১৪ আগস্ট ২০২২
`

ভারত কোন দিকে যাবে?

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি - ছবি : সংগৃহীত

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন এক সংবেদনশীল বিশ্ব পরিস্থিতিতে দিল্লি সফর করেছেন। সফর শেষে তার বক্তব্যটি ছিল গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেছেন, ভারতকে তারা যে প্রতিরক্ষাসামগ্রী ও প্রযুক্তি শেয়ার করেছেন তা রাশিয়ার হাতে চলে যাচ্ছে কি না তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। চলমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান কৌশলগত সহযোগী হলো যুক্তরাজ্য। ভারতের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করার জন্য বরিসের এ সফর পাশ্চাত্য জোটের সামগ্রিক কোনো সিদ্ধান্তের ফসল হয়ে থাকতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের নেতত্বাধীন পাশ্চাত্য বলয় এখন চাইছে, ভারত তার কৌশলগত অবস্থানটি নিশ্চিত করুক যে, দেশটি রুশ বলয়ে থাকবে নাকি পাশ্চাত্য জোটে আসবে। কোয়াড গঠন ও ইন্দো-প্যাসিফিকে একাধিক যৌথ সামরিক কার্যক্রম এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তির পর মনে হয়েছিল, ভারত পাশ্চাত্য বলয়ে নিজেকে সংযুক্ত করবে। কিন্তু নরেন্দ্র মোদির জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হওয়ার স্বপ্ন ভাঙা এবং চীনের সাথে সামরিক সঙ্ঘাত বৃদ্ধির পর দিল্লি ধীরে ধীরে ওয়াশিংটনমুখী নীতি থেকে সরে আসতে থাকে। কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের নাম দিয়ে রাশিয়ার কাছ থেকে উচ্চ প্রযুক্তির সমরাস্ত্র সংগ্রহ অব্যাহত রাখে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের বাধার মুখেও রাশিয়ার কাছ থেকে ভারত এস৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সংগ্রহ করে।

গভীর হয়ে আসছে অবিশ্বাস
রাশিয়ার সাথে অব্যাহতভাবে উচ্চপর্যায়ের কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখা এবং বৈশ্বিক ফোরামগুলোতে ক্রেমলিনকে সমর্থন জোগানোর কারণে ভারতের ব্যাপারে গভীর অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে আমেরিকান বলয়ে। ইন্দোÑ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের চীনবিরোধী সামরিক জোট হিসেবে পরিচিত কোয়াডে ভারতের অংশগ্রহণের গভীরতার বিষয়ও নানা প্রশ্নের সৃষ্টি করে। কোয়াড যেখানে সামগ্রিক কৌশলগত নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার একটি বলয় সেখানে ভারত কেবল চীনের বিরুদ্ধে দিল্লির স্বার্থানুকূল তৎপরতায় অংশগ্রহণে নিজেকে সীমিত রাখতে চায়। ভারতের তীব্র বিরোধিতার কারণে কোয়াড ফোরামে ইউক্রেনে রাশিয়ান সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কোনো প্রস্তাব গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি।

এর পরেও ইউক্রেন হামলার নিন্দা জানানো বা এই হামলা বন্ধ করার ব্যাপারে কোনো প্রস্তাবেই কোয়াডের অন্য অংশীদারদের সাথে থাকেনি দিল্লি। এই গভীর মতভেদ কোয়াড উদ্যোগকে কার্যত অকার্যকর করে তুলেছে। ভারতের এই সংশয়ী ও সুবিধাবাদী মনোভঙ্গির কারণে বাইডেন প্রশাসন শুরু থেকে কোয়াডের ব্যাপারে আস্থা হারাতে শুরু করে। আর এখন ধীরে ধীরে এই উদ্যোগ অকার্যকর হয়ে পড়ছে। ওয়াশিংটনের এক নিরাপত্তা সূত্র থেকে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে কোয়াড বিলুপ্তির বিষয় বিবেচনা করছে। আর অকাসের সম্প্রসারণ অথবা ইন্দো-প্যাসিফিক নতুন কোনো সামরিক ও অর্থনৈতিক জোট গঠন করার উদ্যোগ নিতে পারে ওয়াশিংটন।

অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকের ধারণা, বরিস জনসনের ভারত সফর দিল্লির মনোভঙ্গি যাচাই এবং পাশ্চাত্যের পক্ষ থেকে বার্তা দেয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বিদায়কালে জনসনের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ পর্যবেক্ষণে মনে হয়, সম্ভবত তার দিল্লি সফরে পাশ্চাত্যের জন্য কোনো ইতিবাচক বার্তা সেভাবে নেই। তিনি রাশিয়ার ওপর ভারতের নিরাপত্তা নির্ভরতা অবসানের যে আহ্বান জানিয়েছেন তাতে কোনো সাড়া দিল্লির নীতিপ্রণেতারা সম্ভবত দেয়নি। দিল্লির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সীমান্ত সঙ্ঘাত মোকাবেলার জন্য রাশিয়াকে প্রয়োজন ভারতের।

যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ভেবেছিল, এশিয়ায় চীনের অভিন্ন প্রতিপক্ষ হিসাবে আমেরিকা ভারতের সাথে একত্রে কাজ করতে পারবে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের নিরাপত্তা বিধানের জন্য। কিন্তু ভারতের নীতিপ্রণেতারা মনে করেন, রুশবলয়ের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে আমেরিকা বলয়ের সাথে তারা সম্পর্ক বজায় রাখবেন। এ ক্ষেত্রে তিনটি সুবিধা দিল্লি পেতে চেয়েছে। এর প্রথমটি হলো, এককভাবে সোভিয়েত সামরিক প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল না হয়ে ধীরে ধীরে ন্যাটোর প্রযুক্তিকে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীতে নিয়ে আসা। দ্বিতীয়ত, ভারতের পাশাপাশি চীনের সাথেও রাশিয়ার যেহেতু গভীর সম্পর্ক রয়েছে সেহেতু বড় কোন যুদ্ধ সঙ্ঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের পাশে পাওয়া। তৃতীয়ত, চীনের সাথে চূড়ান্ত সঙ্ঘাতে পাশ্চাত্য দেশটি থেকে যে বিনিয়োগ ও শিল্প স্থাপনা সরিয়ে আনবে তা যেন ভারতে প্রতিস্থাপিত হয় তার সুযোগ গ্রহণ করা।

মোহ ভঙ্গ?
বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে নতুন নতুন ঘটনা ও মেরুকরণে নবপর্যায়ে এমন এক স্নায়ুযুদ্ধের পরিবেশ তৈরি হয় যাতে সুনির্দিষ্টভাবে যেকোনো এক বলয়ে যাবার বিকল্প থাকছে না। বিশেষভাবে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসী সামরিক হামলার পর দুদিকে থাকার পরিবেশ আর থাকেনি। এর ফলে ভারত রাশিয়ার দিকে অনেকটা একতরফাভাবে ঝুঁকে যাচ্ছে।

এস৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কেনার পর ইউক্রেন প্রশ্নে পাশ্চাত্যের সাথে না থেকে রাশিয়াকে সমর্থন জোগানোয় স্পষ্ট বার্তা যায় পশ্চিমাদের কাছে। সর্বশেষ, ৩০ শতাংশ কম দামে রাশিয়ার কাছ থেকে জ্বালানি তেল সরবরাহ নেয়ার মাধ্যমে প্রকারান্তরে ওয়াশিংটনকে জানিয়ে দেয়া হয় যে, দিল্লির সাথে রুশ প্রেম ছেদ করার মতো নয়। রাশিয়ার মিল মি অ্যাটাক হেলিকপ্টার না কেনার ঘোষণা দিয়ে প্রকাশ্যে কিছুটা আশ্বস্ত করতে চেষ্টা করলেও পাশ্চাত্য এখন নিশ্চিত, বৈশ্বিক সঙ্ঘাতে মিত্র হিসেবে তারা ভারতকে পাশে পাবে না। এর আগে মিয়ানমারে অং সান সু চির বিরোধী পক্ষকে সমর্থনের বিষয়েও দিল্লি পাশ্চাত্য বলয়ের সাথে না থেকে চীন-রাশিয়ার পক্ষে থেকেছে। প্রতিবেশী হিসাবে মিয়ানমারের ক্ষেত্রে নিজস্ব সমীকরণ থাকলেও ইউক্রেন ইস্যুতে সেটি থাকার কথা নয়। কিন্তু রুশ স্বার্থের বিপক্ষে যেতে পারেনি ভারত।

এসব বিবেচনা করে বাইডেন-বরিস বলয় ভারতের ব্যাপারে এক ধরনের মোহভঙ্গ পরিস্থিতিতে পড়েছে বলে মনে হচ্ছে। ভারতের চির বৈরী প্রতিবেশী পাকিস্তানের সাথে পাশ্চাত্যের কৌশলগত সমীকরণকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার পেছনে এই হিসাব নিকাশ সক্রিয় ছিল বলে জানা যাচ্ছে। কৌশলগতভাবে চীনের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখেই ইসলামাবাদ পাশ্চাত্যের সাথে স্নায়ুযুদ্ধকালের মতো কৌশলগত সমীকরণ বজায় রাখবে। এতে পাকিস্তানের নিজস্ব লাভ লোকসানের অবস্থা কী দাঁড়াবে সে আলোচনা অন্য কোনো লেখায় করা যাবে। তবে পাকিস্তানের গভীর ক্ষমতাবলয়ের সাথে আমেরিকান বোঝাপড়া এবং নতুন পর্যায়ের সম্পর্ককে সামনে এগিয়ে নেয়ার উদ্যোগে ভারতের ব্যাপারে পাশ্চাত্যের আশাহত হওয়ার বিষয়টি বেশি সক্রিয় বলে মনে হয়।

দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতকে হিসাব থেকে বাদ দিয়ে পাকিস্তান ও অন্য ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোকে সামনে নিয়ে এগোতে চাইলে ভারত স্নায়ুযুদ্ধের মতো প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে রুশনির্ভরই থাকবে। ফ্রান্স ও ইসরাইলের মতো পাশ্চাত্য বলয়ের মিত্রদেশের সাথে দ্বিপক্ষীয় ভিত্তিতে সম্পর্ক হয়তো বজায় রাখা যাবে। তবে সেটিও নির্ভর করবে রুশ অক্ষের সাথে সম্পর্কের কতটা গভীর পর্যন্ত ভারত জড়ায়, তার ওপর।

কেন ছাড়া যাচ্ছে না রাশিয়াকে
রাশিয়াকে কেন ভারত চাইলেও ছাড়তে পারছে না তার অনেকগুলো বাস্তব কারণ রয়েছে। প্রথমত, ভারতের প্রতিরক্ষা খাতে এখনো ৭০ থেকে ৮০ ভাগ নির্ভরতা রাশিয়ার ওপর। রুশ অস্ত্র ও প্রযুক্তি ব্যবহারে ভারতের নিরাপত্তা বাহিনীগুলো অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। ভারতের গভীর ক্ষমতাবলয়ের সাথে রাশিয়ার গোয়েন্দা পরিষেবার গভীর সম্পৃক্ততা রয়েছে। রুশ সমরাস্ত্র ক্রয়ের সাথে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্বের অর্থনৈতিক স্বার্থের যোগসূত্র থাকার বিষয়টিও রয়েছে বলে মনে করা হয়।

আরেকটি বিষয় হলো- স্নায়ুযুদ্ধ সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং এরপর নানা সময়ে টানাপড়েন তৈরি হলেও রাশিয়া কাশ্মিরসহ বিভিন্ন ইস্যুতে বৈশ্বিক ফোরামে ভারতকে একতরফা সমর্থন দিয়ে গেছে। ব্রিকস ও হংকং সাংহাই কো-অপারেশনের সাথে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে দিল্লির প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিল মস্কো। আফগানিস্তান থেকে শুরু করে মধ্য এশিয়ায় আরো সামনে অগ্রসর হতে চাইলে ভারতকে রাশিয়ার সাথে গভীর সুসম্পর্ক রক্ষা করে চলতে হবে। এ ছাড়া বিকল্প বিশ্বব্যবস্থার অংশ হিসেবে, নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ও এশীয় অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাংকের মতো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোতে ভারতের প্রধান উদ্যোক্তার ভূমিকা পালন সম্ভব হয়েছে রুশ সমর্থনে। এ জন্য রাশিয়ার সাথে কৌশলগত সম্পর্কের অনেক মূল্য রয়েছে ভারতের কাছে।

ভারতের জন্য আরেকটি বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, সীমান্ত সঙ্ঘাত। এই সঙ্ঘাত মূলত চীন ও পাকিস্তানের সাথে। রাশিয়ার সাথে থাকলে মস্কো বেইজিংয়ের ওপর এই সঙ্ঘাতকে সহনীয় অবস্থার মধ্যে রাখার ব্যাপারে প্রভাব বিস্তার করতে পারবে। সেটি যে করেছে তাতে এখন আর অস্পষ্টতা নেই।

ভারত এখন কৌশলগত বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কম্পার্টমেন্টাল রিলেশনের নীতি গ্রহণ করেছে। যেসব পয়েন্টে যার সাথে সহযোগিতার অবকাশ রয়েছে সেখানে সেটি করা হবে। চীনের সাথে দীর্ঘ সীমান্ত বিরোধ থাকলেও মিয়ানমারে বেইজিং-দিল্লির ভূমিকা একই রেখায় চলমান রয়েছে। ব্রিকস ও হংকং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা এমনকি ইউক্রেন প্রশ্নে বিশ্বফোরামে চীন-ভারতের ভূমিকা অভিন্ন। চীন ভারতের সাথে যতই বিরোধে যুক্ত হোক না কেন, দেশটি দিল্লির বৃহত্তম বিনিয়োগকারীর একটি। চীন যেসব শিল্প স্থাপনা ‘সর্ব আবহাওয়ার মিত্র’ দেশ পাকিস্তানে করেনি সেটি করেছে ভারতে।

চলতি শতাব্দীর শুরু থেকে ভারত-চীন দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটে। চীন ২০০৮ সালের মধ্যে ভারতের বৃহত্তম পণ্য ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হয়, যে অবস্থানটি চীন আজো ধরে রেখেছে। বর্তমান দশকের শুরু থেকে, দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৃদ্ধি তাৎপর্যপূর্ণভাবে রেকর্ড গড়েছে। ২০১৭ এবং ২০১৮ সালে, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০১৯ সালে, ভারত চীনের ১২তম বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার ছিল। কোভিডের কারণে মোট দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বছরে ২.৯৩ শতাংশ হ্রাস পেয়ে এসময় ৯৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে। চীনে ভারতের রফতানি একই সময়ে ৪.৫ শতাংশ কমে ১৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। আর চীন থেকে ভারতের আমদানিও ২.৫ শতাংশ কমে ৭৫ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। কোভিড-১৯ এর প্রভাব অব্যাহত থাকায়, চীনের সাথে সামগ্রিক বাণিজ্য ২০১৯ সালের একই সময়ের (৬৯.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) তুলনায় ২০২০ সালের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর (৬০.৫ বিলিয়ন ডলার) সময়ে ১৩.১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। ২০২১ সালে বাণিজ্য আবার বৃদ্ধির ধারায় চলে গেছে।

ফলে আপাতদৃষ্টিতে আমরা চীন-ভারত বৈরিতাকে যে মাত্রায় দেখি সেটি সব সময় সঠিক পর্যবেক্ষণ হয় না। আগামী দিনে যে নতুন বিশ্ব পরিস্থিতি আসছে সেখানে চীন-রাশিয়া-ভারত নিয়ে যদি শেষ পর্যন্ত একটি অক্ষ তৈরি হয় এবং এই অক্ষ যদি সমান্তরাল বিশ্বব্যবস্থা তৈরিতে এক সাথে ভূমিকা রাখে তাতে বিস্মিত হওয়ার কিছু থাকবে না।

মূল্য কি দিতে হবে না
রাশিয়াকেন্দ্রিক নীতি ভারত গ্রহণ করলে এ জন্য কি তাকে কোনো মূল্য দিতে হবে? আর দক্ষিণ এশিয়ায় এর প্রভাবই কী হবে, সেই প্রশ্নটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চীন থেকে পাশ্চাত্যের বিনিয়োগ সরিয়ে এনে ভারতে তা প্রতিস্থাপনের একটি প্রক্রিয়া এর মধ্যে শুরু হয়ে গিয়েছিল। মোদি প্রশাসন আশা করেছিল, এর মাধ্যমে চীনে যে উচ্চপ্রবৃদ্ধির কয়েক দশক এসেছিল সেটি আসবে ভারতে। দেশটির অর্থনীতি ও প্রভাব প্রতিপত্তি অনেক বেড়ে যাবে। এই অক্ষ পরিবর্তন ঘটলে সেই সম্ভাবনা সামনে আর নাও থাকতে পারে।

এতে ভারতের কৌশলগত ভাগ্যের মতো অর্থনৈতিক ভাগ্যও রাশিয়া চীনের সাথে সংযুক্ত হয়ে যাবে। বিকল্প অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যদি সফল হয় তাহলে ভারতের সামনেও আসতে পারে সাফল্য। আর রুশমুখী নীতি আর অবরোধ নিষেধাজ্ঞার পশ্চিমা নিয়মনীতি ভঙ্গের কারণে ভারতের ওপর আমেরিকার কোনো নিষেধাজ্ঞা এলে অর্থনৈতিকভাবে বৈরী এক অবস্থায় পড়তে পারে দেশটি। এর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষুদ্র দেশগুলোতে পশ্চিমাশক্তির সাথে একাত্ম হওয়ার নতুন মেরুকরণে ভারত যে প্রভাব বিস্তার করেছিল সেটিও কিছুটা পাল্টে যেতে পারে। আমেরিকা দক্ষিণ এশিয়ার নেতা হিসেবে ভারতকে যে স্বীকৃতি দিয়েছিল, সেটিও থাকবে না। এ ক্ষেত্রে চীনের সাথে ভারতের সঙ্ঘাত বেশ খানিকটা কমে আসতে পারে। তবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে ভারত-চীন স্বার্থগুলো এতটাই পরস্পর বিপরীত ধারায় রয়েছে যে, এগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধন অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।

এশিয়ায় ভারত-চীন-রাশিয়া অক্ষ তৈরি হলে শ্রীলঙ্কা নেপাল মালদ্বীপ পরিস্থিতিতে পাশ্চাত্যের নিয়ন্ত্রক প্রভাব কিছুটা কমে যেতে পারে। বাংলাদেশে কী হবে, সেটি বলা কঠিন। কারণ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নির্ভরতার সাথে পাকিস্তানের মিল রয়েছে। তবে ভারত-চীন একসাথে কোনো ভূমিকা পালন করলে পরিস্থিতির গতিমুখ কোন দিকে যাবে তা নিশ্চিত করে বলা মুশকিল হতে পারে।

mrkmmb@gmail.com


আরো সংবাদ


premium cement