নি। অর্থাৎ বিদেশ থেকে কম দামে কিনে স্থানীয় বাজারে বেশি দামে বিক্রি করায় বিপিসি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। গত বছরও বিপিসি তার সব ব্যয় মিটিয়েও পাঁচ হাজার কোটি টাকা নিট মুনাফা করে। যার পুরোটাই সরকারের কোষাগারে জমা দেয়া হয়।
এ দিকে গত জুলাই থেকে জ্বালানি তেলের দাম হঠাৎ বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে তা বাড়তে বাড়তে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে এসে প্রতি ব্যারেল পরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ৯৭ ডলার এবং অপিরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ৯০ ডলারে উঠে যায়। তখন দাম বৃদ্ধির প্রবাহ থেকে ধারণা করা হয়েছিল প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যাবে। এ ধারণা থেকেই স্থানীয় বাজারে জ্বালানি তেলের দাম প্রতি লিটারে এক লাফে ২৩ শতাংশ বাড়িয়ে ৬৫ টাকা থেকে ৮০ টাকা করা হয়। যদিও বিপিসির হিসাবে বলা হয়, লিটারে ১৫ টাকা বৃদ্ধিতে বিপিসির এক বছরে বাড়তি আয় হবে ৭ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা। তবে জ্বালানি তেলে ভ্যাট, ট্যাক্স মিলে সরকারকে ৩০ টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি তেল বিপণন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) লোকসান গুনতে হয় লিটারে ১৩ টাকা ১ পয়সা। আর এ লোকসান সমন্বয় করতেই জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়। নতুন দাম কার্যকর হওয়ায় আবারো মুনাফায় ফেরে বিপিসি।
বিপিসির এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা গতকাল নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, গত বছর জ্বালানি তেল কম দামে কিনে বেশি দামে বিক্রি করায় সরকারকে ভ্যাট ট্যাক্স পরিশোধ করেও বিপিসির ৫ হাজার কোটি টাকা নিট মুনাফা হয়েছিল। যার পুরোটাই সরকারের কোষাগারে জমা দেয়া হয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় ৬৫ টাকা লিটারে বিক্রি করতে গিয়ে বিপিসি ডিজেলে লিটারে ১৩ টাকা ১ পয়সা লোকসান গুনতে হয়। সে হিসাবে দিনে প্রায় ২০ কোটি টাকার লোকসান গুনতে হয়। যদিও লিটারে সরকারকে ২৪ টাকার উপরে সরকারকে ভ্যাট ট্যাক্স দিতে হয়। মোটা দাগে সরকারের ভ্যাট ট্যাক্স পরিশোধের পরিসংখ্যান দিয়ে বিপিসির সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে সবশ্রেণীর জ্বালানি তেলে আমদানি শুল্ক রয়েছে ১০ শতাংশ, ভ্যাট ১৫ শতাংশ, অগ্রিম আয়কর ও আয়কর মিলে পরিশোধ করতে হয় আরো ৫ শতাংশ। সবমিলে সবশ্রেণীর জ্বালানি তেলে সরকারের ভ্যাট ট্যাক্স হিসেবে পরিশোধ করতে হয় ৩০ শতাংশের উপরে। এর পরেও গেল বছর লিটারে ৬৫ টাকা বিক্রি করে বিপিসির নিট মুনাফা হয়েছিল ৫ হাজার কোটি টাকা, যার পুরোটাই সরকারের কোষাগারে জমা দিতে হয়েছে। বিপিসির পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, বিপিসি এবং এর অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলো গত ২০১৯-২০২০ অর্থ বছরে ভ্যাট, ট্যাক্স ও বিভিন্ন ধরনের ডিউটি খাতে সরকারি রাজস্ব জমা দিয়েছে ১৪ হাজার ১২২ কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য হ্রাসের বিপরীতে দেশের বাজারে মূল্য স্থির থাকায় বিপিসি দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষতি কাটিয়ে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল।
এখন আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমে যাওয়ায় স্থানীয় বাজারে এর কোনো প্রভাব এখনো পড়েনি। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বিপিসি আপেক্ষা করছে দাম কমতে কমতে কোন পর্যায়ে তা স্থীর হয়। এটা পর্যবেক্ষণ করেই দাম কমানোর প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।
বিপিসির পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, দেশের সার্বিক জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৮ শতাংশ জোগান আসছে স্থানীয় উৎস হতে এবং অবশিষ্ট প্রায় ৯২ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে। প্রতি বছরেই জ্বালানি তেলের চাহিদা বেড়ে যাচ্ছে। বিপিসির প্রতিষ্ঠালগ্নে ১৯৭৬ সালে দেশে পেট্রোলিয়াম পণ্যের চাহিদা ছিল প্রায় ১১ লাখ টন। ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়ে গত অর্থবছরে (২০২০-২১) চাহিদা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬৬ লাখ টন। এর আগের অর্থবছরে (২০১৯-২০) দেশে ব্যবহৃত মোট জ্বালানি তেলের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৫ লাখ ৩ হাজার টন। ব্যবহৃত জ্বালানির ৭৩.১১ শতাংশ ডিজেল, ৬.৬২ শতাংশ ফার্নেস অয়েল, ৫.৮৬ শতাংশ পেট্রল, ৪.৭৮ শতাংশ অকটেন, ১.৯২ শতাংশ কেরোসিন, ৬.২৭ শতাংশ জেট এ-১ এবং ১.৪৪ শতাংশ অন্যান্য তেল। আর জ্বালানি তেলের ৬৪.২৭ শতাংশ পরিবহন, ১৮ শতাংশ কৃষি, ৭.৬৫ শতাংশ শিল্প, ৬.৭৪ শতাংশ বিদ্যুৎ, ১.৯৭ শতাংশ গৃহস্থালি এবং ১.৩৭ শতাংশ অন্যান্য খাতে ব্যবহার হয়েছে। আর ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের প্রায় ৮৪ শতাংশ নৌপথে, ৯ শতাংশ রেলপথে এবং ৭ শতাংশ সড়কপথে পরিবহন হয়ে থাকে।