২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮
বিশ্বকাপ ফুটবল

এবারের ফাইনালের ব্যতিক্রম বিষয়গুলো, যা আগে কখনো হয়নি

ফুটবল
জয়ী ফ্রান্সের খেলোয়াড়দের শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ, ক্রোয়েশিয়ার প্রেসিডেন্ট কলিন্দা গ্রাবার-কিতারোভিচ। উপস্থিত আছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন - ছবি : এএফপি

এবারের বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল ম্যাচটি ছিল এমন এক ধরনের ম্যাচ যেখানে সবকিছু্‌ ছিল। বিতর্কিত সিদ্ধান্ত, মাঠে দর্শক ঢুকে পড়া, ফাইনাল ম্যাচে প্রথম আত্মঘাতী গোল, পেলের পর দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেব একজনের গোল এবং গোল রক্ষকের হাস্যকর ভুলের জন্য একটি গোল - এসব কিছুই হয়েছে ফাইনাল ম্যাচে।

স্মরণীয় এ ম্যাচে ফ্রান্স ৪-২ গোলে ক্রোয়েশিয়াকে হারিয়ে বিশ্ব ফুটবলের চ্যাম্পিয়ন হয়েছে।

অনেক গোল হওয়া
ফাইনাল ম্যাচে সর্বমোট ছয়টি গোল হয়েছে।

সাধারণত ফাইনাল ম্যাচে যে ধরনের উত্তেজনা এবং চাপ থাকে তাতে গোল কম হয়।

কিন্তু এবার সেটির ব্যতিক্রম দেখা গেল। সর্বশেষ ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল ম্যাচে দুটির বেশি গোল হয়েছিল।

১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনালে সর্বমোট সাতটি গোল হয়েছিল।

সেবার ব্রাজিল ৫-২ গোলে সুইডেনকে হারিয়েছে।

ইংল্যান্ডের সাবেক ডিফেন্ডার রিও ফার্ডিনান্ড বিবিসি ওয়ানকে বলেছেন, সাধারণত এ ধরনের ম্যাচ একঘেয়ে দাবা খেলার মতো হয়।

কিন্তু এবারের ফাইনাল সে রকম ছিলনা। ক্রোয়েশিয়া যেভাবে ফ্রান্সকে আক্রমণ করেছে তাদের তারা প্রশংসার দাবিদার বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ভিএআর নিয়ে বিতর্ক
এ বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো রেফারিদের সহায়তা করার জন্য ভিডিও প্রযুক্তির ব্যবহার করা হয়েছে, যেটিকে ভিএআর বলা হয়।

গ্রুপ পর্যায়ে এ প্রযুক্তির ব্যবহার করা হলেও নক পর্যায়ে এটি তেমন একটা ব্যবহার করা হয়নি।

কিন্তু ফাইনাল ম্যাচে ফ্রান্সকে পেনাল্টি দেবার জন্য ভিএআর ব্যবহার করা হয়েছে।

ফ্রান্সের কর্নার থেকে ক্রোয়েশিয়ার ইভান পেরিসিচ-এর হাতে যখন বল লাগে তখন রেফারি তাৎক্ষণিকভাবে পেনাল্টি দেননি।

কিন্তু ভিডিও অ্যাসিসটেন্স রেফারির সাথে দীর্ঘক্ষণ আলাপের পর তিনি নিজেই ভিডিও দেখতে মাঠের বাইরে যান এবং এরপর পেনাল্টির সিদ্ধান্ত দেন। এ পেনাল্টি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

ইংল্যান্ডের সাবেক খেলোয়াড় অ্যালান শিয়েরার মনে করেন এটা একটা ‘হাস্যকর সিদ্ধান্ত’ কারণ ক্রোয়েশিয়ার ইভান পেরিসিচ ইচ্ছাকৃত হ্যান্ডবল করেননি।

পেনাল্টি দেবার বিষয়টিকে ‘খারাপ সিদ্ধান্ত’ হিসেবে দেখছেন আরেকজন ফুটবল বিশ্লেষক এবং ইংল্যান্ডের সাবেক খেলোয়াড় রিও ফার্ডিনান্ড।

এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে জার্মানির সাবেক খেলোয়াড় এবং কোচ ইউর্গেন ক্লিন্সম্যান বলেন, ‘আপনি যখন নিশ্চিত হতে পারছেন না, তখন এটা আপনার দেয়া উচিত নয়। এটা ভুল সিদ্ধান্ত।’

ফাইনাল ম্যাচে প্রথম আত্মঘাতী গোল
এবারের বিশ্বকাপ আসরে সর্বমোট ১২টি আত্মঘাতী গোল হয়েছে। এর মধ্যে ফাইনাল ম্যাচে হয়েছে একটি।

ফ্রান্সের অ্যান্টনি গ্রিজম্যানের ফ্রি-কিক থেকে ক্রোয়েশিয়ার মারিও মানজুকিচের মাথায় লেগে ক্রোয়েশিয়ার জালে বল প্রবেশ করে।

বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচে এটিই প্রথম আত্মঘাতী গোল।

পেলের পর ফাইনাল ম্যাচে সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা
ব্রাজিলের ফুটবল কিংবদন্তী পেলের পর ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপে হচ্ছেন দ্বিতীয় ব্যক্তি যিনি সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনালে গোল দিয়েছেন।

এবারের বিশ্বকাপের আসরে এমবাপের খেলা সবার নজর কেড়েছে।

দ্বিতীয় রাউন্ডে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে দুই গোল করেছিলেন এমবাপে। সব মিলিয়ে এবারের আসরে এমবাপে চারটি গোল করেছেন।

গোল রক্ষকের অদ্ভুত ভুল
জার্মানির গোলরক্ষক হুগো লরিস-এর ভুলের কারণে ক্রোয়েশিয়া একটি গোল পেয়েছে।

ডিফেন্ডার স্যামুয়েল যখন গোল রক্ষকের কাছে বল দেন তখন তার পেছনে অনেক দুর থেকেই ছুটে যান ক্রোয়েশিয়ার মানজুকিচ।

বলটি দ্রুত মাঝ মাঠ ঠেলে না দিয়ে ফ্রান্সের গোলরক্ষক হুগো লরিস খুব আয়েশি ভঙ্গিতে মানজুকিচকে পাশ কাটিয়ে যেতে চান। কিন্তু সেটি সম্ভব হয়নি।

ক্রোয়েশিয়ার মানজুকিচের পায়ে বল লেগে সেটি ফ্রান্সের জালে ঢুকে যায়।

মাঠের ভেতরে লোক ঢুকে পড়া
রাশিয়ায় বিশ্বকাপের আয়োজন নিয়ে নানা উদ্বেগ ছিল। সম্ভাব্য বর্ণবাদ, গুণ্ডামি এবং সমকামীদের উপর সহিংসতার আশঙ্কা ছিল।

কিন্তু এসব ক্ষেত্রে কিছুই হয়নি এবং পুরো আয়োজন বেশ ভালোভাবেই গেছে।

শুধু ফাইনাল ম্যাচে কয়েকজন দর্শক মাঠে আচমকা মাঠে ঢুকে যায় এবং খেলাও বন্ধ হয়ে যায়।

রাশিয়ার রক গ্রুপ পাসি রায়ট বলছে তারা একাজ করেছে।

রাশিয়ার কিছু রাজনৈতিক ইস্যুতে প্রতিবাদ করতেই তারা এটি করেছে বলে দাবি করে।

তবে নিরাপত্তা কর্মীরা দ্রুত তাদের মাঠ থেকে সরিয়ে নেয়। তবে দুই দলের কয়েকজন খেলোয়াড়দের সাথে মাঠে প্রবেশ করা ব্যক্তিদের হাতাহাতি হয়।

সূত্র: বিবিসি

আরো পড়ুন : 

জিদানের পর পগবা : ফ্রান্সের বিশ্বকাপ জয়ে মুসলিমদের ভূমিকা

রফিকুল হায়দার ফরহাদ, রাশিয়া থেকে

মুসলিম দেশ গুলোর বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনালে খেলার সুযোগ কখনো হয়নি। সর্বশেষ ২০০২ জাপান -দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বকাপে সেমিফাইনাল পর্যন্ত যাওয়া তুরস্ক শেষ পর্যন্ত তৃতীয় হয়েছিল। এটাই মুসলিম দেশগুলোর বিশ্বকাপে সেরা অর্জন। অবশ্য মুসলিম দেশগুলো ফাইনালে না গেলেও ফাইনালে খেলার সুযোগ হয়েছে মুসলমান ফুটবলারদের। এবং এই ফাইনালে গোল আছে একাধিক। এত দিন ফাইনালে গোল করা একমাত্র মুসলমান ফুটবলার ছিলেন ফ্রান্সের জিনেদিন ইয়াজিদ জিদান। রোববার সেই কৃতিত্বে ভাগ বসালেন পল পগবা। জিদানের মতোই তিনি ফরাসি ফুটবলার। একই সাথে মিডফিল্ডারও।

১৯৯৮ সালে ফ্রান্স নিজ মাঠে বিশ্বকাপ জয় করে। ফাইনলে তারা ৩-০-এ কাবু করে ব্রাজিলকে। সেই ম্যাচে জোড়া গোল ছিল জিদানের। ২৭ মিনিটে ও প্রথমার্ধের ইনজুরি টাইমে তার দুই গোল। আলজেরিয়ান বংশোদ্ভ’ত জিদান দুই গোলই করেন হেড থেকে। লক্ষণীয় বিয়ষ দুটিরই উৎস ছিল কর্নার। দুই ক্ষেত্রেই ব্যর্থ ব্রাজিলের ডিফেন্ডাররা। মূলত জিদানের ওই জোড়া গোলই ফাইনাল থেকে ছিটকে ফেলে রোনালদোর -বেবেতোর দেশকে। ৯৩ মিনিটে ব্রাজিলের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকেছিলেন ইমানুয়েল পেতিত।

রোববার মস্কোর লুজনিকি স্টেডিয়ামে রাশিয়া বিশ্বকাপের ফাইনালেও পল পগবার গোল লড়াইয়ের শক্তি শেষ করে দেয় ক্রোয়েটদের। এর আগ পর্যন্ত ২-১ এ এগিয়ে ছিল ফ্রান্স। ৫৬ মিনিটে পল পগবার বক্সের উপর থেকে নেয়া শট এক প্রকার নিশ্চিত করে ফরাসিদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ। এরপর নতুন পেলে খ্যাত ইলিয়ান এম্বাপে চতুর্থ গোল করে ক্রোয়েশিয়ার সব আশাই শেষ করে দেন। যদিও গোল রক্ষক হুগো লরিচের ভুলে ক্রোয়েশিয়ার মানজুকিচ ব্যবধান কমান। ৯০ মিনিট শেষে স্কোর লাইন ৪-২ থাকায় জিদানের মতোই কার্যকরী হয় পল পগবার গোল। চ্যাম্পিয়নশিপের আনন্দ উদযাপন করা হলো তার।

বিশ্বকাপে এটি পল পগবার দ্বিতীয় গোল। ২০১৪ বিশ্বকাপে তার গোল ছিল নাইজেরিয়ার বিপক্ষে। সেই ম্যাচে ম্যান অব দ্য ম্যাচও হন তিনি। সেই আসরের সেরা উদিয়মান ফুটবলার ছিলেন পগবা। রোববার অবশ্য ফাইনাল সেরা হন গ্রিজম্যান। ফ্রান্সের লিড নেয়া আত্মঘাতী গোল গ্রিজম্যানের ফ্রি-কিক থেকেই।তা মানজুকিচের মাথার ছোঁয়া নিয়ে জালে জড়ায়। এরপর পেনাল্টি থেকে গোল গ্রিজম্যানের। কাল তিনি এবং এম্বাপে আদায় করেন এই বিশ্বকাপে চতুথৃ গোল। তারা চারটির বেশি গোলঅ না পাওয়ার ৬ গোল দিয়ে গোল্ডন বুট জয করে নেন ইংল্যান্ডের হ্যারি কেন। ১৯৯৮ সালের ফাইনালে ম্যাস সেরার পুরস্কার গিয়েছিল জিদানের দখলে।

জিদান , পগবা ছাড়াও বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ নেয়া মুসলিম ফুটবলার হলেন জার্মানির মেসুত ওজিল ও সামি খেদিরা। ২০১৪ এর চ্যাম্পিয়ন দলের সদস্য তারা। মেসুত ওজিলের ফাইনাল খেলা হলেও সাইড বেঞ্চে ছিলেন সামি খেদিরা।


আরো সংবাদ