১৯ জুন ২০২১
`

নেহরুভিয়ান এক গুপ্ত-হস্তক্ষেপের রাষ্ট্র

নেহরুভিয়ান এক গুপ্ত-হস্তক্ষেপের রাষ্ট্র - ফাইল ছবি

কলকাতায় রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশিত হয়েছে গত ২ মে, মানে এক মাসেরও আগে এবং তাতে তৃণমূল কংগ্রেস দলের মমতা তৃতীয়বারের মতো জয়লাভ করেছেন। মানে আবার মমতা ব্যানার্জি সরকার গড়বেন এবং গড়েছেনও। অথচ এই নির্বাচনে প্রচণ্ড মিথ্যা আশ্বাস জড়ো করে ফেলা হয়েছিল যে, নরেন্দ্র মোদির বিজেপি বিজয়ী হচ্ছেই; এই প্রপাগান্ডা এখন আত্মঘাতী অবস্থায়। তাই বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের মানসিক জোর ধরে রাখার জন্য, মিথ্যা উচ্ছ্বাস জীবিত রাখতে গিয়ে প্রতি পদে পদে কেন্দ্র বনাম রাজ্য- এভাবে মোদি-মমতা মুখোমুখি সঙ্ঘাত জোরদার করেছেন মোদি।

এ অবস্থায় ভারত-রাষ্ট্রে কেন্দ্র-রাজ্য বিবাদ, এই জিনিসটা কী আসলে? যদিও এই প্রশ্নটাই সর্বত্র সরব হয়ে উঠেছে। আর তা এবার কলকাতা ছাড়িয়ে ভারতের অন্য রাজ্যগুলোতেও ক্রমে ছড়াচ্ছে।

ফেডারেল শব্দটা ইংরেজি। এর একটা বাংলা অনেকে করে থাকেন ‘যুক্তরাষ্ট্রীয়’ বলে। যেমন অনেকে লিখেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ফেডারেল যদি রাষ্ট্র-সম্পর্কিত কোনো বিষয়ের মধ্যে সীমিত থাকে তাহলে হয়তো এই বাংলা দিয়ে চলে। যদিও এটা ভালো বাংলা নয়। কারণ ফেডারেল শব্দের সাধারণ অর্থ হলো, স্বাধীন ও সমতুল্যদের মধ্যে এবং তাদের নিয়ে গড়া এক অ্যাসোসিয়েশন। যেমন ফুটবল ক্লাবগুলোকে গড়া এক ফেডারেল অ্যাসোসিয়েশন বা ফেডারেশন। অথবা গার্মেন্টস ট্রেড ইউনিয়নগুলোর এক ফেডারেশন। অথবা সবধরনের ট্রেডের অ্যাসোসিয়েশনগুলোরও আবার এক ফেডারেশন। লক্ষ্য করুন, এখানে কিন্তু ফেডারেশন বা ফেডারেল ধারণার ব্যবহার কোনো রাষ্ট্র-বিষয়ক ব্যাপারে নয়। তাই ‘যুক্তরাষ্ট্রীয় শব্দটা এখানে কোনোভাবেই যুতসই তো নয়ই; সোজা কথা তা খাটবে না, অচল। তাই এ লেখায় ফেডারেল শব্দের কোনো বাংলা না করেই তা সরাসরি ব্যবহার করব।

তাহলে কেবল রাষ্ট্র-সম্পর্কিত কোনো ধারণা হিসেবে যদি বলি, এটা একটা ‘ফেডারেল রাষ্ট্র’ বলতে যেমন, আমেরিকা একটা ফেডারেল রাষ্ট্র, তাহলে কী বুঝব?

আরো পড়ুন : লাক্ষাদ্বীপে বিজেপির হিন্দুত্ববাদী থাবা

নাগরিক অধিকারের বর্তমান হাল

সে ক্ষেত্রে এর অর্থ হলো, এটা ৫০টা স্বাধীন ও সমতুল্য স্টেটের সমর্থনে গঠিত একটা ফেডারেল রাষ্ট্র অবশ্যই; তবে ফেডারেল রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার আগেই সেগুলো স্বাধীন রাজ্য ছিল এবং আছে বলে তাদের নিয়ে গঠিত এই বিশেষ ধরনের অ্যাসোসিয়েশন বা রাষ্ট্রটাকে ফেডারেল রাষ্ট্র বলা হচ্ছে।

তাহলে এখন এক সম্পূরক প্রশ্ন তোলা যাক। তাই, ভারতও কী একটা ফেডারেল রাষ্ট্র? কারণ ভারতেও তো বর্তমানে ২৮টা ছোট-বড় রাজ্য আছে বা নিয়ে গঠিত?

না, একেবারেই তা নয়। ভারত কোনো ফেডারেল রাষ্ট্র নয়; যদিও কেন নয় তা যথেষ্ট না জেনে বুঝেই অনেকে পত্রিকা রিপোর্টে ভারতের কেন্দ্র ও রাজ্যের বিরোধের ইস্যু হলেই তাকে ‘ফেডারেল’ সমস্যা বলে যেচে নিজের জ্ঞানবুদ্ধি জাহির করতে চায়। অথবা শব্দটা তারা শুনেছে সেটা বোঝাতে চায়। কিন্তু কথাটা সবচেয়ে বেখেয়ালে বলে ফেললেও ভারত কোনোভাবেই ‘ফেডারেল রাষ্ট্র’ নয়।

কিন্তু কেন? এত কঠোর সীমারেখা টানছি কেন?
কথাটা আমরা বুঝতে পারি আমেরিকার জন্মের ইতিহাস দিয়ে এবং সম্ভবত তাতে সবটা সহজে বোঝা যাবে। খুব অল্প কথায় বললে আজকের ফেডারেল আমেরিকা রাষ্ট্র ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই জন্ম নিয়েছিল। আর এর আগের কলোনিয়াল আমেরিকা বলতে তা ব্রিটিশসহ ইউরোপের বহু রাষ্ট্রেরই ছোট ছোট কলোনি বা দখলকৃত ভূমি হিসেবে ছিল। আর ওই দখলকৃত ভূমিগুলো আবার ব্রিটিশসহ নানান ইউরোপীয় দখলদাররা নিজ নিজ দেশ থেকে ‘বিনা পয়সায় জমি দেয়া হবে, শুরুর বিনিয়োগ দেয়া হবে’ ইত্যাদি নানা প্রলোভনের কথা বলে গরিব ইউরোপীয় বাসিন্দাদের মাইগ্রেট করে জাহাজে ভরে ভরে এককালে আমেরিকায় এনেছিল।

এসব গরিব ইউরোপীয় বাসিন্দাই জমি পাওয়ার লোভে স্থানীয় আদি বাসিন্দাদেরকে (‘রেড ইন্ডিয়ান’ বলে এরা ডাকত যাদের) খেদিয়ে দিয়েছিল, কখনো মেরে ফেলা হয়েছিল অথবা আরো গহিন বন জঙ্গলে পালাতে বাধ্য করা হয়েছিল। আর এভাবেই সাদা চামড়ার কলোনি মালিকরা সাদা ইউরোপীয় মাইগ্রেন্টদের এনে বসতি স্থাপনে বিভিন্ন ছোট শহর বা রাজের আমেরিকা কলোনি স্থাপন সম্পন্ন করেছিল। এই প্রথম পর্বের পরে মালিকরা এরপর সেখানে নিয়ে আসে আফ্রিকানদেরকে ‘কালো দাস’ নামে, একইভাবে মাইগ্রেট করিয়ে। তফাত খালি এরা পায়ে শিকল পরানো দাস হিসেবে এসেছিল এবং আফ্রিকা থেকে। আর এই দাসদেরকেই পরিচালনা করত সাদা মাইগ্রেন্টরা তবে সাদা মালিকদের পক্ষ থেকে। আর রাশিয়ান সোভিয়েত শ্রমশিবিরের চেয়েও ভয়াবহভাবে শিকলে বাঁধা দাসশ্রমিক হিসেবে। তবু যতই দিন গেছে, আর কালো মানুষেরা যত পোষ মেনেছে, ততই শিকল আলগা করে দিতে হয়েছে।

ওদিকে ব্রিটিশরা ভারতে কলোনি দখল ও শাসন শুরু করেছিল- আমেরিকার কলোনিমুক্ত বা স্বাধীন হওয়ার মাত্র কুড়ি বছর আগেই। ব্রিটিশরা ভারতীয়দের পায়ে শিকল না দিলেও কলোনির হুকুম ও বাধ্যবাধকতার ভেতরে রেখেছিল যা আমাদের প্রায়ই অসহ্য হয়ে উঠলে বিদ্রোহের ঘটনা ঘটত। কিন্তু আমেরিকার বেলায় নানান শহর ও রাজ্যের সাদা মাইগ্রেন্টরাই এক সময় তাদেরই মাস্টার বা সাদা মালিকদের শাসনের বিরুদ্ধে শুধু বিদ্রোহ নয় একবারে বিপ্লব- মানে পাল্টা ক্ষমতা দখল করে বসেছিল। এটাই আমেরিকান কলোনিতে ‘নয়া আমেরিকান বিপ্লব’ নামে পরিচিত, যার সময়কাল ১৭৭৬ সালের আশপাশের সময়। সোজা কথা, ব্রিটেনে বসে কলোনি ব্যবসায়ী মালিকরা আমেরিকায় তাদের নানা শহর বা রাজ্যের কলোনিগুলো সাদা ইউরোপীয় মাইগ্রেন্টদের দিয়ে পরিচালনা করবে, এই সুযোগেরই পরিসমাপ্তি ঘটেছিল এতে। এরপর স্বাধীন সেসব শহর ও কোথাও পুরা রাজ্যটাই স্বাধীন এবং এবার তারা একত্রে হওয়ার জন্য সম্মিলিত হয়ে বসেছিল; যেটাকে তারা আমেরিকা মহাদেশীয় সম্মেলন (আমেরিকান কন্টিনেন্টাল কংগ্রেস ১৭৭৫) নামে ডাকে। এরপর এক ফেডারেল আমেরিকা রাষ্ট্রে তারা সম্মিলিতভাবে গঠিত হয় পরের বছর।

লক্ষণীয় যে, এখানে শহর বা রাজ্যগুলো আগে স্বাধীন ও কলোনিমুক্ত হয়েছে; পরে স্বাধীন রাজ্যগুলো একটা রাষ্ট্রে একত্র হতে এসেছিল। এটাই ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই জন্মের ঘোষণা দেয়া আজকের ফেডারেল আমেরিকা রাষ্ট্র ও এর বৈশিষ্ট্য। তবে আজকের ৫০ রাজ্যের আমেরিকা যা আমরা দেখছি তা শুরুতে ছিল না। মাত্র ১৩টা রাজ্য কনফেডারেশনে এ ফেডারেল রাষ্ট্র গড়তে সম্মতি দিয়েছিল। কেন? কারণ সবার ভয় ছিল নতুন এই ফেডারেল রাষ্ট্র গড়তে গিয়ে আবার আগের মতো কোনো রাজ্য আরেক রাজ্যের ওপর কলোনির মতো আচরণ শুরু করে কি না- সেটা সবাই আগে নিশ্চিত হতে চেয়েছিল। তাই দ্বিধা ও দেরি। তাই ধীরে ধীরে আস্থা আসার পক্ষে আইনকানুন কী তৈরি হচ্ছে সেগুলো এবং গঠনতন্ত্র কী রাখা হচ্ছে, কাঠামো কী ইত্যাদি দেখে আর কিছুটা প্র্যাকটিসে নিশ্চিত হওয়ার পরে ১৩ রাজ্য থেকে সেটা আজ ৫০ রাজ্যের আমেরিকা।

তাহলে এখন আসুন ১৯৪৭ সালে, নেহরুর গঠিত ভারত কি এমন ২৮-২৯টা রাজ্যে এবং এরা কি প্রত্যেকে স্বাধীন ও কলোনিমুক্ত রাজ্য ছিল? না, একেবারেই নয়। বরং কথিত ভারত বলে একটা বিরাট ভূখণ্ড ছিল সেটাই ব্রিটিশ শেষ ভাইসরয় (রানীর প্রতিনিধি) মাউন্টব্যাটেন নেহরুর হাতে তুলে দিয়েছিলেন। তবে সেগুলো কোন কোন ভূখণ্ড? এক কথায় বললে, কেবল যেগুলোর প্রশাসন ব্রিটিশদের হাতে তৈরি ও পরিচালিত হতো। অর্থাৎ তিন প্রেসিডেন্সি (বেঙ্গল, মাদ্রাজ ও বোম্বাই) ও প্রায় ১৮টা প্রদেশ। এর বাইরে ছোটবড় মিলিয়ে ৫৫০ এরও বেশি করদ রাজার রাজ্য ছিল। এগুলো নেহরুকে হস্তান্তরের প্রশ্নই ছিল না।

কারণ এগুলো ছিল ব্রিটিশ শাসনক্ষমতার অধীনস্থ এবং শর্ত সাপেক্ষে ওই শাসনক্ষমতার সাথে রাজারা রাজস্ব শেয়ার করতেন। কাজেই ব্রিটিশরা ভারত ছেড়ে চলে গেলে ওসব করদ রাজ্য তখন থেকে আবার ফিরে স্বাধীন হয়ে যায়, যাদের নেহরুর কাছে হস্তান্তরের কোনো আইনি অধিকার ব্রিটিশ শাসকের ছিল না।

কাজেই নেহরু যে দুশ্চিন্তায় ‘পাগল’ ছিলেন তা হলো, প্রেসিডেন্সি, প্রদেশ ও পুরানা করদ রাজ-এদের সবগুলোকে পিটিয়ে জবরদস্তি করে হলেও সেনাবাহিনী পাঠিয়ে হলেও কথিত এক ভারত রাষ্ট্রের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া যায় কী করে! এই হলো জন্মের সময়কালের নেহরুর ভারত। সে কারণে নেহরুর নিজের ভারতের রাজ্যগুলোর প্রতি অ্যাটিচ্যুড যেন ভারত কলোনিমুক্ত হলেও তিনি এর কলোনি ভাইসরয়!

অর্থাৎ উল্টা করে বললে ২৮-২৯ টা রাজ্যে এরা যতই স্বাধীন ততই তা নেহরুর মাথা ব্যথার কারণ। সার কথায়, আমেরিকার মতো স্বাধীন রাজ্যগুলো স্বেচ্ছায় যুক্ত হচ্ছে, এমন কোনো রাষ্ট্রে তারা সংযুক্ত হয়নি। আর মাউন্টব্যাটেন নেহরুকে ভারত বলে কিছু একটা দিয়ে গেছে; অতএব সে কারণেই ভারতের রাজ্যগুলো স্বাধীন নয়, এমনকি পুরানা করদ রাজ্যগুলোও স্বাধীন নয়- জবরদস্তির এই অনুমানটাই বাস্তবায়ন করেছেন নেহরু। আর সেকালে ভারত রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে এভাবে। এই রাষ্ট্র তাই নিজেই নিজেকে কখনো ফেডারেল বলে ব্যাখ্যা করতে যায়নি। তাহলে?

এখন এই ভূতুড়ে ভারতটা কে? অনেক সময় মনে হবে এটা ‘উত্তর প্রদেশ’ রাজ্য। কেন? কারণ এর এলাহাবাদ শহরে নেহরুরা বাস করতেন। তার বাবা মতিলাল ওকালতি প্র্যাকটিস করতে কাছের বড় শহর হিসেবে (কাশ্মিরি ব্রাহ্মণ তিনি) এলাহাবাদে এসেছিলেন। তাহলে কি এটা উত্তর প্রদেশ নামে এই রাজ্যের বাকি সব রাজ্যের ওপর শাসনকর্তৃত্ব? কিন্তু সে ক্ষেত্রেও এই শাসনের ভিত্তি কী, ক্ষমতার উৎস কী, তা কেউ জানে না। তাই এটা ভূতুড়ে! তাহলে কি এটা সেই ইঙ্গিত যে, উত্তরপ্রদেশ মানে এক আর্য-শাসন বুঝতে হবে? তাহলে আর সবাই মানলেও বাংলা বা দ্রাবিড়রা তা মানতে বাধ্য কেন?

এসব প্রশ্নের কোনো দিনই কোনো সমাধান হয়নি। উল্টা উত্তর প্রদেশ বা হিন্দিবেল্ট কেন্দ্রিক ভূতুড়ে এক ক্ষমতা, এরই নাম হয়ে গেছে ‘কেন্দ্র’। কনস্টিটিউশনে কখনো একে ‘ইউনিয়ন’ বলা হয়েছে বটে কিন্তু কাদের ইউনিয়ন? ইউনিয়নে যুক্ত হওয়ার আগে কি তারা স্বাধীন ছিল? তাহলে কারা এক জায়গায় জড়ো বা ইউনিয়নে যুক্ত হচ্ছে? এসবের কোনো জবাব কোথাও নেই। বরং আগেই বলেছি সারা ভূখণ্ডকে ভারত নামের মধ্যে ধরে রাখবেন কী করে, কিসের আঠা লাগিয়ে, এটা ছিল বরং নেহরুর দুশ্চিন্তা। এই ‘আঠা’টাই হলো হিন্দুত্ব। যদিও নেহরু ও গান্ধী বুদ্ধিমান, তাই তারা এ কথাটা প্রকাশ্যে কোথায় লিখে বলতে চাননি। আর সে কারণেই সম্ভবত এই কথিত কেন্দ্র এই ভারত, সেটা কথিত ‘সেকুলার’ কি না তাও তারা কোথাও লিখে রাখেননি। ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭৬ সালে তা লিখিয়েছিলেন।

আমরা তাহলে এখন আরো ফোকাসে আসি। সেটা হলো, নেহরুর ভারত তাহলে ফেডারেল দূরে থাক, এটা বরং কেন্দ্র নামে ভূতুড়ে ক্ষমতার অধীনস্থতায় থাকা সব রাজ্যগুলোতে, যেখানে বহুবিধ জায়গা রেখে দেয়া হয়েছে যাতে কেন্দ্র রাজ্যের ওপর চাইলেই হস্তক্ষেপ করতেই পারে।

যেমন গভর্নর ব্যবস্থা, এটা করাই হয়েছে যেন যেকোনো সময় রাজ্যসরকার কেন্দ্র বাতিল করে এর পরিচালনা নিজের হাতে উঠিয়ে নিয়ে আসতে পারে। রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থতি খারাপ- এই বলে গভর্নর রিপোর্ট দিয়ে তা বাস্তবায়ন করতে পারেন। আসলে গভর্নর মূলত কেন্দ্রের প্রধানমন্ত্রী হস্তক্ষেপের হাতিয়ার। একইভাবে বাজেট বরাদ্দ নিয়ন্ত্রণ অথবা প্রশাসনিক অনিয়ম, দুর্নীতিরোধ ইত্যাদির বিরুদ্ধে ব্যবস্থ নেয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণে মানে প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতায় রাখা হয়েছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠান ব্যবহার-অপব্যবহার করে মমতার রাজ্য সরকারের ওপর মোদির হস্তক্ষেপের সুযোগ রেখে দেয়া হয়েছে। আসলে এভাবেই হস্তক্ষেপের মেকানিজম যেন তথাকথিত ভূতুড়ে কেন্দ্রের হাতে থাকে এমন সুযোগ রেখেই সেকালে কনস্টিটিউশন লেখা হয়েছিল; যাতে নেহরু হাতে সব নিরঙ্কুশ ক্ষমতা নিশ্চিত করতে পারেন।

আবার এ হস্তক্ষেপগুলো কেনো লিখে রাখা ‘রুল বুক’ মেনে চলা হোক, তা সেভাবে রাখাই হয়নি। রাখা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তি বা সাবজেকটিভ ইচ্ছার উপর। কাজেই রাজ্যকে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানোর জন্য প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিইচ্ছার অধীন হতে হবে রাজ্যকে, সোজা কথায় ‘তেল মারতে হবে’। এমনিতেই রুল বুক বা প্রশাসনের বিজনেস রুল বুকের অধীনে না থাকা কোনো ক্ষমতা মানেই তা ভয়াবহ হতে বাধ্য। এই না থাকার মানেই হলো চরম অরাজকতা। কারণ ব্যাপারটাকে কেউ নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হলেই তার ব্যক্তিখেয়ালে কোনোভাবেই ছেড়ে দেয়াই যায় না। রুল বুকের স্ট্যান্ডিং গাইডলাইন অবশ্যই থাকতে হবে। অথচ তা নেই।

এবারের নির্বাচনে হারার পর মোদির আচরণ ও তৎপরতা বলছে তিনি মমতার সাথে সঙ্ঘাতেই থাকতে চান। যেমন সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড়কে উছিলা করে মোদি মমতার সাথে এক মিটিংয়ে বসতে চান বলে ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। কিন্তু মোদির ইচ্ছা সেখানে তিনি রাজ্য বিরোধীদলের নেতা হিসেবে তার দলের লোককেও উপস্থিত রাখবেন এবং এতে সম্ভবত দলীয় কর্মীদের দেখাবেন বিরোধী নেতাও অনেক ক্ষমতা রাখেন। এখন মমতার দাবি, মোদি এই ব্যাপারটা একা ঠিক করতে পারেন না যে, রাজ্য থেকে সচিব ও প্রশাসনিক স্টাফসহ কোন কোন জনপ্রতিনিধি তাদের দুজনের সভায় উপস্থিত থাকবেন। আর এসব বিধি বা কনস্টিটিউশনে নেই বলে দাবি করেছেন মমতা।

এমনিতেই এটা দৃষ্টিকটু যে প্রধানমন্ত্রী ব্যুরোক্র্যাট আর মুখ্যমন্ত্রীর মতো জনপ্রতিনিধিকে একই প্রটোকলে ট্রিট করছেন। এর উপর সবখানেই মোদির এটা প্রদর্শনের ইচ্ছা যে, মুখ্যমন্ত্রী যেন প্রধানমন্ত্রীর এক অধীনস্থ প্রশাসনিক স্টাফ! এমনিতেই নেহরু কথিত কেন্দ্রের হস্তক্ষেপের বহুবিধ সুযোগ রেখে দিয়ে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক সাজিয়ে গেছেন। কারণ তার অযথা ভয় থেকে অযাচিত ক্ষমতার চর্চা যে রাজ্য যদি কেন্দ্রের কথা না শুনে; তাই সবসময় রাজ্যকে দাবড়ে রাখার সব মেকানিজম, দ্বৈত ক্ষমতাকর্তৃত্ব-ব্যবস্থা- এসবই হবে এর হাতিয়ার। এর উপর মোদি নিজেই মমতাকে একটা শিক্ষা দিয়ে অধীনস্থতায় আসতে বাধ্য করতে চাচ্ছেন। তাই সব মিলিয়ে এটা ভয়াবহ।

এখন মমতা ওই সভায় রাজ্যের প্রধান সচিবকে সাথে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু ইচ্ছা করেই সম্ভবত কেবল মোদির সাথে সাক্ষাৎ করেই, কোনো মিটিং না করেই ফিরে চলে আসেন। শুধু তাই নয়, ওই রাজ্যের মুখ্যসচিবও মোদির মিটিং বর্জন করে চলে আসেন।

স্বভাবতই এটা মোদির জন্য অপমানবোধের। তিনি মুখ্যসচিবকে শোকজ করেন এবং দিল্লিতে এসে রিপোর্ট করতে বলেন। কিন্তু মুখ্যসচিব এর জবাবে লিখেন, তিনি মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে মানে কথা শুনে মোদির ওই সভায় থাকেননি। অর্থাৎ তিনি যেন বলছেন, আমিও কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মচারী অবশ্যই। কিন্তু আমার রিপোর্টিং জনপ্রতিনিধি হলেন মুখ্যমন্ত্রী; প্রধানমন্ত্রী নন। কাজেই মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশকেই তাকে ফলো করতে হয়েছে। অর্থাৎ এটাও আসলে এক দ্বৈত ক্ষমতা ব্যবস্থার পরিণতি এবং তা ব্যুরোক্র্যাসিতে।

এমনিতেই সবখানে জাতিবাদের শ্রেষ্ঠত্ববাদের তোড়ে ভারত ডুবছে। এর ওপর তাদের আরেক ভ্যানিটি হলো, ভারতের ব্যুরোক্র্যাসি নাকি ‘স্টিলের তৈরি’, তাই এটা এতই শক্ত। আর ক্রেডিট হলো নাকি বল্লভভাই প্যাটেলের। তিনি এক গুজরাটি লোক। তাই মোদি গুজরাটে তার রেকর্ড উঁচু এক স্ট্যাচু বানিয়ে নিজেই আরো বিখ্যাত হওয়ার চেষ্টা করেছেন। আর সেই প্যাটেল হলেন আবার নেহরুর সব আকাম বা জবরদস্তি ঘটানো যে কোনো কাজের ডানহাত। যেমন ১৯৪৭ সালে সেনাবাহিনী পাঠিয়ে করদ রাজাদের ভারতে অন্তর্ভুক্ত হতে বাধ্য করার নেতা তিনি ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে।

এখন বাস্তবে এই স্টিলের ব্যুরোক্র্যাসির যে দ্বৈত শাসনব্যবস্থা সেটাই ভেঙে পড়তে যাচ্ছে তা বুঝতে পারা বা বিপদ অনুভব করার কেউ আছেন এমন দেখা যাচ্ছে না।

কাজেই এভাবে চললে মোদির টার্ম শেষ হতে হতে ২০২৪ সাল নাগাদ নেহরুর ছাপ মারা এই ভারত মানে, এই নেহরুভিয়ান ভারতরাষ্ট্র তার জন্মদুর্বলতায় ক্রমেই আরো কয়েক ধাপ ভাঙনের দিকেই এগিয়ে যাবে। এর সোজা প্রকাশ আমরা দেখতে পাবো পরবর্তীতে কথিত কেন্দ্রীয় সরকার গঠনে। আমরা দেখব, কোনো সর্বভারতীয় দল যেমন কংগ্রেস বা বিজেপি আর কেন্দ্রে সরকার গড়তে পারছে না। কোয়ালিশনই একমাত্র ভরসা হিসেবে উঠে আসছে।

এটাই রাষ্ট্র ভেঙে পড়ার পূর্বাভাস। এমনিতে রাষ্ট্র ভেঙে পড়া মানেই তা খারাপ, তা কিন্তু নয়। কারণ গড়তে গেলে তো আগে তা ভাঙতেই হবে। কিন্তু এটাই বিরাট বিপদের হবে যখন ভাঙার পরে গড়বেন কিভাবে, কী গড়তে চান, এ নিয়ে আপনি একেবারেই অপ্রস্তুত ও পরিকল্পনাহীন! সারা ভারতের দশা আবার এটাই বলে মনে হয়!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com



আরো সংবাদ