Naya Diganta

কুরআন শিক্ষায় ৫০ বছর ধরে ছুটছেন আছিয়া

কুরআন শিক্ষায় ৫০ বছর ধরে ছুটছেন আছিয়া

বয়সের ভারে ন্যুব্জ আছিয়া। এখন আর আগের মতো হাঁটতে পারেন না। তারপরেও দিনভর ছুটে চলেন এ-গ্রাম থেকে ও-গ্রামে। এ-পাড়া থেকে ও-পাড়ায়। ঘুরে ঘুরে ছেলেমেয়েদের কুরআন শিক্ষা দেন। গত ৫০ বছর ধরেই আছিয়া এই কাজ করে এসেছেন। আগে কারো কাছ থেকে এ বাবদ টাকা নিতেন না। এখন আর সংসার চলে না। যে কারণে যে যা দেন সংসার চালাতে তা গ্রহণ করেন। 

গ্রামের সবার কাছে আছিয়া ‘আরবি পড়ানোর নানী’ হিসেবে পরিচিত। গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার কাওরাইদ গ্রামে এমন কোনো মানুষ নেই; যিনি আছিয়া খাতুনকে চেনেন না। ১৯৬৮ সালের কথা। বাড়ির আশপাশের শিশুদের বিনামূল্যে কুরআন শেখানো শুরু করেন আছিয়া। দিন দিন বাড়তে থাকে শিার্থীর সংখ্যা। তাকে ছুটতে হয় দুই-তিন কিলোমিটার দূরের গ্রামেও। কুরআন শিক্ষা দেন বিনা পারিশ্রমিকে। কাওরাইদসহ আশপাশের বেশ কয়েকটি গ্রামে তিনি যেমন পরিচিত ঠিক তেমনই নন্দিত একজন মানুষ।

আছিয়া খাতুনের বয়স ৮৭ ছুঁয়েছে। তবুও তার অবসর নেই। অবসর নেবেনই বা কেন? তিনি বাড়িতে বসে থাকলে যে অনেক শিশুর কুরআন শিক্ষা বন্ধ হয়ে যাবে! বয়স্কদেরও অনেকে তার কাছ থেকে কুরআন শিক্ষা গ্রহণ করছেন। তিন মেয়ে ও এক ছেলের জননী আছিয়া খাতুন জানান, স্বামীকে হারানোর পর সংসারের দায়িত্ব ছিল একমাত্র ছেলে ফাইজুর কাঁধে। রিকশা চালিয়ে সংসারের চাকা সচল রেখেছিল ফাইজুর। ১২ বছর আগে এক সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে ছেলে অম হয়ে পড়ে। এখন আর কোনো কাজকর্ম করতে পারে না। বড় মেয়ে তখন তাকে কিছু সহায়তা করত। চার বছর আগে মেয়েটিও মারা গেছে ক্যান্সারে। ছেলে ও তার বউসহ দুই নাতির সংসারের ভার এখন বৃদ্ধা আছিয়ার কাঁধে। বাড়িভিটে ছাড়া তার নেই কোনো জমিজমা। বয়সের ভারে এখন আর পারছেন না আছিয়া। ভোর থেকে কষ্ট করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে কুরআন শিক্ষা দিলেও আছিয়ার কোনো চাহিদা নেই। কেউ ২০ টাকা, কেউ ৫০ টাকা কেউ বা খুশি হয়ে তাকে ১০০ টাকাও দেন। এতেই তিনি সন্তুষ্ট। 

আছিয়া বলেন, আল্লাহকে খুশি করার জন্যই তিনি বিনা পারিশ্রমিকে কুরআন শিক্ষা দিচ্ছেন। কুরআন শিক্ষার পাশাপাশি তিনি ছেলেমেয়েদের নৈতিক শিক্ষাও দিতেন। যে কারণে পুরো এলাকার মানুষ তাকে পছন্দ করে। এলাকায় কোনো নারী মারা গেলে গোসল করানোর জন্যও ডাক পড়ে তার। আছিয়া বলছিলেন, এ পর্যন্ত অর্ধশতাধিক মৃত নারীকে গোসল করিয়েছেন তিনি।

আল্লাহর ঘর দেখার খুবই ইচ্ছে আছিয়ার। হজ পালন করতে চান তিনি। এ জন্য তিনি কিছু টাকাও জমিয়েছেন। কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। তার কষ্ট, আর মনে হয় সম্ভব হবে না! আল্লাহর ঘর দেখার ইচ্ছে মনে হয় ইচ্ছেই থেকে যাবে।
আছিয়াকে নিয়ে কথা হয় স্থানীয় কয়েকজনের সাথে। সাদিয়া আফরিন রানী নামের একজন গৃহিণী বলেন, ওনার মতো সহজ-সরল ও ত্যাগী মানুষ আমি খুব কম দেখেছি। গ্রামের মানুষও তো অসচ্ছল। যে কারণে ওনার পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই।

মরিয়ম খাতুন নামের একজন বৃদ্ধা বলেন, আমি এই শেষ বয়সে ওনার কাছে কুরআন শিখছি। উনার পরিশ্রম দেখে নিজের মনে বল ফিরে পাই। আমি চাই এই মানুষটার প্রতি কেউ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিক। আর্থিকভাবে জীবনমানের পরিবর্তন করতে না পারলেও আছিয়া খাতুনের কোনো আফসোস নেই। মহান আল্লাহর ওপর ভরসা করেই আছেন এই মহতী নারী।