১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯

আসামের আসামি ও ‘আলী-মালী-কুলী’

-

কেবল ভারতজুড়েই নয়, প্রতিবেশী বাংলাদেশেও তুমুল আলোচনা-সমালোচনা চলছে বিতর্কিত এনআরসি, অর্থাৎ ‘জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন’ তালিকা নিয়ে। ভারতের বিজেপি সরকারের এই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত উদ্যোগটি সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষপ্রসূত এবং বিশেষভাবে, মুসলমানেরাই এর টার্গেট- এমন অভিযোগ শুধু ব্যাপক নয়, বাস্তবভিত্তিকও। তবে শেষ পর্যন্ত, এনআরসি ভারতের কেন্দ্রে ও আসামে ক্ষমতাসীন দল, বিজেপিসহ উগ্র সাম্প্রদায়িক মহলের জন্য লেজেগোবরে দশা সৃষ্টি করছে বলেই মনে হয়। দেখা যাক, জাতীয়তাবাদের নামে গোঁড়া হিন্দুত্ববাদী শক্তি তাদের এই গলার কাঁটা নামানোর জন্য এখন কী কারসাজি অবলম্বন করে।

আসামে বিগত শতাব্দীর ত্রিশের দশকে ‘বাঙাল খেদাও’ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বিদ্বেষ ছড়িয়েছিল গোপীনাথ বরদলৈর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস। তারই সর্বশেষ সংস্করণ হিসেবে এখন কংগ্রেসের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, ভারতীয় জনতা পার্টি সরকার কথিত বিদেশী বিতাড়নে উন্মত্ত হয়ে উঠেছে। ‘এনআরসি’ ফাঁদে ফেলে, ‘বিদেশী’ বানিয়ে প্রধানত মুসলমানদের তাড়ানোর নীলনকশা বাস্তবায়নের অভিযোগ ভিত্তিহীন নয়। বিজেপির সাম্প্রদায়িক উগ্রতা এবং এনআরসি প্রসঙ্গে এর নেতাদের বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য মুসলিম সংখ্যালঘুদের সাথে, ভারতের অসাম্প্রদায়িক মানুষজনেরও এ সম্পর্কিত সন্দেহকে জোরালো করে তুলেছে। বাস্তবতা হলো, আসামে সৃষ্ট অবাঞ্ছিত পরিস্থিতির জন্য দায়ী ক্ষমতাসীন সরকারসহ মুসলিমবৈরী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী; অথচ কার্যত আসামি হিসেবে ওদের আঙুল মুসলমান বাংলাভাষীদের প্রতি।

ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বলছে, যারা ১৯৭১ সালের পরে আসামে গিয়ে অভিবাসী বা সেখানকার বাসিন্দা হয়ে গেছে, তারাই ‘বিদেশী’। আবার আসামে ও ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারে যারা ক্ষমতাসীন, এর পেছনে তাদের আসল উদ্দেশ্য যে, মুসলিম জনগোষ্ঠীকে ‘বাংলাদেশী’ ও ‘বিদেশী’ বলে চিহ্নিত করে সুকৌশলে বিতাড়ন, তা স্পষ্ট। কিন্তু ’৭১ সালের পরে দূরের কথা, সাবেক পাকিস্তান আমলেও তদানীন্তন পূর্বপাকিস্তান, অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশ থেকে ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষ সীমান্তের ওপারে ভারতের আসাম বা অন্য কোনো রাজ্যে পাড়ি দেয়া অস্বাভাবিক, অযৌক্তিক ও অবাস্তব। বরঞ্চ দাঙ্গায় সর্বস্ব হারিয়ে প্রতিবেশী ভারত থেকে লাখ লাখ বিপন্ন মুসলমান (যাদের মধ্যে বাঙালি-অবাঙালি উভয়ই ছিল) সে আমলে আমাদের দেশে ছুটে এসেছে জান ও মান বাঁচাতে।

বাঙালি মুসলমানেরা তদানীন্তন বাংলা প্রদেশের কয়েকটি জেলা থেকে প্রধানত ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে, বৃহত্তর আসামে গিয়েছিল সেখানকার দুর্গম বনাঞ্চলে হিংস্র পশুর মোকাবেলার মাধ্যমে, বিরাট ভূখণ্ডকে চাষাবাদের উপযোগী করে তুলতে। তাদের তৎকালীন প্রশাসন সেখানে নিয়ে গিয়েছিল অথবা এ ব্যাপারে যথাসাধ্য সহায়তা করেছিল। কারণ, বিরাট আসাম অঞ্চলে ভূখণ্ডের তুলনায় মানুষ ছিল খুব কম আর কৃষি কাজের জন্য প্রস্তুত করা জমিও ছিল অপ্রতুল। এ জন্য, বৃহত্তর নোয়াখালী কুমিল্লা ঢাকা ময়মনসিংহ ফরিদপুর পাবনা রংপুর প্রভৃতি জনপদের কৃষিজীবী পরিবারের বহু লোক যাতে আসামে গিয়ে বসতি স্থাপন করে এবং সেখানে বিস্তীর্ণ এলাকায় চাষবাসের পরিবেশ তৈরি করতে পারে, সরকার এটাই চেয়েছিল। এই বাঙালিরা ছিল প্রায় সবাই মুসলিম জনগোষ্ঠীভুক্ত। তাদের কোনোভাবেই বিদেশী, অনুপ্রবেশকারী কিংবা অবাঞ্ছিত বহিরাগত বলা যায় না। সে যুগের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে তাদের আসাম গমন এবং সেখানে জীবন সংগ্রামে লিপ্ত হওয়াই ছিল সবার কাম্য ও কাক্সিক্ষত।

আসাম বা অসমের কথা উঠলে ব্যক্তিগত কিছু কথা এসে যায়। স্কুলে পড়ার সময় আমাদের মফঃস্বল শহরটির একটি বাঙালি হিন্দু পরিবারের আসামে চলে যাওয়ার স্মৃতি আজো মনে দোলা দেয়। শহরের কেন্দ্রস্থলে তাদের বিরাট কাপড়ের দোকান আর বাসা মিলিয়ে দোতলা বিল্ডিং ছিল। সম্ভবত ১৯৬৫ সালের দিকে তারা শিলং চলে গেলেন। সে সময় শিলং ছিল আসামের অন্তর্গত। কারণ, তখনো পৃথক মেঘালয় রাজ্য গঠিত হয়নি। এই পরিবারের একটি মেয়ে স্কুলে আমার বড় বোনের সাথে পড়তেন। এমন বহু হিন্দু বাঙালি সেই পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে তো বটেই, এমনকি বাংলাদেশ হওয়ার পরেও কারণে-অকারণে সীমান্তের ওপারে ত্রিপুরা, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয়ে চলে গেছেন স্থায়ীভাবে। তাদের অনেকের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজন আগে থেকেই ভারতের এসব প্রদেশে বাস করতেন।

এ-পারের অনেকের আয়-সম্পদের একাংশ ওপারে থাকাও অসম্ভব ছিল না। কিন্তু ধর্মীয় কারণে মুসলিম বাঙালিদের ক্ষেত্রে এমনটা হওয়া সম্ভব নয়। প্রসঙ্গত একটি ঘটনা মনে পড়ছে। প্রাইমারি স্কুলে আমাদের একজন জাঁদরেল হিন্দু শিক্ষক ছিলেন, তার বুক পকেটে থাকত চেনওয়ালা ঘড়ি, হাতে থাকত ছাত্র পেটানোর বেত। তিনি শিক্ষক হিসেবে ছিলেন সুদক্ষ; হাতের লেখা ছিল সুন্দর। আমরা তাকে বাঘের মতো ভয় করতাম। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরপরই এই প্রবীণ স্যারের সাথে দেখা। তখন আমি হাইস্কুলে পড়ি। তার পদধূলি নেয়ার পর তিনি বিষণœ কণ্ঠে জানালেন, এই বাংলাদেশে তার পক্ষে থাকা সম্ভব হচ্ছে না।

তাই চিরতরে ভারতে চলে যাচ্ছেন। শুনে আমি তো হতবাক! মুক্তিযুদ্ধের সময় কষ্টকর শরণার্থী জীবন কাটিয়ে মাত্র স্বদেশে ফিরেছেন। এর মাঝে এমন কী ঘটল যে, বাংলাদেশ ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। সে দিন তিনি যা বললেন, তাতে বুঝলাম, তখনকার সময়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিকভাবে যাদের দাপট, তাদের দৌরাত্ম্যে তার মতো নিরীহ হিন্দু ভদ্রলোকও জন্মভূমিতে টিকতে পারছেন না। যা হোক, ’৭১ সালে ওপারে আশ্রয় নিয়ে অনেক হিন্দু পরিবার আর বাংলাদেশে ফিরেনি। পরে তাদের অনেকে পড়শি দেশে চলে গেছেন তল্পিতল্পা গুটিয়ে। এটা মুসলমানদের বেলায় হয়েছে বলে কিছুতেই মনে করা যায় না।

বাংলাদেশের অর্থনীতি আমাদের সীমান্তবর্তী ভারতীয় অঞ্চলগুলোর চেয়ে ভালো। তা হলে কেন এখানকার মানুষ অহেতুক দুর্ভোগ পোহাতে সে দেশে যাবেন এবং সেখানে অভিবাসী হবেন? এ প্রশ্ন ইতোমধ্যে জোরালোভাবে উঠেছে, যার জবাব বিশেষত সঙ্ঘ পরিবারের উগ্র ভারতপ্রেমীরা দিতে পারেননি। অথচ এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এ ইস্যুতে।

বাঙালি মুসলমান প্রসঙ্গে কিছু কথা। ভার্সিটিতে পড়ার সময় এক ছাত্রের সাথে পরিচয় হলো। তিনি একদিন জানালেন, তাদের আদি নিবাস নোয়াখালী জেলায়। সেই ব্রিটিশ আমলে আরো অনেকের মতো তার পরিবারও জঙ্গল কেটে আবাদ করে কৃষি কাজের জন্য আসাম চলে গিয়েছিল। সাম্প্রদায়িক তাণ্ডবে ষাটের দশকের মাঝামাঝি তারা দেশে ফিরে আসেন। এরপর এ দেশে তারা কুমিল্লা জেলার একটি গ্রামে নতুন বসতি গড়ে তোলেন। নিজের বিয়ের পর জানতে পারি, আমার শ্বশুরের বাবা ও চাচা ব্রিটিশ শাসনামলে আসামে রেলওয়েতে চাকরি করতেন। শ্বশুরের বাবার কর্মস্থল ছিল ‘লোয়ার আসাম’ তথা বরাক উপত্যকার নওগাঁ জেলায়; আর চাচা থাকতেন ‘আপার আসাম’ তথা ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার তেজপুরে। উল্লেখ্য, সেখানে ভারতের সেনানিবাস রয়েছে এবং সেখানেই মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর জন্ম। আমার সে দু’জন আত্মীয়ও কিন্তু আসামে থেকে যাননি।

তারা বাংলাদেশে ফিরে এসে গ্রামে বাকি জীবন কাটিয়েছেন। আসামে প্রধানত ধর্মীয় কারণে সৃষ্ট বৈরী রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশে মুসলিম বাঙালির পক্ষে (বিশেষত যারা এ দেশ থেকে গিয়েছিলেন) নিরাপত্তার নিদারুণ অভাব বোধ করাই স্বাভাবিক। এ কারণে, তারা ১৯৪৭ সালে ‘অপশন’ দিয়ে সদ্য গঠিত পূর্বপাকিস্তানে চলে এসেছিলেন। ভারতের বর্তমান ক্ষমতাসীন মহলের এটা জানা থাকার কথা যে, এখনকার বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের মানুষ সাবেক পাকিস্তান আমলের ২৪ বছরের মতো, স্বাধীনতা পরবর্তী ৪৮ বছরেও স্বদেশ ছেড়ে ভারতের বাসিন্দা হওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। তার পরও জাতীয়তাবাদের আড়ালে এবং দেশপ্রেমের মুখোশ পরে সাম্প্রদায়িক শক্তি আসাম থেকে মুসলমানদের বিতাড়নের বিদ্বেষপূর্ণ তৎপরতায় মরিয়া হয়ে উঠেছে।

এবার ‘আলী, মালী ও কুলী’ প্রসঙ্গ। আসামে ‘আলী’ মানে বাঙালি মুসলমান, ‘মালী’ অর্থ বাঙালি হিন্দু আর ‘কুলী’ মানে, চা বাগানের অবাঙালি (প্রধানত দক্ষিণ ভারতীয়) শ্রমিক। ভারতের দার্জিলিংয়ের মতো আসাম অঞ্চলের চা বিখ্যাত। এই চা শ্রমিকদের আনা হয় ব্রিটিশ শাসনের সময়। তারা সাধারণত উড়িষ্যা, অন্ধ্র প্রদেশ, তামিলনাড়– প্রভৃতি প্রদেশের দরিদ্র শ্রমজীবী এবং তাদের বিরাট অংশই আদিবাসী শ্রেণীর মানুষ। তাদের আসাম ছেড়ে আদিনিবাস বা অন্যত্র যাওয়ার দরকার পড়েনি, এখনো পড়ছে না।

অপর দিকে, বাঙালি মুসলমান যারা প্রধানত কৃষিজীবী ‘বাঙাল’, তারা সাবেক পাকিস্তান আমলে ফিরে এসেছেন। এরপর বাংলাভাষী মুসলিমরা আসামে যাওয়ার মতো বাস্তবতা বা পরিবেশ ও প্রয়োজন সৃষ্টি হয়নি। অতএব, সে অভিযোগ অমূলক ও অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আর, বাঙালি হিন্দুরা স্বাভাবিকভাবেই আসামে থেকে গেছেন। কারণ, তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান মুসলিমপ্রধান অঞ্চল এবং আসাম হিন্দু অধ্যুষিত ভারত রাষ্ট্রের অংশ। ইদানীং অবশ্য হিন্দু বাঙালিদের অনেকে উগ্র অসমীয় জনগোষ্ঠীর দ্বারা বৈষম্য ও বৈরিতার শিকার। তবু বলা যায়, আসামে বাঙালিদের প্রতি অন্যায়-অবিচার হলে মুখ্যত মুসলিম বাংলাভাষীরা এর টার্গেট হয়ে থাকেন। তাই এখন এনআরসি নিয়ে মুসলিমপ্রধান বাংলাদেশের মানুষের এত উদ্বেগ।

এনআরসি থেকে ১৯ লাখের মতো মানুষ বাদ পড়েছেন। তারা বংশানুক্রমে আসামের অধিবাসী হলেও এখন কার্যত বিদেশীর মতো আচরণ পেতে পারেন। কর্তৃপক্ষ যতই বলুন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত তাদের ‘বিদেশী’ বলা যায় না, বাস্তবে উগ্র সাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদীরা সরকারের মদদে এই ভাগ্যহত মানুষদের আর ‘স্বদেশী’ বলে মনে করছে না। ফলে তারা অব্যাহতভাবে এবং ক্রমবর্ধমান হারে বৈষম্যবঞ্চনার টার্গেট হবেন বলে ধরে নেয়া যায়। আসামে বাঙালি হিন্দুদের অনেকে, এমনকি ক্ষমতাসীন দলের এক অমুসলিম বিধানসভা সদস্যও এনআরসির তালিকায় ঠাঁই পাননি। এর পাশাপাশি জানা যায়, ভারতের সুপরিচিত রাজনীতিক ও সাবেক প্রেসিডেন্ট মরহুম ফখরুদ্দীন আলী আহমদের পরিবারের লোকজন ও ঘনিষ্ঠ স্বজন এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন কৃতী সাবেক সদস্য (মুসলিম জনগোষ্ঠীর লোক) এনআরসি থেকে বাদ পড়েছেন। অনেকের আশঙ্কা- ‘মালী’রা শেষাবধি উতরে গেলেও ‘আলী’রা আটকে যাবেন। দেখা যাক, শেষ পর্যন্ত এনআরসির অবস্থা কী দাঁড়ায়।


আরো সংবাদ