১৬ অক্টোবর ২০২১, ৩১ আশ্বিন ১৪২৮, ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩ হিজরি
`

লাল ফিতা উড়িয়ে দাও

-

[প্রথম পর্ব]

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অসংখ্য মানুষের চরম আত্মত্যাগ, অবর্ণনীয় দুঃখকষ্ট, নির্মম, নৃশংস, দুঃসহ নির্যাতনের ইতিহাস। এমন অসংখ্য ঘটনা আছে যা হয়তো অনেকেই জানেন না। তারই একটি হলো ‘লাল ফিতা উড়িয়ে দাও’।
১৯৭১ সালে পাকিস্তান সামরিক সরকারের নীতিনির্ধারণী বডির মধ্যে এমন একজন সিনিয়র দূরদর্শী বাঙালি সামরিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন; যিনি দেশ নিয়ে, দেশের স্বাধিকার নিয়ে, আমাদের অধিকার নিয়ে, পরাধীনতার গ্লানি থেকে দেশকে মুক্ত করতে নিজের জীবনের রিস্ক নিয়ে পরিকল্পনা করেছিলেন যুদ্ধ ছাড়া দেশকে স্বাধীন করার। তিনি অনেকের আগেই বুঝতে পেরেছিলেন ইয়াহিয়া ও কুচক্রী ভুট্টো গং পাকিস্তানের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে গণহত্যার পরিকল্পনা নিয়ে সময় ক্ষেপণ করছিলেন। রাজনীতিকরা তা বুঝে উঠতে না পারলেও সুদক্ষ সামরিক নেতা ও বিশেষজ্ঞ হিসেবে তিনি ও নিকটস্থ সহকর্মীরা তা স্পষ্টভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন। আর সামরিক পোশাকের দুঃসাহসী নিখাদ দেশপ্রেমিক সেই ব্যক্তিত্বটি ছিলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহমুদুর রহমান মজুমদার, যিনি এম আর মজুমদার নামেও পরিচিত। বঙ্গবন্ধু যদি তার পরিকল্পনাটি অনুমোদন করতেন, তা হলে হয়তো স্বল্পসংখ্যক পাকিস্তানি সেনা দলকে বন্দী করে একাত্তরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতেই বাংলাদেশের স্বাধিকার অর্জন করার সম্ভাবনা ছিল!
১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মরত সর্বজ্যেষ্ঠ বাঙালি অফিসার ছিলেন চারজন। জ্যেষ্ঠতাক্রমে তারা হলেনÑ ১. লেফটেন্যান্ট জেনারেল খাজা ওয়াসি উদ্দিন (২০ মার্চ ১৯২০-২২ সেপ্টেম্বর ১৯৯২); ২. মেজর জেনারেল মুহাম্মদ ইস্কান্দার আল করিম (এম আই করিম), জেনারেল অফিসার কমান্ডিং (২৩ নভেম্বর ১৯২৪-৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮)। ৩. ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহমুদুর রহমান মজুমদার (২৫ ডিসেম্বর ১৯২২-১৯ ডিসেম্বর ২০১১); ৪. ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ খলিলুর রহমান (১ জানুয়ারি ১৯২৭-২০ এপ্রিল ২০০৯)।
ইতোপূর্বে প্রথমজনকে নিয়ে লিখেছি; এবার তৃতীয় জন ও তার দুঃসাহসী এক পরিকল্পনা ‘লাল ফিতা উড়িয়ে দাও’ নিয়ে আলোকপাত করব। বাংলাদেশ সৃষ্টির পেছনে আমাদের সেনাবাহিনীর অনবদ্য অবদানে অনন্য ও অসাধারণ ভূমিকা রেখেছেন মরহুম ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম আর মজুমদার। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে চট্টগ্রামের সামরিক আইন প্রশাসক, ফরমেশন কমান্ডার, স্টেশন কমান্ডার, ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারের কমান্ড্যান্ট ছিলেন। সে সময়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী তথা সামরিক সরকারের মধ্যে তিনি ছিলেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং পূর্ব পাকিস্তানে জ্যেষ্ঠতম বাঙালি সামরিক অফিসার। তিনি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের প্রায় প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছিলেন। তাই মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক বা প্রস্তুতি পর্যায়ের তিনি অন্যতম পরিকল্পনাকারী। দেশের স্বার্থে নিজেকে উৎসর্গ করার মতো অত্যন্ত ঝুঁঁকিপূর্ণ সব দুঃসাহসিক কাজই তিনি নির্দ্বিধায় করেছেন। তিনি ১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পশ্চিম পাকিস্তানি স্বল্পসংখ্যক সামরিক উপস্থিতির সময় তাদের বন্দী বা হত্যা করে স্বাধিকার অর্জনের পরিকল্পনা, সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অমান্য করে ‘সোয়াত’ জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাস না করে বরং বিদ্রোহের পরিকল্পনা করায় শুধু অপসারিতই হননি, এর জন্য তাকে মারাত্মক কঠিন মাশুল দিতে হয়েছে। তার ওপর এমন অকল্পনীয়, অবর্ণনীয়, নির্মম, নিষ্ঠুর ও নৃশংস অত্যাচার চালানো হয়েছে, যা গুয়ান্তানামো বে কারাগারের বন্দী নির্যাতনকেও হার মানায়।
১৯২২ সালের ২৫ ডিসেম্বর আসাম প্রদেশের কাছাড় জেলার কাঠিহড়া থানার চন্ডিনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এম আর মজুমদার। তার পৈতৃক নিবাস সিলেট জেলার জকিগঞ্জ উপজেলায় কসকনকপুর ইউনিয়নের বলরামের চক গ্রামে। বাবার নাম ওয়াজেদ আলী মজুমদার। তার ছিল ছয় ছেলে। বড় ছেলে সাজ্জাদ মজুমদার ছিলেন ডেপুটি কমিশনার; ব্রিগেডিয়ার মজুমদার তৃতীয় সন্তান। তিনি সিলেট এমসি কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে দ্বিতীয় গ্র্যাজুয়েশন কোর্সে যোগ দেন এবং পাকিস্তান মিলিটারি অ্যাকাডেমিতে প্রশিক্ষণ শেষে ১৯৪৯ সালের ৩০ জুলাই পাঞ্জাব রেজিমেন্টে কমিশন লাভ করেন। সেনাবাহিনীতে তিনি একজন সুদক্ষ পেশাদার, চৌকস অফিসার হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে শিয়ালকোট সেক্টরে দুর্ধর্ষ সমরনায়ক হিসেবে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ পরিচালনা করেন এবং মারাত্মকভাবে আহত হন। অসম সাহসিকতার জন্য এ রাষ্ট্রীয় সম্মানসূচক ‘টিকিউ’ (তগমখায়ে কায়েদে আযম) পদক লাভ করেন। ১৯৬৯ সালে ব্রিগেডিয়ার পদে পদোন্নতি লাভ করেন। ১৯৭১ সালে তিনি চট্টগ্রামের ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারের (ইবিআরসি) কমান্ড্যান্ট হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। ব্রিগেডিয়ার মজুমদারই ছিলেন সেই সময়ে পূর্ব পাকিস্তানের সর্বজ্যেষ্ঠ বাঙালি সেনা কর্মকর্তা এবং একমাত্র বাঙালি ফরমেশন কমান্ডার। জ্যেষ্ঠ সামরিক কমান্ডার হিসেবে পাকিস্তান সরকারের অনেক অতি গোপনীয় তথ্য জানতে পারেন। তা ছাড়া পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থানরত সিনিয়র বাঙালি অফিসার লে. কর্নেল মুহাম্মদ খলিলুর রহমানও (পরে মেজর জেনারেল ও মহাপরিচালক বাংলাদেশ রাইফেলস) অনেক তথ্য তাকে জানাতেন, যা তিনি জেনারেল ওসমানীর মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর সাথে শেয়ার করতেন। সেনা কর্তৃপক্ষের অগোচরে পাকিস্তানি ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনাসংক্রান্ত অতি গোপনীয় চিঠির একটি কপি তার হস্তগত হয়; যা তিনি বঙ্গবন্ধুর কাছে পাঠিয়ে দেন। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান সামরিক সরকারের গোপন পরিকল্পনা অবহিত হয়ে সহজে নিজ পরিকল্পনা প্রণয়ন করতেন। মরহুম এম আর মজুমদারের বর্ণনা, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে ছয় দফা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার জন্য ঢাকায় আসেন। শেখ মুজিবের সাথে কয়েক দফা বৈঠক করেন তিনি। ইয়াহিয়া ছয় দফা মেনে নিতে মৌখিকভাবে রাজি হন। করাচি ফেরার পথে ঢাকা বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘শেখ মুজিবই পাকিস্তানের ভাবী প্রধানমন্ত্রী।’ পাঞ্জাব রেজিমেন্টে তথা পশ্চিম পাকিস্তানে আমার দীর্ঘ ১৮ বছর চাকরির অভিজ্ঞতা থেকে এ কথা বিশ্বাস করতে পারলাম না। ভাবলাম, ২৩ বছর ধরে বাঙালিদের ওপর প্রত্যক্ষভাবে আধিপত্যকারী পশ্চিম পাকিস্তানি আমলা ও সেনা কর্মকর্তারা খাঁটি বাঙালি শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফাভিত্তিক একচ্ছত্র শাসন কখনো মেনে নেবে না! করাচি ফিরে ইয়াহিয়া খান ভুট্টোর আমন্ত্রণে সপারিষদ সিন্ধু প্রদেশের লারকানা শহরে গেলেন। আমার মনে সন্দেহ হলো যে, লারকানায় ভুট্টোর রাজকীয় আতিথেয়তার আড়ালে নিশ্চয়ই বাঙালি ও মুজিববিরোধী কোনো অভিযানের ষড়যন্ত্র হচ্ছে। লে. কর্নেল খলিলুর রহমান এ সময় সেনাসদর বা জিএইচকিউ ট্রেনিং উইংয়ে জিএসও-১ ছিলেন। তিনি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে খুবই আগ্রহী ও উদ্বিগ্ন ছিলেন। তার সাথে টেলিফোনে প্রায়ই কথাবার্তা হতো। তিনি আমাকে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সাধারণত জিএইচকিউতে আসেন না। অথচ লারকানা থেকে ফিরে ইয়াহিয়া খানকে দু-তিন দিন ধরে জিএইচকিউতে দেখছি। এখানে জেনারেল হামিদ, পীরজাদা, গুল হাসান ও ওমরকে নিয়ে রুদ্ধ কামরায় মিটিং করেছেন। নিশ্চয় ওরা কিছু একটা ঘোঁট পাকাচ্ছে।’
এ অবস্থার মধ্যে এক দিন জিএইচকিউ থেকে দীর্ঘ দুই পাতার একটি টপ সিক্রেট চিঠি পেলাম। চিঠি পড়ে মর্মাহত হলাম। চিঠিতে লেখা হয়েছে, আওয়ামী লীগের ছয় দফার ভিত্তিতে প্রতিরক্ষা বাহিনীতে সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব মেনে নিলে বাঙালির প্রাধান্যে এটি একটি তৃতীয় শ্রেণীর সেনাবাহিনীতে পরিণত হবে। বিস্তৃতভাবে এসব কথা বর্ণনার পর উপসংহারে লেখা হয়েছে, এ অবস্থায় শেখ মুজিবকে কিছুতেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে দেয়া যায় না।
‘তা হলে আমরা আর পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে থাকব না, আমরা স্বাধীন হবো। প্রয়োজনে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনবÑ এ ছিল আমার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া। আমার একান্ত বিশ্বস্ত চিফ ইন্সট্রাক্টর লে. কর্নেল মুজিবর রহমান চৌধুরীকে আমার অফিসে ডেকে পাঠালাম। তাকে চিঠি পড়তে দিলাম। এ নিয়ে দুইজনে আলোচনা করলাম। ঠিক হলো, কর্নেল (অব.) এম এ জি ওসমানীর মাধ্যমে শেখ মুজিবকে যথাশিগগির বিষয়টি অবহিত করতে হবে।’
অতঃপর ব্রিগেডিয়ার মজুমদার পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থিত সামরিক বাহিনী, ইপিআর, পুলিশ ও আনসার বাহিনীর চাকরিরত ও অবসরপ্রাপ্ত বাঙালি সদস্যদের একটি তালিকা প্রণয়ন করেন। তাদের নিয়ে মাত্র কয়েক শ’ পাকিস্তানি সৈন্য (জানুয়ারি ১৯৭১) সংবলিত বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও তাদের ওপর আক্রমণ করার দুঃসাহসিক এক পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন এবং সেটি অনুমোদনের জন্য কর্নেল ওসমানীর মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে পাঠান। কিন্তু বঙ্গবন্ধু হয়তো কোনো বিবেচনায় তা অনুমোদন করেননি। এ প্রসঙ্গে এম আর মজুমদারের বক্তব্য হলো, ‘ওসমানী সাহেবকে টেলিফোনে সিলেটি ভাষায় কিছু ইঙ্গিত দিয়ে যত শিগগির সম্ভব চট্টগ্রাম শহরে লে. কর্নেল রবের বাসায় গোপনে আসতে বলি। পূর্ব পাকিস্তানে তখন পূর্ব পাকিস্তানি ও পশ্চিম পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীর শক্তি ও অবস্থানের মৌখিক হিসাব কষতে বসলাম আমরা। দেখা গেল, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইপিআর, পুলিশ, আনসার মিলে তাৎক্ষণিক স্ট্রাইকিং ফোর্স পশ্চিম পাকিস্তানিদের চেয়ে আমাদের সাত-আট গুণ বেশি। অতএব, স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনার জন্য অবিলম্বে আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে। দুই দিন পর ওসমানী সাহেব এলেন। তাকে জিএইচকিউ থেকে পাওয়া টপ সিক্রেট চিঠির বিষয়বস্তু জানালাম। বললামÑ ইয়াহিয়া, মুজিব, ভুট্টো বৈঠক ও কাদা ছোড়াছুড়ি করে একে অন্যকে ক্ষেপিয়ে সংসদ অধিবেশন বিলম্বিত করার আড়ালে বাঙালিদের সামরিক বাহিনী দিয়ে দমন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে জিএইচকিউ। পশ্চিম পকিস্তান থেকে রি-ইনফোর্সমেন্ট আনার আগেই অকস্মাৎ আমাদের আক্রমণ করতে হবে।’
রাজনৈতিক নেতা ও সামরিক নেতার সমস্যা সমাধানের মধ্যে পার্থক্য হলো, প্রথমজন আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধান চান; আর দ্বিতীয়জন চান যত দ্রুত সম্ভব শত্রুকে ঘায়েল করে সমাধান। তবে ১৯৭১ সালের জানুয়ারির পর থেকে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ আলোচনার মাধ্যমে কেবল সময় ক্ষেপণ করছিলেন সামরিক প্রস্তুতি নেয়ার জন্য। প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল একটি সামরিক সমস্যা, যা সামরিক উপায়েই সমাধান করতে হয় এবং এটি ব্রিগেডিয়ার মজুমদার একজন সামরিক নেতা হিসেবে বুঝতে সক্ষম হয়েছিলেন এবং জেনারেল ওসমানীর মাধ্যমে তা বঙ্গবন্ধুর কাছে তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে কূটচক্রী ইয়াহিয়া খান ২৫ মার্চ পর্যন্ত আলোচনার নাম করে এমনভাবে ব্যতিব্যস্ত রেখেছিলেন, বঙ্গবন্ধু যাতে জেনারেল ওসমানী বা তার রাজনৈতিক সহকর্মী কারোই সাথে একান্ত আলোচনা বা মতবিনিময়ের সময় না পান।
২৫ মার্চ অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে গণহত্যা চালানোর জন্য, ‘সোয়াত’ নামক জাহাজে করে বিপুল অস্ত্র ও গোলাবারুদ পাকিস্তান থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছে মার্চের মাঝামাঝি। সেই সময় বাঙালিদের চেয়ে পাকিস্তানি সৈন্যসংখ্যা ছিল একেবারেই কম। এ বিশাল অস্ত্রভাণ্ডার যাতে খালাস করা না হয়, সে জন্য এম আর মজুমদার বিভিন্ন টালবাহানা করছিলেন; যা পাকিস্তানিরা বুঝতে পেরেছিল। ফলে ২৪ মার্চ পাক সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল (কিউএমজি) আবু ওসমান মিঠা খান চট্টগ্রামে এসে এম আর মজুমদারকে নিয়ে বন্দরে আসেন। মেজর জেনারেল মিঠা এম আর মজুমদারকে অস্ত্রভাণ্ডার খালাস করতে চাপ প্রয়োগ করলে তিনি জানান, ‘সোয়াত’ থেকে এখন অস্ত্রশস্ত্র নামাতে গেলে শ্রমিক ও জনতার সাথে তাদের সংঘর্ষ অনিবার্য। এ ক্ষেত্রে উত্তেজিত জনতা যদি জেটি বিধ্বস্ত করে ফেলে বা তাতে অগ্নিসংযোগ করে, তা হলে খাদ্যশস্যসহ হাজার হাজার টন মালামাল বিনষ্ট হবে। উত্তরে মিঠা খান উত্তেজিত হয়ে চিৎকার করে ব্রিগেডিয়ার মজুমদারকে বলেন, ‘ওভ ঃযব ভরৎব বহমঁষভং ঃযব বহঃরৎব পড়ঁহঃৎু ধহফ নষড়ড়ফ ভরষষং ঃযব কধৎহধঢ়যঁষর ৎরাবৎ, ও ফড়হ’ঃ পধৎব. ও ধিহঃ সু ধৎসং ঁহষড়ধফবফ.’ এর পরও এম আর মজুমদার আদেশ পালন করেননি। নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর গুলিবর্ষণে অস্বীকৃতি জানান এবং এমভি সোয়াতের বিপুল অস্ত্র ও গোলাবারুদ খালাসের আদেশ তিনি কৌশলে অমান্য করেন। মজুমদারের ভাষায়, ‘আমার কাছে খবর এলো যে, প্রায় ১০ হাজার টন অ্যামুনেশন নিয়ে এমভি সোয়াত চট্টগ্রাম পোর্টে আসছে, ডকিং করবে। আমি সাথে সাথে চট্টগ্রাম পোর্টের শ্রমিক সমিতির সভাপতি মান্নান সাহেবকে ডাকলাম। তাকে বললাম, ‘আপনি এই জাহাজ আনলোডিং করতে দেবেন না।’ তিনি বললেন, ‘আপনি কোনো চিন্তা করবেন না, যা লেবার আছে ওদেরকে সরিয়ে দেবো।’ আমি যত দিন চট্টগ্রাম ছিলাম অর্থাৎ ২৪ মার্চ পর্যন্ত, সোয়াত থেকে অ্যামিউনেশন আনলোড করতে দেইনি। হ



আরো সংবাদ