১৮ অক্টোবর ২০১৯

ভেতরে একটি ‘নাকি’ আছে

-

‘মন আমার দেহ ঘড়ি’ একটি জনপ্রিয় লোকগীতি। তার কয়েক লাইন উদ্ধৃত করে আজকের নিবন্ধটি শুরু করছি। সেগুলো হলো, ‘মন আমার দেহ ঘড়ি/সন্ধান করি বানাইয়াছে কোন মিস্তরি। একখান চাবি মাইরা, হায় একখান চাবি মাইরা দিছে ছাইড়া, জনম ভইরা চলতে আছে।/দেহ ঘড়ি চৌদ্দতলা/তার ভিতরে দশটি নালা/নয়টি খোলা একটি বন্ধ গোপন একটি তালা আছে/মন আমার দেহ ঘড়ি সন্ধান করি/ বানাইয়াছে কোন মিস্তরি/মন আমার দেহ ঘড়ি।’

এ গানের কথাগুলো মনকে নাড়া দিয়েছিল, এবার জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর একটি বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ‘বালিশ কাণ্ড’ নিয়ে প্রশ্নোত্তর পর্বে জবাব দিচ্ছিলেন প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং। তার আগে বাজেট-উত্তর সংবাদ সম্মেলনেও অর্থমন্ত্রীর বদলে তিনি বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। এটিও ছিল নিয়মের ব্যতিক্রম। অর্থমন্ত্রী যদি অসুস্থ হয়ে থাকেন, তা হলে সাবেক অর্থ প্রতিমন্ত্রী ও বর্তমান পরিকল্পনামন্ত্রী এ সংবাদ সম্মেলন করতে পারতেন; কিন্তু স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী কেন এগিয়ে এলেন? নাকি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সাংবাদিকেরা অর্থমন্ত্রীকে প্রশ্ন করতে পারতেন; হয়তো প্রশ্নবাণে জর্জরিত করতে পারতেন। কালো টাকা, ঋণখেলাপি, বিত্তবান-বান্ধব বাজেট নিয়ে সাংবাদিকদের অনেক কথা থাকতে পারত। তার অনেক প্রশ্নেরই সন্তোষজনক জবাব অর্থমন্ত্রী দিতে পারতেন না বলেই ধারণা। সম্ভবত সে কারণেই সংবাদ সম্মেলনের ভার নিয়েছিলেন খোদ প্রধানমন্ত্রী। উল্লেখ্য, অর্থমন্ত্রী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর চিকিৎসকেরা বারবার বলেছিলেন যে, তিনি ভালো আছেন, সুস্থ আছেন।

আবার প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনের হাল আমাদের জানা আছে। প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে এখন যান সম্পাদকেরা ও টিভি চ্যানেলের মালিক বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তারা সামনের সারিতে পুতুলের মতো বসে থাকেন। কেন তারা যান, সেটি বোধগম্য নয়। আসলে এসব সংবাদ সম্মেলনে যাওয়ার কথা রিপোর্টারদের; কিন্তু তাদের কমই দেখা যায়। প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নও করা হয় বড় অদ্ভুতভাবে। প্রথমে দীর্ঘ সময় নিয়ে প্রশ্নকর্তারা প্রধানমন্ত্রীর নানা কাজের জন্য ব্যক্তিগতভাবে তার প্রশংসা করতে থাকেন। তারপর যে বিষয়, সে বিষয়ে নিজেই ব্যাপক ব্যাখ্যা দেন। এরপর থামিয়ে দেয়ার উপক্রম হলে তিনি নিজেই ‘দপ্’ করে বসে যান। প্রশ্নটি আর করা হয়ে ওঠে না। এই ধারাই চলছে। প্রধানমন্ত্রী বিদেশ সফর শেষে এ ধরনের সংবাদ সম্মেলন করে থাকেন। এখানে প্রধানমন্ত্রী বিব্রত হতে পারেন, এমন প্রশ্ন করার মতো কোনো সাংবাদিক কখনো আমন্ত্রিত হন না।

ফলে এসব সংবাদ সম্মেলন অনেক সোজা। ‘যাও, প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা করো। বসে পড়ো।’

গত ১৭ জুন তেমন আরেকটি আলোচনা হয়ে গেল। তাতে দেখা গেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বালিশ ও অন্যান্য দ্রব্যসামগ্রী সরবরাহের ক্ষেত্রে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে। এর দায়ভার গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের। এই কাণ্ড ঘটার পর অনেক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। গণপূর্ত মন্ত্রণালয় বলেছে, তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির রিপোর্ট আসুক, তারপর ব্যবস্থা। ইতোমধ্যে বিষয়টির ওপর ধুলা পড়তে শুরু করেছে। এমন সময়ে গত ১৭ জুন বালিশ প্রসঙ্গটি সংসদে আসে সম্পূরক বাজেটের ছাঁটাই প্রস্তাবের সময় এবং তখনো অনুপস্থিত ছিলেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম। আর তার হয়ে জবাব দেন প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং। তিনি বলেন, ‘একজন বালিশতত্ত্ব নিয়ে এসেছেন। পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওই ঘটনায় যিনি দায়িত্বে ছিলেন, তার কিছু পরিচয় আমরা পেয়েছি। একসময় তিনি বুয়েটে ছাত্রদলের নির্বাচিত ভিপিও নাকি ছিলেন। তাকে সেখান থেকে সরানো হয়েছে। যখনই তথ্য পেয়েছি, সঙ্গে সঙ্গে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি।’

প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ‘বালিশতত্ত্ব নিয়ে আমারও একটা প্রশ্ন আছে। পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র যেখানে গড়ে উঠছে, সেখানে আর কিছু না পেয়ে পেল বালিশ। কী বালিশ, সেটাও একটা প্রশ্ন। এটা কি তুলার বালিশ? কোন তুলা? কার্পাস তুলা না শিমুল তুলা? নাকি সিনথেটিক তুলা? নাকি জুটের তুলা? আর বালিশ নিয়ে রাস্তায় আন্দোলন করতে দেখলাম। এত মানুষ; এত বালিশ এক দিনে কিনে ফেলল কিভাবে? এই বালিশ কেনার টাকার জোগানদারটা কে? সেটা আর বলতে চাই না।’

এ বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে একটা বিষয় স্পষ্ট যে, বালিশ নিয়ে দুর্নীতির খবরটি প্রকাশ হওয়ায় তিনি দৃশ্যত নাখোশ হয়েছেন। এ জন্য যে দায়ী, তিনি ‘নাকি’ বুয়েটে ছাত্রদল থেকে ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। এই ‘নাকি’ কথাটা থেকে আমাদের মনে অনুরণিত হয়েছে, গানটি-‘মন আমার দেহ ঘড়ি...।’ ‘নয়টি খোলা একটি বন্ধ, গোপন একটি তালা আছে।’ তাকে সরিয়ে দিলেই কি দুর্নীতির অবসান ঘটে গেল? বা ঘটবে?

কিন্তু ‘নাকি’ কেন? প্রধানমন্ত্রীকে যারা এই তথ্য সরবরাহ করলেন, তারা দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেননি। তথ্যটি সুনির্দিষ্টভাবে নিশ্চিত হওয়া গেল না কেন যে, তিনি অত সালে বুয়েটের ভিপির দায়িত্ব পালন করেছেন। এ থেকে মনে করা যায়, সবাই দায়সারা গোছের কাজ করছেন, সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছেন না।

এটা অনেকটা অপরাধী পুলিশকে ‘ক্লোজড’ করার মতো। যেন ক্লোজড করা মানেই শাস্তি; সরিয়ে দেয়া মানেই শাস্তি। এই মনোভাব নিয়ে কাজ করলে অপরাধ শুধু বাড়বে, কমবে না।

এ দিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কেনাকাটায় দুর্নীতির দায় নিতে নারাজ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। গত ১৮ জুন মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ নিয়ে আলোচনা হলো। সেখানে বালিশ কাণ্ডের ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। কমিটির একজন সদস্য বিষয়টি স্পষ্ট করার জন্য মন্ত্রী ও সচিবকে অনুরোধ করেন। তবে মন্ত্রী ও সচিব বলেছেন, এর দায় তাদের নয়। যেহেতু কাজটা করছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, তাই দায় তাদেরই নিতে হবে। বৈঠক শেষে কমিটির সদস্য ডা: মো. হাবিবে মিল্লাত সাংবাদিকদের বলেন, বিষয়টি নিয়ে আমরা খুবই উদ্বিগ্ন। সবাই অখুশি। মন্ত্রণালয়ের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছিলাম। তারা বলেছেন, যেহেতু কাজ দিয়েছি অন্য একটা মন্ত্রণালয়কে, তাদের কাছ থেকে সে কাজ বুঝিয়ে দেয়ার আগে এর দায় তাদেরইে নিতে হবে। ‘তাহলে কি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় দায়ী?’ এর জবাবে তিনি বলেন, ‘মন্ত্রী ও সচিবের কথা অনুযায়ী তো এটাই হয়। তবে আমরা বলেছি, বিষয়টি দ্রুত পরিষ্কার করতে। এর সঙ্গে সরকারের ভাবমূর্তি জড়িত।’

বৈঠকে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী আলোচনা হয়। হাবিবে মিল্লাত বলেন, একটি বালিশের দাম পাঁচ হাজার ৯৫৭ টাকা এবং তা ওঠানোর খরচ ৭৬০ টাকা কিভাবে হয়? কমিটির সভাপতি রুহুল হক এ বিষয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান ও মন্ত্রণালয়ের সচিব আনোয়ার হোসেনের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছেন। তখন মন্ত্রী বলেন, ‘এটা নিয়ে বসে থাকলে তো চলবে না, আমাদের কাজ শেষ করতে হবে।’ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, কাজটি হচ্ছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ পিডব্লিউডির মাধ্যমে। ফলে সেখানে তদারকি করার অধিকার আমাদের নেই। ‘এ সময় কমিটিকে জানানো হয়, প্রকল্পের দুর্নীতি বিষয়ে দুটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। প্রতিবেদন হাতে পেলেই ব্যবস্থা নেয়া হবে। আদালতের রায় পেলেও তা বাস্তবায়ন করা হবে।’

এই দুর্নীতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় বয়ে গেছে। বালিশসহ প্রকল্পের তৈজসপত্র কেনা ও ভবনের ফ্ল্যাটে তোলার জন্য ব্যয় হয়েছে ২৫ কোটি ৫৯ লাখ ৯২ হাজার ২৯২ টাকা। প্রকল্প পরিচালকের মাসিক বেতন ধরা হয়েছে সাত লাখ টাকা। পরিচালকের গাড়ির ড্রাইভারের বেতন ধরা হয়েছে মাসিক ৭৪ হাজার টাকা। মালির মাসিক বেতন ৮০ হাজার টাকা। এ সম্পর্কে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা হাফিজউদ্দিন খান বলেছেন, এমন ঘটনা যদি সত্য হয়, তা হলে খুবই বিপদের কথা। এমন হরিলুট চলছে, অথচ দেখার কেউ নেই, শোনার কেউ নেই; কোনো স্বচ্ছতা নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেছেন, যদি এমন দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়া হয়, তাহলে দুর্নীতি দিনে দিনে বাড়তে থাকবে। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এ ধরনের ঘটনা অত্যন্ত দুঃখের ও উদ্বেগের বলে জানান। কারণ সরকারের এত বড় হাইপ্রোফাইলের একটি প্রকল্পের একটি অংশে এত বড় দুর্নীতির বিষয় সবাইকে ভাবিয়ে তোলে। এ ধরনের অস্বচ্ছতার কারণ হচ্ছে, কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ না থাকা। তবে প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি নিয়ম মেনেই এই দামে বাজার থেকে ‘কেনাকাটা’ করা হয়েছে; কিন্তু সংশ্লিষ্টরা কার প্রশ্রয়ে এ ধরনের বড় গলায় কথা বলতে পারছেন?

মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেয়ার পরপরই গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম আওয়াজ দিয়েছিলেন যে, তার যুদ্ধ দুর্নীতির বিরুদ্ধে। কিন্তু পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের কর্মকর্তাদের ফ্ল্যাটের জন্য কেনা হয় এ ধরনের আসবাবপত্র। প্রতিটি খাট কেনার খরচ দেখানো হয়েছে ৪৩,৩৫৭ টাকা। আর তা ভবনে ওঠানোর খরচ দেখানো হয়েছে ১০,৭৭৩ টাকা। বৈদ্যুতিক চুলা কেনায় খরচ দেখানো হয়েছে প্রতিটি ৭,৭৪৭ টাকা। আর এই চুলা ওপরে ওঠাতে ব্যয় দেখানো হয়েছে ৬,৬৫০ টাকা। বৈদ্যুদিক কেটলি কিনতে খরচ দেখানো হয়েছে ৫,৩১৩ টাকা আর ওই কেটলি ওপরে তুলতে ব্যয় দেখানো হয়েছে ২,৯৪৫ টাকা। রুম পরিষ্কারের একটি মেশিন কিনতে সংশ্লিষ্টরা খরচ দেখিয়েছেন ১২,০১৮ টাকা। আর প্রতিটি ওঠাতে খরচ দেখানো হয়েছে ৬,৬৫০ টাকা।

প্রতিটি টেলিভিশন কিনতে খরচ দেখানো হয়েছে ৮৬,৯৬০ টাকা। আর ওঠানোর খরচ ৭,৬৩৮ টাকা। টেলিভিশন কেনা হয়েছে ১১০টি। আর সেগুলো রাখার জন্য কেবিনেট কেনা হয়েছে ৫২,৩৭৮ টাকা করে। ফ্রিজের দাম দেখানো হয়েছে প্রতিটি ৯৪,২৫০ টাকা আর ওঠাতে খরচ পড়েছে ১২,৫২১ টাকা করে। ওয়ারড্রোব কেনা হয়েছে প্রতিটি ৫৯,৮৫৮ টাকায়। ওঠাতে খরচ দেখানো হয়েছে ১২,৪৯৯ টাকা। মাইক্রোওয়েভ ওভেন প্রতিটি কেনায় ব্যয় হয়েছে ৩৮,২৭৪ টাকা আর ওঠাতে খরচ হয়েছে ৬,৮৪০ টাকা। প্রতিটি সোফা কেনা হয়েছে ৭৪,৫০৯ টাকায়। আর ওঠাতে ব্যয় হয়েছে ২৪,২৪৪ টাকা। সেন্টার টেবিল কেনা হয়েছে ১৪,৫৬১ টাকা করে। ভবনে তুলতে খরচ হয়েছে ২,৪৮৯ টাকা। ছয়টি চেয়ারসহ ডাইনিং টেবিল সেট কেনা হয়েছে ১,১৪,৬৭৪ টাকা করে। ভবনে তুলতে লেগেছে ২১,৩৭৪ টাকা করে।
এর পরও সরকারের তরফ থেকে বড় গলায় কথা বলা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র যেখানে গড়ে উঠেছে, সেখানে আর কিছু না পেয়ে পেল বালিশ। হায় বালিশকাণ্ড! এখানে ‘নয়টি খোলা একটি বন্ধ, গোপন একটি তালা আছে!’

লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক
[email protected]


আরো সংবাদ




astropay bozdurmak istiyorum
portugal golden visa