২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯
আ মি ও ব ল তে চা ই

অন্ধকারের গান

-

বাবা-মায়ের বিয়ের এক বছর পূর্ণ হওয়ার কয়েক দিন পরই পৃথিবীর আলো দেখলাম আমি। বংশে ছেলেসন্তান জন্ম নিয়েছে, এই আনন্দে নাকি তখন আমার পূর্বপুরুষেরা সুখের বানে ভেসে গিয়ে ১০ গেরামে মিষ্টি বিতরণের এক এলাহি কাণ্ড করে ফেলেছেন। ছেলেসন্তানের বাব-মা হয়ে আমার অভিভাবকেরা অপার আদরযতœ আমাকে বিলিয়ে দিতে কার্পণ্য বোধ করেননি। সে কারণে ছোটবেলা থেকে আজ অবধি সবার অকৃত্রিম ভালোবাসায় বেড়ে উঠছি।
আমার সাড়ে তিন বছর বয়সে মা আবার গর্ভবতী হলেন। সঠিক সময়ে আমার বোন রুনু পৃথিবীতে এলো। কন্যাসন্তান জন্ম নেয়াতে পরিবারের অনেকে নারাজ ছিল বলে তাদের মুখে হাসির রেখা দেয়া যায়নি। শ্যামলা বর্ণের বোন রুনু আর আমাকে নিয়ে দুই সন্তানের সংসারে মা একজন মমতাময়ী হয়ে উঠলেন। আমরা দুই ভাইবোন বড় হতে থাকি।
সংসার জীবনের আট বছর পর মা তৃতীয়বারের মতো সন্তানসম্ভবা। তার তৃতীয় সন্তানও পৃথিবীতে এলো কন্যা হয়ে, নাম রুবি। তৃতীয় সন্তানটি ছেলে কামনা করেছিলেন বাবা। কিন্তু রুবির জন্মের মধ্য দিয়ে বাবার সেই স্বপ্ন অপূর্ণ থেকে গেল বলে মুখ বেজায় কালো হলো তার।
রুনু আর রুবি বড় হতে থাকে। আমি খেয়াল করলাম, বাবা-মা দু’জনে তাদের তিনসন্তানকে যতখানি ভালোবাসেন, তার বেশির ভাগ আমার প্রতি। আমি ছেলে, বড় হয়ে আয় রোজগার করব, যা রুনু আর রুবিকে দিয়ে সম্ভব নয়। যে কারণে বাবা-মা দু’জনেরই আমার দিকে বিশেষ সুনজর। রুনু আর রুবির প্রতি তাদের এক ধরনের চাপা অবহেলা।
সেই অবহেলা আরো গাঢ় হলো যখন মা চতুর্থবারের মতো গর্ভবতী হলেন। মায়ের গর্ভে এবারো কন্যাসন্তান।
আমার তৃতীয় বোন রোজী পৃথিবীতে আসার পর বাবা-মা দু’জনের মুখের হাসি যেন চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেল। নবজাতক শিশুটির দিকে তাদের কোনো বিশেষ গুরুত্ব নেই। অবজ্ঞা, অনাদর, অবহেলা সব কিছু ভোগ করতে যেন রোজী পৃথিবীতে এসেছে।
স্ত্রী পরপর তিনটি কন্যা দিয়েছেন কেন, মায়ের প্রতি বাবার এই অভিযোগ দিন দিন ঝগড়া-বিবাদে রূপ নেয়। তত দিনে সংসার থেকে সুখ পাখিও উড়াল দিলো কোন অজানায়। বেলায়-অবেলায় মায়ের সাথে বাবার এক ধরনের জঘন্য সংগ্রাম চলে।
চার সন্তানের মাঝে বাবা আমাকেই আদর-সোহাগ কোনো অংশে কম দেন না। অথচ রুনু, রুবি আর রোজী সেই কবেই পিতৃ¯েœহ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। আমার দিকে সবার সুনজর। জামাকাপড় থেকে শুরু করে খাওয়া-দাওয়ায় আমার রাজকীয় হাল। অথচ আমার তিন বোন বিপরীত অবস্থানে। কন্যাসন্তান সংসারের বোঝা, তাদের দিয়ে কিছুই হবে না, বিয়ে দিলে পর হয়ে যাবেÑ এসব ছুতো বের করতে করতে বাবা ভুলে গেছেন তিনি আমার মতো রুনু, রুবি আর রোজীরও বাবা। অথচ আমাকে তিনি পারলে মাথায় তুলে রাখতেও রাজি। কেননা আমি তার পুত্রসন্তান। আমি তার সাত রাজার ধন। বুড়ো বয়সে তিনি আমার ওপর ভরসা করবেন।
দিন দিন আমি বড় হতে হতে দেখি, আমার তিন বোনের প্রতি বাবার কেমন উদাসীন আচরণ। চলাফেরায় কোনো ব্যাঘাত দেখলে বাবা আমার তিন বোনকে কি নির্দয়ভাবেই না মারধর করেন, সে দৃশ্য দেখে আমার চোখে পানি চলে আসে। তখন খুব বলতে ইচ্ছে করেÑ ‘বাবা, মেয়ে বলে ওদেরকে সন্তানের পূর্ণ অধিকার দিচ্ছেন না কেন? চোখ মেলে দেখুন, এই দেশের অনেক অভিভাবক তাদের কন্যাসন্তানের কারণে সমাজে মুখ উজ্জ্বল হয়েছে।’
জোবায়ের রাজু
আমিশাপাড়া, নোয়াখালী


আরো সংবাদ

Hacklink

ofis taşıma Instagram Web Viewer

canli radyo dinle

Yabanci Dil Seslendirme