১৭ নভেম্বর ২০১৮
সব পেশাতেই সাফল্যের স্বাক্ষর রাখছেন নারী ; ছবি : ইন্টারনেট

নারীর পেশা নির্বাচনে স্বাধীনতা

-

নারী কি স্বাধীনভাবে পেশা নির্বাচন করতে পারে? চাইলেই কি পারে পছন্দের পেশায় যোগ দিতে? এ প্রশ্নের উত্তর অধিকাংশ ক্ষেত্রে এখন নেতিবাচক। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পরিবার সমাজ ঠিক করে দেয় নারীর পেশা। কিন্তু প্রতিটি মানুষের অধিকার আছে নিজের ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত নিজে নেয়ার। এসব নিয়ে লেখাটি তৈরি করেছেন
মাকসুদা রহমান

দিন বদলেছে। বদলে গেছে সমাজ ও মানুষের ধ্যান-ধারণা। কিন্তু কথা হলো কতটা বদলেছে। লেখাপড়ার ক্ষেত্রে এখন মেয়েদের বাধা অনেকটাই কম। কথা সত্যি। বেশির ভাগ পরিবারে লেখাপড়া শেখানোর ক্ষেত্রে ছেলেমেয়ে আলাদা করা হয় না। উভয়েই সমান সুযোগ পায়, কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখন যখন মেয়েটি পড়াশোনা শেষ হলে নিজের মতো ক্যারিয়ার গড়তে চায়। বেশির ভাগ মেয়েকেই তখন শুনতে হয় পড়াশোনা শেষ করেছ, এবার বিয়ে করো। স্বামী যদি চাকরি করতে দেয় তবে চাকরি করো। অর্থাৎ একটি মেয়ের পড়াশোনা শেষে বিয়েই গন্তব্য; অথচ মেয়েটি হয়তো ক্যারিয়ারের কথা চিন্তা করেই লেখাপড়া করেছে। সেভাবে নিজেকে তৈরি করেছে। গড়তে চেয়েছে স্বপ্নের ভবিষ্যৎ।
নাজমা (ছদ্মনাম) পরিবারের প্রথম সন্তান। লেখাপড়ায় ভালো। ছোট থেকেই তার ইচ্ছা, বড় হয়ে চাকরি করবে। বাবার পাশে দাঁড়াবে। হোক সে মেয়ে, পরিবারের বড় সন্তান হিসেবে তার দায়িত্ব আছে। কিন্তু সে যখন এইচএসসি পাস করে অনার্সে ভর্তি হলো, তখনই পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে বিয়ে দিয়ে দেয়া হলো। অবশ্য হাল ছাড়েনি নাজমা। সংসার-সন্তানের জন্য কয়েক বছর নষ্ট হলেও পড়ালেখা সে ঠিকই শেষ করেছে। একটি ভালো চাকরিতে জয়েন করেছে; কিন্তু তত দিনে বাবা-মা দুইজনেই চলে গেছেন পরপারে। নাজমার স্বপ্ন অধরাই থেকে গেল।
শামীমার (ছদ্মনাম) স্বপ্ন ছিল গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে স্কলারশিপ নিয়ে দেশের বাইরে পড়তে যাবে। সেভাবেই সে পড়াশোনা করে। গ্র্যাজুয়েশন শেষে যখন পরিবারকে এ কথা জানায়, তখন পরিবার থেকে বলা হলোÑ দেশের বাইরে পড়তে চাও ভালো কথা। আগে তোমাকে বিয়ে দিই; তারপর স্বামীর সাথে না হয় দেশের বাইরে যাবে। পড়াশোনা করবে। এখন শামীমা স্বামীর সাথে কানাডায়। জীবনযাপনের জন্য শর্ট কোর্স করে চাকরি করছে। একা হাতে সংসার, সন্তান ও চাকরি সব সামাল দিতে প্রচণ্ড ব্যস্ত থাকতে হয় শামীমাকে। শামীমা কি উচ্চতর ডিগ্রি নিতে পারবে কখনো? তার ইচ্ছা যে এখন মনের কোণে উঁকি দেয়।
নিজের পছন্দের পেশা বেছে নেয়ার ক্ষেত্রে শুধু যে পরিবারই বাধা দেয় তা নয়, সমাজও মনে করে সব ধরনের পেশায় নারীর না যাওয়াই ভালো। চাকরি করতে চাইলে নারী শিক্ষিকা, কলেজের অধ্যাপক কিংবা ডাক্তার হবেন। ভাবনার গণ্ডি আগে থেকেই ঠিক করে দেয় পরিবার ও সমাজ। তারাই বলে দেয়Ñ সংসার, স্বামী ও সন্তানের দায়িত্ব পালন করাই আসল কাজ। বাস্তবেও তা-ই ঘটে। একটি ছেলের সারা দিন অফিসের পর বাসায় এসে কোনো কাজ থাকে না, কিন্তু একটি মেয়েকে সারা দিন অফিসের পর বাসায় এসে রান্না থেকে শুরু করে সংসারের সব কাজই করতে হয়। সে কারণে চ্যালেঞ্জিং পেশায় নারীর পদচারণা তুলনামূলক কম। আবার অফিসের কাজে কোনো নারী অফিসের বাইরে যাবেন, সেটিও অনেক পরিবার মেনে নিতে পারে না। এসব ক্ষেত্রে অনেককেই চাকরি ছাড়তে হয়। আর্কিটেক্ট কিংবা আর্ট কলেজ থেকে পাস করা অনেক মেয়েকেই স্বামী ও পরিবারের ইচ্ছায় শুধু গৃহিণী হয়ে থাকতে হয়।
অর্থাৎ পেশা নির্বাচনের ক্ষেত্রে এখনো নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারেন না বেশির ভাগ মেয়ে। তাকে পরিবার কিংবা সমাজের ঠিক করে দেয়া পথেই জীবন চলতে হয়, অথচ প্রত্যেক মানুষের অধিকার আছে জীবনে তার মতো করে সিদ্ধান্ত নেয়ার। পছন্দের পেশা বেছে নেয়ার অধিকার সবারই থাকা উচিত। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নারীরা পেশা নির্ধারণ করার স্বাধীনতা পান না। তাকে পরিবার ও সমাজের চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্তেই জীবন চালাতে হয়।
এত কিছুর পরও কিছু নারী তাদের কর্মদক্ষতা কাজে লাগিয়ে এখন পরিবার, সমাজ ও দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় যোগ দিয়ে প্রমাণ করছেন নিজের যোগ্যতা। নারী যখন নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিয়ে দক্ষতা অনুযায়ী উপযুক্ত পেশা নির্ধারণ করতে পারবেন, তখন আরো বেশি উন্নতি সাধন সম্ভব হবে।

 


আরো সংবাদ