১৫ জুলাই ২০২৪, ১ শ্রাবণ ১৪৩১, ৮ মহররম ১৪৪৬
`

‘একই বিষয়ের পুনরাবৃত্তিই ঘটবে’

লেখক সালাহউদ্দিন বাবর। - ছবি : নয়া দিগন্ত

জানি না আমাদের অনুমান সঠিক কি না, এমন মনে হচ্ছে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচনের সামান্য কিছু আগে বিএনপি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে হয়তো একটা ফাঁদে ফেলতে চেয়েছিল। শাসকদল তাদের প্রতিপক্ষের পাতা সেই ফাঁদে ঠিকই পা দিয়েছে। বিএনপি দাবাচাল চেলে ‘রাজা’কে চেক দিয়ে কিসতিমাত করে ফেলেছে। তবে এ-ও জানি না, আওয়ামী লীগ বিষয়টি কোন বিবেচনায় নিয়েছে। আমরা বোধ হয়, পাঠককে একটু ধোঁয়াশার মধ্যে ফেলে দিয়েছি। আসলে বিষয়টি এমন, আবারো বলছি, সবকিছুই একান্তই আমাদের ধারণাসঞ্জাত বিষয়, একাদশ সংসদ থেকে বিএনপি তাদের এমপিদের পদত্যাগ করতে বললে, তারা সবাই সংসদের স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে সংসদ থেকে চলে আসেন। আসনগুলো শূন্য হলো। নির্বাচন কমিশন (অজ্ঞাতজনদের পরামর্শে বোধ হয়) তড়িঘড়ি করে সেই শূন্য আসনগুলোতে উপনির্বাচনের উদ্দেশ্যে তফসিল ঘোষণা করে। এ জন্য আরো কিছু বিলম্বও করা যেত। সময়ের নিরিখে এবং সংসদে আওয়ামী লীগের ‘বিপুল সংখ্যাধিক্যতার’ কারণে এই উপনির্বাচনে অংশ নিয়ে সংসদে তাদের আসন বৃদ্ধির কোনো প্রয়োজনই ছিল না; কিন্তু তারা হয়তো আসনগুলো পাওয়ার জন্য ‘ক্রেজি’ হয়ে ওঠায়, তাদের বিলম্ব সইছিল না। সে জন্য যত তড়িঘড়ি। অবশ্য অন্য কোনো কারণ থাকতেও পারে শাসক দলের।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনেও শাসকদল বিজয়ীদের জন্য সব কৌশল অবলম্বন করেছে। তাদের সেসব কৌশল নিয়ে অনেকের ভেতর যুগপৎ বিস্ময় ও হাস্যরসেরও সৃষ্টি হয়েছে। সেই সাথে বহু প্রশ্নের জন্মও হয়েছে। যাই হোক, আমরা এই নিবন্ধের সূচনায় বলেছি, বিএনপি সম্ভবত ক্ষমতাসীনদের একটা ফাঁদে ফেলতে চেয়েছে। শাসকদল সে ফাঁদে পা দিয়েছে। হয়তো অজান্তেই আওয়ামী লীগ সে ফাঁদে পা দিয়ে ফেঁসে গেছে। যেমন সদ্য সমাপ্ত উপনির্বাচনে তাদের আচার-আচরণ, মন ও দেহভঙ্গিমা ভবিষ্যতে তাদের বিপক্ষে থাকা দলগুলোর জন্য শক্ত ‘এভিডেন্স’ হয়ে উঠতে পারে। আওয়ামী লীগের ভাবনায় এটা দৃঢ়তার যে, দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন তাদের অধীনেই হতে হবে। অথচ উপনির্বাচনের তাদের যাবতীয় কর্মকাণ্ড দেখে জনগণের এই বিবেচনা আরো শক্তিশালী হয়েছে : ক্ষমতাসীনদের অধীনে ভবিষ্যতে আর কোনো জাতীয় নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক হওয়া একেবারেই অসম্ভব। তথাপি তারা কিন্তু ‘জোর গলায়’ বলে চলেছে, তাদের অধীনেই দ্বাদশ সংসদ হবে। গ্রামাঞ্চলে একটা কথার খুব প্রচলন আছে, বাঁশঝাড়ের নিচ দিয়ে কারো চলার সময় যে ভয় পায়, তবে সজোরে গান গায় অথবা কথা বলে।

এখন এ ধারণা জোরদার হবে উপনির্বাচনে শাসক দল সব কার্যক্রমকে বিবেচনায় নিলে। এটা সহজেই বোঝা যায়, তারা জনগণের ওপর কোনোভাবেই ভরসা করতে পারবে না, আগামীতে তারা সাধুতার শত প্রতিশ্রুতি দিলেও। বিএনপি বোধ হয়, সেটিই একেবারে দ্বাদশ নির্বাচনের আগে আবারো প্রমাণের জন্য এই ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল। বিএনপির ফাঁদে পা দিয়ে আরো কিছু ব্যত্যয় ক্ষমতাসীনরা করেছে, সে কথা একে একে বলা যেতে পারে।

প্রথমত, অনেক দিন থেকে এমন অভিযোগ রয়েছে, শাসকদল তাদের পুরনো কোনো ভূমিকারই পরিবর্তন করতে পারেনি। ভবিষ্যতে সেটি করবে। অতীতের অভিজ্ঞতা তা বলে না। এ পর্যন্ত তাদের দ্বারা সেটি সম্ভব হয়নি, সে তালিকার অন্যতম হচ্ছে, তাদের অধীনে কোনো অবাধ, সুষ্ঠু ও প্রশ্নমুক্ত নির্বাচন করানো। গত ১৫ বছরে তাদের অধীনে জাতীয় সংসদের তিনটি নির্বাচনের মধ্যে একটিও কাক্সিক্ষত মানের ভোট পর্ব হতে পারেনি যাতে দেশে ও বিদেশে কোনো মহল যাকে ভালো নির্বাচন বলে স্বীকৃতি পেতে পারে। নির্বাচন নিয়ে শাসকদলের এখনো যে দৃষ্টিভঙ্গি সেটি নেতিবাচক। নির্বাচনের মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি তারা ‘খেলার’ পর্যায়ে নামিয়ে নিয়ে এসেছে। সব শেষ যে আসনগুলোতে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেখানে শাসকদলের যে ‘টেন্ডেন্সি’ অনুশীলন করতে দেখা গেছে, সেটি একেবারে ‘খেলা তামাশার’ রূপ ধারণ করেছিল। অথচ এই গুরুত্বহীন উপনির্বাচনে তাদের নিষ্ক্রিয় থাকাই ছিল শ্রেয়। ক্ষমতাসীন দলের প্রতিপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ বরাবর করে থাকে, আওয়ামী লীগ যেকোনো নির্বাচনেই সব সময় কলকাঠি নাড়ে; সেটিই শাসকদল প্রমাণ রেখে গেল, যা আখেরে তাদের কুদৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

দ্বিতীয়ত, পক্ষশক্তি প্রতি নির্বাচনেই নীতিনৈতিকতার কোনো ধার ধারে না। তাদের মনোবাঞ্ছা পূরণের সবকিছু জলাঞ্জলি দিতেও প্রস্তুত; ‘পাছে লোকে কিছু বলে’ এমন নীতিবোধের তোয়াক্কা তারা কখনো করে না, নিজ স্বার্থ উদ্ধারে পিছুটান অনুভব করে না। সে জন্যই এবারো দেখা গেছে অতীতের বহু আসন নিয়ে সেসব ক্যারিকেচার করেছে।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে বিশেষ একটি আসনের ক্ষেত্রে নীতিনৈতিকতা ও লোকলজ্জা সবকিছু দূরে সরিয়ে রেখে সেই একই ‘গেইমের’ পুনরাবৃত্তি করেছে। বিগত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল সেই একই প্রহসন করেছে, ভবিষ্যতেও নিঃসন্দেহে সেই ধারাবাহিকতাই তাদের দ্বারা অনুসৃত হবে। এখন তার একটা ‘মিনি এক্সারসাইজ’ ইতোমধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হতে দেখা গেছে। সেখানে অনুষ্ঠিত সেই নাটকের ‘নায়ক’ অর্থাৎ তথাকথিত স্বতন্ত্র প্রার্থীকে ঘিরে যা হয়ে গেল সেটি হাস্যরসেরই ব্যাপার ছিল। সেই প্রার্থী আসলে ‘কার খালু’ সেটিও জনগণ সহজেই বুঝতে পেরেছে।

তৃতীয়ত, আবারো প্রমাণ হয়েছে, ক্ষমতাসীনদের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে অংশ নেয়ার ব্যাপারে অতীতের মতো এতটুকু আগ্রহ উৎসাহ জনগণের অবশিষ্ট নেই। সেটি কিন্তু অবলোকন করা গেছে, বিশেষ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উপনির্বাচনের সময়। পত্র-পত্রিকার রিপোর্ট ও যে ছবি ছাপা হয়েছে, তাতে দেখা গেছে ভোটারদের উপস্থিতি একেবারেই ‘লিন অ্যান্ড থিন’। একে আর যাই বলা হোক, সর্বশেষ কথা হচ্ছে, গণতন্ত্র মহাসঙ্কটের এগোচ্ছে। দূর অতীতে এটা বহুবার দেখা গেছে, এ দেশের গণতন্ত্রমনা মানুষ বরাবর নির্বাচনকে বেশ উৎসব হিসেবে গ্রহণ এবং দলে দলে মানুষ ভোটকেন্দ্র গিয়ে হাজির হয় নিজেদের পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে ভোট দিতে, আনন্দ উল্লাস করে।

চতুর্থত, অতীতে আরো দেখা গেছে নির্বাচন/যত আনন্দ কোলাহল হলেও দেখা যেত না হুড় হাঙ্গামা; ভোটের বাক্স ছিল তাই, তখন এমন ঘটনার লেশ মাত্র ছিল না। এখন এসব হটিয়ে মাস্তান-ক্যাডাররা ভোটের দিনে হাঙ্গামা হুজুগ বাধিয়ে ভোটের জন্য উপযুক্ত সেই শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ধ্বংস করে ফেলেছে। এবারও উপ নির্বাচনে তেমন হাঙ্গামার খবর পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। একই সাথে নানা অনিয়ম ও ভোটদানের গোপনীতাও রক্ষিত হয়নি। পত্রিকায় এমন সব ছবি দেখা গেছে যে, একজন বুথে ঢুকে ভোট দিচ্ছে; ঠিক তার পাশে কয়েকজন দাঁড়িয়ে রয়েছেন। এসব হাঙ্গামা রোধে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরা কিছু মাত্র সক্রিয় ছিল না। এসব ঘটনা সব মহলকে উদ্বিগ্ন করেছে এবং আশঙ্কা করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে এমন বিশৃঙ্খলা অবদমন করা হবে না, ক্ষমতাধরদের যত কারসাজিতে। অথচ নির্বাচনের অনেক পূর্বশর্তের মধ্যে এটাও রয়েছে, ভোটের দিনে শান্তিপূর্ণ ও ভয়ভীতিহীন পরিবেশ সৃষ্টি করা; তা এবার মাত্র কয়েকটি আসনের নির্বাচনে সেই শর্ত পূরণ করা সম্ভব হয়নি।

পঞ্চমত, যেসব অনিয়ম ব্যত্যয় ও অঘটন নিয়ে কথা বলা হলো, তার দায় ক্ষমতাসীনদের এবং নির্বাচন কমিশনকেই নিতে হবে। নির্বাচনকে অর্থবহ করা, ভোটের সৌন্দর্যশৈলী রক্ষা ও সামগ্রিক পরিস্থিতি অনুকূলে রাখার ক্ষেত্রে উল্লিখিত দুই পক্ষের দায়িত্ব পালন করার কথা থাকলেও সেখানে অবহেলার বিষয় পরিস্ফুট হয়েছে। এসব দেখে কেউ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, উল্লিখিত দুই পক্ষের সক্ষমতা পারঙ্গমতার এমন ঘাটতি ভবিষ্যতেও দূর করা যাবে না।

যাই হোক, অনেক পূর্ব শর্তের মধ্যে ভোটের দিনে শান্তিপূর্ণ ভয়ভীতিহীন পরিবেশ সৃষ্টি করতে না পারার অর্থ হচ্ছে- ভোট নিয়ে শত অভিযোগ অনুযোগকে সাদরে আমন্ত্রণ জানানো। তাই এসব ব্যত্যয়ের জন্য অবশ্যই যারা যখন ক্ষমতায় থাকুন না কেন, তাদের এ নিয়ে দায়িত্ব পালনে ঘাটতি ছিলই। তার জন্য অবশ্যই ক্ষমতায় যারা থাকবেন তাদের দায়ভার অনেক বেশি নিতে হবে। সেই সময় যে ইসিই থাকুক না কেন তাদেরকেও অভিযুক্ত হতে হবে। নিকট অতীতের অভিজ্ঞতা হচ্ছে, উল্লিখিত দুই পক্ষের কেউ তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথ প্রতিপালন করতে পারেননি। এর ফল ছিল, সেই সময় যত নির্বাচন হয়েছে, সেগুলো নিয়ে শত অভিযোগ ছিল, সাধারণের ক্ষোভ এবং আন্তর্জাতিক বলয়ের যেসব নির্বাচন নিয়ে অসন্তুষ্টি কম ছিল না।

সম্প্রতি যেসব আসনে উপনির্বাচন হয়েছে, অতীত থেকে বিএনপির ধারাবাহিক যে অভিযোগ, বর্তমান প্রশাসনের অধীনে কোনো ভোটই সুষ্ঠু হতে পারে না, তাদের সেই বক্তব্যই এবারো সত্যে পরিণত হয়েছে। তবে এ কথা ঠিক, বিএনপিরও একটি বড় ধরনের দুর্বলতা সবাই এবার লক্ষ করেছে। সেটি হলো, দলের নেতা নির্বাচনে তারা সবসময় সঠিক ব্যক্তিদের বেছে নিতে পারেনি। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তথাকথিত সেই স্বতন্ত্র প্রার্থীর আঁতুড়ঘর কিন্তু বিএনপির শিবিরেই। অথচ কী দর্শনীয় ডিগবাজি না তিনি দিয়েছেন। আগামীতে এই দলের জন্য এটা শিক্ষণীয় বিষয় হয়ে থাকা উচিত, বিপদই কিন্তু সঠিক ব্যক্তি পরিচয় পাওয়ায়। এটাও জনগণ দেখেছে, ওয়ান-ইলেভেনের সময় বড় দুই দলের বহু পরীক্ষিত (!) নেতারা পদ-পদবির জন্য কতটা কাতর হয়ে পড়েছিলেন- এসবই ইতিহাস।

ndigantababar@gmail.com


আরো সংবাদ



premium cement