২৬ এপ্রিল ২০১৯

অঙ্ক-ভীতি 'ম্যাথেমাফোবিয়া'

বেশিরভাগ মানুষের এই অঙ্ক কিংবা সংখ্যার প্রতি বিদ্যমান ভীতি লুকিয়ে আছে তাদের মস্তিষ্কে - সংগৃহীত

ফরাসি স্কুলছাত্র লরেন সোয়াজ, অঙ্ক করতে বসলেই তার হাত-পা ঘেমে একাকার। নিজের ওপর খুব সহজেই বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে যে, সে এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে না।

শুধু এই লরেন সোয়াজই নয়, দুনিয়া জোড়া শত সহস্র মানুষের একই সমস্যা। অঙ্কের সমাধান করতে বসলেই হাত-পা ঘামা শুরু হয়। মস্তিষ্ক কাজ করতে অনীহা প্রকাশ করে, চরম পরাজয়ের মতো অস্বস্তি বোধ হয়। তবে আপনারও যদি একইরকম হয়ে থাকে, তবে আপনি মোটেও একা নন।

গবেষকদের মতে, পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় বিশ শতাংশ এই ধরনের অঙ্ক নিয়ে ভীতিতে ভুগে থাকে। কোনো কোনো মনস্তত্ত্ববিদের মতে, এই অঙ্কে ভীতি একধরনের চিকিৎসাযোগ্য মানসিক সমস্যা। তবে এই সমস্যায় ভুক্তভোগী ব্যক্তি যে অঙ্ক ভালো করতে পারে না, তা মোটেই সত্য নয়। অঙ্ককে ভয় পাওয়া সেই ফরাসি স্কুলছাত্র লরেন সোয়াজ পরবর্তীতে অঙ্কের সর্বোচ্চ সম্মান ফিল্ডস মেডেলে ভূষিত হয়েছিলেন।

অঙ্কভীতি নিয়ে গবেষণা শুরু করেন মেরি ফিডেস গফ নামের এক গবেষক। ১৯৫৪ সালে তিনি প্রথম তার লেখায় ‘Mathemaphobia’ নামে শব্দটির প্রচলন করেন। অঙ্ককের প্রতি সাধারণ মানুষের ভীতি আর তার প্রতিকারে কী করা যেতে পারে, তা ছিল এই গবেষকের গবেষণার বিষয়বস্তু। পরবর্তীতে স্কুল, কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়ের শত-সহস্র ছাত্র ছাত্রীর ওপরে অঙ্কের ভয় নিয়ে গবেষণা করা হয়েছে।

বর্তমান সময়ের মনস্তত্ত্ববিদদের মতে, বেশিরভাগ মানুষের এই অঙ্ক কিংবা সংখ্যার প্রতি বিদ্যমান ভীতি লুকিয়ে আছে তাদের মস্তিষ্কে। যারা অঙ্ককে ভয় পায়, তাদের অনেকের মনেই এই ধারণা বদ্ধমূল যে, তারা অঙ্কে খারাপ। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ঘটনা কিছুটা উল্টো। তারা অঙ্ক নিয়ে ভয়ে থাকে বলেই তাদের গাণিতিক সমস্যা সমাধান করার দক্ষতা কম।

মনস্তত্ত্ববিদদের মতে, মানুষ যখন অঙ্ক সমাধানের ব্যাপারটি নিয়ে শঙ্কিত হয়ে যায়, তখন তার বুদ্ধির জ্বালানিতে টান পড়ে। আর সেই জ্বালানি হলো ক্ষণস্থায়ী এবং দ্রুতগতির স্মৃতিশক্তি ব্যবস্থা, যা ‘ওয়ার্কিং মেমরি’ নামেও পরিচিত। এই স্মৃতিশক্তি ক্ষণস্থায়ী হলেও কোনো কাজের তথ্যগুলো ঠিকঠাক গুছিয়ে নিতে এর বিকল্প নেই। কঠিন বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ কিংবা সমস্যা সমাধানে এই ক্ষণস্থায়ী স্মৃতিশক্তির ভূমিকা আরো বেশি। অঙ্ক সমাধানের ক্ষেত্রে এই ক্ষণস্থায়ী স্মৃতির সিংহভাগই ব্যবহার করতে হয়।

তবে গবেষণায় দেখা গেছে, অঙ্কের সমস্যা নিয়ে শুরুতেই যদি কেউ ভীত হয়ে যায়, তাহলে এই ক্ষণস্থায়ী স্মৃতির অনেকটাই নেতিবাচকতা এবং এর প্রতিক্রিয়া দেয়ার কাজেই ব্যস্ত হয়ে যায়। অঙ্কের সমস্যাকে মোকাবেলা করার জন্য খুব অল্পই অবশিষ্ট থাকে। ফলে দেখা যায় অঙ্কের ভীতিতে ভুক্তভোগীদের অনেকেই মানসিক চাপে সাধারণ যোগ-বিয়োগেও তালগোল পাকিয়ে ফেলেন। প্রতিযোগিতা কিংবা পরীক্ষায় এই ধরনের সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করে অনেকের মাঝেই। তবে শিশু কিংবা তরুণদের মধ্যে অঙ্ক নিয়ে ভীতির পরিমাণ তুলনামূলক বেশি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কিংবা প্রাপ্তবয়স্কের অনেকেও এই সমস্যায় জর্জরিত। দোকানে কিংবা বাজারের ফর্দ দেখেও অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে যান। তবে ব্যাপারটি শুধুই আমাদের মনেই ভীতির সঞ্চার করে না, অনেক মানুষ অঙ্ক সমাধান করতে রীতিমতো যন্ত্রণা অনুভব করেন।

গবেষকদের দীর্ঘদিন ধরে চালানো গবেষণায় দেখা গেছে, অঙ্কের প্রতি ভীতি থাকা ব্যক্তিদের অঙ্কের সমস্যা দিয়ে কোনো পরীক্ষা কিংবা প্রতিযোগিতায় বসিয়ে দিলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ‘কর্টিসল’ নামক হরমোন নিঃসরিত হয়। এই হরমোন আমাদেরকে অধিকমাত্রায় উত্তেজিত করে দেয়। পাশাপাশি এই ধরনের প্রতিযোগিতা কিংবা পরীক্ষা আমাদের মস্তিষ্কের এমন কিছু জায়গাকে (পেইন ম্যাট্রিক্স) উত্তেজিত করে, যেগুলো আমরা সাধারণত ব্যথা পেলেই কার্যকর হয়। তবে এমনটা হওয়ার পেছনে লুকিয়ে থাকা কারণটা বের করতেও কাঠখড় কম পুড়িয়ে যাচ্ছেন না গবেষকরা।

তাদের ধারণা, শিশুদেরকে খুব কম বয়সে যেভাবে অঙ্কের হাতেখড়ি দেয়া হয়ে থাকে, সে ব্যাপারটিও কোনো অংশে কম দায়ী নয়। বেশিরভাগ শিশুর সামনেই তার পরিবার কিংবা শিক্ষক উভয়েই অঙ্ককে বিভীষিকা হিসেবে উপস্থাপন করেন। এমনকী অনেক কম বয়স থেকেই বেঁধে দেয়া সময়ে অঙ্কের সমাধান করতে দেয়াও ভীতির সঞ্চার করে শিশুদের মধ্যে। বিশেষ করে মেয়েরা অঙ্ক সমাধানে কম দক্ষ, এমন মানসিকতাও বিদ্যমান অনেকের মধ্যেই।

ব্যাপারটি মোটেই সত্য নয়। সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন গবেষণা বলছে, অঙ্কের সমস্যা সমাধানে দক্ষতা আমাদের লিঙ্গের সাথে যতটা না জড়িত, তার চেয়ে অনেক বেশি জড়িত আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে। ছোটবেলা থেকেই মেয়ে শিশুদের মধ্যে অঙ্ক সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা দিয়ে দিলে পরবর্তী জীবনে তা উতরে যাওয়া খানিকটা কঠিন। এমনকী অঙ্কের অন্যতম সর্বোচ্চ সম্মান ফিল্ডস মেডেল পাওয়া প্রথম নারী অঙ্কবিদ মরিয়ম মির্জাখানিও স্কুলে পড়ার সময়ে অঙ্কের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলেন। কারণ, তার শিক্ষকেরা মনে করত মরিয়মের অঙ্ক সমাধান করার মতো প্রতিভা নেই।

তবে গবেষকদের ধারণা, অঙ্কের প্রতি বিদ্যমান এই ভীতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। মূলত যেকোনো প্রতিযোগিতায় অঙ্ককে কেন্দ্র করে ভীতি এবং উত্তেজনাকে কাটিয়ে উঠতে একটি কার্যকর উপায় হলো এই ভীতিকে অন্যদিকে ধাবিত করে দেয়া। এটি করা যেতে পারে ছোট ছোট নিঃশ্বাস নিয়ে। এই প্রক্রিয়া অবলম্বন করে উত্তেজিত মুহূর্তেও নিজেকে শিথিল করা যায়। কর্টিসল হরমোনের প্রভাবে সৃষ্ট উত্তেজনার ফলে অনেক সময় আমাদের হাত-পা কাঁপতে থাকে কিংবা অতিরিক্ত ঘাম হওয়ার যে ব্যাপারটি দেখা যায়, সেটিও নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

অঙ্কভীতিকে যেহেতু বর্তমান সময়ে একটি মানসিক সমস্যা হিসেবেও গণ্য করা হয়, সেটিকে দূর করার আরেকটি উপায় হলো অঙ্ক নিয়ে নিজের ভয়ভীতি লিখে ফেলা এবং সেগুলো মূল্যায়ন করা। ‘Expressive writing’ নামক প্রক্রিয়ায় নিজের সমস্যাগুলোর বিবরণ নিজেই খাতায় লিখে ফেলা হয় এবং এর ফলে ক্ষণস্থায়ী কার্যকরী স্মৃতির ওপর চাপ অনেকটাই কমে আসে।


আরো সংবাদ




iptv al Epoksi boya epoksi zemin kaplama Daftar Situs Agen Judi Bola Net Online Terpercaya Resmi

Hacklink

Bursa evden eve nakliyat
arsa fiyatları tesettür giyim
Canlı Radyo Dinle hd film izle instagram takipçi satın al ofis taşıma Instagram Web Viewer

canli radyo dinle

Yabanci Dil Seslendirme

instagram takipçi satın al
hd film izle
gebze evden eve nakliyat