১৫ নভেম্বর ২০১৮

খালেদা জিয়ার চিকিৎসা নিয়ে ছলচাতুরি চলছে : রিজভী

-

বিএনপি অভিযোগ করে বলেছে, দলের চেয়ারপারসন কারাবন্দি বেগম খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ হলেও এখনো পর্যন্ত তার সুচিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি সরকার। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যদের একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার পর দুদিন পার হয়ে গেলেও বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসা বিষয়ে কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আজ মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে এসব বলেন।

নয়া পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এই সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কবীর মুরাদ, কেন্দ্রীয় নেতা খায়রুল কবির খোকন, মো: মুনির হোসেন, আব্দুল আউয়াল খান প্রমুখ।

রিজভী বলেন, খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসকরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন দ্রুত বেগম জিয়ার চিকিৎসা না দেয়া হলে তার বাম পা ও হাত অবশ হয়ে যেতে পারে। তার শারীরিক অবস্থা দিন দিন অবনতি যাচ্ছে। তার চিকিৎসা নিয়ে ছলচাতুরি চলছে এবং কালক্ষেপণ করা হচ্ছে বলে আমরা মনে করি। আমি দলের পক্ষ থেকে কাল বিলম্ব না করে বেগম খালেদা জিয়াকে বেসরকারি বিশেষায়িত হাসপাতালে সুচিকিৎসার জোর দাবি জানাচ্ছি।

তিনি বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তি ও সুচিকিৎসার দাবিতে গতকাল দেশব্যাপী মানববন্ধন পালনকালে পুলিশ ব্যাপক ধরপাকড়, নির্বিচারে গ্রেফতার ও হামলা করার পরও সকল বাধা উপেক্ষা করে মানববন্ধন কর্মসূচি সফল করেছে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীরা।

তিনি বলেন, সভা-সমাবেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা রাজনৈতিক দলগুলোর সাংবিধানিক অধিকার, তারপরও যথাযথ কর্তৃপক্ষের অর্থাৎ পুলিশের অনুমোদন নিয়ে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করলেও নির্বিচারে গ্রেফতারের ঘটনা ন্যাক্কারজনক। মানববন্ধনের মতো শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে হামলা, গুলি ও নির্বিচারে গ্রেফতারের ঘটনায় দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় বইছে।

মামলা ও গ্রেফতারের অভিযোগ তুলে রিজভী বলেন, গতকালও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-ধর্মবিষয়ক সম্পাদক জন গমেজকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। এছাড়া বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু বকর সিদ্দিককে গতকাল থেকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। খোঁজ না পাওয়ায় তার পরিবার ও বিএনপির সকল নেতাকর্মী গভীরভাবে উদ্বেগাকুল ও উৎকন্ঠিত। নিশ্চয়ই তিনি সরকারি কোনো বাহিনীর নিকটই আছে। আমি অবিলম্বে তাকে জনসমক্ষে হাজির করার জন্য জোর দাবি জানাচ্ছি।

তিনি বলেন, টাংগাইলের সখিপুর বিএনপির হাজী আবদুল গনি কমিশনার, কৃষক দলের ফজলুল হক ভেন্ডার, যুবদলের সেন্টু খান, নাসির উদ্দিন কমিশনার, সখিপুর কলেজ ছাত্রদলের একাব্বর হোসেনসহ ১৩ জন গ্রেফতার করেছে। চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির ইয়াকুব চৌধুরী, আবু মুসা, আকবরশাহ থানা বিএনপির আবদুস সাত্তার সেলিম, শহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া, গোলাম কিবরিয়া গোলাপকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। চাটখিল থানা বিএনপির খোকনকে পুলিশ গতকাল গ্রেফতার করেছে।

রিজভী বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মো: হেলালুজ্জামান তালুকদার লালু, বিএনপি নেতা সাজ্জাদুজ্জামান জয়সহ ৯৪ জন বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের নামে গাবতলী ও শাহজাহানপুর থানায় বিস্ফোরক আইনে মিথ্যা ও বানোয়াট মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির দেওয়ান মো: গিয়াস উদ্দিন, মো: জহিরুল ইসলাম ভূঁইয়া জহির, মো: আলাউদ্দিন, মামুন ও মোহাম্মদপুর থানার আরো দুজনসহ মোট ১২ জন নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। কামরাঙ্গিরচর থানা বিএনপির ৩৭ জন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে বিষ্ফোরক আইনে মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। নাটোরের বড়াইগ্রাম বিএনপির আবদুল মজিদ সরকার, ছাত্রদলের আবদুল খালেক সরকার, শামীম হোসেন, শরিফুর রহমান সুজন, শাহীন খান, নয়ন, আবদুর রহমান আকাশসহ ৩০/৪০ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এছাড়া অজ্ঞাতনামা প্রায় ৪৫০ জনের নামে মিথ্যা বানোয়াট মামলা দায়ের করেছে এবং বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের বাড়িতে বাড়িতে প্রতিরাতে হামলা চালাচ্ছে।

তিনি বলেন, ঝালকাঠি জেলা বিএনপির মেহেদী হাসান খান বাপ্পি, গিয়াস সরকার, মাইন উদ্দিন, কামাল মল্লিক, টিপু সুলতানসহ ১৮ জন নেতাকর্মীর বাসায় গতরাতে পুলিশ তল্লাশির নামে ব্যাপক ভাংচুর করেছে, এছাড়া পুলিশ পার্টি অফিস তালাবদ্ধ করে রেখেছে। ঢাকা মহানগর ছাত্রদলের মো: সাদিকুর রহমান ভূঁইয়া সোহাগের শিবপুরের বাসায় পুলিশ তল্লাশী চালায় এবং ঘরের আসবাবপত্র ভাঙচুর করে।

গতকাল থেকে এ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যমতে ঢাকাসহ দেশব্যাপী ৩০০ জনের অধিক বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কেবল ঢাকাতেই প্রায় ২৭৫ জন নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আমি দলের পক্ষ থেকে অবিলম্বে নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার ও তাদের নিঃশর্ত মুক্তির জোর দাবি জানাচ্ছি।

রিজভী বলেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকেও একতরফা করতে অবৈধ ভোটারবিহীন সরকার নানা নীলনকশা করেই যাচ্ছে। দেশব্যাপী বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় থানায় গায়েবী মামলা দায়ের অব্যাহত রয়েছে। সরকারের নীলনকশার অংশ হিসেবে আগামী নির্বাচনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী ও সক্রিয় নেতা-কর্মী এবং সমর্থকদের বিরুদ্ধেও ঢালাওভাবে মামলা দেয়া হচ্ছে। দেশব্যাপী স্কুল, কলেজ, মাদরাসার শিক্ষকদের তালিকা করা হচ্ছে, কারা বিএনপি করে বা বিএনপি পরিবারের সাথে যুক্ত। অর্থাৎ বেছে বেছে আওয়ামী সমর্থিত লোকদেরকে নির্বাচনী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেয়ার কার্যক্রম চলছে। মানুষের সকল অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। প্রশাসনকে দলীয়করণ করে ধ্বংস করা হয়েছে, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে বানানো হয়েছে সরকারের দলীয় বাহিনীতে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হয়েছে, নি¤œ আদালতে এখন ন্যায়বিচার উধাও হয়ে গেছে।

তিনি বলেন, গতকাল জাতিসঙ্ঘের পক্ষ থেকে মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার আহবান জানানো হয়েছে। জাতিসঙ্ঘ বলেছে, ‘অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য এটা অপরিহার্য। সাম্প্রতিক সময়ে সেখানে বিক্ষোভরত শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের ওপর হামলা হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে। মানহানির অভিযোগ আনা হয়েছে। তাদের সঙ্গে খারাপ আচরণের রিপোর্ট পাওয়া গেছে। এসব সহিংসতার জন্য হেলমেট পরা যেসব আওয়ামী ক্যাডাররা দায়ী তাদেরকে অবশ্যই বিচারের আওতায় আনতে হবে। সুতরাং দেশ-বিদেশের কারো দৃষ্টিকেই আর ফাঁকি দিতে পারবে না এই ভোটারবিহীন অত্যাচারী সরকার।

বিএনপির এই নেতা বলেন, গত ১০ বছরের বর্তমান স্বৈরাচারী সরকার দেশব্যাপী বিএনপিসহ বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের ওপর যে নির্মম নির্যাতন চালিয়েছে, যেভাবে হত্যা, গুম, খুন চালিয়েছে, যেভাবে ক্রসফায়ারের নামে সাধারণ নিরপরাধ মানুষকে খুন করেছে, যেভাবে নিরাপদ সড়ক ও কোটা আন্দোলনের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন নিপীড়ন চালানো হয়েছে, মামলা দেয়া হয়েছে, গ্রেফতার করা হয়েছে, এখনো উদ্বেগ ও উৎকন্ঠার মধ্যে আছেন শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা। এখনো শিক্ষার্থীদের গ্রেফতার চলছে, তারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেতে পারছে না।

তিনি বলেন, কয়েকদিন আগে ১২ জন শিক্ষার্থীকে তুলে নিয়ে গিয়ে গতকাল গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। এই দৃষ্টান্ত সম্পূর্ণভাবে সন্ত্রাসীদের দ্বারাই সম্ভব। রাষ্ট্রের মালিকানা এখন বেআইনী সন্ত্রাসীদের হাতে চলে গেছে। এ অবস্থায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, হেলমেট বাহিনী ও ছাত্রলীগ দিয়ে সেই জনরোষ রোধ করা যাবে না। নেকনজরে পড়ার জন্যই আইন শৃঙ্খলা বাহিনী আইনানুগ কাজ না করে সরকারের কথা শুনছে। যতদিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অবৈধ সরকারের গৃহজাত বাহিনী হয়ে থাকবে ততদিন আইনের শাসন অদৃশ্যই থেকে যাবে। জনগণের মধ্যে আওয়ামী নির্যাতনে যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে, যেকোনো সময় তার বিস্ফোরণ ঘটবেই।


আরো সংবাদ