০৯ ডিসেম্বর ২০১৯

চোখে মুখে হতাশা : সৌদি থেকে খালি হাতে ফিরলেন ২১৫ বাংলাদেশী

চোখে মুখে হতাশা : সৌদি থেকে খালি হাতে ফিরলেন ৮৬ বাংলাদেশী - ছবি : নয়া দিগন্ত

রাত দেড়টা। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ২ নম্বর গেট দিয়ে বেরিয়ে আসছেন পঞ্চাশোর্ধ এক ব্যক্তি। তবে স্বাভাবিকভাবে অবস্থায় নেই তিনি। হুইল চেয়ারে বসে আছেন তিনি। তাকে ঠেলে নিয়ে আসছেন আরেকজন। বাইরে অপেক্ষমাণ অসংখ্য মানুষ। সবার চোখ পড়লো হুইল চেয়ার বসা ব্যক্তির ওপর। কাচা পাকা চুল। হয়তো বেশ কিছু দিন হলো কামানো হয়নি, তাই মুখজুড়ে ছোট ছোট দাঁড়ি গজিয়েছে। মোটাসোটা শরীর। চোখে মুখে চিন্তার ছাপ।

গেট পার হতেই এই প্রতিবেদকের সাথে কথা হলো তার। ভালো করে কথা বলতেও পারছেন না। অনেকটা কেঁপে কেঁপে বললেন, নাম ইলিয়াস আলী। বাড়ি সিলেটের গোলাপগঞ্জে। স্ত্রী, দুই ছেলে ও দুই মেয়ের সংসার। সন্তানদের লেখাপড়া ও সংসারে সুখ আনতে বছর দুয়েক আগে সৌদি আরব পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি। প্রায় চার লাখ টাকা খরচ করে সৌদি আরব গিয়েছিলেন।

এই বয়সে কেন বিদেশ? প্রশ্ন ছিল ইলিয়াস আলীর কাছে। সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় বললেন, আশা ছিল ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষের মতো মানুষ করব। এজন্য তো টাকা লাগবে? সংসারের অভাব অনটন দূর হবে। তাই বিদেশ গিয়েছিলাম। কিন্তু সে স্বপ্ন তো পূরণ হলো না। ঋণ করে বিদেশ গেলাম। দালাল বলেছিল, ভালো বেতনে কাজ দেবে। কিন্তু সেখানে গিয়ে তা পাইনি। এখন খালি হাতে দেশে ফিরতে হলো। কীভাবে ঋণ ফেরত দেব? ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া কীভাবে চালাব?

কান্নায় ভেঙে পড়েন পঞ্চাশোর্ধ ইলিয়াস আলী। প্রবাস ফেরত বাংলাদেশী, যারা নানা সমস্যায় দেশে ফিরছেন প্রতিদিনের মতো বুধবার রাতেও খাবারের প্যাকেট দিচ্ছিলেন ব্রাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের কর্মীরা। একটি প্যাকেট ইলিয়াস আলীর হাতেও তুলে দিলেন একজন। এই ফাঁকে কথা হচ্ছিল তার সাথে। সৌদি আরবে যাওয়া, সেখান ফেরত আসাসহ নানা বিষয়ে।

ইলিয়াস আলী জানান, সৌদি আরবে গিয়ে কাজ পাইনি। যে কোম্পানিতে কাজ করার কথা ছিল তাদের দেখা মেলেনি। ফলে এখানে সেখানে কাজ করেছি। আকামা হয়নি। আকামার জন্য দুই দফায় টাকা দিয়েছি ২১ হাজার রিয়াল। এরইমধ্যে মাস ছয়েক আগে ডান পাটা অবশ হয়ে গেল। চলাফেরা করতে পারি না। যে জায়গায় কাজ করি, সেই কফিল (নিয়োগকর্তা) বললেন, আকামা করতে ২৭ হাজার রিয়াল লাগবে। এই পা নিয়ে আমি এখানে থেকে কী করব। পরে ধরা দেই। এক সপ্তাহ জেলে ছিলাম। এরপর দেশে এলাম। কথাগুলো বলার সময় চোখে পানি চলে আসে তার। চোখ মুছতে মুছতে তিনি আরো বলেন, যা কিছু রোজগার হয়েছে, দেশে পাঠিয়েছি। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া আর সংসারের খরচের জন্য।

বুধবার রাত সোয়া ১১টার দিকে সৌদি এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছেন ইলিয়াস আলীসহ হতভাগ্য ৮৬ বাংলাদেশী। তাদের সাথেই ছিলেন বাহারউদ্দিন। তিনি ইলিয়াস আলীর পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। বাড়ি সিলেটের কানাইঘাটে। তিনি সৌদি আরবের রিয়াদ বিমানবন্দর থেকে অসুস্থ ইলিয়াস আলীকে সহযোগিতা করছেন। হুইল চেয়ার ঠেলে বিমানবন্দরের গেট পার করেছেন।

এরপর রাত দেড়টার দিকে সৌদি এয়ারলাইন্সের আরেকটি ফ্লাইটে দেশে আসে আরো ১২৯জন প্রবাসী। সব মিলে এক রাতেই ফিরলেন ২১৫ জন সৌদি প্রবাসী।

কথা হলো বাহার উদ্দিনের সাথে। তিনি বলেন, ২৬ বছর সৌদি আরবে ছিলেন। কন্সট্রাকশনের কাজ করতেন। মাঝখানে ছয়বার দেশে ঘুরে গেছেন। এইবার সৌদি আরবে যাওয়ার পর আর আকামা লাগেনি। ফলে অবৈধ হয়ে যান তিনি। আকামা করাতে নিয়োগকর্তাকে ৯০০ রিয়াল দিয়েছিলেন। কিন্তু, আকামা করে দেয়নি। ফলে অবৈধভাবে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে কাজ করতেছিলেন বাহার উদ্দিন। রাস্তা থেকে পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে যায়। জেলখানাতে গিয়ে পরিচয় হয় একই জেলার ইলিয়াস আলীর সাথে। তিনিসহ একই জেলখানায় থাকা আরো কয়েকজন বাংলাদেশী ফিরেছেন একসাথে।

বাহার উদ্দিনের ভাষ্য, অনেক বছর সৌদি আরবে ছিলাম। জীবনে এমন পরিস্থিতি কখনো সৌদি আরবে দেখিনি। সেখানকার পুলিশ বেপরোয়া হয়ে গেছে। বৈধ-অবৈধ দেখছে না। রাস্তা থেকে ধরে সোজা জেলে। এরপর পাঠিয়ে দিচ্ছে বাংলাদেশে।

বিমানবন্দরে কথা হয়, টাঙ্গাইলের মো. জাহেদ আলী ও শাহাবুল, রংপুরের মো. সাজু, কিশোরগঞ্জের আসান, সিলেটের কামাল আহমেদ, মাছুম, শাবলু, হবিগঞ্জের কালাম, গাজীপুরের হারুণ ও ইমরান, লক্ষীপুরের আলাউদ্দিন, কুড়িগ্রামের কোবেল আলী, কুমিল্লার ইব্রাহিম, মাদারীপুরের জুলহাস, কিশোরগঞ্জের সোহরাব, যশোরের শাহ আলম, চাঁদপুরের সেলিমসহ সৌদি আরব থেকে ফেরা কমপক্ষে ৪০ জনের সাথে।

রাত সোয়া ১১টার দিকে তারা হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামলেও ইমিগ্রেশন কার্যক্রম শেষ করে বিমানবন্দর থেকে বের হতে থাকেন রাত পৌনে ১২টার পর থেকে। এক এক করে বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে আসেন হতভাগ্য এসব বাংলাদেশী। যারা এক বুক স্বপ্ন নিয়ে গিয়েছিলেন সৌদি আরবে। সংসারের অভাব অনটন দূর করবেন, স্ত্রী সন্তানদের মুখে হাসি ফুটাবেন। ভালভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন বুঁনেছিলেন। কিন্তু, ওইসব স্বপ্ন দুঃস্বপ্ন হয়ে তাদের জীবনে এখন ঘোর অমানিশা। এক বুক হতাশা নিয়ে একেবারেই খালি হাতে দেশে ফিরলেন তারা।
তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রত্যেকে ৩-৫ লাখ টাকা খরচ করে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। এদের কারো আকামা ছিল, কারোর বা আকামা হয়নি। রাস্তা থেকে উভয়কেই পুলিশ ধরে জেলে পুরেছিল। এরপর কিছুদিন জেল খেটে ট্রাভেল পাস নিয়ে দেশে ফিরেছেন।

জেল থেকে সরাসরি বিমানে তুলে দেয়া হয়েছে অনেককে। তাই তারা যে দেশে ফিরেছেন এটাও অনেকের স্বজনদের অজানা। তারা যখন ফেরেন, তখন বিমানবন্দরের বাইরের গেটে শত শত মানুষের ভিড়। তারা অপেক্ষা করছেন বিভিন্ন দেশ থেকে স্বজনরা ফিরবেন বলে। কিন্তু, বুধবার রাতে সৌদি আরব থেকে ফেরা লোকদের মধ্যে দুই একজন বাদে বাকিদের কারোরই স্বজন উপস্থিত ছিলেন না বিমানবন্দরে। বেশির ভাগই ছিলেন ক্ষুধার্ত। ব্রাক মাইগ্রেশনের এক প্যাকেট খাবার ও পানি পেয়ে পাশে বসেই খেয়ে নিয়েছেন তারা। মধ্যরাত। তাই বিমাবন্দরের ভেতরেই সকাল হওয়ার অপেক্ষা এক কোণায় বসে থাকতে দেখা যায় অনেককে।

সৌদি ফেরাদের বেশির ভাগের চোখে মুখে হতাশার ছাপ। যেন রাজ্যের দুঃখ-কষ্টগুলো ফুটে উঠেছে তাদের চেহারায়। তাদের কেউ জমিজমা বিক্রি করে আবার কেউ ঋণ করে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। খালি হাতে ফিরতে হয়েছে। স্বজনদের কাছে ফিরে যাচ্ছেন এক বুক হতাশা নিয়ে। কিভাবে সংসার চলবে, কিভাবেই বা ঋণের বোঝা দূর করবেন এই টেনশন তাদের মনে।

বিমানবন্দর প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক ও ব্রাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরে সৌদি আরব থেকে ২০ হাজারেরও বেশি শ্রমিক ফেরত এসেছে। যাদের বেশির ভাগই আকামা থাকা সত্ত্বেও পুলিশ গ্রেফতার করে দেশে পাঠিয়ে দিয়েছে।


আরো সংবাদ




Paykwik Paykasa
Paykwik