০৫ জুলাই ২০২২, ২১ আষাঢ় ১৪২৯, ৫ জিলহজ ১৪৪৩
`

দেশে দেশে নিবর্তনের খড়গ ও সমাজতান্ত্রিক পুঁজিবাদ

বার্লিন প্রাচীর - ছবি : সংগৃহীত

I've Always Liked Communist and Socialist 'Ideas' - রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন, ২৫ জানুয়ারি ২০১৬, নিউজউইক
১৯৮৮ সালে পূর্ব জার্মানির গোয়েন্দা সংস্থা স্টাসির হাতে গ্রেফতার হন এড্রিয়াস নামের একজন পূর্ব জার্মান নাগরিক। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ২৮ বছর। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা আইনে তাকে গ্রেফতার করা হয়। তার ওপরে চলে অমানুষিক নির্যাতন। ছাড়া পাওয়ার পর তিনি মন্তব্য করেন- ‘I will forever know how it feels to live in a dictatorship’অর্থাৎ আমি সারা জীবন মনে রাখব একটি স্বৈরতান্ত্রিক একনায়কশাসিত রাষ্ট্রে বসবাস করার মানে কী।

১৯৮৯ সালের ৯ নভেম্বর পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানিকে বিভক্তকারী বার্লিন দেয়াল উভয় পাশের জার্মানবাসী ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। তখন সমাজতান্ত্রিক পূর্ব জার্মানির নিবর্তনবাদী শাসক এরিক হোনেকার তার গোয়েন্দা বাহিনীর বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্নাইপারদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, বার্লিন দেয়ালের কাছে যেই যাবে তাকে দূর থেকে গুলি করে হত্যা করতে হবে। আদেশ অনুযায়ী স্নাইপাররা আশপাশের উঁচু দালানগুলোতে অবস্থান নেয়। কিন্তু পঙ্গপালের মতো মানুষ জড়ো হতে দেখে স্টাসির স্নাইপাররা আর তা করতে সাহস করেনি।

১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে মিত্রশক্তি জার্মানিকে দুই ভাগে ভাগ করে নেয়। পূর্ব জার্মানিকে বলতে গেলে প্রদেশে পরিণত করে সোভিয়েত রাশিয়া। পশ্চিম জার্মানি গ্রহণ করে গণতান্ত্রিক পথ ও তর তর করে যুদ্ধের ক্ষতি পুষিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে থাকে। চিরায়ত অভ্যাস মতো কথিত সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শ বজায় রাখার জন্য পূর্ব জার্মান কর্তৃপক্ষ ভয়ঙ্কর এক গোয়েন্দা সংস্থা-স্টাসি গঠন করে। এদের কাজ ছিল কোন কোন নাগরিক সমাজতন্ত্রের বিরোধী তাদের খুঁজে বের করা, গুম করে দেয়া ও কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে পাঠানো। অবর্ণনীয় নির্যাতন চালানোয় স্টাসির কুখ্যাতি ছিল। সমাজের প্রতিটি স্তরে তারা এজেন্ট ও ইনফরমার তৈরি করে প্রতিটি নাগরিকের ওপর নজরদারি করত। পান থেকে চুন খসলেই তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হতো। এমনকি ১৮ বছরের নিচের শিশুদের মধ্য থেকে তারা ১০ হাজার ইনফরমার তৈরি করেছিল ভয়ভীতি দেখিয়ে। এসব শিশুর কাজ ছিল তাদের নিজ পিতা-মাতা, ভাইবোন, আত্মীয়স্বজনের ওপর নজরদারি করা। তারা বাসায় সরকার নিয়ে কী কথা বলেন, কারো বার্লিন দেয়াল টপকে পশ্চিম জার্মানিতে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা আছে কি না- এসব তথ্য তারা স্টাসিকে সরবরাহ করত। চাকরির ক্ষেত্রে স্টাসির ছাড়পত্র ছাড়া কারো চাকরি হতো না। আর ছাড়পত্র তাকেই দেয়া হতো যে ‘খাঁটি কমিউনিস্ট ও পার্টির প্রতি একান্ত বাধ্যগত, অনুগত’।

১৯৮৯ সালে বার্লিন দেয়াল ভেঙে ফেলার পর ৫ ডিসেম্বর ড্রেসডেনের উত্তেজিত জনতা একনায়কতন্ত্র টিকিয়ে রাখার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়ে। তারা সেখানে স্থানীয় কেজিবি কার্যালয় ঘেরাও করে। ওই কার্যালয়ের দায়িত্বে ছিলেন তদানীন্তন কেজিবি মেজর ভ্লাদিমির পুতিন। হাজার হাজার মানুষ জড়ো হতে দেখে তারা সবাই ঘাবড়ে যান। একপর্যায়ে পুতিন বের হয়ে এসে জড়ো হওয়া মানুষের সাথে নরম ভাষায় কথা বলেন। উত্তেজিত জনতা তখন কিছুটা শান্ত হয়। পুতিন কিন্তু ভীষণ ভয় পেয়েছিলেন যা তিনি বহু কষ্টে চেপে রেখেছিলেন। কার্যালয়ে ফিরে গিয়েই তিনি সব গোপনীয় ফাইল পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দেন ও স্থানীয় সোভিয়েত রেড আর্মির ট্যাংক ইউনিটকে ফোন করে দ্রুত ট্যাংক পাঠানোর অনুরোধ করেন। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা অতিবাহিত হলেও ট্যাংক আসেনি। তখন আবারো ফোন করলে ট্যাংক ইউনিটের কমান্ডিং অফিসার তাকে বলেন, We can’t do anything without orders from Moscow-Moscwo is silent! অর্থাৎ ‘আমরা মস্কোর নির্দেশ ছাড়া কিছুই করতে পারব না এবং মস্কো এ ক্ষেতে নীরব’!

পুতিন মস্কো ইজ সাইলেন্ট এ কথাটি কখনো ভোলেননি। তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নে ফিরে গিয়ে লেফটেন্যান্ট কর্নেল হিসেবে পদোন্নতি পান। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায়। তখন পুতিন প্রতিজ্ঞা করেন যে, তিনি যদি কখনো উচ্চ পদে আসীন হন তখন এমন ব্যবস্থা করবেন যেন ‘মস্কোকে সারা পৃথিবী শুনতে পায় ও মস্কো কখনো নীরব না হয়ে পড়ে’। কিন্তু এই ‘নীরবতা’ ভাঙতে গিয়ে তিনি তার কেজিবির ছায়াকে ছড়িয়ে দিয়েছেন চার দিকে। রাশিয়া এখন একটি স্যুডো গণতন্ত্র যেখানে বিরোধী দল কোণঠাসা। গোয়েন্দা সংস্থা তাদের তাড়িয়ে বেড়ায়, যখন তখন ধরে নিয়ে যায়, বিষ প্রয়োগ করে। নির্বাচন হয় নামকাওয়াস্তে। রাশিয়ায় অভ্যন্তরীণ খাতেই শুধু নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে চলছে নিবর্তনবাদী একনায়কদের সমর্থন দিয়ে টিকিয়ে রাখার ভীতিকর কৌশল। ভেনিজুয়েলা, লিবিয়া, বেলারুশ, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান, সিরিয়া, মালিসহ বহু দেশে রাশিয়া প্রত্যক্ষভাবে একনায়কতান্ত্রিক সরকারগুলোকে সমর্থন জুগিয়ে আসছে। এখন শুরু করেছে মধ্য এশিয়া, যা একসময় সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত ছিল সে দেশগুলোকে পুরোপুরি কব্জা করার প্রক্রিয়া। ২০১৪ সালে পুতিন সেই প্রক্রিয়ার সূচনা করেন ইউক্রেনের ক্রিমিয়া দখলের মাধ্যমে। যেই ইউক্রেনে গণবিপ্লবে রাশিয়াপন্থী স্বৈরশাসকের পতন হয়, তখন থেকে সেখানে চলছে রাশিয়ার সরাসরি ও পরোক্ষ হস্তক্ষেপ, বিচ্ছিন্নতাবাদ। গণতন্ত্র, জনগণের মত সেখানে কোনো ব্যাপারই না। ইউক্রেন রাশিয়ার চাই। লাখের ওপর সেনা ও শত শত ট্যাংক মোতায়েন করার মধ্য দিয়ে সম্প্রতি তা ভয়ঙ্কর অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। এক কথায় বলতে গেলে গণতন্ত্র, নির্বাচন, ইউক্রেনের মানুষের নিজের অধিকার বা মতের কথা বুঝি না, আমার (অর্থাৎ রাশিয়ার) কথায় সব হতে হবে। থাকবে একজন লৌহমানব জাতীয় শাসক। যুক্তি- পাশ্চাত্য ঠেকাও!

আজকের পৃথিবীটা কেমন? এ নিবন্ধটি যখন লিখছি তখন সুদানে হাজার হাজার মানুষ সড়কে সেনাবাহিনী ও পুলিশের গুলির মুখে মুক্তির আন্দোলন করে যাচ্ছে। তাজা বুলেটে ঝরে যাচ্ছে বহু জীবন। আমাদের পাশের দেশ মিয়ানমারে চলছে চীন সমর্থিত সামরিক শাসন। সেখানকার সামরিক বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা যাকে যখন খুশি হত্যা করছে, গুম করছে। ১০ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে। হাজার হাজার পালিয়ে যাচ্ছে থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়ায়। মিয়ানমার সেনাবাহিনী চীনের তৈরি জঙ্গিবিমান দিয়ে নিজের জনগণের ওপর বোমা ফেলছে, পুড়িয়ে মারছে। কেন? যেভাবেই হোক আরাকান অঞ্চল- যেখানে চীন গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপন করেছে ও সেখান থেকে চীনের কুনমিং পর্যন্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করছে তা সিকিউরড করা। বঙ্গোপসাগরে চীনের প্রবেশের দ্বার খুলে দেয়া। চীন থেকে মিয়ানমার হয়ে বঙ্গোপসাগর হবে চীনের অন্যতম প্রধান লজিস্টিকস রুট। এটিকে তারা বলছে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ।

বাংলাদেশও এর অংশীদার। ভালো কথা। কিন্তু সে জন্য সেনাশাসন জারি করে মিয়ানমারের মানুষের ওপর এমন জুলুম চালানো কেন? আজ সারা বিশ্ব থেকে মিয়ানমার বিচ্ছিন্ন। কিছুই যায়-আসে না তাতে চীন বা মিয়নমারের আরেক বৃহৎ সমর্থক রাশিয়ার। মরুক মানুষ। ভূমি চাই। থাকবে কঠোর নিবর্তনবাদী সরকার। তারা গোয়েন্দা দিয়ে, সেনা দিয়ে মেরে কেটে দেশটিকে শুধু গণতন্ত্রের বাইরে রাখবে। গণতন্ত্র থাকলে সমস্যা কোথায়? আছে। তখন সংসদ থাকে, জবাবদিহিতা থাকে, দেশের লাভ-ক্ষতির হিসাব থাকে। চট করেই অন্য দেশের স্বার্থে নিজ দেশের এলাকায় যা খুশি করতে দেয় না সংসদ। বিতর্ক করে সিদ্ধান্ত নেয়। এটিই সমস্যা। এত সময় নেই বর্তমানের সমাজতান্ত্রিক পুঁজিবাদী দেশ- চীন ও রাশিয়ার। এদেরকে সমাজতান্ত্রিক পুঁজিবাদ বলছি এ জন্যই যে, এরা এক অদ্ভুত হাসজাঁরু শাসন ও সরকারব্যবস্থা কায়েম করেছে। দেশ চলছে সমাজতান্ত্রিক ধাঁচে, অর্থনীতি চলছে পুঁজিবাদী পথে। এ দু’টির মিশেল এখন নানা রকম ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিচ্ছে। দ্রুত উন্নয়নের নামে রেজিমেন্টেড ধারা বজায় রাখা ও কথিত স্থিতিশীলতা ধরে রাখার নামে জনগণ হয়ে দাঁড়িয়েছে শাসকদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার গিনিপিগ।

অথচ চীন যখন তার অর্থনীতির দুয়ার উন্মুক্ত করে তখন আমেরিকা ও পশ্চিমা দেশগুলো তাদের সব টেকনোলজি, কোম্পানি নিয়ে এগিয়ে এসেছিল ১৪০ কোটি লোকের একটি দেশকে চরম দারিদ্র্যের হাত থেকে উত্তরণের জন্য। তাদেরও লাভ ছিল এতে। কম মূল্যের শ্রমের সুবিধা নিয়ে পণ্যমূল্য কমানো ও চীনকে একটি বড় বাজারে পরিণত করা। তা হয়েছে। এককভাবে চীন এখন বিশাল বাজার। কিন্তু যেই না তাদের হাতে টাকা এসেছে, প্রযুক্তি এসেছে, সামরিক শক্তির আধুনিকায়ন হয়েছে তখনই তারা হুট করে বন্দুকের নলটি তাদের ওখানে পুঁজি বিনিয়োগকারী দেশগুলোর দিকেই তাক করেছে। এখন তারা চাইছে তাদের সিস্টেমে বিশ্ব চলুক। এখানে সমস্যা হতো না যদি না তারা অতি দ্রæত পৃথিবীর সর্বোচ্চ আসনটি দখলের স্বপ্ন না দেখত। যদি না তারা দেশে দেশে গণতন্ত্র ধ্বংস করে নিবর্তনবাদী শাসকদের প্রশ্রয় দিয়ে তাদের বলয়ে নেয়ার চেষ্টা না করত। ভেনিজুয়েলায় গণতন্ত্র ছিল, তা চলতে দিয়েই সম্পর্ক ভালো রাখা যেত। বাংলাদেশে গণতন্ত্রের পথ উজ্জ্বল হচ্ছিল ও সমান্তরালে চীনের সাথে সামরিক সম্পর্কও গভীর ছিল। এটিকে ওভাবে চলতে দিলে সমস্যা নেই। কিন্তু সমাজতন্ত্রের সাথে পুঁজিবাদ মেশালে যে একটি ভজকট আসলেই হয় চীনের ও রাশিয়ার এক্সপেরিমেন্টগুলো তারই সাক্ষ্য দিচ্ছে।

গণতন্ত্রকামী মানুষ ও বিশেষ করে যেসব দেশ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে অভ্যস্ত সেসব দেশ হঠাৎ করে আজগুবি ‘উন্নয়ন’ তত্ত¡কে একমাত্র ধ্যানজ্ঞান করা শুরু করল কেন সেটি বড় প্রশ্ন হতে পারে। তবে এসব দেশে কখনো গণতন্ত্র ছাড়া বর্তমানে যে সমস্যা শুরু হয়েছে তার সমাধান কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে সমাধান হবে না। তাই দেখা যাচ্ছে, দেশে দেশে চলছে আন্দোলনের পর আন্দোলন। আর সরকারগুলো সেসব আন্দোলন দমন করছে চরমতম বক্ররতার মধ্য দিয়ে। বেলারুশে গত ২০২০ সালে প্রহসনের নির্বাচনের পর সেখানকার ২৬ বছর ধরে চলে আসা শাসক লুকাশেনকো রাষ্ট্রের সব শক্তিকে জনগণের বিরুদ্ধে নামিয়ে দেয় ও কথিত কঠোর হাতে সব বিরোধিতা দমন করে। তাদের বিশেষ বাহিনীর যেসব ছবি বা ভিডিও সেসময় বিশ্ব মিডিয়ায় প্রচারিত হয় তাতে দেখা যায়, তারা খুবই সুপ্রশিক্ষিত, ওয়েল ইকুইপড। এরা নিজ জনগণকে রাষ্ট্রের শক্তি প্রয়োগ করে নিবর্তনবাদী শাসনকে পাকা করছে। কেন? কারণ এসব গোয়েন্দা, পুলিশ ও বিশেষ বাহিনীকে লুকাশেনকোর মতো শাসকরা উচ্চ বেতন-ভাতা, সুযোগ-সুবিধা ও অবৈধ পথে সম্পদ অর্জনের পথ করে দিয়েছে। তারা বিলাসী জীবনযাপন করছে, যা তারা কখনো চিন্তাও করেনি ও গণতন্ত্র আসলে হয়তো তাদের সেসব অনাকাক্সিক্ষত সুযোগ সুবিধা আদায়ের পথ রুদ্ধ হয়ে যাওয়ার ভীতি তাদের পেয়ে বসেছে। সে জন্য দেশে দেশে স্বৈরতান্ত্রিক শাসকদের অনুগত হিসেবে কাজ করছে সেনাবাহিনীসহ প্রায় সব প্রশাসন। আরাম-আয়েশ কে ছাড়ে? এ জাতীয় দেশগুলোর সেনা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দিকে লক্ষ করলে দেখা যায়, তারা বেশ ধোপদুরস্ত, তেলতেলে, ইউনিফর্মে ঝুলছে ডজনখানেক মেডাল। এরা ‘নেতা’ ও ‘পার্টি’র প্রতি নিবেদিতপ্রাণ। দেশ মানেই তাদের কাছে পার্টি। জাতীয় নিরাপত্তা মানেই বিরোধী মত দমন। উন্নয়ন মানেই প্রশস্তি কীর্তন ও পদলেহন। সব জায়গায় একই ট্রেন্ড। আশ্চর্য নয় কি?

কিন্তু এসব নিবর্তনবাদী কাজ কারবারে সৃষ্টি হয়েছে অকল্পনীয় জটিলতার। লাখ লাখ শরণার্থী পালিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে ভিন্ন দেশে। কে চায় নিজের পিতৃভ‚মি, সহায়, সম্পদ ছেড়ে অন্য দেশের অনিশ্চিত জীবন বেছে নিতে? কিন্তু দানবীয় রাষ্ট্রীয় শক্তির কাছে তারা অসহায়। জীবন বাঁচাতে তারা চলে যাচ্ছে পঙ্গপালের মতো ভিন দেশে। ইউএনএইচসিআরের হিসাব মতে, গত ১০ বছরে পৃথিবীতে রাজনৈতিক ও অন্যান্য কারণে দেশত্যাগে বাধ্য হওয়া মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে আট কোটি ২৪ লাখে। এর ৬৮ শতাংশ আবার পাঁচটি নিবর্তনবাদী দেশের। এই হিসাবের বাইরে যে কত লাখ মানুষ নানাভাবে সাগর পাড়ি দিয়ে বা হিসাবের বাইরে পালিয়েছে তার কোনো পরিসংখ্যান নেই। গৃহযুদ্ধ, প্রাকৃতিক বিপর্যয় ছাড়া শাসনতান্ত্রিক সঙ্কটে দেশত্যাগী মানুষের বিষয়টি এ ক্ষেত্রে ভিন্নভাবে আলোচনার দাবি রাখে। বিশেষ করে স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের নিগড়ে শরণার্থীতে পরিণত হওয়া মানুষের সংখ্যা আজ হু হু করে বাড়ছে।

ভেনিজুয়েলায় সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা কায়েম হওয়ার পর ২০২১ সালের অক্টোবর মাস পর্যন্ত ৫৯ লাখ বিরোধী মতের মানুষ দেশ ছেড়েছে। এদের প্রায় সবাই আশ্রয় নিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। কলম্বিয়াতেও গেছে কয়েক লাখ। পালিয়ে যাওয়া ওই সব মানুষের সহায় সম্পদ দখল করেছে ‘পার্টির’ নেতাকর্মী ও অনুগত কর্তারা। ২০১৮ সালে ভেনিজুয়েলায় একটি হাস্যকর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় যাকে একমাত্র ও তাৎক্ষণিক সমর্থন দেয় রাশিয়া ও চীন। একসময় যখন গণবিপ্লব ছড়িয়ে পড়ে তখন অতিদ্রæত চীন সরবরাহ করে রায়ট কন্ট্রোল গিয়ারসহ যাবতীয় উপকরণ। ২০১৯ সালে জাতিসঙ্ঘে ভেনিজুয়েলা নিয়ে কথা উঠলে রাশিয়া ভেটো প্রয়োগ করে মাদুরোর মতো একজন ঘৃণ্য স্বৈরশাসককে টিকে থাকার পথ করে দেয়। প্রকল্প সহায়তার নামে চীন দেয় ৫০ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা যার বেশির ভাগই লুটেপুটে খেয়েছে ‘দলের’ নেতাকর্মীরা। এ ছাড়াও সামরিক সমর্থন প্রকাশ করার জন্য রাশিয়া ২০১৮ সালে তার স্ট্র্যাটেজিক বোমারু বিমান টুপোলেভ-১৬০ উড়িয়ে নিয়ে আসে ভেনিজুয়েলায়।

এ দিকে সিরিয়ার স্বৈরশাসক আসাদের গোয়েন্দা সংস্থা ও সেনাবাহিনীর গণহত্যা থেকে রক্ষা পেতে পালিয়ে গেছে ৬৮ লাখ সিরিয়ান। বেশির ভাগ গেছে তুরস্কে। বাকি সব ইউরোপের দেশগুলোতে। গত অক্টোবরে নির্বাচনের নামে প্রহসনের আয়োজন করলে গোয়েন্দাদের হুমকিতে নিকারাগুয়া থেকে হাজার হাজার মানুষ পালিয়ে চলে যায় জীবন বাঁচাতে। বেলারুশ এ দিকে এক নাটকের সৃষ্টি করে পোল্যান্ড সীমান্তে। গত বছর জুলাই মাসে বেলারুশ সেনাবাহিনী তাদের ট্রাকে করে হাজার হাজার অসহায় মানুষকে নিয়ে আসে সীমান্তে। সাজানো হয় শরণার্থী নাটক। বাংলাদেশও শরণার্থীর ভার বইছে যদিও এ দেশ থেকেও বহু মানুষ বিগত বছরগুলোয় অ্যাসাইলাম নিয়ে পশ্চিমা দেশে চলে গেছে। এখানে যদি আফগানিস্তানের উদাহরণ টানি তবে দেখা যাবে, সেখানকার শরণার্থীরাও চলে গেছে পশ্চিমা দেশে, চীন বা রাশিয়ায় নয়। ওই দু’টি দেশ কাউকে আশ্রয় দেয়নি।

এখন প্রশ্ন হলো, কেন বিভিন্ন দেশ এভাবে শরণার্থী সমস্যার সৃষ্টি করছে? এটি হলো চাপ প্রয়োগের কৌশল। নিজ দেশের ভিন্ন মত দমন করাও হলো আবার গণতন্ত্র চাওয়া সেসব মানুষকে গণতান্ত্রিক দেশগুলোর ওপর চাপিয়ে দিয়ে বোঝা সৃষ্টি করা হলো। নেও এখন তোমরা গণতান্ত্রিক দেশগুলো গণতন্ত্রকামী মানুষ লালন পালন করো! তোমাদের ডেমোগ্রাফি, সোসাইটি নষ্ট করো! অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করো! গণতন্ত্র চাও? নেও গণতন্ত্র খাও! কী যায়-আসে? নিবর্তনবাদী দেশগুলো বেঁচে গেল! তারা তাদের নিজের মতো করে সমাজতান্ত্রিক পুঁজিবাদ নিয়ে এগিয়ে যাবে। অন্য দিকে লাখ লাখ মানুষ যাপন করবে মানবেতর জীবন।

পৃথিবী দুই ভাগে ভাগ হচ্ছে। আমেরিকা ও পশ্চিমা দেশগুলো এর আগে মধ্যপ্রাচ্যে তথাকথিত সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করেছে। এখন তারা হয়তো তাদের ভুল বুঝতে পেরেছে। তবে ক্ষতি যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। তারা যখন ব্যস্ত ছিল যুদ্ধে তখন রাশিয়া ও চীন তাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতা বাড়িয়েছে। করোনা মহামারীর সুযোগে তারা এখন নখদন্ত বের করে তাদের বলয় বৃদ্ধিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। গণতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণা লালনকারী দেশগুলো দেখছে মহাবিপদ। যদি দেশে দেশে নিবর্তনবাদ চেপে বসে তা হলে আরো কত যে ঝামেলা তাদের সহ্য করতে হবে তা কেউই বলতে পারে না। যদি রাশিয়া ও চীন উন্নত অর্থনীতির স্রোতে জীবনব্যবস্থার পাশাপাশি শাসনব্যবস্থাকেও উন্নত করত ও তাদের মিত্র দেশগুলোয় জোর করে নিবর্তনবাদ চাপিয়ে দেয়ার কৌশল না নিত তা হলে বরং লাভ হতো তাদেরই। পশ্চিমারা তখন ব্যাকফুটে চলে যেত। কিন্তু তারা বেছে নিয়েছে কিম্ভ‚তকিমাকার কৌশল। পুতিন তার মন থেকে কখনোই যে হারিয়ে যাওয়া সমাজতন্ত্রের ভ‚ত দূর করতে পারেননি, তা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তার দরকার সেই ভ‚তের আরো বংশবিস্তার। সাথে জুটেছে একসময়ের নিরীহ ও সভ্যতাগর্বী মহাচীন। কিন্তু এসব করে তাদের লাভ কী? এবং কিসের বিনিময়ে তারা কী অর্জন করতে চাচ্ছে? অ্যাট দ্য কস্ট অব হোয়াট? গণতন্ত্রের বিনিময়ে? কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা, মান-সম্মান, মর্যাদার বিনিময়ে?
লেখক : সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও সাংবাদিক, বাংলাদেশ ডিফেন্স জার্নালের প্রধান সম্পাদক


আরো সংবাদ


premium cement