১৯ নভেম্বর ২০১৮

ককলিয়ার ইমপ্লান্ট

-

শিশুর বাকশক্তি ও ব্যক্তিত্ব বিকাশের জন্য তার স্বাভাবিক শ্রবণশক্তি অত্যাবশ্যকীয়। কোনো ব্যক্তির পক্ষে সর্বোচ্চ কর্মকুশলতা দেখাতে হলেও চাই স্বাভাবিক শ্রুতিশক্তি। আর এর কোনোরকম অন্যথা হলেই দেখা দিতে পারে প্রতিবন্ধিতা। বিশ্বজুড়ে মোটামুটি হিসাবে প্রতি এক হাজার জনের মধ্যে একজন বধিরতা নিয়ে জন্মায়। প্রায় সমানসংখ্যক জনগোষ্ঠী শ্রুতিশক্তি নিয়ে জন্মালেও তাদের জীবদ্দশার কোনো না কোনো সময় বধিরে পরিণত হয়। বাংলাদেশে প্রায় এক কোটি ত্রিশ লাখ লোক বিভিন্ন মাত্রার বধিরতায় ভুগছে। এর মধ্যে ৩০ লাখ লোকের বধিরতা মারাত্মক বা প্রগাঢ় ধরনের।
ককলিয়ার ইমপ্লান্ট কী?
এটি এক প্রকারের ইলেকট্রনিক যন্ত্র, যা মানুষের কানের পেছনে স্থাপন করা হয়। যেসব ক্ষেত্রে অন্তঃকর্ণ সম্পূর্ণ বিকল হয়ে যায় অথচ অডিটরি স্নায়ু সক্ষম থাকে, সেখানে বিদ্যমান স্নায়ুকে ব্যবহার করে শল্য চিকিৎসার মাধ্যমে শ্রবণশক্তিকে পুনরুদ্ধার করা হয়। সহজ ভাষায় একে বলা যায় বায়োনিক কান।
অপারেশনের জন্য রোগী নির্বাচন
ককলিয়ার ইপ্লান্টের জন্য বিশেষায়িত কেন্দ্রে কোনো রোগীকে পাঠানো হলে তাকে ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে বাছাই করে নেয়া হয়, যাতে করে শল্য চিকিৎসার জন্য সে উপযুক্ত কিনা তা নিশ্চিত হওয়া যায়। এ মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় সাধারণ থাকে অডিওলজির বিভিন্ন পরীক্ষা, সাইকোলজির পরীক্ষা, শল্য চিকিৎসকের নিজস্ব পরীক্ষা-নিরীক্ষা, এক্স-রে, সিটি স্ক্যান, এমআরআই ফিজিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং কাউন্সেলিং বা উদ্বুদ্ধকরণ। ইমপ্লান্ট গ্রহীতা বা তার বাবা-মাকে অবহিত করা প্রয়োজন যে, এর ফলে কী ঘটবে এবং ঘটবে না। অপারেশন-পরবর্তী ফলোআপ কার্যক্রমের গুরুত্ব এবং এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের আন্তরিকতার বিষয়টিও তাদের হৃদয়ঙ্গম করা দরকার।
ককলিয়ার ইমপ্লান্টের জন্য উত্তম প্রার্থী কে?
সাধারণ প্রাপ্তবয়স্ক একজন প্রার্থীর নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্য থাকলে তাকে বাছাই করা যেতে পারে।
ক্স যার দু’টি কানেই মারাত্মক থেকে প্রগাঢ় শ্রতিহীনতা আছে।
ক্স যার ক্ষেত্রে হিয়ারিং এইড ব্যবহার করে ভালো ফলাফল পাওয়ার সম্ভাবনা নেই।
ক্স যার মৌখিক অথবা প্রাক-মৌখিক বাচনশৈলীর বিকাশ ঘটেছে।
ক্স যার কানে কোনো ইনফেকশন নেই।
ক্স যার অন্তঃকর্ণ গঠনগত দিক দিয়ে স্বাভাবিক।
ক্স যার অডিটরি নার্ভ কর্মক্ষম আছে এবং অন্য কোনো রোগ-বালাই নেই, যা অপারেশনকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে।
ক্স শ্রবণশীল জগতের সাথে যুক্ত হওয়ার জন্য যার মধ্যে প্রবল আগ্রহ রয়েছে। যিনি কথা বলতে, কথা শুনতে এবং স্পিচ রিডিং করতে খুব উৎসাহী।
ক্স যিনি ইমপ্লান্ট-পরবর্তী নিবিড় পুনর্বাসনমূলক কর্মসূচিতে অংশ নিতে রাজি আছেন।
মাত্র ১৪ মাসের শিশুকেও ককলিয়ার ইমপ্লান্ট করা সম্ভব হয়েছে এবং আরো কম বয়সের শিশুদেরও সফলভাবে ইমপ্লান্ট দেয়া যেতে পারে।
শিশুদের ক্ষেত্রে উপযুক্ত প্রার্থী নির্বাচনে বড়দের জন্য অনুসৃত বিষয়গুলোর সাথে সাথে আরও বিবেচনা করা হয় যেÑ
ক্স শিশু তার বাবা-মায়ের সাথে সাথে শল্য চিকিৎসা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবহিত হয়ে সম্মতি প্রদান করতে পারে (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)।
ক্স বাবা-মায়ের মতো সে-ও ককলিয়ার ইমপ্লান্টের সফল ব্যবহার প্রসঙ্গে প্রত্যেকের বিশেষ ভূমিকার কথা বুঝতে পারে (প্রয়োজন ক্ষেত্রে)।
ক্স ককলিয়ার ইমপ্লান্ট ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাবা ও মায়ের মতো তারও প্রবল উৎসাহ ও চাহিদা আছে (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)।
ক্স যখন তার শিক্ষা কার্যক্রম থেকে শ্রুতিশক্তির বিকাশের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে সহায়তা প্রদানের ব্যবস্থা আছে।
ককলিয়ার ইমপ্লান্টের সফলতা
পদ্ধতিটি বেশ নিরাপদ এবং নির্ভরযোগ্য। কিভাবে অপারেশনটি করা হয়েছিল কিছু দিন পরে তা আর মনে না-ও পড়তে পারে। কদাচিৎ কারও জটিলতা দেখা দিতে পারে।
অপারেশন-পরবর্তী পুনর্বাসন
বয়স্ক এবং শিশুদের পুনর্বাসন কর্মসূচির উদ্দেশ্য হলো রোগী এবং তার পরিবারকে দৈনন্দিন জীবনে ককলিয়ার ইমপ্লান্টের ব্যবহার সম্পর্কে দক্ষ করে তোলা। এ লক্ষ্যে টিম চেষ্টা করে রোগীর সর্বোচ্চ শ্রবণশক্তি নিশ্চিত করতে, তাকে শুনতে ও যোগাযোগ স্থাপনে সহায়তা করতে। তাকে ভাষা শিখতে এবং কথা বলতে তারা উদ্বুদ্ধ করেন। তার অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যাগুলোর দেখাশোনা করেন।
অপারেশনের অব্যবহিত পরে (৪-৬ সপ্তাহ পরে) ডিভাইসটিকে চালু করা হয়। একজন প্রাপ্তবয়স্ক রোগী স্বাভাবিক অবস্থায় প্রতি সপ্তাহে একবার করে দুই বা তিন মাস পর্যন্ত ক্লিনিকে আসেন। যখন তারা যন্ত্রটি ব্যবহারে আরো পারদর্শী হয়ে ওঠেন তখন স্পিচ প্রসেসরটিকে বারবার ম্যাপিং বা প্রোগ্রামিং করার দরকার পড়ে না। তখন প্রতি ছয় থেকে ১২ মাস পর্যন্ত প্রয়োজন মতো ক্লিনিকে আসাই যথেষ্ট।
শিশুদের ক্ষেত্রে নিয়মিতভাবে শোনা, কথা বলা এবং ভাষাবিষয়ক নির্দেশনা চালিয়ে যেতে হয় যত দিন প্রয়োজন পড়ে তত দিন পর্যন্ত এমনকি কয়েক বছর ধরে।


আরো সংবাদ