২০ নভেম্বর ২০১৮
  ইলিশের জীবনরহস্য উন্মোচন

সর্বক্ষেত্রে গবেষণাকে উৎসাহ দিতে হবে

-

ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ হলেও বিজ্ঞানের এই চরম উৎকর্ষের যুগেও এত দিন আমরা এ মাছের জীবনরহস্য উদঘাটন করতে পারিনি। অবশেষে এ ক্ষেত্রে সফল হলেন ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক।
নয়া দিগন্তসহ বিভিন্ন পত্রিকার খবরে জানা গেছে, এই গবেষণাকারীদের মধ্যে ছিলেন বাকৃবির তিনটি বিভাগের চারজন অধ্যাপক। তারা জানিয়েছেন, তাদের এই আবিষ্কারের মাধ্যমে বহু প্রশ্নের জবাব মিলবে। বাংলাদেশের পানিসীমার মধ্যে ইলিশের স্টক বা কোনো এলাকায় মাছের বিস্তৃতির পরিসীমা ক’টি এবং মেঘনা ও পদ্মার মোহনায় প্রজননকারী ইলিশগুলো একাধিক স্টকের কি না, তা এখন জানা যাবে। আলোচ্য গবেষক টিমের প্রধান হিসেবে অধ্যাপক সামছুল আলম জানান, ২০১৫ সালের ডিসেম্বর থেকে দুই বছরব্যাপী গবেষণা করে তারা ইলিশের জীবনরহস্য উদঘাটনে সফল হয়েছেন। এই গবেষণার কাজে পূর্ণবয়স্ক ইলিশ মাছ সংগ্রহ করা হয় মেঘনা নদী ও বঙ্গোপসাগর থেকে। এরপর ল্যাবরেটরিতে এর উচ্চমানের ডিএনএ তৈরি করা হয়েছে। তারপর যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইলিশের প্রয়োজনীয় তথ্য জোগাড় করা হয়। গবেষণা কার্যক্রমের একপর্যায়ে ইলিশের জীবনরহস্য জানা সম্ভব হয়েছে। ইলিশ বছরে দু’বার প্রজনন করে থাকে। এ দুই সময়ের ইলিশ জিনগতভাবে আলাদা কি না, এখন জানা যাবে। নির্দিষ্ট কোনো নদীতে জন্ম নেয়া ইলিশপোনা সাগরে গিয়ে বড় হওয়ার পর প্রজননের জন্য একই নদীতে ফেরে কি না, তা-ও জানা সম্ভব হবে জিনোম সিকোয়েন্সের মাধ্যমে।
ইলিশ মাছের পূর্ণাঙ্গ জিনোম গবেষণার গুরুত্ব তুলে ধরে ড. সামছুল আলম বলেন, ইলিশের চাহিদা যেমন এ দেশে, তেমনি বিদেশেও ব্যাপক। বিশ্বের ৬০ শতাংশ ইলিশই বাংলাদেশে উৎপন্ন হয়ে থাকে। তাই ইলিশের উৎপাদন বাড়িয়ে আমরা লাভবান হতে পারি। এ জন্য জানা দরকার এই মাছের জন্ম, বৃদ্ধি, প্রজননসহ নানা বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে। ‘জিনোম’ হচ্ছে কোনো জীবের ‘পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান’। জিনোম জীবের প্রজনন, বৃদ্ধি, পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াসহ জৈবিক যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করে। পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্স থেকে জানা যাবে, ইলিশ কোথায় কোন সময়ে ডিম দেবে। এসব বিষয়ে জানা গেলে ইলিশের টেকসই উৎপাদন ও আহরণ সহজ হবে।
জানানো হয়েছে, এই যুগান্তকর গবেষণার মধ্য দিয়ে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং দেশের মৎস্য খাত পূর্ণাঙ্গ জিনোম গবেষণার সূচনা করেছে। উল্লেখ্য, এর আগে এ দেশের বিজ্ঞানীরাই ‘সোনালি আঁশ’ পাট এবং গবাদিপশু মহিষের জীবন রহস্য উন্মোচন করেছেন। ২০১২ সালে গবেষণার দ্বারা পাটসমেত অর্ধসহস্র উদ্ভিদের পূর্ণাঙ্গ জিন-তথ্য উদঘাটিত হয়েছে। ফলে অচিরেই রোগ প্রতিরোধক ও উন্নত জাতের পাট উদ্ভাবন সম্ভব হবে। ২০১৩ সালে দেশী পাটের জীবনরহস্য উন্মোচন করেন প্রবাসী বাংলাদেশী বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলম। ২০১৪ সালে মহিষের জিন নকশা উন্মোচনে এ দেশের বিজ্ঞানীরা সফলতার পরিচয় দেন। এর ফলে মহিষের উন্নত ও অধিক উৎপাদনশীল জাত উদ্ভাবন করা যাবে।
বাংলাদেশ অপার সম্ভাবনার পাদপীঠ এবং এ দেশের সন্তানেরা অনুকূল পরিবেশ পেলে মেধা ও প্রতিভা কাজে লাগিয়ে অনন্য উদ্ভাবনের প্রমাণ রাখতে পারেন। ইলিশ ও পাটসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবিষ্কার এরই দৃষ্টান্ত। ইলিশের জীবন রহস্য উদঘাটনের জ্ঞান ও প্রযুক্তির সুফল পেতে হলে এ বিষয়ে গবেষণা আরো জোরদার করার জন্য পর্যাপ্ত সহায়তা প্রয়োজন। এটি সরকারের পক্ষেই দেয়া সম্ভব এবং সরকারেরই দায়িত্ব।
শুধু মৎস্য, উদ্ভিদ বা গবাদিপশু নয়, বিজ্ঞানের সব শাখা তো বটেই, জ্ঞানের অন্যান্য ক্ষেত্রেও সময়োপযোগী ও কার্যকর গবেষণা অব্যাহত রাখতে হবে। এ জন্য সরকারের উদ্যোগে পর্যাপ্ত অর্থবরাদ্দসহ বিভিন্নভাবে সহায়তা করতে হবে। তাহলে ফলপ্রসূ গবেষণার মাধ্যমে নানান উদ্ভাবন দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেবে এবং জাতির সার্বিক কল্যাণের নব নব দিগন্ত হবে অবারিত।

 


আরো সংবাদ