১৭ জুন ২০১৯

গ্যাসের অযৌক্তিক ও অপরিণামদর্শী দাম বাড়ানো

-

শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী সংগঠন, ভোক্তা অধিকার সংস্থা ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, অনেক রাজনীতিবিদ ও সাধারণ মানুষের প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও সরকার গ্যাসের দাম বাড়িয়ে দ্বিগুণ করার প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছে। আর সরকার কাজটি করছে রীতিমতো আইন ভেঙে। কারণ, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুরেটরি কমিশনের (বিইআরসি) আইন অনুযায়ী, তাদের কাছে গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলো বছরে একবারের বেশি গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিতে পারে না। রাষ্ট্র পরিচালিত পেট্রোবাংলা ও এর বিতরণ কোম্পানিগুলো বিইআরসির কাছে দাবি তুলেছে, গ্যাসের প্রান্তিক ভোক্তাদের প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের বর্তমান দাম ৮.৩৩ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২.১৯ টাকা করার।

ছয়টি গ্যাস বিতরণ কোম্পানি- তিতাস, বাখরাবাদ, জালালাবাদ, পশ্চিমাঞ্চল, কর্ণফুলী ও সুন্দরবন এই দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়ার পর সরকার গ্যাসের দাম বাড়ানোর এই প্রক্রিয়া শুরু করে। এসব কোম্পানি বলছে, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত গ্যাস দিয়ে লিকুইড ন্যাচারাল গ্যাস (এলএনজি) ব্লেন্ডিং করার কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। উল্লেখ্য, দেশে জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম নিয়ন্ত্রণ করে বিইআরসি। কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, ‘এ মুহূর্তে গ্যাসের দাম বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই বিইআরসির হাতে, কারণ এর নিজস্ব আইন অনুযায়ী বিইআরসি বছরে দুইবার গ্যাসের দাম বাড়াতে পারে না।’

গ্যাসের দাম সর্বশেষ বাড়ানো হয়েছিল গত বছরের অক্টোবরে। অতএব, এ বছরের অক্টোবরের আগে গ্যাসের দাম বাড়ানো বিইআরসির নিজস্ব আইনের পরিপন্থী। তা সত্ত্বেও কেউ কেউ এগিয়ে এসেছেন রাষ্ট্র পরিচালিত কোম্পানিগুলোর পক্ষ সমর্থনে। তাদের অভিমত, বাস্তবতা হচ্ছেÑ দেশে গ্যাসের মজুদ দ্রুত কমে আসছে। অন্য দিকে, বাড়ছে গ্যাসের চাহিদা। এমন অবস্থায় এলএনজি আমদানির কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক নুরুল ইসলাম বলেন, ‘সাধারণ ভোক্তা ও শিল্পকারখানার চাহিদা মিটিয়ে নির্ভরযোগ্য গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হলে এলএনজি আমদানির কোনো বিকল্প নেই।’ সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো একই ধরনের অভিমত ব্যক্ত করে বলেন, ‘এই দাম বাড়ানো হচ্ছে সাময়িক জ্বালানি সমস্যার সমাধান। কিন্তু এটি অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে, তিতাস গ্যাসের মতো কোম্পানির দুর্নীতি ও অদক্ষতার ব্যয় এই দাম বাড়ানোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। অদক্ষতার দায়ভার যেন ভোক্তাদের ঘাড়ে চাপানো না হয়।’

তিতাস গ্যাসের প্রস্তাব মতে, বর্তমানে যারা ঘরে এক গ্যাসের চুলা ব্যবহার করেন তাদের মাসে দিতে হয় ৭৫০ টাকা, দাম বাড়ানোর ফলে এখন তাদের দিতে হবে ১৩৫০ টাকা। তেমনিভাবে বর্তমানে যেখানে দুই চুলার জন্য দিতে হয় ৮০০ টাকা, দাম বাড়ানোর পর দিতে হবে ১৪৪০ টাকা। আবাসিকসহ সব ধরনের গ্যাসের দাম গড়ে ১০২ দশমিক ৮৫ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে লাভে থাকা গ্যাস কোম্পানি।

গ্যাস বিতরণকারী কোম্পানিগুলো বিগত নির্বাচনের আগে ডিসেম্বরেই গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেয় বিইআরসির কাছে। দেশে তরলকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির কারণে বিতরণ কোম্পানিগুলো তাদের উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে জানিয়ে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়। উল্লেখ্য, গত বছরের এপ্রিল থেকে এলএনজি আমদানি শুরু হয়, যার দাম প্রতি ঘনমিটার প্রায় ৩০ টাকা। এই দাম দেশীয় গ্যাসের চেয়ে প্রায় চারগুণ। এ পরিস্থিতিতে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই গ্যাসের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। গণশুনানি করে বিইআরসি গ্যাসের দাম কিছুটা বাড়িয়েছিল। কিন্তু এতে ভোটের ওপর বিরূপ প্রভাবের কথা চিন্তা করে সরকার তা থেকে পিছু হটে। এবার নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার দুই মাস পর আবার গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই গ্যাসের বাড়তি দামের বোঝা বহনের মতো অবস্থায় নেই শিল্পোদ্যোক্তারা। এ অভিমত ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিনের। তিনি বলেন, ‘গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে শিল্প খাতে পণ্য উৎপাদনের খরচ আরো বাড়বে। এর ফলে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাবে, বাড়িয়ে তুলবে মূল্যস্ফীতি। যার অনিবার্য পরিণতি হচ্ছে জনদুর্ভোগ।’

এ দিকে বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে- বিইআরসি গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোর দুর্নীতি বন্ধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ না নিয়ে প্রস্তাবিত দাম বাড়ানোর আবেদন গ্রহণ করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। তাদের অভিমত, জনগণের জীবনযাত্রার কথা বিবেচনায় রেখে সরকারের উচিত গ্যাসের এই দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়া থেকে দ্রুত সরে আসা। এ দিকে সম্প্রতি গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের প্রতিবাদে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা যথার্থই বলেছেন, চড়া দামে এলএনজি আমদানি করে এই দায় জনগণের ওপর চাপানো হচ্ছে। অথচ অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা লুটপাট হচ্ছে। এই লুটপাটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে গণশুনানিকে তামাশায় পরিণত করা হয়েছে। তারা মনে করেন, গ্যাসের দাম গড়ে ৬৬ শতাংশ বাড়ানো হলে দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি হবে। তাই তাদের দাবি, অবিলম্বে এই প্রহসনের গণশুনানি ও দাম বাড়ানো বন্ধ করতে হবে।

অন্য দিকে, গ্যাস খাতে হাজার হাজার কোটি টাকার কর ছাড়ের ব্যাপারটি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জানা গেছে, গ্যাসের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখার কথা বলে চলতি অর্থবছরে এরই মধ্যে এ খাতে ১৫ হাজার কোটি টাকার কর ছাড় দিয়েছে রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আমদানি ও সম্পূরক শুল্ক এবং মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) বাবদ এ কর ছাড় দিয়েছে সংস্থাটি। এই কর ছাড় পাওয়ার পরও গ্যাসের দাম ১০২ শতাংশ বাগানোর প্রস্তাব দিয়েছে পেট্রোবাংলার অধীন বিতরণ কোম্পানিগুলো। অবশ্য বিইআরসির চেয়ারম্যান মনোয়ার ইসলাম বলেছেন, গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলো গ্যাসের দাম যত বেশি বাড়ানোর প্রস্তাব করুক না কেন, যৌক্তিক পর্যায়ে তা বিবেচনা করা হবে। কাজেই জনগণের আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।

এলএনজি আমদানির পর গ্যাসের দাম যাতে না বাড়ে, সে লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশে চলতি অর্থবছরের শুরুতেই গ্যাসের ওপর প্রযোজ্য সব ধরনের শুল্ক কর কমানোর উদ্যোগ নেয় এনবিআর। সর্বশেষ ২০১৮ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর এ খাতে কর ছাড় দিয়ে তিনটি এসআরো জারি করে সংস্থাটি। প্রজ্ঞাপনে শুধু গ্রাহকপর্যায়ে সরবরাহের ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাট বহাল রেখে ১৩ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক, ১৫ শতাংশ আমদানি ভ্যাট ও ৫ শতাংশ আমদানি শুল্কের শতভাগ অব্যাহতি দেয়া হয়। অগ্রিম ব্যবসায় কর ৫ থেকে ২ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। গ্যাস খাতে এই কর অব্যাহতির ফলে চলতি অর্থবছরে এনবিআর ১৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাবে বলেও ওই সময় অর্থ মন্ত্রণালয়কে জানায় এনবিআর। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এ খাতে রাজস্ব বোর্ড বড় মাপের করদাতা ইউনিটের আহরণ সাত হাজার কোটি টাকা কমেছে।

শিল্প-বাণিজ্য ও বিদ্যুৎ উৎপাদন নির্বিঘœ করতেই গ্যাসের ক্ষেত্রে এই কর ছাড় দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন এনবিআর চেয়ারম্যান ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব মো: মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া। তিনি বলেছেন, বিপুল অঙ্কের রাজস্ব কমলেও মানুষের ভোগান্তি কমাতে গ্যাসের ক্ষেত্রে শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট ছাড় দেয়া হয়েছে। মূলত এলএনজি আমদানির পর যেন গ্যাসের দাম না বাড়ে, সে লক্ষ্য সামনে রেখেই এই অব্যাহতি দেয়া হয়েছিল।

এ কথা সত্যি, গ্যাসের ওপর রাজস্বে এ ছাড় দেয়ায় সাধারণ গ্রাহকেরা কোনো সুবিধা পাচ্ছেন না। এরপরও উল্টো পেট্রোবাংলার নির্দেশে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে হাজির হয়েছে বিতরণ কোম্পানিগুলো। এরই মধ্যে চলা গণশুনানিতে ছয়টি বিতরণ কোম্পানি নতুন প্রস্তাবে সব শ্রেণীর গ্যাসের দাম গড়ে ১০২ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে। পাশাপাশি এরই মধ্যে সবচেয়ে বেশি দাম বাড়ানো হচ্ছে সার ও বিদ্যুৎ খাতে। বিদ্যুৎ খাতে ব্যবহারের গ্যাসের দাম আগের চেয়ে ২০৮ শতাংশ বাড়িয়ে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ৩ টাকা ১৬ পয়সা থেকে ৯ টাকা ৭৪ পয়সা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

সারের ক্ষেত্রে ২১১ শতাংশ বাড়িয়ে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ২ টাকা ৭১ পয়সা থেকে ৮ টাকা ৪৪ পয়সা এবং ক্যাপটিভ পাওয়ারের ক্ষেত্রে ৯৬ শতাংশ বাড়িয়ে ৯ টাকা ৬২ পয়সার পরিবর্তে ১৮ টাকা ৬৮ পয়সা করার প্রস্তাব করেছে বিতরণ কোম্পানিগুলো। এ ছাড়া শিল্প খাতে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের বর্তমান দাম ৭ টাকা ৭৬ পয়সা থেকে ১৩২ শতাংশ বাড়িয়ে ১৮ টাকা ৪ পয়সা এবং বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে ৪১ শতাংশ বাড়িয়ে ১৭ টাকা ৪ পয়সা থেকে ২৪ টাকা ৫ পয়সা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া আগেই বলা হয়েছে, আবাসনের ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশ বাড়িয়ে এক চুলার জন্য বর্তমান ৭৫০ থেকে বাড়িয়ে ১৩৫০ টাকা এবং দুই চুলার জন্য বর্তমান ৮০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৪৪০ টাকা করার কথা বলা হয়েছে।

যেকোনো বিবেকবান মানুষ বলতে বাধ্য হবেন, এই অযৌক্তিক হারে গ্যাসের দাম বাড়ানো সরকারের মাধ্যমে জনগণের পকেট কাটারই শামিল। তা ছাড়া এর বিরূপ প্রভাব যে অর্থনীতির নানা খাতে পড়বে, তা অস্বীকার করার উপায়ও নেই। বিতরণ কোম্পানিগুলোর এই অযৌক্তিক দাম বাড়ানোর বিরোধিতা করে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি মোহাম্মদ আলী একটি জাতীয় দৈনিকে সাক্ষাৎকার দিয়ে বলেছেন, গ্যাসের প্রস্তাবিত এই দাম বাড়ানো হলে একটি বস্ত্রকলও টিকবে না। তিনি বলেছেন, গ্যাসের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তটি আমাদের ব্যবসায়ীদের জন্য একটি বড় ধরনের দুঃসংবাদ।

গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত বিইআরসির গণশুনানিতে প্রথমবারের মতো ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর সভাপতি শফিউল ইসলামের পাশাপাশি বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএর শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। বিটিএমএর পক্ষ থেকে আমি ছিলাম। সেখানে তিতাসের কর্মকর্তারা গ্যাসের দাম বাড়ানোর পক্ষে যৌক্তিক কোনো কারণ দেখাতে পারেননি। তারা বারবার তাদের শেয়ার মালিকদের মুনাফা দেয়ার কথা বলেছেন। তখন আমি প্রশ্ন করেছিলাম, আপনাদের পাবলিক শেয়ার কত শতাংশ? তিতাসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল ২৫ শতাংশ। এর অর্থ হচ্ছে, ৭৫ শতাংশের মালিক তিতাস গ্যাস।

তিতাস লভ্যাংশের মাধ্যমে লাভ নিচ্ছে। আবার গ্যাসের দাম বাড়িয়েও মুনাফা ঘরে তুলছে। এ ছাড়া সঞ্চালন লাইনসহ অন্য যেসব কারণ কোম্পানিগুলো দেখাচ্ছে, তার কোনো যৌক্তিকতা আমরা খুঁজে পাচ্ছি না। পৃথিবীর কোনো দেশের সরকার গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির মতো পরিষেবা নিয়ে ব্যবসা করে না। কারণ, সেগুলো দিয়ে পরোক্ষভাবে অন্য খাত থেকে লাভ পাওয়া যায়। গত তিন বছরে গ্যাসের দাম ১৩০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। আমাদের নিজস্ব কোনো কাঁচামাল নেই। গ্যাস ও শ্রমই হচ্ছ আমাদের কাঁচামাল। তাই প্রতিযোগিতা করতে হলে ভর্তুকি দামে গ্যাস দিতে হবে।

তিনি যথার্থ বলেছেন, গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে একটি বস্ত্রকলও টিকবে না। হয়তো নিভু নিভু করে জ্বলে এক সময় বন্ধ হয়ে যাবে। বর্তমানে অনেক বস্ত্রকল লোকসানে আছে। সুতা উৎপাদনে যে খরচ হচ্ছে, সে দাম পাওয়া যাচ্ছে না। গ্যাসের দাম বাড়ানোর যে প্রস্তাব দেয়া হয়েছে, তাতে প্রতি কেজি সুতা উৎপাদন খরচ ৫ শতাংশ বেড়ে যাবে। তার প্রশ্ন- সে বাড়তি খরচের টাকা কে দেবে?

সরকার কি ভেবে দেখেছেÑ বস্ত্র ও পোশাক খাত বন্ধ হলে প্রথম আঘাত আসবে ব্যাংক খাতে। পোশাক ও বস্ত্র খাতে ১ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ আছে বিভিন্ন ব্যাংকের। দ্বিতীয় আঘাত আসবে কর্মসংস্থানের ওপর। কারণ, পোশাক ও বস্ত্র খাতে ৫৫ লাখের মতো মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। তা ছাড়া, এ খাতের রফতানি বন্ধ হয়ে গেলে উন্নয়নের চাকাও বন্ধ হতে বাধ্য। গত তিন বছরে ৩ হাজার কোটি ডলারের পোশাক রফতানি হয়েছে। এই পোশাক তৈরির জন্য বস্ত্র খাত সরবরাহ করছে দেড় হাজার কোটি ডলারের কাপড়।

সেটি যদি না থাকে, তবে মূল্য সংযোজন কিছুই থাকবে না। বস্ত্রশিল্প যদি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে পোশাক শিল্পের অর্ডারগুলো চলে যাবে ভারত, ভিয়েতনাম, চীন ও মিয়ানমারসহ বিভিন্ন দেশে। গ্যাসের দাম বাড়ানোর আঘাতই বস্ত্র খাতের একমাত্র আঘাত নয়, আছে ঋণখেলাপের আঘাতও। এমনিতেই অনেক বস্ত্র কারখানা বন্ধ হয় আছে ঋণখেলাপের কারণে। গ্যাসের দাম বাড়ানোর আগে এসব বিষয় সরকারকে ভাবতে হবে।

গ্যাসের দাম বাড়ানোর ফলে দেশের প্রায় সব খাতে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে, সে ভাবনাও এড়িয়ে চলা যাবে না। ব্যবসায়ীরা মনে করছেন তা ব্যবসায়ের স্বাভাবিক গতি বাধাগ্রস্ত করবে। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেছেন, গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে ব্যবসায়ীরা গভীর সঙ্কটে পড়বে। এভাবে যখন তখন জ্বালানির দাম বাড়ানো হলে ব্যবসায়ের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই তিনি গ্যাসের দাম না বাড়িয়ে ভর্তুকির দাবি জনিয়েছেন। তার এই দাবির পেছনে যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে।

ইতোমধ্যে গ্যাসের এই অযৌক্তিক দাম বাড়ানো স্থগিত চেয়ে হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করা হয়েছে। এ রিটের শুনানি এখন চলমান। এই রিটের রায় শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়াবে, তা জানা নেই। তবে সরকারের নেতা-নেত্রীরা এখন বলে বেড়াচ্ছেন, গ্যাসের দাম বাড়ানো হবে সহনীয় মাত্রায়। এতে মনে হয় সরকার গ্যাসের দাম বাড়ানোর অবস্থান থেকে সরে আসবে না। তবে মনে হয়, সার্বিক পরিস্থি’তি বিবেচনা করে গ্যাসের দাম বাড়ানো হবে পুরোপুরি অযৌক্তি এবং তা নিশ্চিতভাবেই দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলবে, এ লেখার মাধ্যমে এই হুঁশিয়ারিটুকু সরকারের কাছে উপস্থাপন করতে চাই।


আরো সংবাদ