০২ অক্টোবর ২০২০

এইডসের ঝুঁকি কাদের বেশি

-


এখন আর এইডস কোনো বিশেষ অঞ্চলে বা দেশে বা সম্প্রদায়ের মাঝে সীমাবদ্ধ নেই, এইচআইভি/এইডস রোগী এখন পৃথিবীর সব দেশেই দেখা যায় এবং এর বৃদ্ধির প্রবণতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। পৃথিবীর কোনো কোনো দেশে আজ এইচআইভি বহনকারীর সংখ্যা ৪০-৫০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। লিখেছেন মোহাম্মদ খায়রুল আলম

পৃথিবীর ইতিহাসের এ যাবৎকালে যত মহামারী হয়েছে, তার বিস্তার কোনো বিশেষ অঞ্চলে বা দেশে বা মহাদেশেই সীমাবদ্ধ ছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীর প্লেগ ছিল সবচেয়ে দীর্ঘ দিন স্থায়ী ও বিশাল এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পরা মহামারী। পুরো ইউরোপজুড়েই গ্লেগ মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু এইচআইভি/এইডস আজ পুরো পৃথিবীব্যাপীই ছড়িয়ে পড়েছে।
এইচআইভি/এইডস ধর্ম, বয়স, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যেকোনো মানুষের হতে পারে। আর এইডস আক্রান্ত ব্যক্তি সাধারণ যেকোনো রোগে মৃত্যুবরণ করে যেমনÑ ডায়রিয়া, যক্ষ্মা, জ্বর, ক্যান্সার প্রভৃতি। এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তি বাইরে থেকে দেখে বোঝার কোনো উপায় নেই, অর্থাৎ এইচআইভিতে আক্রান্ত হওয়ার দীর্ঘ সময় পর এর লক্ষণ রোগীর শরীরে ধরা পড়ে। রোগ নির্ণয় হওয়ার আগ পর্যন্ত এইচআইভি ভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তি সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের মতো জীবনযাপনে অভ্যস্ত থাকে, এ অবস্থায় সে তার নিজের অজান্তেই আরো অনেকের মাঝে এই ভাইরাস সংক্রমিত করতে পারে। সুতরাং বিভিন্ন কারণে এইচআইভি/এইডসের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ঝুঁকিপূর্ণ আচরণে বা অনিরাপদ যৌন মিলনে যারা অভ্যস্ত তাদের ক্ষেত্রে এইচআইভি/এইডস হওয়ার ঝুঁকি খুবই বেশি। একাধিক যৌনসঙ্গী যাদের থাকে, তাদের সবসময় যৌন মিলনের ক্ষেত্রে নিজেদের নিরাপদ রাখা সম্ভব হয় না। বাণিজ্যিক যৌন কেন্দ্রগুলোতে প্রত্যেক যৌনকর্মীকে সপ্তাহে প্রচুর খদ্দেরের মনোরঞ্জন করতে হয়। এ ক্ষেত্রে যৌনকর্মীরা সবসময় যৌন মিলনে নিজেদের নিরাপদ রাখতে পারে না বা প্রতি ক্ষেত্রে কনডম ব্যবহার করতে পারে না। তাই যারা পেশাদার যৌনকর্মীর সাথে নিয়মিত যৌনকর্ম করে থাকে, তাদের ক্ষেত্রে এইচআইভি/এইডস হওয়ার প্রবণতা বেশি থাকে। সুতরাং স্বামী-স্ত্রী ছাড়া একাধিক ব্যক্তির সাথে যৌন মিলন না করাই ভালো। যদি সম্ভব না হয়, তা হলে তাদের প্রতিবার যৌন মিলনে কনডম ব্যবহার করা একান্ত উচিত।
সিরিঞ্জের মাধ্যমে যারা নেশা করে তারাও এইচআইভি/এইডস সংক্রমণের বাহক হিসেবে কাজ করে থাকে। এসব নেশা সাধারণত দু-তিনজন মিলে অথবা দলবদ্ধভাবে নিয়ে থাকে। কোনো কোনো জায়গায় একই সিরিঞ্জ দিয়ে কয়েকজন নেশা করে, এ ক্ষেত্রে একজনের এইচআইভি/এইডস থাকলে একই সিরিঞ্জ ব্যবহারকারী সবাই খুব সহজেই সংক্রমিক হতে পারে। জাতীয় এইচআইভি এবং আচরণগত সার্ভিলেন্সের চতুর্থ পর্যায়ের জরিপে সিরিঞ্জের মাধ্যমে নেশা গ্রহণকারীদের মাঝে এইচআইভিতে আক্রান্তের সংখ্যা অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর থেকে বেশি পাওয়া যায়, বাংলাদেশে তখন কেন্দ্রীয় অঞ্চলে ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারীদের মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণের সর্বোচ্চ মাত্রা শতকরা চার ভাগ নির্ণীত হয়েছে।
বাংলাদেশে ১৯৯০ সালে বুপেনরফিন আসার পর থেকে সিরিঞ্জের মাধ্যমে নেশার প্রবণতা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে, এর কারণ হিসেবে দেখা যায়, এসব নেশা বস্তুর সহজলভ্যতাই প্রধান। তা ছাড়া যারা বিভিন্ন নেশায় আসক্ত তারা চার থেকে ১০ বছর পর সিরিঞ্জের মাধ্যমেই নেশার দিকে ঝুঁকে পড়ছে। আবার যারা হেরোইনে আশক্ত, তারা কখনো হেরোইন না পেলে সিরিঞ্জের বা শিরার মাধ্যমে নেশাকেই বেছে নেয়।
অপরিশোধিত সুচ বা এইচআইভি পরীক্ষিত নয় এমন রক্ত গ্রহণকারীদের এইডসের ঝুঁকি থাকে, কেননা আমাদের দেশে অনেক রক্তদাতা আছে যারা কোনো না কোনো নেশার সাথে সম্পৃক্ত থাকে এবং তারা মূলত নেশার টাকা জোগাড় করার জন্য রক্ত বিক্রি করে। আর এসব নেশা আসক্তদের এইচআইভি/এইডস সংক্রমণের ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সুতরাং আমাদের এইচআইভি/এইডস সংক্রমণের হাত থেকে মুক্তি পেতে হলে এইচআইভি/এইডস সংক্রমণের উৎস সম্পর্কে সবাইকে সচেতন হতে হবে। যেহেতু এর কোনো প্রতিষেধক নেই, তাই প্রতিরোধের উপায়গুলো ও সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ যারা তাদের এর ঝুঁকিপূর্ণ দিকগুলো সম্পর্কে জানাতে হবে।

 


আরো সংবাদ