১৬ অক্টোবর ২০১৯

লাদাখ নিয়ে ভারত-চীন বিরোধ

-

ভারতের উত্তরতম প্রান্তে লাদাখের প্যাংগং হ্রদের তীরে গত ১১ সেপ্টেম্বর প্রায় সারা দিন ধরে ভারতীয় ও চীনা সেনাবাহিনীর মধ্যে সঙ্ঘাত হয়েছে বলে দিল্লিতে সামরিক সূত্রগুলো জানিয়েছে। তবে দিনের শেষে দুই দেশের সেনাবাহিনীর প্রতিনিধি পর্যায়ের বৈঠকের পর সেই বিরোধের অবসান হয়। এর পর থেকে পরিস্থিতি সেখানে শান্ত বলেই জানা গেছে।

আগস্টের ৫ তারিখে ভারত সরকার লাদাখকে একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করার পর এই প্রথম দুই দেশের সেনাবাহিনী কোনো মুখোমুখি সঙ্ঘাতে জড়াল। এর আগেই লাদাখ অঞ্চলকে ভারতের কেন্দ্রীয় শাসনের অধীনে নেয়ার সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করেছে বেইজিং।

লাদাখের যে প্যাংগং হ্রদের ধারে এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, সেটি দুই দেশের বর্তমান সীমান্ত বরাবর অবস্থিত। প্রায় ১৩৫ কিলোমিটার লম্বা এই সুদীর্ঘ হ্রদটি চীনের তিব্বত থেকে ভারতের লাদাখ পর্যন্ত বিস্তৃত। চার হাজার ৩৫০ মিটার (১৪২৭০ ফুট) উচ্চতার এই হ্রদের ৬০ ভাগ তিব্বতে অবস্থিত। হ্রদের পূর্ব দিকটি তিব্বতের অন্তর্গত এবং পশ্চিম প্রান্তটি ভারতের অন্তর্গত। এই হ্রদটির সবচেয়ে চওড়া স্থানটি পাঁচ কিলোমিটার বিস্তৃত। ভারত এই হ্রদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। প্যাংগং লেকের বাকি অংশ রয়েছে চীনের নিয়ন্ত্রণে।

প্যাংগং হ্রদের তীর ঘেঁষে ও হ্রদের বুকেও দুই দেশের সৈন্যরা হেঁটে বা স্পিডবোটে নিয়মিত টহল দিয়ে থাকে।

ভারতের ‘দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া’ পত্রিকা জানিয়েছে, ১১ সেপ্টেম্বর সকালে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সদস্যরা যখন লেকের ধারে রুটিন টহল দিচ্ছিল তখনই চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) ফৌজ তাদের বাধা দেয়। এর পরই দুই পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে, দুই দেশের সেনাদের মধ্যে হাতাহাতি পর্যন্ত হয়। দুই পক্ষই বাড়তি ফৌজ চেয়ে পাঠায়, আর দফায় দফায় এই সঙ্ঘাত চলে বুধবার প্রায় সারা দিন ধরেই। সন্ধ্যায় প্রতিনিধি পর্যায়ের বৈঠকের পর বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে ‘ডিএসক্যালেট’ ও ‘ডিসএনগেজ’ করা সম্ভব হয়েছে বলে ভারতের সামরিক সূত্রগুলো জানিয়েছে।

ভারত ও চীনের মধ্যে লাদাখে যে ‘লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল’ (প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা) সীমান্তের কাজ করে, দুই পক্ষের মধ্যে তার ব্যাখ্যার তারতম্যের কারণেই এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে বলে ভারতীয় সেনাবাহিনীর দাবি।

দুই বছর আগে ২০১৭ সালের আগস্ট মাসেও ভারত ও চীনের সেনারা প্যাংগং লেকের ধারে এক সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছিল। সেবারের ঘটনায় একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়াতে ছড়িয়ে পড়ে, যাতে দেখা যায় দুই পক্ষের সেনারা পরস্পরকে লাথি ও ঘুষি মারছে বা এমনকি পাথরও ছুড়ছে।

গত স্বাধীনতা দিবসেও চীনের সেনাবাহিনী প্যাংগং হ্রদের তীরে ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রবেশের চেষ্টা করছিল বলে অভিযোগ ওঠে। কিন্তু ভারতীয় সেনারা তাদের ভারতীয় ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশে বাধা দেয়। সেই সময় দুই ঘণ্টা চেষ্টার পরে ভারত-চীন সীমান্ত অঞ্চলে তৈরি হওয়া ওই উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। তবে দুই দেশের সেনাই তাদের নিজের অবস্থান থেকে সরে আসার আগে বিতর্কিত অঞ্চলটিতে নিজেদের দেশের অধিকার ঘোষণা করে ব্যানার আটকায় সেখানে। এরপর ঠিক ১১ সেপ্টেম্বরের মতোই ব্রিগেডিয়ার স্তরের আধিকারিকরা ওই অঞ্চলের উত্তেজনা হ্রাস করার উপায় বের করতে একটি বৈঠক করেন এবং সাময়িকভাবে সমস্যার সমাধান করেন।

প্যাংগং হ্রদের পার্শ্ববর্তী অঞ্চল রক্ষার জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেনা উচ্চগতির ইন্টারসেপ্টর নৌকাগুলো সব সময় প্রস্তুত রাখে সেখানে। ওই রণতরীতে প্রায় ১৫ জন সেনা একসাথে থাকতে পারে এবং রাডার, ইনফ্রারেড সেন্সর এবং গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেমসহ সব আধুনিক ব্যবস্থা রয়েছে সেটিতে। এই রণতরী নিজেদের জায়গা পুনরুদ্ধার এবং আধিপত্য ঘোষণা করতে টহল পরিচালনার কাজেও ব্যবহৃত হয়।

প্যাংগং হ্রদ, যেটা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৪ হাজার ফুট ওপরে হাজার হাজার রুক্ষ পাহাড় আর মরুভূমির মধ্যে অবস্থিত আল্লাহর এক বিশেষ আশীর্বাদ। এক নীল রঙেরই ক্ষণে ক্ষণে নানা রকম নীলের অদল-বদল আর বিস্তার। কখনো হালকা নীল, কখনো গভীর, কখনো আকাশি আর কখনো এক সবুজাভ নীল। কখনো মনে হবে পাথুরে পাহাড়ের সাথে মিলেমিশে ধূসর আর নীলের এক নান্দনিক শেড।

পুরো প্যাংগং হ্রদ দেখতে হলে ভারত ও চীনের প্রায় ৬০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হবে। যেটা সম্ভব নয় আদৌ। অনেকে মনে করে, প্যাংগং হ্রদ ভারতের ইন্দাস নদীর কোনো অংশ হয়তো। কিন্তু না, এটি কোনো নদীর অংশ নয়, বরং পাহাড় ও ভূমি দিয়ে আবৃত একটি বেসিন বা জলাশয় মাত্র। রুক্ষ পাহাড় ও মরুভূমির মধ্যে আল্লাহর বিশেষ আশীর্বাদ।

প্যাংগং হ্রদ ও এর আশপাশের অঞ্চলের স্বাভাবিক তাপমাত্রা মাইনাস ৫-১০ ডিগ্রি, যেটা শীতে কখনো মাইনাস ২০-২৫ ডিগ্রি বা এর চেয়েও বেশি হয়ে থাকে। সামারে যে লেকে টলটলে নীল জলরাশি, শীতে সেই হ্রদ জমে বরফ হয়ে থাকে।

যে প্যাংগং হ্রদ নিয়ে ভারত ও চীনের মধ্যে এত বিরোধ, সেটি ব্যাপক পরিচিতি পায় বলিউডে ‘থ্রি ইডিয়টস’ সিনেমাটির সুবাদে। এই ব্লকবাস্টার মুভিটির ক্লাইম্যাক্স দৃশ্যটির শুটিং হয়েছিল প্যাংগং হ্রদের ধারে ভারতীয় অংশে। এই পার্বত্য হ্রদটির গাঢ় নীল পানির সৌন্দর্য দেখতে হাজার হাজার ভারতীয় পর্যটক প্রতি বছর লাদাখে আসেন আর ভারতীয় সেনার তত্ত্বাবধানেই তাদের লেকটি ঘুরে দেখানোর ব্যবস্থা করে হয়ে থাকে।

চীন ও ভারত কেউই প্যাংগং হ্রদ এলাকা থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয়নি। বন্ধ করেনি টহলও। চীন ও ভারত বড় অর্থনীতির দেশ। বিশ্ব অর্থনীতি দেশ দু’টির অবদান আছে। এখন দেশ দু’টির মধ্যে যদি উত্তেজনা অব্যাহত থাকে, তা এক দিকে যেমনি চীনের জন্য ভালো নয়, ঠিক তেমনি ভালো নয় ভারতের জন্যও।


আরো সংবাদ




astropay bozdurmak istiyorum